সন্দীপ কাঞ্জিলাল


অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল বনাম আঁতেল 
পর্ব-১

 স ন্দী প  কা ঞ্জি লা ল


অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল 

সাধারণ মানুষ যে কথা বলেন, সেই কথাই যাঁরা অন্যভাবে বলেন, সাধারণ মানুষ কাজ যেভাবে করেন সেই কাজ যাঁরা ভিন্নভাবে করেন তাদের 'অ্যাঁতেলেকত্যুয়েল 'বলে। বুদ্ধিবৃত্তি বলতে কোনও ব্যক্তির নিজস্ব কর্ম, শিক্ষা, জীবনের প্রতিফলন কিংবা দর্শনবোধের মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করার চিন্তাধারাকে বোঝানো হয়। এঁরা প্রধানত বুদ্ধিকে উপজীব্য করে পেশাদারীত্ব অথবা ব্যক্তি উদ্যোগকে কাজে লাগান। অর্থাৎ,  সমাজ ও সংস্কৃতি সচেতন এবং জ্ঞান বিজ্ঞানে দক্ষ সুনিশ্চিত মানুষ হিসাবে স্বীয় বুদ্ধির বলে বা বুদ্ধির কাজ দিয়ে তারা জীবন- জীবিকা নির্বাহ করেন। সাধারণত লেখক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, শিল্পবোদ্ধা ব্যক্তিগণ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।আসলে এই সমস্ত মানুষদের কাছে এমন কিছু থাকে যার জন্য সাধারণ মানুষ তাঁদের  দিকে আকৃষ্ট হন। যেমন মুঠোয় বাদাম থাকলেই বানর তার দিকেই ছোটে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপদের সময়, এঁরা বুদ্ধি দিয়ে সঠিক পথের খোঁজ দেন।
বুদ্ধিজীবী শব্দটির সবচেয়ে প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে, দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায়। মহাভারতের বর্ণনাতে, অর্জুন ও রাজা - মহারাজাদের আগমনের পরপরই সভাস্থলে উপস্থিত হয় ' নিপুণা বুদ্ধিজীবীন ' নামক ব্যক্তিগণ, যাঁরা স্বয়ংবরদের লক্ষ্যভেদের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়প্রকাশক আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। 
চীনে ২০৬ খৃষ্টপূর্ব হতে ১৯১২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে, স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা  নিয়োজিত হতেন স্কলার অফিসিয়াল হিসেবে, যাঁরা ছিলেন চীনের সম্রাট কতৃক দৈনিক সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য নিয়োজিত কর্মচারী। জিন-পল-সার্টার বলেন, 'বুদ্ধিজীবীরা হলেন তাঁদের সময়ের নৈতিক চেতনা, তাই তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব হল সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, এঁরা তাদের চেতনা অনুযায়ী তাদের নিজ নিজ সমাজের প্রতি স্বাধীনভাবে এসকল বিষয়ে কথা বলা।'

রাশিয়ার উনিশ শতকের ষাটের দশকে প্রথম একটি গোষ্ঠী তাদের নিজেদের সমাজে প্রথম বুদ্ধিজীবী শব্দটি ব্যবহার করেন। বিপ্লব, নিরীশ্বরবাদ ও বস্তুবাদে বিশ্বাস করে তাঁরা নিজেদের একটি পৃথক ও প্রভাবশালী বৌদ্ধিক জনগোষ্ঠী মনে করেন। তাঁদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ' 'Nikolay Chemyshevsky'র দ্বারা কাল্পনিক উপন্যাস 'Chtodelat' (১৮৬৩) দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। উপন্যাসটির শিরোনামের অর্থ ' কি করণীয়? ' এটি পড়ে  বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ঘোষণা করেন যে, সমাজতন্ত্রের প্রচারে সাহিত্য একটি কৌশল হওয়া উচিত। বাংলায় intelligentsia-র সন্ধান পাওয়া যায় উনিশ শতকের প্রথমভাগে, যে সময় রাজা রামমোহন রায় এবং ইয়ং বেঙ্গল নামে একটি প্রগতিবাদী গোষ্ঠী এমন কিছু প্রশ্ন তোলে যা সমকালীন বাংলা সমাজকে বিস্মিত করে। তবে বাংলার এই বুদ্ধিবাদী আন্দোলনের মূল নিহিত অতীতে।

বুদ্ধিজীবীরা সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল, সংবেদনশীল বিদগ্ধ, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। এই বুদ্ধিজীবী তকমা ওঁদের মাথায় আমরা লাগিয়ে দিতে পারি আবার অনেকে নিজেদের মাথায় বুদ্ধিজীবী সাইনবোর্ড লাগিয়ে নেন। এঁদের ছবি, তাকানো, হাবভাব দেখলে মনে হয়, সেল্ফ ইমপোজড্ ইন্টেলেকচ্যুয়েলস। মার্কিন ইতিহাসবিদ নরম্যান স্টোন বুদ্ধিজীবীদের দোষ ত্রুটির কথা বলতে গিয়ে  বলেন,   "বুদ্ধিজীবী সামাজিক শ্রেণি সমাজের বাস্তবতাকে ভুলভাবে বোঝে এবং এ কারণে তাঁরা যৌক্তিক প্রতারণা, আদর্শিক বোকামি এবং আদর্শ মতবাদ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত দুর্বল পরিকল্পনার ভ্রান্তিতে ভোগে।"

চিত্র- প্রান্তিকা মাইতি
----

Comments

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি