জ্বলদর্চি

স্মৃতিকুঠুরির দরজায় …. /মিনতি ঘোষ

স্মৃতিকুঠুরির দরজায় …. 

মিনতি ঘোষ

স্মৃতিঘরের দরজায় হাত রাখলেই কত যে চিত্র বিচিত্র সুর আর স্বরের বিস্তার শুনতে পাই! দরজার ওপারে স্মৃতি-বিস্মৃতির কত জানা, অজানা ছবির চিত্রপট সাজানো। মাঝেমাঝে একাকী থাকার মুহূর্তে - নেই কাজ, খই ভাজার দিনে, বিশেষ ক'রে পাগলা হাওয়ার বাদলা দিনগুলোতে তারা আমায় ডাকে আর ডাকে…
সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার, রোদ-বৃষ্টির আতর মাখা গন্ধ আমাকে নেশাতুর ক"রে তোলে! আমি সেই গন্ধরাজির মধ্যে হঠাৎই ভাতের গন্ধে আকুল হয়ে উঠি। পৃথিবীর আদি, অকৃত্রিম চেতনার ভরকেন্দ্র খাদ্য …খাবার! .. ভাত… ভাত… ভাত ! … ভাত ছাড়া সবকিছু বরবাদ! একছুট্টে আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে আমার কিশোরী বেলা।  আমি তখন ক্লাস সিক্স/সেভেনে পড়ি। সালটা উনিশশ’ছেষট্টি - সাতষট্টি। 

চারিদিকে তখন অন্ধকার। আগের দুবছর ভয়ানক খরার কারণে চালের উৎপাদনে ধস নামে। এর উপর রেশনিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং মজুদদারি, কালোবাজারি বেড়ে যাওয়ায় এক ভয়াবহ খাদ্য সংকট শুরু হয়।  "এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার …"  এমন অন্ধকার জীবনে সেই প্রথম,  বিশেষ করে সেই সময়কার দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের জীবনে। 
🍂
চালের আকাল। কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছেনা। আমাদের রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী তখন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। বললেন ভাত খাওয়ার প্রয়োজন নেই, কাঁচকলা খাও।  ব্যাপক আন্দোলন শুরু হলো - শুধু কলকাতা শহরে নয় জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়লো সে আন্দোলনের ঢেউ। ছাত্র, যুব, সাধারণ মানুষকে আর আটকে রাখা যাচ্ছেনা। পুলিশি দমন পীড়নও চললো। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দুজন - কৃষ্ণনগরের আনন্দ হাইত, বসিরহাটের  নুরুল ইসলাম। আমাদের বস্তির অন্ধকারে সে আলোর খবর এসেছিল কিনা তা জানা নেই, হয়তো বয়সের কারণে তখনও কান প্রস্তুত হয়নি। তবে দেখেছিলাম জোছনা মাসিদের (জ্যোৎস্না)। সেই আকালে পোর্টকমিশনে কর্মরত আমার বাবা মাঝেমাঝে তিন শিফটেই ডিউটি করছেন। সন্তান পরিজনদের মুখে ভাত তুলে দেবার জন্য লালার দোকানে রাতের গভীরে গোপন অভিযান।  লালার লোক পিঠে করে চুপিচুপি আমাদের ঘরে  চালের বস্তা নাবিয়ে দিয়ে যায়। বস্তির মানুষের ঘরে ঘরে তখন ভাত নেই, সে জায়গায় আটা, মাইলো আর গোটামুগ। লালার চালের ভাত আমি খেতে পারছি না। ফুটে উঠলেই কী দুর্গন্ধ! আমি বমি করে ফেলি। বাড়িতে কিন্তু সবাই খাচ্ছে। অসুবিধা হলেও মেনে নিচ্ছে। আমার চেতলা আসরের বন্ধু বাসন্তী। রোজ আসরে যাবার আগে আমাদের বাড়িতে আসে। ওদেরও বাড়িতে ভাত রান্না হচ্ছে না। মা রোজই ওকে ভাত দেয়। বাসন্তী ওর ভাইকে নিয়ে আসে। মা ওকেও খাওয়ায়। আমাদের ঠিক পাশের ঘরেই জোছনা মাসিরা থাকে। মা দু ঘরের বেড়ার পার্টিসনের নিচ থেকে ওদের দিকেও ভাতের থালা বাড়িয়ে দেয়। জোছনা মাসির মেয়ে দেবু আমার বন্ধু।  ওরা ছয় ভাই-বোন, বাবা মা। সন্ধ্যাবেলায় ওদের ঘরে কয়লার উনুনে রুটি হয়। মেসো রুটি বেলে দিতো, দেবু সেঁকতো। আমিও ওদের ঘরে গিয়ে দেবুর কাজে হাত লাগাতাম। আমার খুব ভালো লাগতো রুটি সেঁকতে। একসঙ্গে দশ বারোটা রুটি তাওয়ায়, তারপর তারের উপর রুটি রেখে সরাসরি সে রুটি ফোলানো। ঐ বয়সে দেখেছিলাম আর পরে বুঝেছিলাম গরীব ঘরের পেট ভরাতে হয় রুটির সংখ্যা দিয়ে, খিদে দিয়ে নয় । মেসো কাউকে রুটির লেচি কাটতে বা বেলতে দিত না - খুব ছোট্ট ছোট্ট লেচি করে, বেলতে বেলতে তা বড় করা। বাচ্চাদের বরাদ্দ তিন, মেসো মাসির চার। এর অন্যথা হবে না। দুপুরের খাবার পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কা দিয়ে গোটা মুগ সিদ্ধ। ওটা মাঝেমধ্যে আমিও খেয়েছি। সকাল বেলায় ওদের ঘরে বাচ্চাদের চীৎকার করা কান্না, মেসো কোন বাচ্চাকে হয়তো মারছে। রাতে সবাই যখন ঘুমে, তখন সে হয়তো সকালে কর্পোরেশন স্কুলের টিফিনের জন্য রাখা দুটো রুটি চুরি করে খেয়েছে - সবদিন কি রাতের খিদে মেটে? মাসি আগে মানুষের বাড়িতে কাজ করলেও, সংসার বেড়ে যাওয়ায় চালের ব্যবসায় নামে এ সময়।  

মনে পড়লো দীপ্তি দিদিমণির কথা।  মাসি, মেসো দুজনেই উদয়াস্ত পরিশ্রম ক’রে কোনরকমে সংসার টেনে নিয়ে চলতো।  এত টানাটানি মধ্যেও মাসি হঠাৎ সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়লো । ওদের বাচ্চাদের পড়াতে আসে দীপ্তি দিদিমণি। স্বামী পরিত্যক্তা। পাশেই থাকে। আমাকে মাসি গোপনে ডেকে নিয়ে গিয়ে ঐ দিদিমণির ঘরে মেসোর কোন লিখিত চিঠিপত্র আছে কিনা দেখতে বলতো। ঘর খোলা রেখে সেই দিদিমণি তখন হয়তো বারোয়ারি কলে জল আনতে গেছে। মাসি তো নিজে পড়তে পারে না। এখন আর মনে নেই আমি সেদিন কোন অভিজ্ঞান পত্র পেয়েছিলাম কিনা! 
 তো সেই আকালের সময় জোছনা মাসির মত অনেক গরীব মানুষ এই চাল ব্যবসায় নামে। অল্প পুঁজি। মানুষের কাছ থেকে ধার করে ব্যবসা। লুকিয়ে চুরিয়ে রাতের অন্ধকারে সেই চাল সামান্য মুনাফায় বড়লোক বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। ঠিক যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের "আমি যেন সেই বাতিওয়ালা, যে সন্ধ্যায় রাজপথে- পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য, নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার…" চাল নিয়ে কারবার, অথচ নিজের ঘরেই ভাত নেই। এর কয়েক বছর পর, নিরন্তর এই অভাব অনটনের মধ্যেই সময়মতো বেতন না পেয়ে প্রাইভেট অফিসের পিয়ন মেসো একদিন অফিসেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। 

 জোছনা মাসিদের এই চাল ব্যবসা নিয়ে লিখেছেন জয় গোস্বামী।  লিখেছেন বনগাঁ রানাঘাটের এই চালমাসিদের কথা।  আমার জোছনা মাসিরা যেত ঝিঞ্ঝিরিয়া, নুঙ্গি, লক্ষ্মীকান্তপুর ….আজ জোছনা মাসিদের কথা ভেবে জয় গোস্বামীর সেই কবিতা মনে পড়ে গেল। হুবহু ওদেরই কথা - ওদের জীবন ….

"ফুল  ছুঁয়ে  যায় চোখের  পাতায়,  জল ছুঁয়ে যায় ঠোঁটে
ঘুমপাড়ানি  মাসিপিসি  রাত  থাকতে ওঠে 

শুকতারাটি  ছাদের  ধারে,  চাঁদ  থামে  তালগাছে 
ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি  ছাড়া  কাপড়  কাচে 

দু এক ফোঁটা  শিশির  তাকায় ঘাসের  থেকে  ঘাসে 
ঘুমপাড়ানি  মাসিপিসি  ট্রেন  ধরতে  আসে 

ঘুমপাড়ানি  মাসিপিসি  মস্ত  পরিবার 
অনেকগুলো  পেট  বাড়িতে,  একমুঠো রোজগার 

ঘুমপাড়ানি  মাসিপিসি  পোঁটলা  পুঁটলি  কোথায়?  
রেল  বাজারের  হোমগার্ডরা  সাত  ঝামেলা  জোটায়

সাল  মাহিনার  হিসেব  তো  নেই, জষ্টি  কি  বৈশাখ 
মাসিপিসির  কোলে-কাঁখে  চালের  বস্তা  থাক

শতবর্ষ  এগিয়ে  আসে ---শতবর্ষ  যায়
চাল  তোলো  গো  মাসিপিসি  লালগোলা  বনগাঁয়"

Post a Comment

1 Comments

  1. বড় মর্মস্পর্শী লেখা। সময়টা আমার স্কুল জীবনের শেষ পর্যায়। এত কঠিন অভিজ্ঞতা না হলেও মধ্যবিত্ত পরিবারে এর আঁচ এসে লেগেছিল। বদলাতে হয়েছিল কিছু কিছু খাদ্যাভ্যাস। মায়েদের কষ্ট ছিল সব থেকে বেশী।

    ReplyDelete