রতনতনু ঘাটী


র ত ন ত নু  ঘা টী

জন্মান্ধ

আমার জন্মান্ধ মাকে বাবা ভালবেসে বিয়ে করেছিল।
লোকে বলত, “অবিনাশটা বড্ড ভাল!”
সকালবেলা আমাদের বাগান থেকে
বাবা একটা গেরুয়া রঙের দোপাটি তুলে এনে 
মায়ের ফোঁপায় পরিয়ে দিয়ে বলত,
“খুশি, এটা ঠিক তোমার মতো!”
তখন মায়ের অবুঝ চোখের পাতা
ধানপাতার মতো তিরতির করে কাঁপত।
কেমন করে অমন রং চিনতে পারত মা?

সন্ধেবেলা যখন ঝাঁকড়া কদমগাছটার মাথায় 
মেরিলিন মনরোর চোখের মতো চাঁদ উঠত
বাবা তার একটা বরাভয় হাত রাখত আমার কাঁধে,
মায়ের শাঁখা-পরা ডান হাতটা আর-এক হাতে নিয়ে 
বাবা সমগ্র সন্ধেটা রবীন্দ্রনাথ গেয়ে শোনাত আমাদের।
তখন আমলকী পাতার মতো কেঁপে উঠত 
মায়ের চোখের পাতা।
মা যে কেমন করে শাঁখার সাদার মতো গানও দেখতে পেত?

প্রতিপদের লাজুক অন্ধকারে মাকে হাতে ধরে 
ডাহুক-ডাকা দিঘিপারের মাঠে নিয়ে গিয়ে
আলেয়া চেনাতে-চেনাতে বাবা বলত,
“খুশি, আমি তোমাকে একদিন আলো চেনাব।”
মা আকাশের লুব্ধকের ভঙ্গিতে
বাবার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসত।
কেমন করে আলো-আঁধারের তফাত করত মা?

আমার জন্মেরও আগে মা যখন যুবতী, 
বাবা কেমন করে মাকে ভালবাসত, আমি দেখিনি।
যখন মায়ের মধ্যে আমি বন্যার জল হয়ে বেড়ে উঠছি,
তখন সন্ধেবেলা বসুন্ধরার মতো মায়ের ভরন্ত পেটের উপর 
জ্যোৎস্না মাখিয়ে দিত বাবা।
 
মায়ের অক্ষয়-সিঁদুর ব্রত মিথ্যে প্রমাণ করে 
যেদিন সন্ধেবেলা বাবা চলে গেল, সেদিন পূর্ণিমা ছিল। 
কে যে মেঘ দিয়ে চাঁদটাকে ঢেকে দিয়েছিল, কে জানে?
সেদিন গোটা রাতটা আমি আর মা পাগলের মতো 
আকাশ ঢুঁড়ে চাঁদ খুঁজতে-খুঁজতে বাবার শ্মশানযাত্রা দেখেছি।

এই পূর্ণিমা, গেরুয়া রঙের দোপাটি, রবীন্দ্রনাথ,
ঝাঁকড়া কদমগাছ, ধানপাতা, আলেয়া,  
মেরিলিন মনরোর চোখের মতো চাঁদ, 
অক্ষয়-সিঁদুর ব্রত, আমার বরাভয় বাবা,
বসুন্ধরার মতো ভরন্ত মা, বাবার শ্মশানযাত্রা,
সবই আমাকে চিনিয়েছে আমার জন্মান্ধ মা।

তারপর আমি আর আমার মা ভিক্ষাব্রত সম্বল করেছি।

দেখুন, দেখুন, ওই তো এক জন্মান্ধ মায়ের হাত ধরে
পৃথিবী চিনতে বেরিয়েছে এক জন্মান্ধ ছেলে!
                     

সিয়াচেনের মেঘ

সিয়াচেনের মেঘ, তুমি দিনরাত বন্ধুর বেশে 
পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম গ্লেসিয়ারের গায়ে 
সৈন্যদের মৌন পোশাক টাঙিয়ে রাখো।
অত উঁচু থেকে নেমে এসে তোমার কি কোনোদিন 
মাটির পৃথিবীর অশীতি রমণীকে ‘মা’ বলে ডেকে উঠতে ইচ্ছে করে না?
থলকলমির বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বান্ধবীর 
আগুনরঙা ঠোঁটের কথা ভুলে যাও তুমি সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে?
তুমি রোজ বিকেলবেলা ঘরেফেরা মেঘের ছেলেমেয়েদের
কেন পড়তে দাও উদাসীন জীবনের পাঠ?

আকাশপারের দৌবারিক,
তুমি এক আকাশ উঁচুতে দাঁড়িয়ে সীমান্ত পাহারা দাও।
তোমার জন্মনক্ষত্র কবে মুখ লুকিয়েছে এই কুচুটেপনায়,
বুঝতে পারো না? 
 
তোমার অনেকটা নীচে যে মানুষগুলো দেশের জন্যে লড়াই করছে
পররাষ্ট্রনীতির জিরাফ এসে রোজ বিকেলবেলা 
তাদের সামনে মুখ তুলে দাঁড়ায়। 
তার গ্রীবাদেশের নীচে কনে-দেখা আলোর মুখশ্রী নিয়ে 
যে মানুষগুলোর বাড়ি যাওয়ার ছুটি বারেবারেই বাতিল হয়ে যায়,
তাদের মুখ লুকনো বিষণ্ণতায় তুমি আড়াল রচনা করো!
তুমি জেনে রাখো, মাইনাস পঁয়শট্টি ডিগ্রি ঠান্ডায় 
তাদের চোখের জল কখনো বরফ হতে শেখেনি।

তাদের খাকি রঙের বুকপকেট থেকে লুকিয়ে 
সন্তানের হ্যাপি বার্থ ডে’র ছবি কেড়ে নাও কেন?
বান্ধবীর সঙ্গে একটা সূর্যাস্ত বুকের মধ্যে লুকিয়ে
যে লোকটা শত্রুপক্ষের মিসাইলকে বুক পেতে ফিরিয়ে দেয়,
পূর্ব কারাকোরাম রেঞ্জের অবিনাশী মেঘ, 
তাকে তুমি উদয়াস্ত বৈরাগ্যের ছবি আঁকা শেখাবে?

কুড়ি হাজার ফুট উপরে পৃথিবীর উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্রের মাথায়
একবার তুমি ভালোবাসার মেঘ ছড়িয়ে দিতে পারো না?
অনেক দূরে একটা গঞ্জের বাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অধোবদন সংসারকে,
পায়সান্ন-রাঁধা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা 
ঘোমটা খসে পড়া মেদুর মায়ের কাছে
ছেলের ঘরে ফেরার খবর পৌঁছে দিতে পারো না তুমি? 

এই তো সেদিন হিমানীসম্পাতে মেশিনগান আঁকড়ে মারা গেল যারা
ওরা যে দেশেরই হোক, মনে রেখো, ওরাও মানুষ!
সত্তর ফুট বরফের নীচ থেকে তাদের শরীর তুলে এনে
বিধবার পোশাক পরা তাদের স্ত্রীর পিঠে হাত রেখে আর বলতে যেও না,
“চলে যাওয়া মানুষের জন্যে অমন করে মাতম করতে নেই!”

মানুষের বাধানো যুদ্ধে ভেঙে পড়ছে গ্লেসিয়ারের হীমশীতল পাঁজর।
এদিক থেকে পল্টুর ভাই গেছে, ওদিক থেকে এসেছে ইয়াসিনের ভাতিজা,
আজ সকালে সূর্য মুখ তোলার আগে পল্টুর ভাইয়ের ছেলে হয়েছে
অকৃতদার ইয়াসিন চোখ বোজার সময় ভাতিজাকে খুঁজেছিল। 
সিয়াচেনের মেঘ, তুমি আর কবে যুদ্ধবিরতির সংবাদ শোনাবে? 
মানুষের লড়াই তুমি আজ যদি থামাতে না পারো,
তবে কোথায় দাঁড়াবে গর্ভধারিণী স্নো লেপার্ড?
কলকাতা মেট্রোরেলের কম্পার্টমেন্টে লজ্জাহীন যুবকযুবতীকে দেখে 
চোখ নামিয়ে নিয়ে যেমন করে ক্ষমা করে দিচ্ছ প্রতিদিন
তেমন ক্ষমাভিক্ষার দরকার নেই শরমী ব্রাউন বিয়ারদের,
তাদের তুমি এক অঞ্জলি নির্জনতা দাও।

ক্ষয়িষ্ণু মানবিকতার মতো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে 
তাপে দগ্ধ কালশিটে পড়া সিয়াচেন গ্লেসিয়ার,
ওর গায়ের মিসাইল আর গ্রেনেডের ক্ষতচিহ্ন মুছে যাক, 
ওকে শান্তিতে শুয়ে থাকতে দাও বরফের নিশ্চিন্ত বিছানায়।

পৃথিবী জুড়ে মানুষ এবার ভুলে যাক সার্বভৌমত্বের মায়াজাল
এবার শপথ নিতে জেগে উঠুক নতুন এক মানব সভ্যতা।
ব্লাউজের ভিতর থেকে ছোট ছেলের ছবিটা বের করে 
প্রসাদ উজিয়ে ঠাকুরের সামনে রেখে 
ভাতের মাড় শুকিয়ে যাওয়া হাতে 
মা ফের ভাত রাঁধতে তিনপাখা উনুন জ্বালুক।
জন্মান্ধ বাবার কোল আলো করে শুয়ে থাকুক 
যুদ্ধে যাওয়া তার একমাত্র ছেলে।
যুদ্ধে যাওয়া দাদার জন্যে এবার থেকে ভাইফোঁটায় 
বোনকে আর দেওয়ালে ফোঁটা দিতে হবে না!
এবার যুদ্ধফেরা সৈনিকের নিরহঙ্কারী স্ত্রীকে উপহার দাও 
একটা গোটা রাতের একটানা অগ্নিকাণ্ড!

তা না হলে নতুন পৃথিবী তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না।
ভিন গ্রহের প্রাণীরাও তোমার দিকে আঙুল তুলে বলবে,
“সিয়াচেনের মেঘ, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী তুমি একটা মিথ্যুক! 
তুমি এক হিংস্র রূপকথার ভুল পররাষ্ট্রনীতি।”


ভুল করতে নেই

ছেলেটা ক’দিন ধরে যাই যাই করছিল, আমি টের পাইনি। 
তোর মা বুঝতে পেরে একদিন আমাকে বলেছিল,
‘অনুপম কোথাও একটা যাওয়ার তোড়জোড় করছে। লক্ষ রেখো! 
তুমি দেখতে পাচ্ছ না, ওর চোখের তারায় চিকচিক করছে লুব্ধক?
যুদ্ধে যাওয়ার সময় আগে-পিছে আরও সৈন্য থাকলে যেমন হয়,
ওরও সামনে-পিছনে বরাভয় ওকে পথ দেখনোর জন্যে তৈরি হচ্ছে?’
বলেছিলাম, ‘ওইটুকু ছেলে, কী-ই বা চেনে! ও আবার কোথায় যাবে?’
তখন বুঝতে পারিনি, মায়েরা আগেভাগে সব বুঝতে পারে। 

মাস ছ’য়েক আগে যেদিন তুই চলে গেলি, সেদিন ছিল শুক্লা দ্বাদশী।
সকালে তোর বালিশের তলায় চিঠি খুঁজলাম, পেলাম না।
তোর বইয়ের তাক হাটকে পেলাম সাদা কাগজে নীল কালিতে
তোরই হাতে আঁকা একটা সুদীর্ঘ পথের স্কেচ।
যে লাল রঙের প্যান্ট আর হলদে টি-শার্ট পরে 
তুই সেদিন রাতে শুতে গিয়েছিলি, ওটকুকুই পরে চলে গেছিস,
আর কিচ্ছু নিয়ে যাসনি।
শুতে যাওয়ার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি, 
‘বাবা, তোমার ওষুধ খাওয়া হয়েছে?’
মাকে বলেছিলি, ‘মা, আজ আর শুতে রাত কোরো না যেন! 
তোমার শরীর ভালো নেই! সব কাজ কাল সকালে কোরো!’

তারপর থানা-পুলিশ-হাসপাতাল-মর্গ-নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপন,
বন্ধুবান্ধবকে ডেকে জিজ্ঞেস করা, কিচ্ছু বাকি রাখিনি।
একটি মেয়ের সঙ্গে তুই রোজ বিকেলবেলা বাঁশের সাঁকোর উপর 
দেখা করতে যেতিস, তাকেও বাড়িতে ডেকে জিজ্ঞেস করেছি।
কেমন করে যে তুই বারুদের ব্যবহার শিখলি,
বন্দুক চালাতে শিখলি দু’ হাতে সঠিক নিশানায়, 
ঘাসের জঙ্গলে কেমন করে মাইন পুঁততে শিখলি?
ওইটুকু ছোট্ট বুকে কেমন করে ঠিকঠাক বিস্ফোরক বাঁধা প্র্যাকটিস করলি,
কিচ্ছু জানতে পারিনি।
আমি আর তোর মা তোকে কেন সতর্ক করে দিতে পারিনি, 
‘কালো-কালো ছায়ামূর্তিগুলো তোকে বাঁচতে দেবে না?
বিস্ফোরণের আগে ওরা তোকে বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার করবে?’
কিছুই জানাতে পারিনি আমরা।

আজ হাটবার ছিল। হরিদাসপুর বাজারের মোড়ে অনেক লোক মারা গেল।
তোর মা বলল, ‘ছেলেটা যাই যাই করছিল। তা হলে সত্যিই চলে গেল!’
বাজারের মাথায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীর মূর্তির পায়ের কাছে
পুলিশ কারও ঝলসে যাওয়া শরীরের একত্রিশটা টুকরো কুড়িয়ে পেয়েছে।
পুলিশ বলছে, ওই কালো টুকরোগুলো নাকি তোর, আমরা বিশ্বাস করিনি। 

আমি আর তোর মা ঠিক করেছি, তোকে চিহ্নিত করতে যাব না।
খবরের কাগজে এসব ছবি ছাপা হবে কাল। তুই যেদিন ফিরে আসবি,
এসে মাকে বলবি, ‘মা, তুমি এত রোগা হয়ে গেছ কেন? 
দাও, আমি তোমার রান্নার জল এনে দিচ্ছি।’
প্যান্টের পকেট হাতড়ে এক বান্ডিল ওষুধ বের করতে করতে বলবি, 
‘বাবা, তুমি কিন্তু এবার মনে করে ওষুধগুলো খেয়ো!’
আমি আর তোর মা সেদিন খবরের কাগজের ছবির ওই টুকরোগুলো
মনে মনে জোড়া দিতে দিতে বলব, ‘বাবা, কখনও ভুল করতে নেই।’
                 

অলীক সফটওয়্যার কোম্পানি

অনেকদিন পরে আজ অনিলেশের সঙ্গে দেখা
তেরো মাথার মোড়ের উদয়পদ্ম গাছটার নীচে।
অনিলেশ বলল, ও নাকি রোজ এখান থেকেই 
সেক্টর নাইন্টি-নাইনের বাস ধরে, 
ওর কোম্পানির নাম অলীক সফটওয়্যার। 
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করলাম, 
এ কি সেই অনিলেশ, যে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়
আমার একটা সুগন্ধি ইরেজার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি?

ওর হাতের টিফিনবক্সের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালাম?
অনিলেশ বলল, এতে নানা রঙের রূপকথা ভরে দিয়েছে ওর বউ।
বাইরে কিচ্ছু খেতে দেয় না, 
তাই এইসব রূপকথা খেয়েই ওর সারাদিন কাটে!
আমি ওর চোখে চোখ রাখলাম, 
এ কি সেই অনিলেশ, যে মেয়েদের সামনে 
নিজের নামটাই ঠিকঠাক মনে করতে পারত না?

একথা-ওকথার পিঠে জানতে চাইলাম, ছেলেমেয়েরা?
অনিলেশ বলল, এক ছেলে দুন স্কুলে পড়ে, 
ওর বিষয় ভোরবেলার স্বপ্ন! 
আর এক মেয়ে বিকেলবেলার রামধনু নিয়ে 
বিশ্বভারতীতে মাস্টার্স করছে, সেকেন্ড ইয়ার।
আমি মনে মনে বললাম, এ কি সেই অনিলেশ, 
যে অঙ্কে তেরো পেত, আর বাংলায় 
কখনও ভাবসম্প্রসারণ লিখতেই পারত না?

বললাম, কদম্বগাছিতে থাকিস, 
ওখানে ফ্ল্যাট না নিজের বাড়ি?
অনিলেশ বলল, যমুনাবতী নদীর পাড়ে 
মধুমঞ্জরী লতায় ঢাকা দোতলা বাড়িটাই তো,
বাড়ির নাম আকাশকুসুম!
আমার মনে পড়ে গেল, যে ছেলেটা খালধারের হতকুচ্ছিত 
একটা বাঁশের বেড়ার ঘরে থাকত, এ কি সেই অনিলেশ?
জানতে চাইলাম, এতটা পথ... গাড়িটাড়ি কিনিসনি?
ও বলল, ওর দুটো গাড়ি আছে, 
একটার নাম পুষ্পক, আর-একটার নাম অন্তরীক্ষ!
গাড়িতে গেলে মানুষ একলা হয়ে যায়, 
তাই বাসে যাতায়াত করে।
আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, 
এ কি সেই অনিলেশ, যার হাওয়াই চটি ছিঁড়ে গিয়েছিল বলে 
অনেক দিন খালি পায়ে স্কুলে আসত?

বললাম, অফিস চলে গেলে বউ সারাদিন কিছু...
অনিলেশ জানাল, অফিস যাওয়ার সময় ও বউকে 
নতুন কিছু করতে বলে যায়,
আর সরোদে-সেতারে, তানপুরায়-বেহালায়, বীণায়-এস্রাজে
ওর বউ সারাদিন নতুন নতুন সুর রচনা করে।
শুনে আমি ভাবলাম, এ কি সেই অনিলেশ, 
যে ভুল বানানে মীতাক্ষরীকে প্রেমপত্র লিখে 
বাংলাস্যারের হাতে ধরা পড়ে বকুনি খেয়েছিল? 

বললাম, মেসোমশাই, মানে এখন...
অনিলেশ বলল, ও, বলাই হয়নি!
বাবার মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছিল,
বাবা দিনেরবেলা আকাশে তিনটে সূর্য
আর রাতেরবেলা চারটে চাঁদ দেখতে পেত।
ছেলেমেয়ের পড়ার ক্ষতি হচ্ছিল,
তাই বাবাকে আর বাড়িতে রাখাই গেল না!
নিজের মনে বললাম, এ কি সেই অনিলেশ,
যার বই কিনে দেওয়ার জন্যে তার বাবা 
লোকের বাড়ি-বাড়ি সাহায্য চাইতে যেতেন?

অনিলেশ চলে যাওয়ার জন্যে উসখুশ করছিল। 
জিজ্ঞেস করলাম, আর মাসিমা?
অনিলেশ বলল, আর বলিস না! 
সংসারে মানিয়ে নিতে পারল না বলে 
মাকে একটা বৃদ্ধাবাসে রেখে এসেছি।
ওখানে কাগজের ঠোঙা তৈরির টাকায় 
আমার এবারের জন্মদিনে মা একটা জামা পাঠিয়েছিল,
কিন্তু বিশ্বাস কর, এত অর্ডিনারি, জাস্ট পরা গেল না!


আমি চেঁচিয়ে বললাম, তুই কি সেই অনিলেশ,
যার জন্যে বাঁশের বেড়ার ঘরের দরজায় 
মাসিমা ভাতের থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত সারাদিন?

আমার কথাগুলো শুনতেই পেল না, দৌড়ে বাসে উঠে গেল অনিলেশ,
অলীক সফটওয়্যার কোম্পানির ম্যানেজার।
নতুন পাঠ্যক্রম

বাঘের মেয়েকে আমি হিংসা পড়ানোর দায়িত্ব পেয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এই পাঠ্যক্রমে 
তাকে ভরতি করতে চায় তার বাবা-মা।

হাতে-পায়ে তার এত বাঘনখ
দাঁতে তার টুঁটি কামড়ে ধরার আহ্লাদ
চোখে জঙ্গলের ব্যাকরণ।
আমি তাকে নতুন কী হাংসা পড়াব?

তবু তাকে হিসা-কবিতা, হিংসা-অঙ্ক,
হিংসা-কুইজ ও হিংসা-ব্যাকরণ পড়াই।
দেখি, এ সম্পর্কে তার জ্ঞান বড় কম!
বাঘের মেয়ে, এখনও ঠিকমতো হিংসা বানান লিখতে শেখেনি।

আমি তার বাবা-মাকে ডেকে বলি,
‘আপনার মেয়ে এই হুঙ্কার শিখছে তো
এই ভুলে যাচ্ছে থাবার কৌশল,
এই দাঁতের তীক্ষ্ণতা রপ্ত করছে তো
এই ভুলে যাচ্ছে হুঙ্কার।
ওকে এক বছর হিংসাপুরের হস্টেলে রেখে আসুন।’

আজ এক বছর পরে দেখি,
দূর মাঠ ভেঙে বাঘ আসছে মেয়েকে নিয়ে
মানুষের কাছে হিংসা পড়াতে।   

---------

Comments

  1. সব গুলিই অনবদ্য

    ReplyDelete
  2. কি অপূর্ব সব কবিতা!

    ReplyDelete
  3. সুন্দর কবিতা। প্রথমে এর আয়তন দেখে অনিচ্ছা জেগেছিল পড়তে। তবু চেষ্টা করে প্রথম কবিতার প্রথম লাইন শুরু করার পর কখন যে সব কবিতা পড়া শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। আমার পড়া ওনার প্রথম কবিতাতেই উনি আমার ভালোলাগা কবিদের মধ্যে স্থান করে নিলেন।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯