দূরদেশের লোকগল্প-- ৩০৪
ভালুক পালালো ভয় পেয়ে
(নেটিভ আমেরিকানদের গল্প)
চিন্ময় দাশ
বনের ধারে থাকত এক বেজি পরিবার। মাটির নিচে তাদের ঘর। দেয়াল আর ছাদ পাথর আর খড় দিয়ে ঢাকা।
বাবা বেজি ছিল বড় শিকারি। হরিণ আর বাইসন শিকার করে রোজ কাঁধে করে মাংস নিয়ে আসত। মা বেজি সেই মাংস পাতলা করে কেটে, লম্বা লাঠিতে শুকোতে দিত। রোদে হাওয়ায় শুকিয়ে গেলে, সেই মাংস সে সুন্দর রঙ করা বড় চামড়ার থলিতে ভরে রাখত।
সেই থলিগুলো ঘরের পাথরের দেয়ালে সাজানো থাকত। দেখতে যেমন সুন্দর, কাজেও লাগত। ছোট ছোট বেজি ছানারা মোটাসোটা। ছানাগুলো সারাদিন হুটোপাটি করত, আর ছোট ছোট ঘর বানানোর খেলা খেলত।
একদিন বাবা বেজি শিকারে গেল না। ঘরে বসে নতুন তীর বানাচ্ছে। বাচ্চারা গোল হয়ে বসে রঙ করা তীর দেখছে আর খুশিতে চোখ চকচক করছে। হঠাৎ দরজার কাছে ভারী পায়ের শব্দ। দরজার পর্দা সরে গেল। প্রথমে ঢুকল একটা বড় কালো থাবা, তাতে বড় বড় নখ। তারপর আরেকটা থাবা। তারপর উঁকি দিল একটা বড় কালো ভালুকের মাথা!
তার নাক শুকনো, চোখগুলো দেয়ালে ঝোলানো মাংসের থলির দিকে। সে খুব ক্ষুধার্ত ছিল। বাইরে শুকোতে দেওয়া মাংসের গন্ধ পেয়ে, সে এসেছে।
ছোট বেজিরা ভয়ে তাকিয়ে রইল। কিন্তু বাবা বেজি বলল, "এসো। এসো, বন্ধু! তোমার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, ক্ষুধার্ত মনে হচ্ছে। আমাদের সাথে খাবে?"
ভালুক বলল, "হ্যাঁ বন্ধু, আমি খুব ক্ষুধার্ত। তোমার শরীরে দয়া আছে জানি বলেই এসেছি।"
মা বেজি তাড়াতাড়ি সবচেয়ে নরম মাংস নিয়ে আগুনে ঝলসে দিল। সেদিন ভালুকটা পেট ভরে খেল। রাতে ঢেকুর তুলতে তুলতে সে চলে গেল।
তারপর থেকে রোজই ভালুক আসতে লাগল। কোনোদিন বাদ দেয় না। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে, দরজার পাশেই বসে। মা বেজি তার জন্য একটা লোমের আসনও পেতে দেয়, যাতে অতিথিকে মাটিতে বসতে না হয়।
এইভাবে রোজ মাংস খেতে খেতে ভালুক মোটা হয়ে গেল। লোম চকচকে হয়ে গেল। একদিন সে এসে আর বসল না। দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে দুষ্টু আলো। বাবা বেজি বলল, "কী হলো বন্ধু?"
ভালুক এক পা এগিয়ে এসে, থাবা উঁচিয়ে বলল, "আমি এখন শক্তিশালী হয়েছি। খুব শক্তিশালী!"
বাবা বেজি বলল, "হ্যাঁ, তা তো বটেই।"
মা বেজি দূর থেকে বলল, "হ্যাঁ, আমাদের খাবার খেয়েই তো শক্তিশালী হয়েছো।"
ভালুকটা দাঁত বের করে হাসল। বলল, "আমার কোনো ঘর নেই, শুকনো মাংসের থলি নেই, তীর নেই। এখানে সব আছে। আমি এগুলো চাই! দেখতেই পাচ্ছো, আমি কত শক্তিশালী!"
বাবা বেজি শান্ত গলায় বলল, "আমি তোমাকে খাইয়েছি, বন্ধু বলেছি। আমার বাচ্চাদের কথা ভেবে, আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও।"
ভালুক কোনো কথা শুনল না। সে গর্জন করে উঠল - "ওয়া-উউফ!" - আর এক ধাক্কায় সবাইকে ঘর থেকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। প্রথমে বাবাকে, তারপর মাকে, তারপর বাচ্চাদের দুটো দুটো করে ধরে বাইরে ফেলে দিল।
দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, "ভাগো এখান থেকে!
বেজি পরিবার কাঁদতে কাঁদতে দূরে গিয়ে লতা আর ঘাস দিয়ে একটা ছোট্ট কুঁড়ে বানাল। কিন্তু সেখানে কোনো খাবার নেই, তীরও নেই। বাবা বেজি সারাদিন বনে ঘুরল, কিন্তু তীর ছাড়া শিকার করতে পারল না। বাড়ি ফিরে দেখে বাচ্চারা খিদেয় কাঁদছে। বাবা বেজি বলল, "আমি তোমাদের জন্য ভিক্ষা করে খাবার আনব।"
সে একটা লম্বা চাদর গায়ে দিয়ে ভাল্লুকের কাছে গেল। ভাল্লুক তখন মাংস কাটছে। তার পুরো পরিবারকে নিয়ে এসেছে। ছোট ভাল্লুক ছানারা নতুন মাংসের নিচে খেলা করছে। বাবা বেজি বলল, "ভাল্লুক ভাই, আমার বাচ্চারা না খেয়ে আছে। একটু মাংস দাও।"
ভালুক গর্জন করে উঠল। পিছনের পা দিয়ে বেজিকে লাথি মেরে ফেলে দিল। অন্য সব ভালুকছানারা হো হো করে হেসে উঠল।
হাসল না শুধু সবচেয়ে ছোট ছানাটা। তার লোম কালো নয়, কটা-কটা আর রুক্ষ। সবাই তাকে কুৎসিত বলে হাসাহাসি করত। তার মনটা কিন্তু খুব ভালো ছিল।
বেজিদের অভাবের কথা শুনেছে ছোটটা। এখন বাবা বেজির হেনস্থা দেখে তার খুব কষ্ট হলো। সে ভাবল, "বাবার কাছে চাইলে, বাবা তো দেবে না, দাদারা হাসবে।" তাই সে গান গাইতে গাইতে ঘাসের ভেতর দিয়ে বেজিদের কুঁড়ের দিকে গেল। কুঁড়ের সামনে এসে সে পিছনের পা দিয়ে একটা লাথি মারল। এক টুকরো তাজা মাংস বেজিদের কুঁড়েতে পড়ল। খুশি মনে তাড়াতাড়ি বাবার কাছে ফিরে গেলছানাটা, যাতে কেউ টের না পায়।
পরদিন বাবা বেজি আবার গেল। এবারও ভালুক তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। বেজি পড়ল ভেজা ঘাসের ওপর, যেখানে রক্ত লেগে ছিল। তার চোখে পড়ল একটু জমাট রক্ত। ভালুক অন্যদিকে তাকাতেই, সে রক্তটা চাদরের নিচে লুকিয়ে নিল।
বাড়ি ফিরে বেজি ভাবল, "এই রক্তটা পবিত্র মনে করে, মহান আত্মার কাছে প্রার্থনা করব।"
সে ছোট্ট একটা ঘাম-ঘর বানাল। গরম পাথরে জল ঢেলে ধোঁয়া করল। এবার রক্তটা পাথরের পাশে রেখে বলল, "হে মহান আত্মা, এই ছোট্ট রক্তটাকে আশীর্বাদ করো।"
তারপর ঘর থেকে কেমন একটা সন্দেহ হোল বেজির। পিছনে কে যেন আসছে। ফিরে দেখে, সুঠাম চেহারা এক যুবক! গায়ে সুন্দর জমকালো পোশাক। হাতে এক জাদুর ধনুক। পিঠে তীরভরা থলি।
বেজি অবাক হয়ে বলল, "কে তুমি, যুবক!"
যুবক বলল, "তোমার একজন ছেলে বলেই ভাবো আমাকে। আমি তোমার প্রতিশোধ নিতে এসেছি।"
বেজি তাকে সব দুঃখের কথা খুলে বলল। যুবক সব শুনে বলল, "চলো, আবার সেই ভতভাগা ভালুকের কাছে যাই।"
ভালুক দূর থেকে তাদের আসতে দেখে, বেদম ভয় পেয়ে গেল। যুবকটির হাতে জাদুর তীর! বুক কাঁপতে লাগল ভালুকের। প্রতিশোধ নিতে আসা বীরের কথা তার শোনা ছিল। এখন নিজের সামনে তাকে ভয় পেয়ে গিয়েছে।
ভালুক চালাকি করে, হেসে বলল, "এসো। এসো, বেজি বন্ধু! এই নাও ছুরি। তোমার পছন্দ মতো মাংস কেটে নাও।"
বেজি ছুরি নিল। তখন যুবকটি ভালুকের চোখের দিকে তাকিয়ে, গম্ভীর গলায় বলল, "আমি ন্যায়বিচার করতে এসেছি। তুমি আমার বাবাকে শুধু একটা ছুরি ফিরিয়ে দিলে। এর জন্য ধন্যবাদ। এবার তার ঘর ফিরিয়ে দাও।"
ভালুক ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে, চিৎকার করে বলল, "পালাও সবাই! এটা বেজির ঘর! ফিরিয়ে দিতে হবে তাকে। জাদু তীর নিয়ে প্রতিশোধ নিতে এসেছে! এক্টুও দেরি নয়। পালাও!"
সব ভালুক হুড়মুড় করে বেরিয়ে, বনে পালিয়ে গেল। বেজি পরিবারও হাসতে হাসতে, গান গাইতে গাইতে ফিরে এলো নিজেদের ঘরে।
এবার সেই যুবক বলল, "আমি চললাম। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হবে আমাকে। যেখেন ডাক পড়বে, গিয়ে দাঁড়াতে হবে আমাকে। বিধাতার হুকুম।
0 Comments