মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় / মধুমিতা মহাপাত্র


ম ধু মি তা  ম হা পা ত্র 


কথাসাহিত্যিক 
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
(জন্ম : ১৯ মে ১৯০৮, মৃত্যু : ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৬)

এক সংকট সময়ে দাঁড়িয়ে আর এক সংকট কালকে ফিরে দেখার জন্য যার স্মরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে তিনি কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।যিনি দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর মাঝে দাঁড়িয়ে সামাজিক চালচিত্রের সঙ্গে মানুষের মানসচিত্র কেউ রূপ দিয়েছেন সুনিপুণভাবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন নিবিড় মানসিক যোগাযোগ। তাই মনের  সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বাঁকগুলো শব্দ তুলির টানে হয়ে উঠেছে জীবন্ত। সুন্দর- অসুন্দরের সহাবস্থানে শিক্ষণীয় ও রমনীয় হয়ে উঠেছে তাঁর সৃষ্টি। তিনি ই শোনাতে পারেন জীবনের কঠিনতম সময়ে দাঁড়িয়ে জীবন সংগ্রামের মন্ত্র ।
নানান ঘটনার ঘনঘটায় আবর্তিত পৃথিবী ও দেশের উত্তাল সময়ে তাঁর আবির্ভাব, উচ্চ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের চতুর্থ সন্তান হিসেবে।পিতার বদলির চাকরির সুবাদে পূর্ব-পশ্চিম উভয় বঙ্গ এবং বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে কেটেছে তাঁর শৈশবকাল আর অভিজ্ঞতার ঝুলিটি পূর্ণ হয়ে উঠেছে। জীবনের সেই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি গুলোর 'অতি ক্ষুদ্র  ভগ্নাংশ ভাগ দেবার তাগিদে'ই লেখালেখির শুরু।তাঁর কথায়- "লেখা ছাড়া কোন উপায়ে ই যেসব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানাবার জন্যই আমি লিখি"। আর তার দুর্নিবার আকর্ষণে ই শেষ পর্যন্ত শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে স্বেচ্ছানির্বাসিত দারিদ্র্যের মধ্যে ও সাহিত্য চর্চা কে অটুট রেখেছিলেন আমৃত্যু। চরম অসুস্থতার মধ্যে থেকেও জীবনের প্রতি আস্থা রেখে বলেছেন' তিনি সুস্থ সবল ও সক্রিয় মানুষ।'তাই চালিয়ে গেছেন 'শরীরের অন্তর্গত ব্যক্তিগত মৃত্যুর বিরুদ্ধে পরাক্রান্ত চৈতন্যের আমৃত্যু সংগ্রাম'।

১৯২৮ সালে 'অতসীমামী 'গল্প দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ১৯৫৬ সালে লেখক জীবনের পরিসমাপ্তি।২৮ বছরের নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে পাঠক কে উপহার দিয়ে গেছেন তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি সম্ভার। তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস গুলি হল -'দিবারাত্রির কাব্য', 'পুতুলনাচের ইতিকথা', 'পদ্মা নদীর মাঝি',' চতুষ্কোণ' ' চিহ্ন', 'প্রতিবিম্ব ','সোনার চেয়ে দামি' 'ছন্দপতন 'সার্বজনীন', 'ইতিকথার পরের কথা' 'চালচলন ','শুভাশুভ ','মাঝির ছেলে', 'ধরাবাঁধা জীবন' 'শহরবাসের ইতিকথা'। উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ- 'অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প' 'প্রাগৈতিহাসিক,' মিহিও মোটা কাহিনী', 'সমুদ্রের স্বাদ' 'ভেজাল ','আজকাল পশুর গল্প 'মাটির মাশুল' 'ছোট বকুলপুরের যাত্রী' 'লাজুকলতা'।

মার্কসীয় দর্শন ও ফ্রয়েডীয় ভাবনার সঙ্গে বিশেষ পরিচিতি থাকার সুবাদে তাঁর সাহিত্যে খুলে গেছে এক নতুনতর দিগন্ত। শহুরে মধ্যবিত্তের আকাশচুম্বী স্বপ্ন, উচ্চাশা পূরণের তাগিদে নৈতিকতার অবনমন শুধু নয়,  তাঁর সাহিত্যে স্থান পেয়েছে অতি নগন্য নিম্নবিত্ত মানুষ ও গ্রামীণ জীবনের আপাত সরল জীবনযাপন এর ফাঁকে মানবমনের জটিলতা। মানব মনের সূক্ষ্ম অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে মানসিক বিকার কেউ ভাষা রূপ দিয়েছেন ।যে পাশবিক গুন মানুষকে পশুর থেকে পৃথক করেছিল পরিস্থিতির শিকার হয়ে সেই  জান্তব ,ক্রুর প্রবৃত্তি প্রকট হয়ে উঠে। লেখক সেখানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির আলো দিয়ে সেই অন্ধকারকে অনুভূতিগোচর করে তোলেন।-"যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচি পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের  মাংসল আবেষ্টনীর  মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনদিন পাইবেও না।"
তাঁর সাহিত্যে এক নিষ্ঠুর বাস্তব যেন নখদন্ত প্রসারিত করে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে মানুষের জীবনে আর অসহায় মানুষ বিরামহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে টিকে থাকার লড়াই । তাঁর মনন জুড়ে ইতিবাচকতার প্রাবল্যের জন্য তাঁর চরিত্রগুলির ও ভবযন্ত্রণা সহ্য করবার শক্তির অকুলান হয় না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না, ছিলেন যথার্থ বিজ্ঞান ভাবনায় ভাবিত, সেজন্যই নিপুণভাবে আঁকতে পারেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে থাকা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের প্রতিলিপি। যেখানে মন্ত্র- তন্ত্র ঝাড়-ফুঁক, মালসার আগুনে কাঁচা হলুদ পোড়ার ধোঁয়ায় চাপা পড়ে যায় আসল সত্য। আবার কখনো জ্যোতিষার্ণবের মাদুলি,কবচ, হস্তরেখার ফাঁকে টিকটিকির ডাক এর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করেন সরস শব্দযোগে। সংগ্রাম প্রতিবাদ,মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের মত সাহিত্য জুড়েও, কখনো নীরব কখনো  সরব কোথাও একক, কোথাও সঙ্ঘবদ্ধ ।জীবনের অসহায়তাকে জয় করে মানসিক শক্তির উত্তরণের দিশাও প্রকাশিত তাঁর সৃষ্টির ছত্রে ছত্রে।আবার অন্নাভাবের হাহাকারের মাঝে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে বিবেক। যে বলে, -''আমি বেঁচে থাকতে যে লোকটা না খেয়ে মরে গেল, অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কি?"
সবশেষে বলা যায় নান্দনিকতা ও শিক্ষা, জ্ঞান এবং অনুভব এর সমন্বয়ে সৃষ্টি কে পাঠকের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব যাঁরা সানন্দে পালন করে থাকেন তাঁরাই হলেন সর্বকালের সেরা সাহিত্যিক, তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা হারায় না কখনো। এ প্রসঙ্গে কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যে প্রথম সারিতে এ নিয়ে দ্বিমত নেই। দ্বিমত নেই তাঁর জনপ্রিয়তার ব্যাপারেও। তার প্রমাণ তাঁর একাধিক উপন্যাস ও অসংখ্য গল্প বিভিন্ন ভারতীয় এবং বিদেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
----------

Comments

  1. সন্দীপ কাঞ্জীলাল।
    ভালো। এই বিভাগ চলতেই থাকুক।

    ReplyDelete
  2. তথ্যবহুল লেখা, অভিনন্দন জানাই

    ReplyDelete
  3. খুব খুব ভালো হচ্ছে।ধন্যবাদ

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি