গ্রন্থ সমালোচনা ―ড.অন্তরা ঘোষ
দিলীপ মহান্তীর 'মৌসুমি বায়ুর দেশ'একটি ঋতু-কেন্দ্রিক আত্ম-অন্বেষণের দলিল। ৪৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে মোট ৪০টি কবিতা আছে, যার শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় কবির পরিভ্রমণের মানচিত্র। বইটির নামকরণই একটি ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিত বহন করে। মৌসুমি বায়ু শুধু ভারতের কৃষি-জীবনের নিয়তি নয়, এটি বাঙালির মননেরও নিয়তি - আশা, অপেক্ষা, উৎকণ্ঠা, প্রেম ও বিরহের চিরন্তন আবর্তন।
গঠন ও বিষয়-বিন্যাস:
সূচিপত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায় কবি অত্যন্ত সচেতনভাবে কবিতাগুলিকে সাজিয়েছেন। গ্রন্থটি শুরু হচ্ছে 'অভিষিক্তা' দিয়ে -
"এই মাত্র ভূমধ্যসাগর থেকে তুমি উঠে এলে
সিক্ত তুমি
গড়িয়ে পড়ছে আলো ধুলো শুষে নিতে
তোমাকে নিঙড়ে নেয়"
এখানে মৌসুমি বায়ু এক রমণী, এক প্রেমিকা। ভূমধ্যসাগর থেকে উঠে আসা মেঘকে কবি নারী-রূপে কল্পনা করেছেন। ইরান-আফগানিস্তান পেরিয়ে তার ভারত-আগমন যেন এক প্রেমিকের ঘরে ফেরা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমগ্র গ্রন্থে ধরা পড়েছে।
কাব্যগ্রন্থটিকে বৈশিষ্ট্যের আঙ্গিকে মোটামুটি চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ক) প্রকৃতি ও ঋতুচক্র:
'স্নান', 'বৃষ্টি', 'মেঘাগ্নি', 'মেঘমল্লার', 'বর্ষণমালা', 'মেঘমালা', 'মেঘের পালক', 'মেঘলা', 'বর্ষা', 'মেঘতিমির' - এই কবিতাগুলি মেঘ ও বৃষ্টির নানা রূপকে ধরে। 'স্নান' কবিতায় বৃষ্টি শুধু প্রকৃতিকে ধোয় না, আত্মাকে শুদ্ধ করে। 'আশ্বিনের ঝড়' বা 'সমুদ্র মন্থন' -এ প্রকৃতির প্রলয় ও সৃষ্টির দ্বৈততা ফুটে ওঠে।
🍂
খ) লোক-উৎসব ও মাটির গন্ধ:
'টুসু', 'জাওয়া', 'করম', 'ইঁদ', 'নবান্ন', 'পুজো' - এই কবিতাগুলি গ্রন্থটিকে শুধু প্রাকৃতিক নয়, সাংস্কৃতিক করে তুলেছে। কবি দিলীপ মহান্তী মেদিনীপুর-জঙ্গলমহলের মানুষ। টুসু-ভাদু-করমের যে লোকায়ত পরম্পরা, তা এখানে নাগরিক কবিতায় নতুন মাত্রা পায়। 'টুসু' কেবল উৎসব নয়, মাটি-কন্যার অপেক্ষার প্রতীক।
গ) মানবিক ও দার্শনিক:
'স্বার্থপর', 'ঠিকানা', 'অপেক্ষা', 'দেবতা', 'অম্বুবাচী', 'সহজ পাঠ', 'জয়' - এখানে কবি ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসায় ফেরেন। 'যাও, উত্তরে' বা 'এসো, মৌসুমি', 'এসো, দক্ষিণে' - এই সম্বোধনমূলক কবিতাগুলি এক ধরনের আহ্বান, যেখানে বায়ুকে, মানুষকে, সময়কে ডাকা হচ্ছে।
ঘ) নাম-কবিতা 'মৌসুমি বায়ুর দেশ':গ্রন্থের শেষ কবিতাটি সার-সংকলন। এখানে দেশ মানে শুধু ভূখণ্ড নয়, একটি মনের অবস্থা - যেখানে সবাই অপেক্ষা করে আছে, ভিজবে বলে, বাঁচবে বলে।
কাব্যভাষা ও নির্মাণ-কৌশল:
দিলীপ মহান্তীর ভাষা আটপৌরে অর্থাৎ ঘরোয়া বা অনানুষ্ঠানিক, কিন্তু চিত্রকল্পে অত্যন্ত আধুনিক এবং মননধর্মী। তিনি অলংকারের আতিশয্য এড়িয়ে চলেন। তাঁর পঙক্তি ছোট, অনেকটা শ্বাস-ছন্দে লেখা। যেমন 'অপেক্ষা' বা 'বৃষ্টি' কবিতায় একটি মাত্র দৃশ্যকে তিনি ধরে রাখেন দীর্ঘক্ষণ।
তাঁর একটি বড় শক্তি হলো 'দৃশ্য থেকে দর্শনে' যাওয়া। একটি সাধারণ বৃষ্টির দৃশ্য থেকে তিনি চলে যান অস্তিত্বের প্রশ্নে - 'ঠিকানা' কবিতায় যেমন। আবার পৌরাণিক অনুষঙ্গ - 'সমুদ্র মন্থন', 'অভিষিক্তা', 'চিত্রলেখা' - এগুলিকে তিনি সমকালের মাটিতে নামিয়ে আনেন। দেবতা আর মানুষের মধ্যে বিভেদ ঘোচে।
পরিশেষে বলা যায় যে,'মৌসুমি বায়ুর দেশ' কোনো আকস্মিক উচ্ছ্বাসের কবিতা নয়। এটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও জীবন-যাপনের ফসল। এই সময়ে যখন বাংলা কবিতা অনেকটাই নগর-বিচ্ছিন্নতা বা আত্ম-প্রচারে ব্যস্ত, তখন দিলীপ মহান্তী আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান মাঠে, মেঘে, টুসুর গানে, নবান্নের ধানে। তাঁর কবিতায় পরিবেশ-চেতনা আছে, কিন্তু তা স্লোগান নয়; তা প্রেম।
0 Comments