সুজিত দাস


 সু জি ত  দা স 

আনপ্লাগড্‌/৫৫

অক্সব্লাড রঙের শাড়ি

কতদিন বলেছি তোমাকে, অক্সব্লাড রঙের শাড়ি পরবে না। এমনিতেই শাড়ি খুব জটিল ছায়া। কোথাও পড়ে, কোথাও পড়ে না। শিফন যে কীভাবে ঋতুচক্র পালটে দিচ্ছে, 'ধরতেও পারবে না'। তার ওপর এই রক্ত রঙের প্রহেলিকা! এই তো জীবন আমার, খুন করে বাড়িতে গেলেও বাহবা পাবে না। নান্‌হা সা জান। মারতে হলে টর্ন জিন্সে মারো, টিউব টবে মারো, কালো থং-এ মারো। আবার শাড়ি কেন? অ্যাম্ফিথিয়েটারে কত লোক বসে আছে, জানো! এই প্রকাশ্য গোধূলিতে আমাকে এভাবে নক্‌ আউট করে দেবে? দোহাই, অক্স ব্লাড রঙের শাড়ি অঙ্গে জড়িও না। হাড়ে সুই বিঁধে যায়। কিংবা মাঘের রাত।

কতদিন বলেছি, বৃষ্টির দিনে জঙ্গলে যেও না। এক একটা দুশ্চরিত্র পুরুষ ময়ুর পেখম তুলে টিজ করবে তোমাকে। ময়ূরের পালকে সহস্র চোখ। দেখে ফেলবে আদিগন্ত। অরণ্য এক গোপন সিকিউরিটি চেক। না বলেকয়ে খুঁজে নেবে কনুইয়ের কালো, ব্যক্তিগত লাল এবং নিজস্ব ঘ্রাণ। যে ঝিঁঝিঁ ডাককে তুমি শুদ্ধ আত্মা বলে ভাবো, সেও আসলে এক কাউন্টার এসপিওনেজ। এখনও সতর্ক হও।

কতদিন বলেছি, প্রিয় আয়নাকেও তেমন বিশ্বাস কোরো না। আয়নায় নিজেকে সবাই পছন্দের কৌণিকে দ্যাখে। তুমিও। তাই একদম বিশ্বাস কোরো না। পৃথিবীর সব গুপ্তহত্যায় শেষ রক্তের ছিট্‌ ওই আয়নার কাচেই লেগে থাকে। আয়না মোটেও জলের মতো সোজা না। এক সাঙ্কেতিক ফিল্মের মতো টুকে রাখছে তোমাকে। যা কিছু দেখছ সঙ্গোপনে, সবই রচিত হচ্ছে। কাচের থেকে বড়ো ট্যাবলয়েড আর কিছু নেই। শোনো, অন্তত একবার আমার কথা শোনো। ইনডিসটিঙ্কট চ্যাটার বলে কিছু হয় না। ওসব সাবটাইটেলে থাকে।

মোটমাট, তোমাকে ঘিরে যে ষড়যন্ত্রের বৃত্ত, তার মূল কারিগর ষাঁড়ের রক্ত, অরণ্যের নির্জন এবং কাচের গোপন। এদের তুলনায় আমি খুব তুচ্ছ শভিনিস্ট। এসব জেনেও ট্রামলাইনের নিচে এমন নির্দ্বিধায় হেঁটে চলেছ?

সাদাকালো বলে কিছু নেই, সুচরিতা। হয় সাদা, নয় কালো। বাকিটা বিভ্রম।

যদিও আয়না তোমাকে টুকে রাখছে অবিকল। রঙিন।


সেক্রেড গেমস ৩.০

১.
চিকের আড়াল থেকে এই খেলাধুলো আর ভাল লাগছে না।
এবারে প্রকাশ্যে আসুক সব নখরা। ডলবি সাউন্ডে বেজে উঠুক শরীর।
স্নায়ু এক পুরনো কাঠের সেতু। দেহবিভঙ্গে শ্রাবণের খর স্রোত।
এ শুধু টেক্সট-এর দিন, এ লগন রিংটোন বেজে ওঠার।
নদীর পার বরাবর রচিত হোক ফেননিভ অভিসার শয্যা। কভি আর কভি পার।
ফাইনাল অ্যাসল্ট।

২.
ক্যালেন্ডারে কোনও তারিখ বদল হবে না আর।
মোবাইল থেকে মোবাইল ভ্রমণপথে ক্লাউডেই থমকে থাকবে রাগিনী এম এম এস।
শেষতম কার্তুজ দিয়ে পেনডেন্ট বানিয়ে ফেলবেন সালমা হায়াক।
বাংলা কবিতার প্রথম স্তবকে, অন্তিম ছত্রে, এবং মায়া-বিভাজিকায় দুলে উঠবে একটি তাজা দানা।
মোটকথা, তছনছ হয়ে যাক এই পুস্পিত কানন। কালচে বাদামি বোঁটায় টুকি দিক না ফোটা বারুদের সম্ভাবনা।

৩.
ঘটিহাতা ব্লাউজ, চিকন গরদ আর এই রাঙ্গাজবা আলতার দিন শেষ, ইয়োর হাইনেস।
এ যুদ্ধ তির-ধনুকে লড়া হবে, প্লে-স্টেশন ভেসে যাবে কস্তূরী ঘ্রাণে। উফার স্পীকার, জোরালো ওয়াই-ফাই।
শিলা বৃষ্টির রাতে কর গুণে বৃত্ত মিলিয়ে নেবেন? সে গুড়ে মোটা দানার বালি।
ঠিক পরের এপিসোডে,
স্বৈরিণী বালিকার অন্তর্বাস সতেরো তলার ইথার থেকে হাওয়ায় ভাসতে, ভাসতে, ভাসতে...

লংশট। প্যানোর‍্যামিক ভিউ।

৪.
মঞ্চসজ্জায় মেদ রাখবেন না রাজন্‌। মৃদু আবহ, সামান্য প্রপ্‌স।
স্ক্রিপ্টে দুনিয়ার চরিত্র, একেবারেই না। ওই মুখর সৈন্যদল জিতবে যতটা ছড়াবে তার শতগুণ।
বরং স্লিপার সেল তৈরি করুন। নওয়াজুদ্দিনের মুখে একটা পেশি কাঁপতে দেখেছেন কখনও?
স্টার-কাস্ট বদলান। পাবলিক বহুত খতরনাক চিজ। সব জানতি হ্যায়। এক মুখে আর কত শীত পার হবে, জাহাঁপনা?
এসব পুরনো বিগ্রহের দিন গিয়াছে।
অন্ধকারেও রেডমি নোট সেভেন, ব্যাপক সেলফি। বড় আইল্যাশ, চুলে স্পাইক।

গনেশ গাইতোন্ডে কে লিড রোলে নিয়ে আসুন। পরের সিজনে সৌরভ শুক্লা এবং ভিখু মাত্রে।

৫.
কী করবেন, কী করবেন না। ভাবুন।
সত্যযুগ এলো বলে। স্রেফ টাইমারে হেরফের থাকায় এ যাত্রা বেঁচে গেল আক্‌খা কলকাতা।
এই পেলব বাংলা কবিতার মৃণালভুজে একটা ঘ্যাম ট্যাটু এঁকে দিই এবারে।
কাঞ্চন বৃক্ষের পাতা। ক্যামেল টো।

নোটা বেনেঃ শিলিগুড়ি থেকে সুতানুটি। কবিতা লিখে কেউ বাঘ মারতে পারেনি। ক্লাউডেড লেপার্ড তো দূর অস্ত্‌। তবু আমাদের এই প্রচন্ড খারাপ লেখাসমূহ মেয়েদের টি-শার্ট দখল করে নিল। সিলি পয়েন্টে তুলে ফেলল লোপ্পা ক্যাচ। এখনও সময় আছে। বলের সেলাই ছিঁড়ে যাওয়ার আগে, চিলাপাতা অরণ্যে বসন্ত আসার প্রাকমুহূর্তে ঠিকঠাক ফিল্ড সাজিয়ে নিন। উইকেটকিপার বদলান।

বর্ণমালায়, আপনি জানেন, চিয়ারলিডারদের পরনেও মেঘ রং শাড়ি। বাঘছাল ওড়না। পোড়ামাটির পমপম।

ওহম্‌ ব্রহ্মাস্মি।


স্পর্শভুলের গাছ

এক একটা হিরণ্ময় বিকেল আমৃত্যু মনে থাকে।
গোপন রুদ্রাক্ষ ছুঁয়ে থাকে নিষিদ্ধ স্পর্শ এবং অলৌকিক সন্ধ্যা।
অশ্রু যতটা জখম করতে পারে স্পর্শ ঠিক ততটা নয়।
একচুটকি লবণের দাম, তুমি তার কী জানো, রমেশবাবু!
লবণ থেকে সমুদ্র তুলে আনার মুহূর্ত এক অনন্ত কমপালসারি ওয়েটিং।
শুধু ওই মিডাস টাচ। ওই অনঙ্গ স্পর্শ।

সেই যে-বছর ক্যুরিয়রে বসন্ত এল,
খাজুরাহো ড্যান্স ফেস্টিভ্যালে একসাথে নেচে উঠল সব প্রস্তর মুর্তি,
যে-বছর তোমার দৃষ্টি আহত হল আবিরের স্পর্শে...
সেই বিষণ্ণ খ্রিস্টাব্দ জুড়ে রুমালে পাখি। আকাশে হরবোলা।

ছকু খানসামা লেন সেই অব্যর্থ দ্রাঘিমাংশ। এক স্বপ্নস্টেশন।
প্ল্যাটফর্ম জুড়ে স্পর্শভুলের গাছ, টিকিটঘরের দেওয়ালে যামিনী রায়।
অথচ তুমি, শশী হে, এইখানে সাদা বেড়াল দেখলে। কালো বেড়ালও।

স্পর্শভীতু র‍্যাম্প-বালিকা,
ওই খুনিয়া রং স্কার্ফ, ওই পিত্তলের ঘুঙুর আর ওই তুখোড় উপত্যকা
বরাবর কোন মন্ত্রবলে স্যানাটোরিয়ামের ঠিকানা লিখেছ, বলো তো!
উদাস খয়ের গাছ, দমনপুরের আগুনে তরল, ২০৬ বাসরুট এবং তুমি।
তোমরা সকলেই এক অবাধ্য হ্যালোউইন মুখোশ পরে নিয়েছ।

এইসব কণ্ঠলগ্ন মুহূর্তের দাম, তুমি তার কী জানো, রমেশবাবু ?

আমি ও অবিনাশ

এই মায়াজন্ম আর ভালো লাগে না অবিনাশ।
এইসব ক্লান্ত বিকেল, ফুটে থাকা সজনেফুল, দিগন্তপ্রসারী সেগুনের মঞ্জরি
কিছুই যে স্পর্শ করে না আর।

শিলিগুড়ি বয়েজ, পরিমল কেবিল, গ্রন্থভারতীর বাদামি মলাট...
এরা ফিরে ফিরে আসে কেন, অবিনাশ!

নির্মীয়মাণ দীনবন্ধু মঞ্চ, ওপারের ফর্সাদিঘি। জলের ওপর পারমিতা করের বাড়ি।
খাতায় ভাওয়াল স্যারের পাটিগণিত। বিট্যুইন দ্য লাইনস, ও কেন তখন উড়িয়ে আঁচল...
আর কেনই-বা বিকেলগুলো এখনও প্রতীক্ষার বাসরঘর?
ধমনিতে দপদপ করে ছোটোখাটো হাসি, গজগামিনী পদসঞ্চার। কেন, অবিনাশ, কেন?
এ কোন্‌ ট্যুইলাইট সাগা...
মৃত্যু আর সজনেফুল ছাড়া এই মায়াপ্রপঞ্চে আর কী-ই আছে, বল তুই।

আমি তোকে কোন্‌ অচেনা কৃষ্ণগহ্বরে নামিয়ে এনেছি!

এই ব্ল্যাকহোলে শুধু অবজ্ঞার নয়নতারা? শঙ্খচক্র নেই, ক্রিসান্থিমাম নেই, মেয়েদের ছেড়ে যাওয়া নেই,
ব্রহ্মতালু ফাটিয়ে দেওয়া বাগরাকোটের তোম্বাও কি নেই, অবিনাশ?
কে-কার চুনরিতে দাগ লাগায়,

কে-কাকে কতটা অপমান করলে স্তব্ধ হয় চরাচর।
কীভাবে জুতো মারলে ঠোঁট ফেটে যায়, শার্টের কলার থেকে খসে পড়ে অহংকার?
জানালায় পাখি আসেনি কতদিন, কতদিন নখ উপড়ে গেলেও ব্যথা টের পাইনি।

এই মায়াজন্ম আর ভালো লাগে না অবিনাশ।


জুলিয়েট বিনোচের জন্য প্রেমের কবিতা

এই যে মসৃণ কালো ইট বাঁধানো রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছ,
এই যে স্লেট রঙের হেরিং বোন বরাবর ভেসে যাচ্ছে তোমার উদাসীন চাউনি
আর এই যে তুমি পৃথিবী তুচ্ছ করা অবাধ্য অলক শাসন করে চলেছ।
দুপাশে ফুলের বাড়িঘর, পাপড়ির বারান্দা উপেক্ষা করে
কোন অসম্ভব দিক আর চক্রের জন্য উড়িয়ে দিচ্ছ ময়ূরকণ্ঠী স্কার্ফ...

এরপর তোমাকে গান-স্যালুট দেবে সাদা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি।
মনাস্টারির কুয়াশা মিশে যাবে মন্ত্রোচ্চারণে। ঘুমন্ত বুদ্ধমূর্তির নিচে প্রদীপ হাতে মৌন শ্রমণ।
আর্মি ট্রাকে পুষ্প বৃষ্টি। ব্যারাকে ব্যারাকে ক্যাম্পফায়ার।

এই মার্জার সরণি তোমার প্রাচীন রেশম পথ না,

এই উদাসীন চাউনি কোনও লবনাক্ত বাতিঘর না, এই গমের দানা তোমার আসল রং না।
তবু তুমি কোন রং-রুটে হেঁটে চলেছ, অরুণমালিকা?
যে কৃষ্ণসার হরিণের বনে লুকিয়ে রেখেছ সব সোনাদানা,
যে ধূসর সাভানায় তোমার অপেক্ষায় জনি ডেপ আর যে বন্দরে ভিড়ে আছে সমস্ত যুদ্ধজাহাজ...
আমাকে নিয়ে চল সেই বসন্তমুখর দ্রাঘিমায়, নিয়ে চল কোকোবন আর চকোলেট সমুদ্রে।

নিয়ে চল, হিস্প্যানিক বালিকা।
নিয়ে চল মৃগনাভির মাস্তুলে, পদ্মগোখরোর সরোবরে।

--------

Comments

  1. ভালো কবিতা। শব্দের সুন্দর গাঁথুনি।

    ReplyDelete
  2. Netflix আর Prime জুড়েই দুনিয়ার নিস্পাপ crime. কবির মাথায় বাসা বাঁধা মৌচাক পাঠকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে হুল ফোটায়। অনবদ্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. :) অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  3. ভালো লাগলো। বিভ্রমে বুঁদ হয়ে থাকলাম কিছুটা সময়.. অলংকরণ অসাধারণ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ। অলঙ্করণ সত্যি অসাধারণ।

      Delete
  4. পড়লাম দোস্ত! চোস্ত!👍❤️

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভালো থেকো দোস্ত।

      Delete
  5. অনন্য সব কবিতা

    ReplyDelete
  6. প্রতিটি কবিতা অসাধারণ। বারবার পড়েও যেন পড়ার স্বাদ মেটে না।

    ReplyDelete
  7. Mousumi DasguptaMay 29, 2020 at 12:19 AM

    ভালো লেগেছে, ভালো লাগে, কারণ আপনার লেখার একটা আলাদা রঙ আছে। আপনার কলম মনের কথা বলে। ভালো থাকবেন।।

    ReplyDelete
  8. ভালো লাগা, ভালো বাসা অলওয়েস!

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯