দিল্লি দর্পণ - ৩


দিল্লি দর্পন || ৩য় পর্ব 

কা লী প দ  চ ক্র ব র্ত্তী 


রাজধানী দিল্লি 

১৯১১ খ্রিস্টাব্দে নিউদিল্লি ভারতের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু রাজধানীর পত্তন হয়েছিল অনেকে আগেই। দিল্লির চাঁদনিচকে ঘণ্টাঘর ও টাউন হল তৈরি হয়। কাশ্মীরী গেটে নতুন পোস্ট অফিসের জন্য বড় বাড়ি নেওয়া হয়। বড় রাস্তা কেটে তৈরি করা হয় কুইন্স রোড, হ্যামিলটন রোড। শহরের উত্তর-পূর্বে তৈরি হয় সিভিল লাইনস্, কয়েকশ বাংলো নিয়ে। অন্যদিকে ফৌজি আদেশে লাল কেল্লার চারশো চল্লিশ গজ এলাকার ভিতর কোনও বাড়ি বা ইমারত বা দোকান রাখা নিষিদ্ধ হওয়ায় হাজার হাজার বাড়ি ও ইমারত ভেঙে ফেলা হয়। আজ  বাহাদুর শা জাফর বা ইংরেজরা কেউ আর নেই কিন্তু এখনও তাদের স্মৃতি জড়িয়ে আছে দিল্লির আনাচে কানাচে। নাদির শা দিল্লিতে ছিলেন মাত্র দু’মাস। জানা যায় ওই দুমাসে তিনি প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোককে হত্যা করেছিলেন। নাদির শা এখন না থাকলেও সে সময়কার বহু স্মৃতি আজও সে সব কথা মনে করিয়ে দেয়। ফিরোজ শা কোটলার বাস স্ট্যান্ডের কাছে গেলে দেখা যায় আজও ‘খুনি দরওয়াজা’ দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে। 
মনে করিয়ে দেয় বাদশাহদের নির্মম অত্যাচারের কথা। দিল্লির মাটি খুঁড়লে আজও হয়তো হাজার হাজার কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আজ তাঁদের রাজত্ব নেই। তবে আছে এক নিবিড় আকর্ষণ যা আজও বহু লোককে গ্রাম-গঞ্জ থেকে টেনে আনে মোহবন্ধনে আবিষ্ট করে রাখার জন্য।
দিল্লি হল স্বাধীন ভারতের রাজধানী এবং একটি কসমোপলিটান সিটি। সবচেয়ে মজার কথা হল, এখন প্রকৃত দিল্লির লোক বলে হয়তো আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যাঁরা বলেন যে তাঁরা দিল্লির অধিবাসী, খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে যে তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন অন্য কোন প্রদেশ থেকে বা সুদূর পাকিস্তান থেকে। তাই দিল্লি বর্তমানে কারো নয়। দিল্লি হল বর্তমান দিল্লি-ওয়ালাদের। দিল্লির একটি পৃথক পরিচয় এবং স্বতন্ত্রতাও আছে। এর একটি ভাল দিক হল, এখানে কেউ বলতে পারে না যে ‘তুমি অন্য প্রদেশের লোক, দিল্লি শুধু আমাদের’। ঠিক তেমনি মন্দ দিকটি হল, কেউ আজও দিল্লিকে নিজের শহর বলে ভাবতে শিখল না। বিপদে সবাই কেমন পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। ভাবে আমি তো অন্য প্রদেশের লোক। তবে আজকাল এই মনোভাবের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। দিল্লির লোকেরা যেমন নিজের নয়, ঠিক তেমনি দিল্লির জলবায়ু, খাবার, দুধ ইত্যাদিও বাইরের, অর্থাৎ ধার করা। রাজস্থানে গরম পড়লে দিল্লিতে গরম বাড়ে, কাশ্মীরে বা হিমাচলে বরফ পড়লে দিল্লিতে ঠাণ্ডা উপলব্ধি হয়। শাক-সবজি, দুধ ইত্যাদির বেশীর ভাগটাই আসে উত্তর প্রদেশ এবং হরিয়ানা থেকে। শুধু তাই নয় অন্য কোনও প্রদেশে/ রাজ্যে গণ্ডগোল হলে পার্লামেন্ট উত্তপ্ত হয়। তবে এখানকার লোকেরা ভি আই পি-দের দেখে এত অভ্যস্ত বলেই হয়তো ভি আই পি-দের দেখতে লোকে ভিড় করে না রাস্তায় রাস্তায় বা মাঠে-ঘাটে। এমনকি ভোটের আগে নেতারা মিটিং করতে এলেও খালি অল্পকিছু কট্টর সমর্থক ছাড়া অন্যদের তেমন দেখা যায় না। 
দিল্লিতে যে বেশ কিছু বন/ জঙ্গল আছে তা অনেক পর্যটকেরাই জানেন না। তার মধ্যে জাঁহাপনা ফরেস্ট, ডিয়ার পার্ক ইত্যাদি আরও অনেক আছে। কলকাতার কলেজ স্ট্রীটের বই-এর বাজারের মত আছে 'নই সড়ক', সাজগোজের জিনিস, নাটকের জিনিস ইত্যাদি পেয়ে যাবেন কিনারি বাজারে। বিদেশী জিনিস পাবেন পালিকা বাজারে। এশিয়ার মধ্যে কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় বাজার আছে নেহেরু প্লেসে। তাই সবই পাবেন এই দিল্লিতে। 
কথায় বলে টাকা থাকলে সব হয়, সে কথাটা মনে হয় দিল্লির ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য। রাজধানী দিল্লিতে এলে আপনি সবুজের সমারোহ দেখতে পাবেন। দিল্লির রাস্তায় চলতে চলতে দু-দিকে দেখতে পাবেন বড় বড় গাছগুলো মাথা-তুলে দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে অভ্যর্থনা করার জন্য। বহু শহরেই এত সবুজের সমারোহ দেখতে পাবেন না। দিল্লিতে সরকারি বড় বড় অফিস এবং দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোর Liaison অফিস থাকাতে, অনেক কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। শুনেছি এই লিয়াজো (Liaison) অফিসাররা নাকি পারেন না এমন কোনও কাজ নেই। 
এখানকার দৈনন্দিন জীবন বড়ই কর্মব্যস্ত। অফিসগুলোতেও খুব কঠোরভাবে নিয়ামনুবর্তীতা পালন করা হয়। নিয়ম ভাঙলেই তাকে চাকরী থেকে হাত ধুতে হয়। এখানে সকাল থেকেই সকলে দৌড়চ্ছে কোনও না কোনও কাজের তাগিদে। কারও কাছেই যেন সময় নেই। এই প্রসঙ্গে একটি মজার গল্প খুব প্রচলিত আছে – একদিন দিল্লির পাশ্বর্বর্ত্তী হরিয়ানা-র গ্রামের একজন সোজা, সরল, বৃদ্ধ চাষি দিল্লি দেখবেন বলে দিল্লি এলেন। এসে দেখলেন সবাই যেন কেমন দৌড়চ্ছে। যাকেই কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তার ‘উত্তর দেওয়ার সময় নেই’ বলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োতে থাকেন। এসব দেখে বৃদ্ধ চাষি লোকটির মনে হল, দিল্লিতে নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে তাই সকলে এভাবে দৌড়চ্ছে। তখন তিনি আর দেরী না করে নিজের গ্রামে ফিরে যান। তাকে এত তাড়াতাড়ি গ্রামে ফিরে আসতে দেখে গ্রামের লোকেরা প্রশ্ন করলে, বৃদ্ধচাষি  জবাব দেন – দিল্লিতে নিশ্চয়ই কোনও অঘটন হয়েছে, সবাইকে দৌড়োতে দেখে তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছেন। এই গল্পটি থেকে দিল্লির ব্যস্ত জীবনের একটু আভাস পাওয়া যেতে পারে। এখানে আপনি বাড়ির বাইরে ‘রক’ দেখতে পাবেন না বা রকে বসে আড্ডার আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন না। একসময় একটু রাত হলেই দিল্লির রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে যেত, এখন কিন্তু তার বিপরীত। রাত দশটার সময়ও রাস্তায় প্রচুর মানুষের ভিড় দেখা যায়। দেখে মনে হবে সবে সন্ধে হয়েছে। এখানকার দোকানীরা দুপুরবেলা দোকান বন্ধ করে ঘুমের কোনও অবকাশ পায় না। আছে কঠোর পরিশ্রম। আর সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ছুটে চলা। দেখে মনে হবে সবাই যেন পাল্লা দিয়ে দৌড়চ্ছে। এ দৌড় কোথায় গিয়ে শেষ হবে কে জানে?

Comments

  1. লেখকের লেখনী যেমন তথ্যসমৃদ্ধ, লিখনশৈলি তেমন interesting!

    ReplyDelete
  2. খুব সত্যি কথা এবং বাস্তব ! ভাল লেগেছে বিষয় গুলো জানতে পেরে ।

    ReplyDelete
  3. দিল্লি সম্বন্ধে লিখা আপনার রচনা খুব সত্যি। খুব ভাল লাগল।
    বিমান দাস

    ReplyDelete
  4. জানা কথার রোমন্থন মন্দ লাগার কথা নয় ।
    বরং আনন্দ পেলাম লেখাটা পড়ে ।

    ReplyDelete
  5. এছাড়াও দিল্লীতে আছে বিশাল অটোপার্টসের বাজার কাশ্মীরি গেটে, এখন অন্যান্ন জায়গায় যেমন করোলবাগ ইত্যাদি তেও ছড়িয়ে আছে । আছে চাঁদনিচকে বিশাল ইলেকট্রনিকসের মার্কেট - লাজপতরায় মার্কেট ও ভাগীরথ প্যালেসে ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল