আশাপূর্ণা দেবী / মধুমিতা মহাপাত্র

ম ধু মি তা  ম হা পা ত্র


আজ, আশাপূর্ণা দেবী-র প্রয়াণ দিবস 

"পৃথিবী অফুরন্ত প্রাণময়ী সে তার অনন্ত ভালোবাসার সঞ্চয় নিয়ে বসে আছে সবাই এর জন্য। সেই ভালোবাসার বলে কেউ তুচ্ছ নয়, কেউ মূল্যহীন নয়, কেউ অবান্তর নয়।"--এমন আশার কথা শোনাতে পারেন একমাত্র আশাপূর্ণা দেবী-ই। যাঁর সৃষ্টি সাগরে অবগাহন করে অতৃপ্তি শূন্যতার মাঝেও পূর্ণতার দিশা খুঁজে  পাওয়া যায়। তিনিই পারেন নারীকে আপন ভাগ্য জয় করে 'প্রেয়সী' থেকে 'শ্রেয়সী' হয়ে ওঠার মন্ত্র শেখাতে। এভাবে চলমান জীবনের কারবারি আশাপূর্ণা দেবীর জীবন অভিজ্ঞতার ঝুলিটি চেনা মানুষজনের অচেনা বিচিত্র সব কাহিনীতে পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কলকাতার এক রক্ষণশীল বৈদ্য পরিবারে ১৯০৯ সালের ৮ই জানুয়ারি আশাপূর্ণা দেবী জন্মগ্রহণ করেন‌। পিতা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, মা সরলাসুন্দরী দেবী। চিত্রকর, উদারমনস্ক বাবা ও বইপ্রেমী মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন শিল্পীসত্তা। কঠোর রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ হয়নি। ভাই এবং দাদাদের পড়া দেখে দেখে তিনি পড়তে শেখেন। হয়ে উঠেন স্বশিক্ষিত। শৈশব থেকে গভীর মনোযোগ তাঁকে জ্ঞান রাজ্যে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়। মা সাহিত্যে উৎসাহী ও বাবা 'জোগানদার' তাঁর ছোটবেলাটা কেটেছে সংসারের ঊর্ধ্বে এক স্বর্গীয় জগতে। বইপড়া ছিল দৈনিক জীবনের আসল কাজ। এভাবে পড়তে পড়তেই লেখাতেও হাতে খড়ি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় 'শিশুসাথী' পত্রিকায়। সেইসঙ্গে আসে গল্প লেখার অনুরোধ। এরপর লেখিকার লেখনী আর থেমে থাকেনি। প্রায় সাতটি দশক তার অবিরাম ধারায় সিক্ত হয়েছে বাংলা সাহিত্য। লিখে গেছে ২৪২টি ছোট- বড় উপন্যাস, ছোটগল্প সংকলন ৩৭ টি এবং শিশুদের উপযোগী বই ৬২টি। তাঁর কথায়--"কতটুকু কি করতে পেরেছি সে হিসেব রাখার দায়িত্ব আমার নয় তবুও কৃতজ্ঞ আমার সেই চির সঙ্গীর কাছে দূর অতীতে একদা যাকে নেহাতই খেলাচ্ছলে হাতে তুলে নিয়েছিলাম সেই আমার কলমটি তার একনিষ্ঠ ভালোবাসা এখনো পর্যন্ত আমার সঙ্গে চলেছে ছেড়ে চলে যায়নি। তার কাছে পরম ঋণ। তাই কখনো বোধহয় নিঃসঙ্গতার শিকার হই না। শূন্যতাবোধে অবসন্ন হই না।"
১৯২৪ সালে ১৫  বছর বয়সে শ্রী কালিদাস গুপ্তের  সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।সাংসারিক জীবনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেও তাঁর লেখনি সদা সচল ছিল। শিশু সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্য চর্চা শুরু। ১৯৩৬ সালে লিখলেন বড়দের উপযোগী গল্প 'পত্নী ও প্রেয়সী'। ১৯৪৪ সালে উপন্যাস 'প্রেম ও  প্রয়োজন'। তবে তাঁর ট্রিলজির প্রথম উপন্যাস 'প্রথম প্রতিশ্রুতি'(১৯৬৪) তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়‌।অন্য দুটি গ্রন্থ হল 'সুবর্ণলতা(১৯৬৭)ও 'বকুলকথা(১৯৭৪)। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলি হল--'ছোট ঠাকুরদার কাশী যাত্রা', 'অগ্নিপরীক্ষা', 'প্রথম নগ্ন', 'সমুদ্র নীল আকাশ নীল', 'নদী দিক হারা', 'নবজন্ম', 'রাতের পাখি', 'গাছের পাতা নীল', 'চাঁদের জানালা', 'এইতো সেদিন'।
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যে মূলত জায়গা করে নিয়েছে নিতান্ত সাধারণ ঘরোয়া মানুষ। "এদের জীবনে রোগ-শোক আকস্মিক দুর্ঘটনা ছাড়া কোন নাটকীয় ঘটনা বড় একটা ঘটেনা। তাই তাদের আত্মার ক্রন্দনধ্বনি কখনোই উত্তাল হয়ে বাজে না।শুধু কান পাতলেই শোনা যায়।" সেই অস্ফুট ধ্বনিকে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের কাছে। অনুভব করেছেন জানা জগতের অজানা রহস্য এবং অসহায়তাকে। শুধু পরিবেশের কাছে নয় মানুষ নিজের চিত্তবৃত্তির কাছেও অসহায়। সামাজিক অসঙ্গতি তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে মেয়েদের অধিকারহীনতা। তার ফলশ্রুতিই 'প্রথম প্রতিশ্রুতি'।"মেয়েদের প্রতি অত্যন্ত হেনস্থা, সমাজ জীবনে মেয়েদের কোন দামই নেই,.. এই সমস্ত অবহেলাজনিত 'কেন'গুলিই পরবর্তীকালে প্রতিবাদের প্রতিমূর্তি হয়ে আমার উপন্যাসের নায়িকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।"সেকাল-একাল অর্থাৎ তাঁর সমকালে দেখা নারী এবং পরবর্তীকালে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বদলে যাওয়া নারী মুক্তির কথা বারবার তাঁর লেখায় ফিরে ফিরে আসে। নারী মুক্তি প্রসঙ্গে 'আত্মমর্যাদা' ও 'আত্ম-অহমিকা' শব্দদুটিকে আলাদা করে চিনিয়েছেন। মেয়েদের আসক্তি ত্যাগ এবং মনোধর্মের পরিবর্তনকে জোর দিতে চেয়েছেন, যেখানে গয়নার চাকচিক্য, বেনারসি শাড়ির ফুলকি অপেক্ষা বুদ্ধিই দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। তাঁর ভাবনায় মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মাবে তখনই যখন মেয়েরা পুরুষের মানসিক সহযোগী হয়ে উঠতে পারবে।
লেখিকা আশাপূর্ণা দেবী শুধু বাংলা সাহিত্যে নয় গোটা ভারতবর্ষে জনপ্রিয়তার আসন লাভ করেছিলেন। তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।উপন্যাস ও গল্প অবলম্বনে সিনেমা, নাটক, টিভি সিরিয়াল হয়েছে। এর থেকে অনুমান করা যায় সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর সাফল্য কতখানি। তাই নিজের স্বীকৃত বিশেষণ 'সরস্বতীর স্টেনোগ্রাফার' সার্থক। সেজন্য সৃষ্টির স্বীকৃতি ও কম নয়। জব্বলপুর, রবীন্দ্রভারতী, বর্ধমান, যাদবপুর, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট প্রদান করে।সর্বোচ্চ সম্মান সাহিত্য একাডেমী এবং  ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
আজ ১৩ ই জুলাই ১৯৯৫ সালের এই দিনটিতে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছিল তার একনিষ্ঠ সাধিকাকে। আজকের দিনের প্রতিটি মেয়েই তাঁর কাছে ঋণী। চিরপ্রণম্যা এই মহীয়সীকে জানাই আমার বিনম্র প্রণতি।
--------

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল