জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ দিবস/ দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ দিবস 

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৬ই নভেম্বর, আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ দিবস। মানব সভ্যতাকে বাঁচাতে গেলে আগে প্রকৃতিকে বাঁচাতে হবে। প্রকৃতি বাঁচানোর অঙ্গীকার নিয়ে আমরা এগিয়ে চলি, আসুন এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্মল বাতাস, স্বচ্ছ জল, সবুজ বনভূমি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র এবং জীববৈচিত্র্য, সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। মানুষ প্রকৃতির সন্তান, অথচ আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে, সঙ্গে মানুষই আজ প্রকৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। পরিবেশদূষণ, বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার অপচয় পৃথিবীর অস্তিত্বকে ক্রমশ সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ৬ই নভেম্বর পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। পরিবেশ কেবল আমাদের বসবাসের স্থান নয়, এটি আমাদের জীবনধারণের মূল ভিত্তি। মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, অক্সিজেন ও পানীয় জলের প্রধান উৎস প্রকৃতি। অথচ মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য আজ বিপর্যস্ত। নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে ফেলা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং প্লাস্টিকের দূষণ পরিবেশকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে।
এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই পরিবেশগত সংকটের প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মের উপরেই সীমাবদ্ধ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও এর কঠিন মূল্য দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের ভবিষ্যৎ
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নির্গমনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে উপকূলবর্তী অঞ্চলে। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপন্নতার সম্মুখীন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে এবং বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, তাই পরিবেশ সংরক্ষণ এখন আর কেবল প্রকৃতিপ্রেমীদের দায়িত্ব নয়, এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা পরিবেশবিদদের নয়। প্রত্যেক মানুষের ছোট, ছোট উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন,
প্রথমত, বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে কাপড় বা পাটের জিনিস ব্যবহার  করতে হবে।
তৃতীয়ত, নদী, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়কে দূষণমুক্ত রাখতে হবে।
চতুর্থত, জল ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করতে হবে।
পঞ্চমত,ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে সম্ভব হলে গণপরিবহণ ও পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহার করতে হবে।
🍂
ষষ্ঠত, বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং পুনর্নবীকরণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তমত,বিদ্যালয়, কলেজ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
অষ্টমত,বন, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
নতুন প্রজন্মের ভূমিকা
পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পৃথিবীর নাগরিক, তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জল সংরক্ষণ এবং পরিবেশবিষয়ক আলোচনা ও কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা যেতে পারে। প্রযুক্তির উন্নয়নকে কাজে লাগিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন প্রকৃতির ক্ষতির বিনিময়ে না হয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষ ও প্রকৃতি পাশাপাশি সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারবে। পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। একে ধ্বংস করে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ করা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য প্রাণের আশ্রয় তৈরি করা। নদী বাঁচানো মানে জীবনের প্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখা। প্রকৃতিকে রক্ষা করা মানেই নিজেদের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা।
আসুন, ৬ই নভেম্বরকে সামনে রেখে আমরা সবাই একটি অঙ্গীকার গ্রহণ করি, প্রকৃতিকে ভালোবাসব, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নির্মল ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলব, কারণ, পৃথিবীকে আমরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাইনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।

Post a Comment

0 Comments