বিজ্ঞানে ঈশ্বরের চিহ্ন // পর্ব - ৩



বিজ্ঞানে ঈশ্বরের চিহ্ন
পর্ব - ৩

পূ র্ণ চ ন্দ্র  ভূ ঞ্যা  

স্থান ও কাল, নাকি স্থান-কাল ?

মা-মরা মেয়ে মার্ফি, বয়েস মাত্র সাত কি আট বছর। তার চল্লিশোর্ধ্ব বাবা যোশেফ কুপার নাসার প্রাক্তন পাইলট, নাসার ডাকে আবারও মহাকাশ অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আগত বিপদের সম্ভাবনা থেকে পৃথ্বীবাসী মানুষকে রক্ষা করা তার লক্ষ্য। এদিকে ছোট্ট মার্ফি রাগে-অভিমানে কেঁদে-কেটে একসা। দাদু ও দাদা ছাড়া তার আপন বলতে একমাত্র বাবা। সেই বাবা যদি অন্যত্র চলে যায়, তার কী হবে ? রূপকথার গল্প কে শোনাবে তাকে? কে তাদের রক্ষা করবে? 

কুপার মার্ফিকে আশ্বাস দেয়, সে খুব তাড়াতাড়ি কাজ সেরে মহাকাশ থেকে ফিরে আসবে। তাতেও যেন কান্না থামে না আদরিনী মেয়ের। শেষমেষ কুপার নাসার মিশনে রওনা হয়ে যায়। মার্ফিও বড় হতে থাকে, কিন্তু তার মহাকাশচারী বাবা আর ফিরে আসে না। মহাকাশে কুপার এনডিউরেন্স-যানে প্রথমে শনি গ্রহের কাছাকাছি অবস্থিত 'গার্গেন্টুয়া' ব্ল্যাকহোলের নিকটবর্তী তিনটি গ্রহ (যেখান থেকে পূর্বতন অ্যাস্ট্রোনটের সঙ্গে পাঠানো নাসার 'বিকন' যন্ত্র কয়েক দশক ধরে সংকেত পাঠাচ্ছে), পরে ওই ব্ল্যাকহোলের ভেতরে একটি tesseract-এ সবমিলিয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে হঠাৎ মস্ত বড় এক স্পেস-স্টেশনে এসে পড়ে, যেখানে পৃথ্বীবাসী সমস্ত মানুষ নিরাপদে বসবাস করছে। সেখানে সে জানতে পারে, তার আদরের মেয়ে মার্ফি এখন হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন। মেয়েকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যায় চল্লিশোর্ধ্ব কুপার। I.C.U.-তে পৌঁছে সে দেখে, তার অল্প বয়সী পরী এখন নব্বই-ঊর্ধ্ব একজন সফল মহাকাশ বিজ্ঞানী, বয়সের ভারে হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যু পথযাত্রী। (চিত্র-১)
                            
হলিউড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান-এর 'Intersteller' চলচ্চিত্রের  কাহিনি উপরে উদ্ধৃত গল্পটি। এতটা পড়ার পরে একটা খটকা লাগে – জন্মদাতা পিতার চেয়ে তার আপন মেয়ে পঞ্চাশ বছর বা তার বেশি বয়সে বড় ? এ যেন গল্পের গরু আকাশে ওড়ে। পুরো আজগুবি !

আসলে পদার্থবিদ্যার আলোয় এ ঘটনা বৈধ। রূঢ় বাস্তবের রুক্ষ্ম জমিতে সোনা ফোলানোর মত প্রকৃতির এ সত্য ঘটনার পথপ্রদর্শক সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের একজন অখ্যাত কেরানি। নাম আলবার্ট আইনস্টাইন (1879 - 1955 )। 1905 খ্রিস্টাব্দে তিনি  যুগান্তকারী যে পাঁচটি তত্ত্ব দিলেন, তার মধ্যে অন্যতম 'বিশেষ অপেক্ষবাদ'। এর গানিতিক ক্যালকুলেশনের সহায়তায় আমরা পেলাম 'কালের প্রসারণ ' (Time Dilation)। 

কালের প্রসারণ কী ?

কোন বস্তুপিণ্ড কিংবা স্পেস-ক্র্যাফট যদি শূন্যস্থানে আলোকের সমতুল্য বা তার কম দ্রুতিতে রওনা হয় , তবে তার মধ্যে থাকা পর্যবেক্ষক দু'টি ঘটনার মধ্যবর্তী প্রকৃত সময়ের ব্যবধান বাড়বে বলে মনে করবে। অর্থাৎ পৃথিবীতে ঘটা দু'টি ঘটনার সময়ের ব্যবধান এক ঘণ্টা হলে ওই বস্তুপিণ্ডে সময়ের পার্থক্য (একজন পর্যবেক্ষকের চোখে) এক ঘন্টার বেশি (পৃথিবীর সাপেক্ষে) হবে। তাই মহাকাশ-যানে ঘড়ি স্লো যাবে এবং ওই যানে পর্যবেক্ষকের বয়েস পৃথিবীর সাপেক্ষে কম বাড়বে বলে প্রতিপন্ন হবে। এটাই কালের প্রসারণ নিয়ম।

ধরা যাক, P ও Q দুটি গ্রহ। এর মধ্যে P গ্রহটি X-নামক ব্ল্যাকহোলের খুব নিকটস্থ এবং Q গ্রহ বেশ দূরে। সুতরাং(চিত্র-২)
                            
P গ্রহের পরিক্রমণ গতি Q-এর চাইতে বেশি হবে। এর কারণ 1915 সালে আবিষ্কৃত আইনস্টাইনের 'সাধারণ অপেক্ষবাদ তত্ত্ব' , যার মূল ভিত্তি মহাকর্ষীয় ভর। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র থেকে আমরা জানি, এই মহাবিশ্বের যে কোন‌ও দু'টি বস্তুপিণ্ড পরস্পরকে তাদের সংযোজী সরলরেখা বরাবর আকর্ষণ করে। যেমন সূর্য ও পৃথিবী। এরা সর্বক্ষণ মহাকর্ষ বল দ্বারা একে অপরকে টানছে। কিন্তু কোন দিক বরাবর? সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে, নাকি তার বিপরীত দিকে ? তাহলে প্রশ্ন, সূর্যের টানে পৃথিবী সরলরৈখিক পথ ছেড়ে উপবৃত্তাকার কক্ষে সূর্যের চারিদিকে কেন ঘুরছে ? স্পিকটি নট নিউটনীয় তত্ত্ব। তার ব্যাখ্যা দিলেন আইনস্টাইন, ব্যাপক অপেক্ষবাদে। তিনি শোনালেন হাড় হিম করা এক আশ্চর্য তথ্য – 'দেশ-কালের বক্রতা'। সেটা কী ? 

কোন বস্তুপিণ্ড তার মধ্যেকার পদার্থের পরিমাণ বা ভরের জন্য পারিপার্শ্বিক শূন্যস্থানকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। যার(চিত্র-৩)
                                
ভর বেশি, তার চারপাশে শূন্যস্থানের দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি।  সেজন্য গড়পড়তা গ্রহের চেয়ে নক্ষত্র অথবা ব্ল্যাকহোলের পাশাপাশি শূন্যস্থানের দেশ-কালের বক্রতার পরিমাণ অনেক বেশি। সেই তোবড়ানো শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে সরলরেখা ধরে গমন করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়, সে বস্তুপিণ্ড হোক কিংবা আলো। ধরো, একটি ছোট বেডসিটের চার কোণে চারজন লোক বেডসিটটিকে টান-টান করে আনুভূমিকভাবে ধরে রেখেছে এবং ঠিক কেন্দ্রের কাছাকাছি বেডসিটের ওপর সাইকেলের বল-বেয়ারিংয়ের গোলকাকৃতি ক্ষুদ্র একটি বল রাখা হয়েছে। এখন তুমি এক কেজি ওজনের একটি নিরেট বড় লোহার বল আনুভূমিক বেডসিটের মধ্যিখানে ফেলে দাও। কী দেখতে পাবে? বেডসিটের ওপর যেখানে বড় লোহার বলটি ফেলা হয়েছে, সে জায়গাটি বেশ গর্ত হয়ে নিচের দিকে ঢুকে গেছে বা নেমে গেছে। আর সাইকেলের বল-বেয়ারিংয়ের ছোট্ট বলটি বৃত্তাকারে বেশ কয়েক পাক ঘোরার পর বড় লোহার বলটির উপর এসে পড়েছে। 
তাহলে বুঝতে পারছেন, সূর্যের বিশাল ভর তার চারপাশের শূন্যস্থানকে এত বেশি বাঁকিয়ে দেয় যে পৃথিবী চতুর্মাত্রিক স্থান-কালে হ্রস্বতম ঋজুপথ (জিওডেসিক পথ) অনুসরণ করে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, মহাকর্ষীয় অভিক্রিয়ার জন্য নয়। কিন্তু পৃথিবী সূর্যের ওপর আছড়ে পড়ছে না কেন, সেই বল-বেয়ারিং-এর বলটির মতো ? তার কারণ অপকেন্দ্র বল। বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে বস্তুপিণ্ড ঘুরলে ব্যাসার্ধ বরাবর কেন্দ্রের বাইরের দিকে বস্তুর উপর অপকেন্দ্র বল ক্রিয়া করে মহাকর্ষ টানকে প্রশমিত করে দেয়। আবার, সূর্যের পেছন দিকে থাকা একটি তারা থেকে আলো সূর্যের খুব নিকট 'কুঞ্চিত' (warped) পথ দিয়ে পৃথিবীর দিকে আসবার সময় খানিক বেঁকে যায়। এর জন্য পশ্চাতের তারকাটিকে তার আপাত অবস্থানে আমরা দেখতে পাই, প্রকৃত অবস্থানে নয়।(চিত্র-৪)
                              

সুতরাং, অফুরন্ত ভরের দরুণ ব্ল্যাকহোল X-এর চারপাশের শূন্যস্থান দুমড়ে-মুচড়ে আছে। দোমড়ানো স্পেসের বক্রতার পরিমাপ 'ব্ল্যাক হোল এককত্ব' (Black Hole singularity) থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ততই কমে যায়। এখানে P গ্রহের স্থানীক ও কালিক বক্রতা যত বেশি, Q গ্রহের অবস্থানের বক্রতা অতটা বেশি নয়। ফলে Q গ্রহের তুলনায় P গ্রহের পরিক্রমণ গতি অনেক বেশি হবে। তাই দু'টি ঘটনা (ঘটনা হল এমন একটি বিষয় যা শূন্যস্থানের একটি বিন্দু এবং একটি বিশেষ সময়ে ঘটে)-র অন্তর্বর্তী কালের ব্যবধান P গ্রহে অধিক হবে। P গ্রহে যে-সময় এক ঘন্টা নির্দেশ করছে, সেটাই Q গ্রহে বেশ কয়েক ঘন্টা-দিন-বছর-দশক অতিক্রম করতে পারে। P গ্রহে সময়ের গতি শ্লথ। অর্থাৎ একই ক্ষণে অথচ ভিন্ন স্থানে ( পড়ুন, দুটি ভিন্ন গ্রহ ) জন্মানো দু'টি শিশুর একজনের বয়স যদি দশ বছর হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না দ্বিতীয় শিশুটির বয়স কত হবে, তা দশ বছর হতে পারে কিংবা তার থেকে কম বা বেশিও হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, হয়তো শিশুটি শৈশব-কৈশোর-যৌবন-বৃদ্ধ দশা পেরিয়ে মারা গেছে অথবা তার শৈশবকাল অতিবাহিত হয়নি; এখনও সে মাতৃদুগ্ধ পান করে, হামাগুড়ি দেয়, হাঁটতে শেখেনি।

ঠিক তেমনি, তিনটি গ্রহ এবং ব্ল্যাকহোলে tesseract-এর মধ্যে অ্যাস্ট্রোনট কুপারের অতিবাহিত চার থেকে পাঁচ ঘন্টা পৃথিবীর আশি কিংবা নব্বই বছরের সমতুল্য। তাই পিতার বয়স মাত্র কিছু ঘণ্টা বাড়লেও মার্ফির বয়স নব্বই বছর বা তার বেশি বেড়েছে। কারণ দু'জনের অবস্থানের স্থানিক ভিন্নতা এবং কালের মন্থরতা।

সুতরাং, শূন্যস্থানে একটি বস্তুপিণ্ডের অবস্থানগত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুধুমাত্র তিনটি দেশ-স্থানাঙ্ক (x , y ও z) দ্বারা সম্পূর্ণ হয় না, সময় স্থানাঙ্কও (ct , c = বায়ু বা শূন্যস্থানে আলোর দ্রুতি) সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও কাল কোন‌ও পৃথক সত্তা নয়, বরং দেশ-কাল একসঙ্গে একটি চতুর্মাত্রিক বিশ্বের ধারণা প্রদান করে যা প্রমাণ করে পরম স্থান (absolute space) ও পরম কাল (absolute time) –এর ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। 

স্থান ও কাল এখন চলমান রাশি। চারমাত্রিক স্পেসের এই নতুন বোধশক্তি ব্রম্ভাণ্ডের ধারণায় বিপ্লব এনে দিয়েছে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং (1942 - 2018)-এর মতে, "একটি ঘটনা থেকে প্রসারমান আলোক চারমাত্রিক স্থান-কালে একটি ত্রিমাত্রিক শঙ্কু সৃষ্টি করে। এই শঙ্কুকে বলে ঘটনাটির ভবিষ্যৎ আলোক শঙ্কু। এইভাবেই আমরা অতীত আলোক শঙ্কু নামে আর একটি শঙ্কু আঁকতে পারি, সেটি এমন কতকগুলি ঘটনার কেতা যেখান থেকে আলোকের একটি স্পন্দন নির্দিষ্ট ঘটনায় পৌঁছাতে পারে।" (পৃষ্ঠা-২৮, কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, ভাষান্তর--শত্রুজিৎ দাশগুপ্ত)। (চিত্র- ৫)
                            
ভবিষ্যৎ আলোক শঙ্কু হল এমন একটি অঞ্চল যার ভেতরের সব ঘটনাগুচ্ছ উপরের চিত্রে 'বতর্মান'-এর ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। আবার ঘটনার অতীত আলোক শঙ্কুর মধ্যে ঘটা সব ঘটনার নির্যাস হল ঘটনা (বর্তমান)। উপরের আলোক শঙ্কু বিশ্লেষণ করে কনা-বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ (জন্ম - 8 আগস্ট, 1931) এবং স্টিফেন হকিং প্রমাণ করেছিলেন যে প্রসারণশীল ব্রম্ভাণ্ডের একটি শুরু আছে এবং হয়ত একটা শেষও আছে। আর যার সৃষ্টি ও ধ্বংস আছে, তার সৃষ্টিকর্তা থাকার সম্ভাবনা অসম্ভব কি ? 
মহাবিস্ফোরণ যদি এমনই এক ঘটনা-বর্তমান হয়, তাহলে আমরা সকলে তার ভবিষ্যৎ আলোক শঙ্কুর মধ্যে ঘটমান জিনিস গুলির স্থানিক ও কালিক সমষ্টিগত প্রকাশ মাত্র।

বিশেষ দ্রষ্টব্য 
Tesseract কী ?
Tesseract হল ত্রিমাত্রিক ঘনকের অনুরূপ চতুর্মাত্রিক মডেল যা 16টি শীর্ষবিন্দু, 24টি তল, 32টি প্রান্ত ও 8টি ঘনকীয় সেল দ্বারা তৈরি এবং যার সাহায্যে অতীত ও ভবিষ্যতে গমন করা যায় ।
-----------------------------------------------------------

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল