শ্যামলকান্তির শ্রেষ্ঠ ছড়া পড়ে /অরুণকুমার বসু


শ্যামলকান্তির শ্রেষ্ঠ ছড়া পড়ে

অরুণকুমার বসু

'শ্যামলকান্তি দাশ-এর শ্রেষ্ঠ ছড়া' বইটি আমার এই শ্যামলকান্তিচারিতার একমাত্র অবলম্বন। ছড়া শব্দটি আমার অভিপ্রেত নয়। শ্যামলকান্তির ছোটোদের জন্যে লেখা কবিতাই আমার লক্ষ্য। শ্যামলকান্তি আদ্যন্ত কবি। তাঁর কবি পরিচিতি বেশ দ্রাঘিমাময়। শ্রেষ্ঠ ছড়া তাঁর অতি কনিষ্ঠ অঙ্গুলি মাত্র। শ্যামলকান্তি নিজেও ছড়া শব্দটি নিয়ে সন্তুষ্ট  নন। 'ছড়া বলতে ঠিক যা বোঝায়, সে রকম লেখা আমি লিখতে পারি না।' ছড়া-র একটা স্বতন্ত্র শর্ত ও সংজ্ঞা আছে। অনেকেই তা ভালো করে বোঝেন না, যত্রতত্র ছড়া শব্দটি ব্যবহার করেন। শ্যামলকান্তিও করেছেন। তবে শিশুকবিতা, ছোটোদের কবিতা বোঝাতে। ছড়া আর কবিতা তাঁর কাছে অর্থে সামর্থ্যে, তুষ্টিতে পুষ্টিতে সমার্থক হয়ে গেছে। শ্যামল যখন লেখেন

যে ছড়াটা তারায় তারায় আকাশ লিখে রাখে
সেই ছড়াটাই অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকে। 

একে কি 'তেলের শিশি ভাঙল বলে' ছড়ার সমগোত্রীয় বলব? শ্যামলকান্তির ছড়া নার্সারি রাইম নয়, ছেলে-ভুলোনো হাততালিও নয়। ছোটোদের বিচিত্র জগৎ থেকে শিশু কিশোরদের কবি শ্যামলকান্তি তাঁর শিশুকিশোর পাঠকদের জন্যে ভালোবাসার ছবি আঁকেন। বাংলার আবহমান শিশুসাহিত্যের অঙ্গ হয়ে যায় তারা

একটা ছড়া আমবাগানের মৌমাছি গুনগুন
সেই ছড়াটাই দুর্গা অপু ইন্দির ঠাকুরণ।
একটা ছড়া পায়রা শালিখ ফিঙে ও বুলবুলি
রাঙা মামার ভাঙা আসর ঠাকুর দাদার ঝুলি।

শ্যামলকান্তি কলকাতার কর্মব্যস্ত জীবনে জড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর ছোটো বয়স কেটেছিল যে পল্লি পরিবেশে, সেখানকার সবুজ আর নীল, সেখানকার হলুদ আর সাদা রঙ গাছপালা থেকে, আকাশ নদী পুকুর ফুল ফল মেঘ বৃষ্টি থেকে চেয়ে এনে শ্যামলকান্তি তাঁর কবিতায় মাখিয়ে দেন। নিশুত রাতে নদীর বাঁকে, তারায় তারায় স্বপ্ন আঁকে তাঁর কবিতা, খুঁজে ফেরে সব পেয়েছির দেশ। সাবেক ছড়ার কাছ থেকে শব্দের শিকল তৈরি করার কায়দাটাও রপ্ত করে নেয়। যেমন

ছেলে ঘুমোল পাড়া জুড়োল
রাঙা ধুলোর পথ ফুরোল
পথ ফুরোল বনের ধারে
চাঁদ ফুটেছে অন্ধকারে।

ছোটোদের চেনা জানা জগতে আজ আর ভূতেদের অস্তিত্ব নেই। শ্যামলকান্তির কবিতার পোড়ো বাড়িতে তাদের দু চার জনকে এখনও ফিসফাস কথা বলতে, কার্নিশে পা ঝোলাতে দেখা যায়। রেলগাড়ির চলাকেও ছড়া কবিতায় ধরে রাখতে খুব ভালোবাসেন তিনি। ছোটোবেলায় দেখা মাচাভরা  কাঁকরোল ফুল, পুকুরের শালুক পাতা, কুয়াশার বিছানায় শোওয়া হাঁদাভোঁদা চাঁদ, পুকুরে জ্যোৎস্নার লাফানো, শেয়ালদের ডাক, মাঠভরা ধানগাছ পানগাছ, নদীতে নৌকোর যাওয়া-আসা—এসবই আজকালকার ছোটোদের শহুরে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। শ্যামলকান্তির কবিতা থেকে হারায়নি। ছেলেদের খেলার মাঠ ধ্বংস করে প্রমোটারদের দাপানি দেখে তিনি দুঃখ পান। অনেক দুঃখে লেখেন “সেই মাঠে আর হয় না খেলা বাড়ির পাশে বাড়ি / সকাল বিকেল দাঁড়িয়ে থাকে প্রমোটারের গাড়ি।" শ্যামলকান্তি  দাশের আর একটি গুণ হল, বাংলা সাহিত্যের অনেক কবির নাম, ব্যক্তিত্বের নাম তিনি কবিতার থলিতে পুরে ছোটোদের কাছে সরবরাহ করেন। যখন তাঁর কবিতা ছবি দেখায় এই বলে  ‘ছবি নকশিকাঁথার মাঠ / ছবি নেতা ধোপানির ঘাট,' তখন অজানা পাঠক মন ক্রমশ জেনে যায় জসিমউদ্দীনের নকশি কাঁথার মাঠ কাব্যের কথা, আর মনসামঙ্গল কাব্যে বেহুলার গাঙুড়ের জলে স্বামীর মৃতদেহ কলার ভেলায় ভাসিয়ে নেতা ধোপানির ঘাটে পৌঁছানোর গল্প। কখনও কখনও শ্যামলকান্তির সমাজবুদ্ধি ছোটোদের মন থেকে কুসংস্কার, আর আংটি -মাদুলির মিথ্যে বিশ্বাস, জ্যোতিষীর ভ্রান্ত আশ্বাস আর লোক ঠকানো ব্যবসার  ভড়ং ঘুচিয়ে দিতে চান। এ বড়ো কম কথা নয়। 'নাম শোনো নি ? মতিশী / পায়রাটুঙির জ্যোতিষী ' প্রথমেই মনে হয় মিলের মজার জন্যে বুঝি লেখা। তা কিন্তু নয়। এই জ্যোতিষী পেশাটাকে নিয়েও মজা করেছেন : ফি-বছর দেখেন হাত, /বাঘের সঙ্গে কাটান রাত।/| কেউ গোয়েন্দা কেউ বা খুনি / সবাইকে দেন গোমেদ চুনি।' হেলাফেলা ছড়া নয় এটি। এতে আছে মুচকি হাসি ও আড়াল থেকে বার করা এক চোরা হাসি। চোরা হাসি কেন? আসলে জ্যোতিষী যখন, তখন তার কাছ থেকে গোয়েন্দা এসে জানতেও চাইবে খুনিকে কীভাবে ধরা যাবে। আবার পরক্ষণেই হয়তো গোপনে এক খুনি এসে জানতে চাইবে, কোন পথে কীভাবে গা ঢাকা দেওয়া যেতে পারে। জ্যোতিষীকে তো এই দুয়ের সঙ্গেই মোকাবিলা করতে হয়। তাই 'বাঘের সঙ্গে কাটান রাত।'  আর, প্রকৃতপক্ষে কী গোয়েন্দা, কী খুনি কারও প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই তার নেই। শুধু লোকের বিশ্বাস উৎপাদন করে লোক ঠকানো। তাই জ্যোতিষী 'সবাইকে দেন গোমেদ-চুনি।' এই দুই রত্ন বিক্রিটাই তার লাভ। লোকে বিশ্বাস করবেই। এমন দামি গ্রহরত্ন যখন জ্যোতিষী দিয়েছেন, তাতে ফল ফলবেই। এই অল্পকথায় অনেক সত্যের অনেক বাস্তবের ইঙ্গিত দেওয়া, কবিতার, বিশেষ করে ভালো কবিতার লক্ষণ। এই গুণটি আছে শ্যামলকান্তির। তাঁর কবিতায় ছোটোদের কাছে তিনি  বিষয়টাকেই গুরুত্ব দেন। তাকে এড়িয়ে ধ্বনির মিলের শব্দের বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা তিনি করেন না। ডাকাডাকি-পাখি। পাতা-মাথা, হাত-রাত, জামা-মামা, এমন মিলেই সন্তুষ্ট তিনি এবং নিশ্চয় তাঁর পাঠকরাও। তাই তাঁর কবিতা কান-টানার নয়, চোখ-টানার, চোখ জোড়ানোর, ছবি দেখানোর। সে ছবি ছোটোদের সঙ্গে আমিও দেখি। কারণ এ ছবি তো আজকাল আমার চোখে পড়বে না। পড়ত সত্তর বছর আগে। তাই শামলকান্তি আমার আয়ুষ্কাল থেকে সাতটা দশক কেড়ে নিয়ে আমাকে আমার হারানো শৈশবে টেনে নিয়ে যায়, যেখানে

গাছভরা আতায় পাতায়
ভড়ছে ফড়িং ছানা
নীলগোলা  চাদরটাতে
জড়িয়ে   যাচ্ছে ডানা।


শ্যামলকান্তি, ধন্যবাদ তোমাকে। আমাকে কিছুক্ষণের জন্যে নীলগোলা চাদর খানায় নিয়ে গেলে!


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া