জ্বলদর্চি

'পড়ন্ত পালকে বাতাস' নিয়ে কলম ধরেছেন দেসা মিশ্র

'পড়ন্ত পালকে বাতাস' নিয়ে কলম ধরেছেন দেসা মিশ্র


সঞ্জীব ভট্টাচার্য পেশায় একজন শিক্ষক, তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি শব্দ শ্রমিক ও। "পড়ন্ত পালকে বাতাস " তাঁর লেখা এই কাব্যগ্রন্থটি আমার হাতে আসে প্রকাশক ঋত্বিক ত্রিপাঠি-র মাধ্যমে। এর আগেও তাঁর দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর কবিতার চলন বেশ সুন্দর, কোনো এক ঘিয়েমি ভাবনা সেখানে নেই, প্রতিটা কবিতায় একে অপরের থেকে আলাদা।
প্রথম কবিতা "যাপন কথা",

"এখনো অনিশ্চিত হাওয়া এখানে যাওয়া মানে পৌঁছানো দ্বিমুখী "- কবিতায় তিনি যাওয়া আর থেকে যাওয়ার মধ্যেকার মানুষটির কথা বলেছেন।মানুষের এই যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাজারো প্রশ্ন যেগুলো অনেক সময় বেশ স্বাভাবিক, তার মধ্যেকার দোটানা...
গেলেও ঠিক কেমন হবে সেই যাওয়ার পদ্ধতি?
প্রতিটা মানুষের মনে যে দ্বন্দ্ব চলে তা কবি নিজগুনে কবিতায় রুপ দিয়েছেন।

আবার "আশ্বাস" কবিতায় আট লাইনের স্বল্প কথনের মধ্যে দিয়ে বলেছেন "ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে বাঁধ /
গচ্ছিত জল ভাসিয়ে দেই সহায় সম্বল "
কবি জীবন প্রবাহে বাঁধা অতিক্রম করার জন্য যত বাঁধ দিয়েছিলেন সবই ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে সময়ের চাপে,প্রাণ প্রবাহে তাই তিনি পচন অনুভব করেছেন, যখন কবিতা এই পথে হাঁটছে হঠাৎ কবি তার মন পথ দ্রুত বদলে দিলেন অন্ধকার গলি আলোকিত রাজপথ হয়ে গেলো তিনি লিখলেন - জাহাজী চোখ খোঁজে অর্ধমৃত মানুষ /তার মধ্যে জেগে থাকে মন্দিরের চূড়া /আশ্রতি পক্ষী শাবক আর তার বাসা।
ডুবন্ত আশায় তিনি আবার প্রাণ সঞ্চার করলেন আর এখানেই একজন কবির জয়।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একজন কবি তার শব্দ দ্বারা শক্তি প্রেরণ করেন। আশা জাগিয়ে রাখেন জীবনের।

"জলবাসী "-কবিতার নামকরণ বেশ সহজ স্নিগ্ধ।
অথচ তার ভেতরের যে শব্দাল্পনা কবি এঁকেছেন তা বেশ গভীর।
"কাল সারারাত বৃষ্টি বেদম,
...
বুক তথাপি শুকনো নিপাট 
কেউ আসেনা কেউ যায় না 
দুলতে থাকে খোলা কপাট "
।
রাতের গভীরতা হাতড়ে কবি দীর্ঘ শুন্যতা পেয়েছেন,বৃষ্টির ফোঁটারা যেন কবির হৃদয়ে এক জল ঘূর্ণির জন্ম দিয়েছে সেখানে তিনি নিজেই নিজেকে আকুল হয়ে খুঁজছেন, এ যেন কালের ঘূর্ণি,
যেখানে তিনি বৃষ্টির আনন্দে ভেসে যেতে পারছেননা। শহর জুড়ে বৃষ্টি হলেও তার রাস্তা যেন আনন্দের বিপরীতে, নিজেকে তিনি একা হয়ে যেতে দেখছেন,,
এবারও শেষের দিকে এসে কবি তার শব্দের জাদুতে কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন তিনি লিখলেন - "বৃষ্টি তুমি বন্যা এনো /ঘর ভেসে যাক ভাটিয়ালি /জলের সঙ্গে বাকি জীবন জলের সঙ্গে গ্রহস্থালি"।
পরে তিনি সেই প্রতিকূল অবস্থাকে ভালোবেসেছেন অর্থাৎ তিনি বৃষ্টিকেই বন্যা হয়ে এসে ঘরে ছড়িয়ে দিতে বলেছেন ভাটিয়ালি সুর-আলো।
তিনি যাপনের শুন্যতাকে পেরিয়ে জল কে করেছেন জীবনের প্রতীক সৃষ্টির অলংকার, তাই তিনি বাকি জীবন জলের সঙ্গেই কাটাতে চান।
কবিতার "ভাসান"এ আমরা দেখি জীবনের চরম সত্যকে তিনি রুপ দিয়েছেন এই ভাবে,-সাজানো ঘর দরজা খোলা /ফুলদানি আর ফুলের জীবন /যখন তখন এভাবেই তো আঙ্গুল দিয়ে আঙ্গুল কথা 

                ঘর আমাদের সাজানো থাকে অথচ শেষ যাওয়া এতো ভীষণ সত্য যে তার দরজা যেন সব সময় খোলা, সে দরজা বন্ধের মতো মন্ত্র কারোর জানা নেই।
দেয়াল জুড়ে তিনি দেখেছেন যুগ্ম ছায়া, সম্পর্কের নানা রকম মায়াজাল আর একটা নরম জীবন ই যেন এক পয়সার দুটো দিক কঠিন ও তরল।
শেষে এসে তিনি যখন লেখেন,-ভাসান ভাসান জলের শব্দে/নীরেট ঘর ফাঁপা বুকে /ঘরের সঙ্গে খিড়কি ছিল/বোকা ছেলে জানতো না।
শেষে যেন তিনি ব্যর্থ হয়েছেন,  তার ভুল হয়ে গেছে চাবি চিনতে, কিম্বা বেরোনোর পথ ছিলো কিন্তু তিনি সময়ের ছলনায় তা জানতে পারেন নি,
                সত্যি তাই,আমরা এতো চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে যায় জীবনের টানা পোড়ানে যে সেই বিপদ থেকে বেরোনোর পথ আমরা খুঁজেই পাই না, বার বার একই পথে ঘুরতে থাকি যেন গোলক ধাঁধা।

"এক্সিট"-কবিতায় মানুষের একাকিত্বকে বুঝিয়েছেন, তিনি তার যে সম্পর্কগুলো নিয়ে নিশ্চিন্তে ছিলেন সেগুলোই তাকে যেন বেশি কষ্ট দিয়েছেন, তার অনুভূতি গুলো নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, এই আঘাত যেন তীব্র আঘাত,যার জন্য কবি মস্তিষ্কের একটা ঘর পেরিয়ে গেলে যেন মনে হচ্ছে,-" ঘরের ভেতর ঘর /তার মধ্যে রহস্যে ভরা গলি /ঘুর পাক খেতে খেতে /মাথা ও দেহ ঘাড়শূন্য বারবার।
অর্থাৎ একটা চরম ভয় যেন নিজের অস্তিত্বকে হিলিয়ে দিচ্ছে, মাথা দেহ সব অবশ হয়ে আসছে নানা চিন্তায়।
             পরে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তার মেরুদন্ড আকাশের দিক চেয়ে শক্তি অর্জন করে নিলো যেন, শরীরে আবার জীবনের তীব্র রক্ত প্রবাহ শুরু হলো, এবং তিনি বুঝলেন, এসব সমস্যার খুব সহজ সমাধান আছে, কবির ভাষায়, -"আমার সামনেই মাথা উঁচু এক্সিস্ট লেখা দরজা"।

"আগুন ও ছাই " পড়তে পড়তে অসীমের সাথে কবির একাত্ম হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পাই। অসীমের টানে তার ছুটে যাওয়া আকাশ কে পাওয়ার তীব্র আকুলতা তাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোনো এক অজানা স্রোতে,
 তিনি বলেছেন -"সেখানে রয়েছো তুমি স্থির /সঙ্গে নিয়ে সমস্ত বৈভব /পরে আছে ছাই এর মাঝে /নিখুঁত আমার অবয়ব।
যেন উর্দ্ধেকাশে সমস্ত নিজের অহংকার ভাসিয়ে দিয়ে তিনি পুড়ে ছাই হয়েছেন, আর সেই ছাই এর মধ্যে তিনি নিজেকে দেখতে পেয়েছেন নিখুঁত আলোয় নিখুঁত হয়ে।
শেষ কবিতা কবিকে চিন্তার অনেক উর্দ্ধে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তার এই শব্দ যাত্রা দীর্ঘ ও মঙ্গলময় হোক।

🍂

Post a Comment

0 Comments