দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৭ই নভেম্বর, জাতীয় ক্যান্সার সচেতনতা দিবস। ক্যান্সারের শব্দেই যেকোন মানুষ ভীত হয়ে পড়ে, কারণ এই রোগ যে সেরে যাবেই, সেরকম নাও হতে পারে। আসুন, এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই। সচেতনতাই হোক ক্যানসার জয়ের প্রথম পদক্ষেপ। ক্যানসার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয়, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একসময় ক্যানসার মানেই যেন ছিল মৃত্যুর আশঙ্কা, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে আজ সেই ধারণা অনেকটাই বদলেছে। সময়মতো রোগ নির্ণয়, যথাযথ চিকিৎসা এবং সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে বহু ক্ষেত্রেই ক্যানসারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব, এমনকি রোগের সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ জীবনেও ফিরে আসা যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রতি বছর ৭ই নভেম্বর ভারতে পালিত হয়, জাতীয় ক্যানসার সচেতনতা দিবস। এই দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো, ক্যানসার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করা। ২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. হর্ষবর্ধন জাতীয় ক্যানসার সচেতনতা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই থেকে দিনটি ক্যানসার প্রতিরোধ ও সচেতনতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। ক্যানসার আসলে একক কোনো রোগ নয়। শরীরের কোনো অংশের কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন ক্যানসারের সৃষ্টি হতে পারে। স্তন ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, জরায়ুমুখের ক্যানসার, মুখগহ্বরের ক্যানসার, পাকস্থলীর ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার মানুষের শরীরে দেখা যায়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে বয়স, বংশগত কারণ, পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ক্যানসারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এর লক্ষণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক পিণ্ড, দীর্ঘদিনের কাশি, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, খাবার গিলতে অসুবিধা কিংবা মল-মূত্রের অভ্যাসে পরিবর্তন, এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। অবশ্য এই লক্ষণগুলির অর্থ সবসময় ক্যানসার নয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতন জীবনযাপনের গুরুত্ব অপরিসীম। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার পরিহার করা, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, মদ্যপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি ও হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের (HPV) মতো কিছু সংক্রমণ প্রতিরোধে উপযুক্ত টিকাকরণও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, লিঙ্গ ও ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করানোও ক্যানসার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ,
তবে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু চিকিৎসকের চেম্বার বা হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই লড়াইয়ে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনও ক্যানসার সম্পর্কে নানা ভুল ধারণা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা রয়েছে। অনেকেই সামাজিক লজ্জা কিংবা ভয়ের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।
🍂
আবার আর্থিক অসুবিধা ও চিকিৎসার সুযোগের অভাবও বহু মানুষের কাছে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যশিবির, সচেতনতামূলক প্রচার, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পরীক্ষা এবং সহজলভ্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান, ভালোবাসা, মানসিক শক্তি ও সহযোগিতা। ক্যানসার সংক্রামক রোগ নয়, তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাঁদের মানসিক সুস্থতা এবং চিকিৎসার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে পরিবারের সদস্য ও সমাজের মানুষের ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জাতীয় ক্যানসার সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম অস্ত্র হলো সচেতনতা। ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য। অবহেলা নয়, প্রয়োজন সময়মতো চিকিৎসা। কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতা। শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে সচেতনতা প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, এই সচেতনতাকে প্রতিদিনের জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে হবে। আসুন, এই জাতীয় ক্যানসার সচেতনতা দিবসে আমরা নিজেরা সচেতন হই, অন্যকেও সচেতন করি। তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে গুরুত্ব দিই এবং ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই। মনে রাখতে হবে, ক্যানসার মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ অনেক জীবনকে নতুন আশার আলো দেখাতে পারে।
0 Comments