বনশ্রী রায় দাস


ব ন শ্রী  রা য়  দা স


জন্মদাগ
           
স্মৃতির মাস্তুল ছাপিয়ে ঢুকে
পড়েছে বেনোজল,
বিশ্বাস করো আর জানতে চাই না 
সাধন পদ্ধতি, যা কিছু সম্বল,
বিলীয়মান অথবা প্রত্ন।

কংক্রিট ভেদ করে মানুষ কাঠের পুতুল 
হাত দুটি শুধু আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে।
ভীষণ ভয় করে আকাশে
কালপুরুষের ছায়া দেখলে।

কথা ফুরিয়ে যাওয়ার আগে 
আর একবার কাছাকাছি হয়
ঝিঙ্গে ফুলের মতো দুটি নক্ষত্র
বীজমন্ত্র বলে, যৌবনের মাটিতে  
চায় জন্মদাগ রেখে যেতে।

আশ্চর্য স্বর

বাইরে ভীষণ ঝড়ের ঘুর্ণি,
বাসা ভাঙলে থেঁতলে যায় অদৃশ্য ভয়,
কালের কানামাছি খেলা
শকুন ডানায়।

ঝড় থামলে প্রতিসারী- হাওয়া,
চিঠির কৌটো মেলে দেয়
সম্পর্কের মর্চে রং।

চাঁপা গাছের নীচে এসে নিভে গেছে পথ,
ঘাসমাটির ঘামে ভেজা আকাশ,
নাড়ি ছেঁড়া কান্না রক্ত হয়ে ঝরছে বাকলে।

উড়ে গেছে জন্ম পরিযায়ী 
পালকের মুদ্রায় বাজে আশ্চর্য স্বর।
তার বোধ, বিলাপ হয়ে চাপ চাপ 
গেঁথে আছে বুকের ভিতর।


যাবো বলেও হয় না যাওয়া 

চুক্তির সমাধি পেরিয়ে চলে এসেছি 
আর ডাক দিও না ও পথে।
বেতবনের কিনারায় ঝুলন্ত মৌচাক ,
গন্ধ ফুলের টানে মৌমাছির ওয়াগেল নৃত্য।
পথের টুকরো রোদ্দুর থেকে 
চৈতন্য ঠিকরে পড়ছে চোখে মুখে।

নদী পাড়ের দিকে চাঁদ স্রোতের ঢেউ,
দুর্গাছাতু টিলায় চরে বেড়াচ্ছে ছাগশিশু,
শিমুলের ষোড়শী স্তনে মুখ গুঁজে 
ওম্ মাখতে চায় নরম শরীরে।
কাঁটার কাঁপনে জল-সোহাগী পাখির মতো
উড়ে এলো কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি।

আলোর উজানে ভাসতে গেলে শরীরী মাছ খেলে যায়,
মেঘ-সমুদ্রে ঝাঁপ মেরে আতঙ্কে থাকি
ঘোরের তালা ভেঙে কবে 
শুনতে পাবো শতভিষা-গান? 


বৃথা বিলাপ 

স্থাবর অস্থাবর জ্ঞান ধর্ম 
মুখ লুকিয়ে গৃহকোণে 
এখন হিসেব নিকেশ বৃথাই।

যুদ্ধ শেষ খাঁ খাঁ কুরুক্ষেত্র ,
অবশিষ্ট গান্ধারীর কান্না 
              আর মহাশ্মশান।

হয়তো ছিল চোখ থাকতে অন্ধ সেজে থাকবার আত্মবিলাপ ও।

হোমাপাখি

আকাশের এক কোণ ধরে
উড়ে যায় হোমাপাখি
যেতে যেতে ছড়িয়ে দেয় গর্ভবীজ,
খসে পড়া পালকে লিখে নেয়
নিঃসঙ্গ জীবন উপাখ্যান।
এসব যন্ত্রণা উঁকি দিয়ে যায় 
মৃত্যু দিনের চৌকাঠে।
একটি ফুল পাতাহীন বৃক্ষ 
আকাশ পথে উড়িয়ে দেয়
গভীর শ্বাস--
নিষ্ফলা কাণ্ডের ভেতর পুষে রাখে 
চামড়া পোড়া গন্ধ।
সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততা নিয়ে বাসস্থানে ফেরে গৃহস্থ-জীবন।
পৃথিবীর সমস্ত বিবেক লন্ডভন্ড করে ,
মাথা নুইয়ে দিতে পারে একটি বিছানা।
হাওয়া মহলের দখিনায় এত কম দামে 
বিক্রি হলে তুমি ?
ওপারে রক্ত জল নরক ,
গোরস্থানের মাটি উঠিয়ে পচা গলা শরীর--
অতৃপ্ত আত্মা ঘোরাফেরা করে 
রাতের মায়াচরে।
পৃথিবী ক্রমশ ঢুকে পড়েছে
গ্লোবাল ভিলেজে ,
একা হতে হতে মানুষগুলো  
হোমাপাখি হয়ে ঢুকে পড়ছে 
জলন্ত নক্ষত্রের অগ্নিগহ্বরে।

------

            

Comments

  1. প্রতিটি কবিতায় নির্মল আবেশে ধরা পড়েছে কবির নিজস্ব অনুভূতি, যা পাঠককে ভাবায়, ভালবাসায় ভরায় অতৃপ্ত হৃদয় ।
    শুভেচ্ছা নিরন্তর । আরও সুন্দর কবিতার জন্ম-মুহূর্তের অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি