সৌমেন রায়
সঞ্জীব ভট্টাচার্য মহাশয়ের মহাচান অনু গল্পের সংকলনটি পাতা উল্টালেই প্রথম চোখ টানে বইটির উৎসর্গ। প্রজন্মান্তরের সঙ্গে আত্মিক যোগ, নাড়ির টান অভিভূত করে। কৌতুহলবশত উল্টে ফেলি বইয়ের সমনামি গল্পটি। তরুণের ধূসর মনোজগত আকর্ষণ করে বইটির ভেতরে প্রবেশ করার জন্য। তারপর একে একে পাতা উল্টালে দেখা যায় এক একটি গল্প একেকটি আস্তরণ সরিয়ে দেয় চোখের সামনে থেকে, মনের উপর থেকে। কি নেই সেখানে? বয়স্কদের মনের অনুভূতি, তরুণের অনুভূতি, বর্তমানে সমস্যা, দার্শনিক ভাবনা সবই লেখকের মনোজগতে ক্রিয়া করে প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেরিয়ে এসেছে গল্পগুলি। সত্যি বলতে কি বইটি হাতে আসার পর বেশ কিছুদিন পড়েছিল টেবিলের উপর। কিন্তু পাতা উল্টানোর পর আর থেমে থাকা সম্ভব হয়নি। এক টানে শেষ করার বেশ কিছুদিন পরও কিছু ভাবনা, কিছু অনুভূতি এখনো মনের মধ্যে ক্রিয়াশীল।
ধাপ্পা গল্পে পড়ে মনে হয় আমাদের গোটা জীবনটাই ধাপ্পা সঙ্কুল। কোথাও আমাকে কেউ দেয় ধাপ্পা, কোথাও আমি দিই। মজা গল্পে দেখি কত মজা জীবনের মোচড় এনে দেয়। শুধু একটা অনুভূতি তো নয়। গল্প তখনই সার্থক হয় যখন গল্পের বাইরের প্রাসঙ্গিক অনুভূতিও মনে করিয়ে দিতে পারে। গল্পগুলি সবই সেই ধরনেরই । এক নিদারুণ অনুভূতি এনে দেয় অচেনা গল্পটি। আমরা কত কাছে থাকি, পাশে থাকি কিন্তু সত্যিই কি আমার পরস্পরের চিনি? সন্দেহ তুলে দেয় গল্পটি । আমাদের মানবিক সম্পর্কের সুগন্ধ যেকোনো বাহ্যিক সুগন্ধের থেকে অনেক গভীর, অনেক তীব্র। সেই ব্যাপারটাই লেখক তুলে ধরেছেন ডিওডোরেন্ট গল্পে। আশ্রয় আরেক অনবদ্য গল্প। প্রতিনিয়ত আমাদের কারও খেলাঘর ভাঙছে, আবার কারও নতুন খেলাঘর গড়ে উঠছে।এই খেলা চিরন্তন। আশ্রয় তারই প্রতিচ্ছবি। হেমন্তের বিকেলের রোদের মতোই সুন্দর অথচ মন খারাপ করা অনুভূতি। বাঁশি সেই বিখ্যাত হিন্দি গানের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাজতি হে বাঁশুরী, বাজানেবালা চাহিয়ে।স্ত্রী ঠিক করেছেন স্বামীর মনের বাঁশুরি তিনি বাজাবেনই । আধুনিক সময়ের কথা, আমাদের দেখনদারি ,সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক কমেন্টের হাংলামির আকুতি সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে ভাইরাল গল্পটিতে। আমাদের শরীরের বয়স বাড়ে কিন্তু মনের বয়স বাড়ে কি? সেই প্রশ্নের উত্থাপিত হয়েছে সিঁড়ি গল্পে । সন্তান সুখের তুল্য সুখ আর কি কিছু আছে? সে কথাই আছে বুকখালি এবং অনুভব গল্পে। রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলায় পড়েছিলাম তিনি চোর দেখতে গিয়ে অবাক হয়েছিলেন এই দেখে যে চোরও আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। কালাচোর গল্পে সেই রকম চোরেরই একটি সাধারন অনুভূতি খুব সুন্দর ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আমরা প্রায়শই হা হুতাশ করি। কিন্তু সত্যিই ভেবে দেখার দরকার আছে যে অবক্ষয় হচ্ছে মূল্যবোধের, নাকি পরিবর্তন হচ্ছে পরিস্থিতির? ভ্রান্তি গল্পে সেই রকম একটি সন্দেহ সুনিপুণভাবে উত্থাপন করে দিয়েছেন লেখক। চুরি গল্পে লেখক হয়তো বলতে চেয়েছেন আমাদের কত কিছুই যে অজান্তে চুরি হয়ে যায়! কিংবা আমরাও অন্যের কতকিছু অজান্তে চুরি করে ফেলি তার কোন হিসাব থাকে না। ঢেউ গল্পে হারুর বউ যেন দার্শনিক। এই সংসারের মোহ, ভালোবাসার রূপ তার যেন জানা হয়ে গেছে। তাই সে আর ভালোবাসার ফাঁদে পড়তে চায় না, বরং শরীর বেচতে তার অসুবিধা নেই। এই ঢেউয়ের অভিঘাত কি সহ্য করা সোজা? ভয় গল্পে মাতৃহারা হওয়ার দুঃখ সূক্ষ্ম অনুভূতিতে, অনবদ্য ভঙ্গিমায় তুলে ধরেছেন লেখক। পড়ার পর দু’দণ্ড বাকরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয়।সহজ সরল মানুষের চাওয়া, তাদের অমলিন হৃদয়ের স্পর্শ আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা বোধহয় বুঝতে পারি না। সেই জায়গাটি ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছে দেওতা গল্পে। মায়েদের নিয়ে গল্প অনেক লেখা হয় কিন্তু উপেক্ষিত থাকেন বাবা। অনুভবে সে কথা অনুভব করেছেন লেখক।অনেক সময় আমাদের চিন্তাভাবনায় যা অনুভব করি সেসব অর্থ্যসত্য । পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কখনো কখনো প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়। একা গল্পে সেই রকমই এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় পাঠক। আগুনের চারপাশে গল্পটি এক অনন্য অনু গল্প । অসুস্থ রাম নিস্ফল আক্রোশে তার হৃদয় অগ্নি দিয়ে কঠোর বাস্তবকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চায়। কিন্তু পারে কি?
সংকলনের প্রতিটি গল্প অনন্যতার দাবি রাখে।সকলকে অনুরোধ করবো বইটি হাতে নিয়ে দেখুন। ঝরঝরে এবং মর্মস্পর্শী গদ্য হৃদয় স্পর্শ করবেই।বইটি বিষয়বৈচিত্রে ভরপুর হলেও, মানব মনের ধূসর অংশে আলোকপাত করার জন্য বিশেষত্বের দাবি রাখে। প্রচ্ছদ শিল্পী অসিতকুমার সেনাপতি বোধহয় এই জায়গাটাই ধরতে চেয়েছেন তার আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদটির মাধ্যমে।
0 Comments