জ্বলদর্চি

সঞ্জীব ভট্টাচার্যের 'পড়ন্ত পালকে বাতাস' ― শরণার্থী জীবনবোধের কবিতা/ড.অন্তরা ঘোষ

সঞ্জীব ভট্টাচার্যের 'পড়ন্ত পালকে বাতাস' ― শরণার্থী জীবনবোধের কবিতা

ড.অন্তরা ঘোষ


সঞ্জীব ভট্টাচার্যের 'পড়ন্ত পালকে বাতাস' কোনো আকস্মিক বই নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে শব্দের সঙ্গে বসবাসের ফসল। নামের মধ্যেই এই বইয়ের দর্শন লুকিয়ে আছে। আমাদের এই দ্রুত বয়ে চলা জীবন, আমাদের একাকীত্ব, আমাদের প্রেম, আমাদের বিষণ্ণতা - সবই যেন সেই পলকের বাতাসের মতো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু গভীর।

বইটিতে মোট ৪০টি কবিতা আছে। সূচিপত্র দেখলেই বোঝা যায় কবির বিচরণ কত বিস্তৃত।

'পড়ন্ত পালকে বাতাস' কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতাটিই পুরো কাব্যের মূল সুর যেন। 
এটি এক আশ্চর্য শূন্যতা আর সরে যাওয়ার কবিতা।
কবি এখানে বলেছেন,―
"একটু একটু করে সরে যাচ্ছে মাটি,
 ক্রমাগত আলগা হয়ে শেকড়-বাকড়।"
এখানে মাটি সরে যাওয়া মানে শুধু প্রকৃতি নয়, আমাদের জীবনের ভিতটাই আলগা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের শেকড়, আমাদের সম্পর্ক, আমাদের বন্ধুত্ব সব আলগা।
নাম কবিতার সবচেয়ে আধুনিক উচ্চারণ―
"বন্ধুত্বের সংজ্ঞাও সফটওয়্যার গামী"
আজকের বন্ধুত্ব ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে বন্দী। সফটওয়্যার আপডেটের মতোই বন্ধুত্ব পাল্টে যায়। ভিড়ের মধ্যে মুখ পাল্টাতে থাকে।
এখানে কবি নিজের অসহায়তার কথা বলছেন - নতুন বছর এসে সবকিছুকে পুরনো করে দেয়, এমনকি আমাকেও। এই চোখ ধাঁধানো জৌলুস, এই উজ্জ্বল আলোর মধ্যে আমরা সবাই আসলে শরণার্থী। আর আমাদের শব্দগুলো একঘেয়ে হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
এক কথায়, এটি একাকীত্ব, শেকড়হীনতা এবং আধুনিক সম্পর্কের ভাঙনের কবিতা।

 শব্দ ও নিস্তব্ধতার দ্বন্দ্ব কবির কাব্যে এক বিশেষ জায়গা নিয়ে নিয়েছে।প্রথম কবিতা 'হাত পেতে আছি শব্দ' তে কবি লিখছেন,
 "হাজার শব্দের ভিড়ে হঠাৎ  নিস্তব্ধতা জেগে ওঠে।"
আজ চারদিকে শব্দের বন্যা, ফেসবুক, মেসেজ, কোলাহল, অথচ প্রকৃত অর্থবহ শব্দের কত অভাব। তাই কবি হাত পেতে বসে আছেন, যদি দু-একটা সত্যিকারের শব্দ ঝরে পড়ে। যেমন―
"ঘুমানো গাছকে ছুঁতে গিয়ে  কোটরে হারিয়ে যায় অস্তিত্ব"
-এই একটি পঙক্তি আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরে।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি আশ্রয় হলো জল ও বৃক্ষ। 'জলবাসী' এই কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি। কবি বলেন,
"কাল সারারাত বৃষ্টি বেদম
 পাতা এবং শেকড় জানে।"
-এখানে একাকীত্বের এক নিটোল চিত্র লক্ষ্যণীয়। কেউ আসে না, কেউ যায় না, শুধু খোলা কপাট দোলে। এই শূন্যতায় কবি বৃষ্টিকে বলেন,
"বৃষ্টি তুমি বন্যা এসো,
 ঘর ভেসে যাক ভাটিয়ালি"। 
এখানে জল ধ্বংস নয়, জল হলো মুক্তি। সব মলিনতা ধুয়ে নতুন করে বাঁচার আকুতি।
আবার 'বৃক্ষকথা' কবিতায় তিনি বলেন, মানুষের প্রতিটি কাজ - খাওয়া, ওঠা-বসা, রমণ - সবই বৃক্ষ ছাড়া অসম্পূর্ণ। অথচ মানুষ উদাসীন। 
"একটি গাছের কথাতেও অন্য গাছের ভূমিকা থাকে।"
-এই পারস্পরিক নির্ভরতার বোধ আজকের স্বার্থপর সময়ে খুব জরুরি।

'এক গণ্ডীবদ্ধ আত্মকথা' আজকের  আমাদের প্রতিচ্ছবি,― 
"ইদানিং জমে যাচ্ছে নুড়ি ও পাথর
কোথাও জলের গভীরতা নেই।"
 আমরা নিজের চারপাশে পাথর দিয়ে নিশ্ছিদ্র দেওয়াল তুলতে তুলতে নিজেরাই নিজেদের সুড়ঙ্গে বন্দী হয়ে যাই।
"একটা হাসিমুখ ফোটাতে অক্ষম আমি
কী করে যে এত কান্না মুছে দিতে পারি।"
এই অসহায়তা আমাদের সবার।

প্রেমের কবিতায় কবি প্রচলিত রোমান্টিকতা ভাঙেন। 'চিরন্তন' কবিতায় তিনি বলেন, 
"এ শহর, এ জনপদ সব ভুলে চল 
একবার কদমতলায় যাই।"
মোবাইল, ফেসবুক সব অফমোডে রেখে তিনি প্রেমকে ফিরিয়ে নিতে চান সেই আদিম কদমতলায়।

আর এই কাব্যের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ কবিতা হলো 'কমফোর্ট জোন' ও 'কৌটো জীবন'। 'কৌটো জীবন' আমাদের সাজানো, অ্যাকোয়াগার্ডে ফিল্টার করা জীবনকে বলছে কৌটো-বন্দী জীবন। আর 'কমফোর্ট জোন' এ তিনি সরাসরি আমাদের মুখোশ খুলে দেন -
 "গ্রহান্তরে তুমি দেবী শুদ্ধ ঘ্যামে থাকো
তোমার স্ট্যাটাস তো খুবই হাইফাই... 
ভয় এসে জাপটে ধরে সব ছারখার।"
নিজেরই তৈরি "বাষ্পীয় ত্রিকোণে" আমরা বন্দী। এই ব্যঙ্গ এই সময়ের সামাজিক দলিল হয়ে উঠেছে।

ভাষা ও শৈলী:

সঞ্জীব ভট্টাচার্যের ভাষা অত্যন্ত মিতব্যয়ী। তিনি বড় উপমা, কঠিন শব্দ ব্যবহার করেন না। তাঁর কবিতা গদ্যঘেঁষা, কিন্তু ভেতরে তীব্র কাব্যময়তা। 'খোলা কপাট', 'নুড়ি ও পাথর', 'ঘুমানো গাছ' - এইসব ছোট ছোট দৈনন্দিন ছবি দিয়েই তিনি গভীর দর্শন তৈরি করেন। তাঁর কবিতা চিৎকার করে না, নিচু স্বরে কথা বলে, কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে বুকে বাজে।

পরিশেষে, 'পড়ন্ত পালকে বাতাস' কেবল কবিতার বই নয়,বয়ে যাওয়া জীবনের আরশি। যেখানে মাটি সরে যায়, শেকড় আলগা হয়, বন্ধুত্ব সফটওয়্যার-গামী হয়, সেখানেও কবি শব্দের জন্য হাত পেতে থাকেন। এই হাত পেতে থাকাই কবিতা, এই অপেক্ষাই বেঁচে থাকা।

🍂

Post a Comment

0 Comments