বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায়


বু বু সী মা  চ ট্টো পা ধ্যা য় 


না বলা কথা 
    
আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে , পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়,
সবচেয়ে আশ্চর্য আবিষ্কার কী? 
আমি বলব- বুকের ভেতরের সেই যে- 
সেই  নদীটির কথা!
তুমি ভাবছ আমি তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছি;
নইলে এমন কথা আগে তোমাকে কেউ বললো না কেন ?
ভারি কৌতূহল হচ্ছে তোমার ,
ভাবছ চোখ খুললেই সেই নদীতে 
একটা আস্ত মহাশূন্য এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে - 
সেখানে ভাসতে ভাসতে অসমাপ্ত পাঁচিল ধরে  
নিঃসঙ্গ-নিঝুম সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামবে খুব! 
একটা হাড়-জুড়ানো আদর তোমাকে ওষ্ঠে-পৃষ্ঠে বেঁধে  
বিহান আলো মাখাতে মাখাতে
নদীর ঘরে পাথর ভাঙার শব্দ শোনাবে আর তুমি বলবে 
"কই এমন করে তো 
নদীর কথা আগে বলোনি কখনো -"।।

 সময় 

অঢেল সময় যেন ঐ সুউচ্চ ভবন থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে আমার মুঠোয় নিজেই পুরে যাচ্ছে, 
অথচ আমার মুষ্টি খোলা জানালার মত!
কোনো কিছুতেই মন লাগে না। 
এইখানে মনখারাপ, তো ওইখানে মনভার! 
এদিকে আবার
ও পাড়ার দক্ষিণ বাতাস এসে
ঠায় হেঁকে গেল সারা সকাল জুড়ে এ পাড়ার
জানালায় জানালায় -
"তোমরা যে যার মত সাজো গো
   আমি এসে ঠিক সময় দেখে যাবো!"
আমার যেন কি হয়েছে 
মনে মনেই বললাম-
"দূর দূর কি হবে সে সাজ তোমায় দেখিয়ে?
       আমার তো কোনো কিছুতে মনই নেই।"

দুপুরের ঠাঁ ঠাঁ রোদ্দুর তার সোনালী আঁচল খুলে 
এসে দাঁড়াল আমার এক চিলতে রান্নাঘরের জানালায়, ঝলমলিয়ে উঠলও তেলচিটচিটে 
জানালার গরাদ! আমি  বাসনকোসন মাজতে মাজতেই বললাম
- "তুমি এখন কি করতে এলে বলে তো? 
 তোমাদের জ্বালায় আমার আর কিছুই ভাল্লাগে না বাপু!"
সে হেসে উঠল,সোনা ঝরে পড়ছে নির্জন দুপুরে
আমার সিঙ্কে।
আমি শুনতে পাচ্ছি  রোদ্দুরটা হাসতে হাসতে 
বলছে--
"তুমি খুব সুন্দর! তোমার মুঠো আলগা হলেও আজ আমার কিন্তু গণ্ডি নেই সবটুকু পরিপাটি আলো তোমাদের সাথে 
ভাগ করে নেবো বলেই তো আঁচল পেতেছি।"


ঘর

কি জানি কি হয় 

কবিতার সাথে ঘর করতে গিয়ে তোমাকে আর সব কথা জানানোই হলো না' সাতপাঁচ ভাবার সময় কোথা? 
হাঁটতে হাঁটতে  পৌছে যাচ্ছি  লালমাটিয়া' গমের ক্ষেত, তারপর একটা চুউউ শব্দের দৌড়-
ঘুলঘুলির থেকে টিয়ার বাচ্চা ধরে মোতি'র-মা আমাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে আমার দৌড়ে লাগতো  দ্রুতগতির জিন,
আর চুউউ শব্দে লাগতো পাড় ভাঙা রগরগে জেদ। 
একসময় পুকুরের পাড়ে  দাদাঠাকুরের মঠের সামনে আমার সব জেদ হয়ে যেত কুসুম'
মোতির'মা আঁচল টেনে আমার ক্লান্তি মুছিয়ে দিয়ে বলতো- 
"একট পইদ্য শুনাও দিকি"- আসলে
তোমাকে বলাই হয়নি কবিতার সাথে ঘর করতে শেখা যায় না- 
কবিতাই তোমাকে একটা ঘর বানিয়ে দেয়।।


ঘেরাটোপ

দরজা বলতে তো আর কিছুই নেই গো গোঁসাই ।
কয়েকটা ঘেরাটোপ আছে;
যা আজন্ম আর ডিঙোতে চায় না মন।
তুমি তো মনের কাছেই বসে থাকো অবিরত,ঠিক যেন আমার মেয়েবেলা।
তবুও আর চিহ্নটিও নেই তাকে ছুঁয়ে দেখার।
বাইরে শ্রাবণের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি  
অন্ধকার ভেদ করে ছিটিয়ে দিচ্ছে শার্সির ওপারে গোপন চিলেকোঠার এক একটি অধ্যায়। 
আজো সেই বাঁশি,
সেই অপেক্ষা,
একটা সূর্যাস্ত আর
ছাতিমের গন্ধে
একটা ঠাণ্ডা বাতাস এমন ভাবে  ধাক্কা দিয়ে গেল'
যে তার না আছে
"কূল" না আছে "কিনারা।"
কত সহস্র শতাব্দী দেখিনি তোমায় মন!
ভেঙে যাওয়া হারমোনিয়ামের রিড তুমি কি আজও সন্ধ্যায় তেমনি করেই বেজে ওঠো? 
যখন পড়ার টেবিলে খুব সন্তর্পণে মা রেখে আসতো 
এক গ্লাস সফেদ উষ্ণতা।


বৃত্ত ভাঙার শব্দ 

গ্রামের চিরপরিচিত অগভীর নদীটি যদি হঠাৎ করে তোমার কাছে জানতে চায়--
"সমুদ্র কতদূর গো ? "
তুমি প্রথম দিনে একটু হেসে বলবে-
"ঐ তো কাছেই আর একটুখানি পথ।"
নদী বুঝবে তুমি সাথেই আছো।
প্রতি বিকেলে নদীর একটা অংশ জুড়ে যেখানে তুমি এসে দাঁড়াও' সেখানে একটা জায়গা করে নিয়ে বেশ পরিপাটি হয়ে বসে কবিতা লেখো আর নদীর বুকে রেখে আসো;
তা কি ভেসে যাবে বলেই ভাসাও?  
নদীর সাহস বাড়ে'
একদিন তোমার পা ভিজিয়ে দিয়ে পাড় ভাঙার গল্প বলতে এসে আবার শুধায়-
"সমুদ্র কতদূর গো?"
তুমি কি চমকে গেলে?
সমুদ্র তোমার ভালো লাগেনা তা তো নদী জানে 'তুমি তো নদীকে পাহাড় থেকে এনে গ্রামের মাঝখানটিতে রেখেছিলে, একেবারে বুকের বাঁ দিকে।
তবুও শুধায়- 
"সমুদ্র কতদূর গো?" 
সেদিন তুমি কোনো উত্তর না দিয়ে পালিয়ে এলে'
নদী তো তোমার পায়ে পায়ে উঠোন পেরিয়ে- 
চৌকাঠ পেরিয়ে-
সোওওজা তোমার পড়ার টেবিলে'
সে তো থামতে শেখেনি; 
একদিন অভিমানী মুখ নিয়ে  নদীর কাছে দাঁড়াতেই  নদীর গর্জন-তর্জন শুরু হলো'
তোমার অভিমান পিছল পথে ভেঙে চুরে যাচ্ছে-
কুঁকড়ে যাচ্ছে তোমার কলমীলতা ভাবনাচর-
তোমার মুঠোয় রাখা সমুদ্রকে  নদী দেখতে না পেয়ে- 
পাড় ভাঙছে আর পাড় ভাঙছে'
হঠাৎ  
একটা ছোট্ট "চুয়া" তোমায় ডেকে বলে উঠলো- 
"শুনছো-- ও কবি তুমি কি শুনতে পাচ্ছো?
নদী কতদূর গো?"
তুমি তখন তোমার মুঠোয় বন্দী রাখা সমুদ্রকে দুচোখে মাখিয়ে নিয়ে ফিরে এলে পড়ার টেবিলে।
বৃত্ত ভাঙার শব্দে সেদিন রাতের তারারা লুকিয়েছিল কোথায় কেউ তো জানি না।।
------

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি