হিমালয়ের পথে চলতে চলতে


দে ব ব্র ত  ভ ট্টা চা র্য্য 

হিমালয়ের পথে চলতে চলতে 
প্রথম পর্ব 


কেদারনাথ দর্শন 

"কেদারনাথ ধাম হ'ল উত্তরাখণ্ড এর চার ধামের একটি। সব চেয়ে দুর্গম। তার উপর ২০১৩ এর ১৬ জুন যে মহাপ্রলয় ঘটেছিল তার কারণেই কেদারনাথের পথ আরও দুর্গম হয়ে পড়ে। আগে এর দূরত্ব ছিল ১৪ কিলোমিটার। এখন সেটা ২১ কিলোমিটার হয়ে গেছে। পথটাও খুব ভাঙ্গা চোরা ।তবে  এ পথ যেমন রহস্যময় তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা।
হরিদ্বার থেকে ভোর পাঁচটায় আমরা বাসে উঠেছি। আমরা বলতে আমার সাথে আছেন বন্ধু ভবেশ বসু। প্রাক্তন সরকারী কর্মী। কবি সাহিত্যিক হিসেবে খুব পরিচিত একজন হলেও উনি আমার কাছে কেবল একজন বন্ধু। সোনপ্রয়াগের উদ্দেশ্যে এখন আমাদের যাত্রা। হরিদ্বার থেকে সোনপ্রয়াগ এর দূরত্ব ২২৯ কিলোমিটার। 
     যখন সোনপ্রয়াগের মাটি ছুঁলাম, বিকেলের আকাশ সিঁদুর রঙে সেজেছে। বাস আগে গৌরীকুণ্ড পর্যন্ত চলে যেতো। কিন্তু  ২০১৩এর ১৬ জুন তারিখটি এখানকার মানচিত্রটাকে একেবারে বদলে দিয়ে গেছে। সেদিনের মহাবিপর্যয়ে মানুষের প্রাণ ও সম্পত্তির যে ক্ষতি হয়েছিল তা বোধহয় আগামী দশকেও পূরণ সম্ভব নয় ।এখন সোনপ্রয়াগ থেকে লোহার ব্রীজ মন্দাকিনীর অপর পারে নিয়ে যায় যাত্রীদের। আমরাও চললাম ব্যাগ সুটকেস টানতে টানতে। ব্রীজে পৌঁছোনোর আগেই দেখলাম, একটি শাখাপথ পাহাড়ের উপরে উঠে গেছে পাক খেয়ে খেয়ে। এ পথ চার কিলোমিটার দূরে ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দিরে নিয়ে যাবে। একটি ছোট্ট প্রাচীন মন্দির। এই মন্দিরে সেই ত্রেতা যুগ থেকে একটি ধুনী জ্বলে আছে। কখনও নেভেনি। এখানেই শিব পার্বতী বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শুনেছিলাম, হৃষীকেশে দক্ষ কন্যা সতীর সাথে শিবের বিবাহ হয়েছিল। বোধহয় শিব মশাই হিমালয়ের এ অঞ্চল জুড়েই তাঁর ঘর সংসার সাজিয়ে রেখেছেন ।
     ত্রিযুগী থেকে সূর্যোদয় দর্শন এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। শুধু এইটুকুর জন্যই এখানে বার বার ফিরে আসা যায়। দূরের পর্বত শৃঙ্গের বরফে রঙের স্পর্শ রেখে সূর্যদেব যখন আবির্ভূত হন সে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য! 
   প্রথা আছে "আগে ত্রিযুগী পরে কেদার "।ত্রিযুগী দর্শন না করলে কেদারনাথ দর্শনের পুণ্যলাভ হয় না। কিন্তু আমরা দুজনেই তো ঠিক করেছি, একেবারে বাবার চরণে গিয়ে থামবো। পাপ পুন্য তিনিই বুঝবেন। "জয় বাবা কেদারনাথ "।
     মন্দাকিনীর উপর নতুন তৈরী লোহার ব্রীজটি একদম স্রোতের উপর শোয়ানো। নদী গর্ভে নামার জন্য নতুন পিচ বাঁধানো মসৃন পথ। নামতে নামতে শুনলাম, এখান থেকে সামান্য দূরে মুন্ড কাটা গণেশের একটি মূর্তি আছে। এখানেই নাকি গণেশদেবের মুণ্ডটি কাটা পড়েছিল। শিব পুরাণে আছে, মহাপাপী পঞ্চপাণ্ডব শিব দর্শনে এলে শিব অত্যন্ত রুষ্ট হন। সে এক যুগান্তকারী কাহিনী, আমরা পরে জেনে নেবো। তা সেই সময় ক্রুদ্ধ মহাদেবের সম্মুখে গনেশ এসে পড়লে মহাদেব মহা ক্রোধে তাঁর মুণ্ডটি কচ করে কেটে ফেলেন। পরক্ষণেই তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরে এক দেবহস্তীর মস্তক ছিন্ন করে গণেশের জীবন দান করেন। আমরা কিন্তু একটা অন্য রকম কাহিনী জানতাম। শণিদেবের দৃষ্টিপাতে গণেশের মস্তিষ্কটি ভষ্ম হয়ে যায়। সে যাই হোক কেদারনাথ ধাম যাওয়ার আগে গণেশের পুজো না দিলে চলে না। আমরা দূর থেকেই তাঁর চরণ বন্দনা করলাম। 
    ব্রীজের উপর দিয়ে পুণ্যার্থীদের পারাপারের জন্য পৃথক পথ এবং ঘোড়া খচ্চরদের জন্য অন্য পথ নির্দিষ্ট। অসংখ্য মানুষের কোলাহলে স্থানটি পূর্ণ। আর মানুষ মানেই বিশৃঙ্খলা। মানুষ  মানেই স্বার্থের লড়াই।যে ভাবেই হোক আগে এগিয়ে যেতে হবে। তীর্থযাত্রার পুণ্যফল না হাত ফসকে বেরিয়ে যায়। 
   এত সামনে থেকে এত গুলি চতুষ্পদকে দেখা যথেষ্ট ভয়ের। তারা ঠক ঠক শব্দে লোহার ব্রীজ কাঁপিয়ে যাতায়াত করছে। সঙ্গে আছে তাদের মালিক। 
    নদীর অপর পারে সারি সারি ট্রেকার দাঁড়িয়ে। এখানের ভাষায় "কাটা গাড়ী"। কে জানে হয়তো এ নামের পেছনেও কোনও গল্প আছে। লাইন দিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। আমরা মাত্র দুজন বলে আগের গাড়ীতে জায়গা হয়ে গেল। পাঁচ কিলোমিটার পথ। কুড়ি টাকা ভাড়া। গাড়ীর ইঞ্জিন গর্জন করে উঠলো। আর সাথে সাথে ধ্বনি উঠলো --জয় বাবা কেদারনাথ জী কী -। ওপর দিকে তাকালাম, আমাদের ঘিরে অসংখ্য পর্বত শিখর, তাদের মাথায় এখনও দিনের আলোর ছোঁয়া। পায়ের কাছে মন্দাকিনীর উচ্ছল জলধারা পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শিশুর মতো। এক সহযাত্রী হিন্দিতে বললেন --এখানে বাসুকী গঙ্গা মন্দাকিনীর সাথে মিলিত হয়েছে। পাহাড়ের উপর বরফ গলা জলে তৈরী হয়েছে একটি সরোবর। নাম "বাসুকীতাল"। সেখান থেকেই জন্ম বাসুকী গঙ্গার । কেউ বলে সোম গঙ্গা। এই কারণে এ স্থানের নাম সোমপ্রয়াগ বা সোনপ্রয়াগ ।
   এখানে সব নদীই গঙ্গা। গঙ্গা শব্দের অর্থ পবিত্র, নির্মল। সে অর্থে সব নদীই পবিত্র। অতি পবিত্র সে জলধারা তাদের অববাহিকায় কত জনপদ সৃষ্টি করেছে। তাদের উদ্দেশ্যে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানালাম।
চিত্র- লেখক। 
 
---------

Comments

  1. অসাধারণ লাগলো

    ReplyDelete
  2. ভোর বেলা নিশ্চিন্ত মনে তোমার ভ্রমন কাহিনী পড়লাম।তুমি খুব ভালো লিখেছো।উপযুক্ত পত্রে পাত্রস্থ হয়েছে।

    ReplyDelete
  3. ভালো লাগছে । আমিও পোঁছে যাচ্ছি আপনার সাথে।।

    ReplyDelete
  4. শ্যামল চন্দ্র দেJune 27, 2020 at 6:16 PM

    ভালো লাগছে । সুন্দর লেখা।
    শ্যামল চন্দ্র দে

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি