ড.অন্তরা ঘোষ
বিনোদ মণ্ডলের কাব্যগ্রন্থ 'সৌরলোকের বামন' একটি ব্যতিক্রমী ও সাহসী কাব্য।
লেখকের এটি নবম গ্রন্থ। একজন পরিণত গদ্য-পদ্য-প্রবন্ধকার হিসেবেই তিনি এই কাব্যগ্রন্থে এসেছেন।
গ্রন্থের নামকবিতা হলো 'সৌরলোকের বামন'। নামের মধ্যেই একটি তীব্র শ্লেষ আছে। সৌরলোক মানে সূর্যের জগৎ, আলোর জগৎ, বিশালতার প্রতীক। আর বামন মানে খর্বকায়, ক্ষুদ্র। কবি বোঝাতে চান, আজকের বিশাল জ্ঞান-বিজ্ঞান, মিডিয়া, রাজনীতির সৌরলোকে মানুষ আসলে ক্রমশ বামন হয়ে যাচ্ছে। এই দ্বান্দ্বিকতাই পুরো বইয়ের মূল সুর।
কবি নামকবিতাটি উৎসর্গ করেছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।যিনি ছিলেন 'মানুষের কবি'। তিনি লিখেছিলেন -
"মানুষের বুকের মধ্যে এত বড় বাদামতলী?"।
যিনি জমি, লাঙল, ভুখা মানুষের কথা লিখতেন। বিনোদ মণ্ডল তাঁর উত্তরসূরি হিসেবেই এই কবিতাটি তাঁকে উৎসর্গ করেছেন। এটা যেন একটা দায়-স্বীকার।
'সৌরলোকের বামন' - এই বিরোধাভাসটাই কবিতার প্রাণ।কবি বলছেন, এই বিশাল সভ্যতা যাদের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, তারাই আমরা - চাষী, মজুর, পাথর ভাঙা মানুষ। আমরা সৌরলোকের নাগরিক নই, আমরা তার বামন। আমরা ছোট, কিন্তু আমরাই ফসল ফলাই।
এই কবিতাটিকে কাব্যের ম্যানিফেস্টো বলা যেতে পারে। কবি বিনোদ মণ্ডল নিজেকে এবং তাঁর স্বজাতিকে 'বামন' বলতে লজ্জা পান না। বরং এই বামনত্বের মধ্যেই তিনি গর্ব খোঁজেন। কারণ এই বামনরাই সারা জীবন ফসল ফলায়, আর সৌরলোকের বড় মানুষেরা সেই ফসল খায়।
আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে ৪৮টি কবিতা আছে। যেমন - তোড়া, সত্য কী?, ঘুম, চণ্ডালিকা, অগত্যা, বোনের জন্য, আসবে যদি, স্নানযাত্রা, নিদ্রা, সতীব্রত, ভবিষ্যতের ভাবনা, ঘরের ঘূর্ণি, আক্ষেপ, অযথা, অনিকেত, ক্রান্তিকাল, সুবিচার চাই, খিল্লি, ডাকাবুকো, ও রেলা, সমসময়, ডাক, বাংলা মা, কাজের কাজ, স্বভাব কবি, কোথায় কর্ণধার, পদাতিক ইত্যাদি।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হলো এই গ্রন্থের প্রধান শক্তি। 'খিল্লি' কবিতায় কবি লিখছেন ―
" আমি জানি! কে বলেছে? ডাহা মিথ্যে। সবই মিথ্যে! ... আমার লেখায় আলোর রেখা?
ভালো বললি। এটা খিল্লি!"
―এখানে আজকের সোশ্যাল মিডিয়া সর্বস্ব 'সবজান্তা' ও ট্রোল সংস্কৃতিকে তিনি খিল্লি করেছেন। 'ক্রান্তিকাল' কবিতাটি তো সরাসরি সময়ের দলিল ―
" কে যেন কার মাথায় চেপে ট্যাগার
বাঙালিকে বানিয়ে দিল ভিখারি...
সময় এখন মন্ত্রণা পড়ে দগ্ধ হওয়ার
আন্দোলিত মুষ্টি চাই গগনজুড়ে।"
―এখানে শ্রেণী-বৈষম্য, ভাত-কাপড়ের খোঁজে লক্ষ হাতে কাজের টুপি আঁকার যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে।
ঘর ও অস্তিত্বের কবিতা 'ঘরের ঘূর্ণি'। কবিতাটি ছোট ছোট দুই লাইনের স্তবকে এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের চক্রাবর্তকে দেখায় ―
" ঘিরে ধরে ঘর
ঘুমের প্রহর।
ঘরে বসে আয়
ঘি ভাত খায়।
পৈত্রিক বাড়ি
ফকিরা নাড়ি।"
শেষে গিয়ে -
"অতএব আমি
সহদেব স্বামী।
দুনিয়া অচল
যাক রসাতল।"
এই আত্ম-উপহাস, এই মেনে নেওয়া ও না-মানার দ্বন্দ্ব খুব খাঁটি।
কবি ও কবিতা বিষয়ক আত্ম-সমালোচনা করে কবি কয়েকটি কবিতা লিখেছেন।সেইরকম 'স্বভাব কবি' গ্রন্থটির অন্যতম সেরা কবিতা। কবি নিজেকেই ব্যঙ্গ করছেন ―
" লেখা কি মা শাড়ির মতো ভালো লাগা আপেক্ষিক; কারো কাছে অসাধারণ পাঁচটা বুলি পানের পিক।"
এখনকার পদ্য-ব্যবসা, সভা-সমিতি, ফেসবুকীয় কবিখ্যাতির প্রতি এ এক নির্মম কষাঘাত।
"পাশে দেখি পাঁচতলা মল সব তলাতে শাড়ি
লক্ষ টাকায় বিকোয় মাগো বাস্তু কাড়াকাড়ি"।
এই পংক্তিতে কবির সমাজ-দৃষ্টি স্পষ্ট।
বিনোদ মণ্ডলের ভাষা অলংকার-বর্জিত, কিন্তু ধারালো। তিনি দীর্ঘ সমাস বা দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করেন না। ছোট ছোট চাল, প্রায় কথ্য ছন্দ, কিন্তু ভেতরে অন্ত্যমিল ও অনুপ্রাস রাখেন।
'ঘুম' কবিতাটি এর উদাহরণ,
"ভাতঘুম আয়েশের রাতে ঘুম স্বস্তির
কাতঘুম বাঁয়ে ফিরে প্রাণে ঘুম মন্ত্রির।"
এখানে ঘুমের শ্রেণীবিন্যাস - ভাতঘুম, কাতঘুম, বাস-ট্রেনে ঢুলে পড়া ঘুম, চটকায় পাওয়া ঘুম - দিয়ে তিনি পুরো বাঙালি জীবনের অর্থনীতিকেই ধরে ফেলেছেন।
তাঁর কবিতা অনেক সময় ছড়ার ছন্দে, কিন্তু বক্তব্য ছড়ার নয়। এই ছড়া-ছদ্মই তাঁর অস্ত্র। পাঠক হাসতে হাসতে পড়ে, পরে বোঝে ভেতরে কাঁটা আছে।
'সৌরলোকের বামন' কোনো প্রেমের কোমল কাব্য নয়। এটি সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক বামনের রোজনামচা। যেখানে সবাই নিজেকে সৌরলোকের বাসিন্দা ভাবছে, সেখানে কবি স্বীকার করছেন - আমি বামন। এই স্বীকারোক্তির মধ্যেই আছে সততা ও প্রতিবাদ।
গ্রন্থটির কোথাও কোথাও প্রতীকের ব্যবহারের বদলে সরাসরি উক্তি প্রকাশিত। জেলার একজন লেখক যেভাবে কলকাতা-কেন্দ্রিক কবিতার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে রাজনীতি, ঘর, বাজার ও কবি-সত্তাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন, তা প্রশংসার যোগ্য।
সব মিলিয়ে, 'সৌরলোকের বামন' একটি পড়ার মতো এবং পড়ানোর মতোই গ্রন্থ।যা আমাদের শুধুমাত্র আনন্দ দেবে এমন নয়,তলিয়ে ভাবতে শেখাবে।
🍂
0 Comments