তুলসীদাস মাইতি



হাজার বছরের বাংলা গান || পর্ব -১
তু ল সী দা স  মা ই তি  

 
চর্যার গান ও সমসঙ্গীত

  সৃজ লাউ সসি লাগোলি তন্তী
  অণহা দান্ডি চাকি কি অত অবধুতি।।
  বাজই অ লো  সহি হেরুঅ বীণা
  সুন অন্তি-ধনি বিলসই রুণা।।
              ……………………………
   নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী
   বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই।।

দশম থেকে একাদশ শতকে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য বীণাপাদ রচিত এই সংগীতচর্যায় তানপুরা(সুজ লাউ)ও'বীণা' বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ সহ নৃত্য -গীত যোগ সমকালীন সংগীতচর্চার মর্মকে প্রকাশ করেছে বলে পণ্ডিতরা মনে করেন। লুইপাদ,কাহ্নপাদ, ভুসুকপাদ সহ চব্বিশ জন গীতিকারের পদ্ধড়ি ছন্দে কখনো বা রাহড়ি ছন্দে রচিত এমন গীতিগুলিই বাংলা ভাষার আদিসঙ্গীত। বাংলা গান। অবশ্য সমসময়ে রচিত বজ্রগীতি,দোহাকোষ,ডাকিনী বজ্রগুহ্যগীতি  প্রভৃতি সমসংগীত যোগে ক্ষেত্রটি বৃহৎ।

বাংলা গান সূচনাপর্বেই তাঁর নিজস্ব উচ্চারণে স্বতন্ত্র হতে পেরেছিল। পালযুগ থেকে সেন যুগ ,বৃহৎবাংলা থেকে খাসবাংলার প্রত্যয় গড়ে ওঠার সময়কালে বাঙালির আপন চরিত্রটি যখন প্রকাশ পাচ্ছে বাংলা গান তখনই জন্ম নিচ্ছে।বাঙালির  বাংলা ভাষায় প্রথম সংগীতই বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্য। যা ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে । চর্যাপদ নামেও তা পরিচিত। প্রকৃত অর্থে  বাংলা গানের ধারার একটা বিপুল আয়োজনের ভূমিকা এই চর্যাপদ। বৌদ্ধসহজিয়া সাধকদের রচিত সংগীতগুলি বাংলা সাহিত্য,সঙ্গীত ও সংস্কৃতি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত এই সংগীতসমূহ সম্পর্কে আমরা জেনেছি। দীর্ঘকাল ধরে তার সাহিত্যমূল্য ঐতিহাসিক মূল্য ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু আসলে এগুলি সাধকদের তৈরি গান, সংগীতধর্ম-রাগরাগিনী সহ তার  একান্ত রূপটি অবহেলিতই থেকেছে। বাঙালির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের প্রসাদগুণ নিয়ে চর্যাপদগুলি নির্মিত।বৌদ্ধসহজিয়া সাধকেরা তাদের সহজ ধর্মাচরণকে গানের মধ্য দিয়ে বলেছেন।  এগুলো বহিরঙ্গে ভারতীয় প্রবন্ধসংগীত। তারাবলী জাতীয় রচনা। শিরোনামে রাগ রাগিনীরও উল্লেখ আছে। প্রচলিত পটমঞ্জরী, ভৈরবী, গাবড়া, দেশাখ, অরু, গুঞ্জরী, দেবক্রী, রামক্রী কামোদ, ধনেশ্ৰী, মালশ্রী,শিবরী, মল্লারী,বাংগালা, কাহ্নগুর্জরি প্রভৃতি রাগ রাগিনীর উল্লেখে সংগীতিক বৈচিত্র প্রতিচিত্রিত। অন্তরঙ্গে তা নৈতিকতার আধারে এক বৃহৎ মানবিক সংগীতভাবনার প্রস্তাবনা। 
           
     নব্যভারতীয় আর্য ভাষার ভেতর থেকে বাংলা সহ অন্যান্য ভাষা রূপ পাচ্ছে নিজের মত করে। তখন রচিত হচ্চে নতুন সংগীত।সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় সংগীতের এক বিরাট ইতিহাস। বৈদিক সামগান ও গান্ধর্ব সংগীতের সঙ্গে মার্গ সংগীত এর বিপুল আড়ম্বর পেরিয়ে দেশি সংগীতের ধারাও প্রবহমান। কাঠামোর পূর্ণতা নিয়ে নিটোল প্রবন্ধগীত, নিবন্ধ সংগীত। ভারতীয় রাগসংগীত ও ভাব সংগীতের রাগরাগিনী, তাল অনুসরণেই চর্যার সহজসঙ্গীত।নিজস্বতাকে প্রকাশের পথে পা ফেলার চেষ্টা। বাংলা ভাষায় লেখা গানগুলি নতুন চিন্তার সূচনার ইঙ্গিত করলো।ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের থেকে চর্যাপদের স্বতন্ত্রতার প্রধানদিক তার আঙ্গিকে নয়, গানের কথা ও তার লক্ষ্যে। ভারতীয় সংগীত তার সুরকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে।কথা সেখানে গৌণ। চর্যাপদে কথার গুরুত্ব অনেকখানি। শাস্ত্রীয় সংগীতে রাজবন্দনা,প্রকৃতি বন্দনা দেববন্দনা গুরুত্ব পেয়ে থাকে। চর্যার গানে কথার ভূমিকা অনেকখানি। কথা থামিয়ে সুর খেলানো তার লক্ষ্য নয়।  সহজিয়া রহস্যগোপন সাধন পদ্ধতির সাংকেতিকতায় মানুষের জীবনই প্রাধান্য পেয়েছে। সিদ্ধাচার্যদের চর্যাগানের অভ্যন্তরে আছে প্রতিবাদ, বিদ্রোহের আচরণও। সমস্তপ্রকার বাহ্যানুষ্ঠানের তীব্র নিন্দার সাথে যুক্ত হয়েছে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি কটাক্ষ, বহির্মুখ পণ্ডিত্যের প্রতি অনীহা। ধর্মকে সামনে আনেননি অথচ সংগীত দিয়েই অস্পৃশ্যতার কথা তুলে ধরেছেন। 'নগর বাহিরে ডোম্বী তোহরি কুড়ি আ।/ ছোই ছোই যাই সি ব্রাহ্ম নাড়ি আ।।'' সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে সুর তুলেছেন তাঁরা "ডোম্বী বিবাহিতা অহারিউ জাম।/ জউতুকে কি অ আনতু ধাম!" ছত্রে ছত্রে এমনই সব  উচ্চারণ। পণ্ডিতরা তাই মনে করেন চর্যাগীতিগুলি দশম থেকে দ্বাদশ শতকে "বাংলাদেশের সাংগীতিক চেতনার ভেতর দিয়ে সমাজচেতনার ই নবজাগরণ"। সে কারণেই চর্যাগানগুলি পরবর্তী বাংলা গানের ধারার ভূমিকা। কেননা ধর্মকে শুদ্ধ আনুষ্ঠানিকতার উঠোন থেকে বের করে এক বৃহৎ নৈতিক মানবতার জগতে উন্নীত করেছেন চর্যার কবিগণ। পরবর্তীকালে জয়দেবের গীতগোবিন্দ,শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণবসহজিয়া পদাবলী, কীর্তন, বাউল, দোহা, সুফিগান প্রভৃতির  ওপর চর্যার প্রভাব রয়েছে। এমনকি রবিঠাকুরের গানেও। 
(চিত্র-  ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।)  
--------

Comments

  1. দারুণ শুরু। তথ্যবহুল আর অনুসন্ধানী এই ধারাবাহিক আমাকে আকৃষ্ট করল। আগ্রহ নিয়ে পড়ে যাব। লেখককে অভিনন্দন জানাই।

    ReplyDelete
  2. পরবর্তী সংখ্যার জন্য আগ্রহ রইল! অভিনন্দন!

    ReplyDelete
  3. বহু নতুন তথ্য জানলাম । অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ।

    ReplyDelete
  4. খুব সুন্দর লাগলো। অলঙ্করণ ও উপস্থাপন দারুণ

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি