শুভজিৎ মুখার্জী


শু ভ জিৎ  মু খা র্জী


বৃত্ত

মনে কর রাকা,
তুমি বসে আছ,
ভরা শ্রাবণের কোন থমকানো দুপুরে,
নিঝুম পুকুরঘাটে ---
আকাশের বুকে ঘন কালো মেঘ ---
আর স্নানোন্মুখ নিথর গাছগুলোর
ছায়া মাখা, নিস্তরঙ্গ জলের বুকে,
হঠাৎ নেমে পড়া বৃষ্টি ---
ইতস্তত কিছু বৃত্তের জন্ম দেয় ;
ঠিক আমাদের জীবনের মতন ।
আমি সেরকম একটা
বৃষ্টির ফোঁটা হতে চাই ।

চারিদিকে ছড়ানো ছেটানো বিক্ষিপ্ত মানুষেরা,
আমাকে ঘিরে রচনা করে চলে
বিভিন্ন সম্পর্কের এককেন্দ্রিক বৃত্তগুলো,
কাছের বা দূরের ---
ভিন্ন ভিন্ন ব্যাসার্ধযুক্ত ।
আমি শুধু নিশ্চল নিথর পার্থিবতায়,
অলক্ষে বসে থাকি সকলের সাধারণ কেন্দ্রে।
তবু আমারও তো সাধ হয়,
পরিধি বরাবর, নিছক হেঁটে যেতে,
প্রতিটি সম্পর্কে।

বয়সের সাথে সাথে,
শুধু বৃত্তের সংখ্যাগুলো বাড়তে থাকে।
আমার প্রত্যক্ষ বিজড়ন ব্যাতিরেকে,
ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ হওয়া
সেইসব জাগতিক বৃত্তগুলো
ক্রমশঃ আমার দম আটকে আনে।
আরও বেশী করে যেন
আমি বাঁধা পড়ে যাই
সমাজ-সংসারের অচ্ছেদ্য বন্ধনে।

নিজেকে বাঁচাতে তাই,
সুচতুর মায়াবী চালে,
আমি রচনা করেছি,
এক গভীর অনুভূতি মাখা
তোমার অস্তিত্বের বৃত্তখানা ।
সবচেয়ে বড় আকারের,
সেই বৃত্তের ভেতরে
সন্তর্পনে সমাজটাকে পুরে ফেলে
আমি নিয়ত পথ চলি,
কবিতার ফুলে ঢাকা
ব্যাসার্ধ রেখাগুলো বরাবর ।

তোমার কাছে পৌঁছবার
অসংখ্য অসীম পথ ধরে
হাঁটতে হাঁটতে, ক্লান্ত হয়ে
যেদিন আমি পরিধিতে পৌঁছব ;
হয়তো তোমায় সেদিন সত্যি করে কাছে পাব। 
হয়তো সেদিন তোমায় চিনতে পারব ।
হয়তো সেদিন তুচ্ছ হয়ে যাবে,
আমায় ঘিরে থাকা
সমাজ ও সমস্ত বৃত্তগুলো।
তোমার পরিধির বাইরে
অজানা মহাবিশ্বের বিশাল পরিব্যপ্তি ---
হয়তো সেদিন আমায় মৌন করে দেবে ।
তোমার মিলনে বিরহী এ প্রাণ,
হয়তো সেদিন মুক্তি পাবে ।
সেদিন থেকেও থাকবো না আমি ।
অথবা না থেকেও ভীষণভাবে থাকবো,
উপলব্ধির সেই পরম সত্যের
নৈর্ব্যক্তিক পুনর্মূল্যায়নে ।।

 ঋতুময়ী রাকা

এই বহ্নুৎসবে মাতা গ্রীষ্মে ---
তোমার ওই মায়া ভরা দৃষ্টি,
মিষ্টি
শীতলতা আনে
আমার পরাণে
নিদারুণ শুষ্ক এ বিশ্বে ।

এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়
তোমার ঐ পেলব পরশ,
হরষ
জাগায় মনে
সংগোপনে,
সুবাসিত রজনীগন্ধায় ।

এই কাশ ফুলে ছেয়ে যাওয়া প্রান্তর ----
তোমার ওই কেশরাশি সুবাসে,
অলসে
মধুর স্বপনে 
নিভৃতে গোপনে
শরতে আকুল হয় অন্তর ।

এই মন-কোনে হামা দেয় হতাশা
তোমার ওই হেমন্ত বিরহে,
কি রহে 
বাকি এই জীবনে ?
বিফল যৌবনে 
শিশির বিন্দু গড়ে কুয়াশা ‌।

এই নির্জন শীতে ভরা যৌবন
তোমার ওই স্মৃতি মাখা সঙ্গ-এ,
অঙ্গে 
উষ্ণতা আনে 
মম দেহ কোণে 
নব উদ্যমে ভরে তনুমন ।

এইরূপে ফিরে আসে 'ঋতুরাজ' 
তোমার ওই জুঁই ফুল হাসি,
আকাশী
জ্যোৎস্না প্লাবনে 
ছন্দের টানে 
আমারে বানাও রাকা 'কবি-রাজ'। 

 
একটুখানি বেঁচে থাকা

নীহারিকা, ছায়াপথ ---তোমাদের প্রশ্ন করেছিলাম,
ভালোবাসা কি ? তোমরা জবাব দাও নি ।
শুধু অসংখ্য তারা ঝিকমিকিয়ে 
হেসে উঠেছিলে ।
আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে আমার মন,
ছুটে বেরিয়েছে এ মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে---
আর মহাশূন্যের মাঝে পূর্ণতা খুঁজতে গিয়ে দেখেছি,
আমাদের বুকেও লুকিয়ে থাকে
মহাকাশের নিদারুণ সর্বগ্রাসী ব্ল্যাকহোলের মত
তাজা, গভীর কোন ক্ষত ।

প্রশ্ন করেছি এই পৃথিবীকেও ।
কিন্তু কেউ উত্তর দেয়নি---
ফুলেরা লজ্জা পেয়ে সুগন্ধ ছড়িয়েছে বাতাসে,
পাখিরা প্রশ্ন শুনে উড়ে গেছে
আরও দূর কোনও অজানায় ।
আর প্রকৃতি ?
সে তার রূপের ডালি মেলে ধরেছে আমার সামনে ।
কখনো ক্রুদ্ধ, কখনো বা কান্নায় ভেঙে পড়া সেই রূপ---
অথবা সদ্যস্নাতা রমণীর স্নিগ্ধতা, আমি দেখেছি ।
আমি দেখেছি, একটা একটা করে দিন চলে যাওয়ার মত,
পাতা ঝরানো । আর তারপরে, 
মিষ্টি হাওয়ার সাথে ভেসে আসা, 
বুকের বাঁ দিক ঘেষে একটু ভাল লাগা ।
কিন্তু ভালোবাসা ? 

দিন-মাস-বছর পেরিয়ে আজ, যখন মৃত্যু তার পরম মায়াময় আলিঙ্গনোদ্যত অবস্থায়
উপস্থিত আমার শিয়রে, 
এবং আমিও যখন খুব ধীরে,
সবে একটা পা বাড়িয়েছি,
সেই অমোঘ পরিণতির দিকে---
তখন জীবন আমার পিছু ডেকে বলল,
"ভালোবাসা হল, একটুখানি বেঁচে থাকা"।


মরু-তৃষ্ণা

তৃষিত ঊষর আজি বহু বর্ষ ধরে
বক্ষ মেলি চাহি আছে সুনীল সমীপে---
সিঞ্চরিয়া প্রেম-বারি তব মুক্ত করে,
জ্বালাও আলোক আজি মিলন প্রদীপে ।

চারিদিকে হাহাকার, শূন্য দগ্ধতা---
রিক্ততার মরুবালু উড়িছে আকাশে ।
তারি মাঝে হেরি কভু ব্যর্থ মুগ্ধতা,
বাজিবে কি আজি আসি তব প্রেম-পাশে ?

উজ্জ্বল ভাস্কর হেথা জীর্ণ, শীর্ণ করি
প্রবল আক্রোশে বুঝি শুষিছে ধরণী---
ক্ষণস্থায়ী শান্তি-ছায়া আনিলে শর্বরী,
জানি, জানি, নহে তাহা তৃষ্ণা নিবারণী ।

কোথা হে জলদপুঞ্জ, তব কৃষ্ণকায়া ?
যতদূর দৃষ্টি চলে, দৃষ্ট নাহি হয় ।
মরন বারতা বহে দিগন্ত ব্যাপিয়া,
অহরহ হিয়া মাঝে জাগে মৃত্যুভয় ।

কখনো বা হু হু করে ভয়ঙ্কর রবে,
ক্ষিপ্রবেগে ধেয়ে আসে উন্মাদিনী ঝড়---
দিবসে আঁধার নামে, হেনকালে যবে
চারিপাশে বহে শুধু বালুকা নির্ঝর ।

জানি এ জগৎ মাঝে আছে তপোবন, 
আছে কত মনোলোভা সুন্দরের মেলা---
আমিতো চাহিনা কিছু, আমার জীবন 
তৃপ্ত হোক, লভি তোমা, আজ এই বেলা ।

প্রতিক্রিয়া

সেদিন সকালে আমি একটা কান্ড করেছি
স্বরচিত একটি ভীষণ প্রিয় প্রেমের কবিতা 
আলাদা আলাদা ভাবে আমি পড়ে শুনিয়েছি
চারজন ভিন্ন বয়সী বান্ধবীকে, টেলিফোনে ।
সবাইকেই অনুরোধ করেছিলাম,
তাদের নিজস্ব অনুভূতিগুলো
সেদিন রাতেই যেন আমায় ফোন করে জানায় ।

সন্ধ্যেবেলা প্রথমে ষোড়শীর মোবাইল ঝংকার---
'মানে-টা সব বুঝতে না পারলেও বলব, 
শুনতে কিন্তু ব্যাপক লেগেছে । 
কেমন যেন একটা ফোনেটিক্যালী মেলোডিয়াস !
উমম্ --- লাভ ইউ সোনা' ।

ব্যাচেলারী, দায়সারা ডিনারের ফাঁকে,
এল দ্বিতীয় ফোনটা---
ঋতুত্তরী-বিগতযৌবনা গলাটা খাদে নামিয়ে
দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন, 'ইস !
আমি যদি আর বছর দশেক পরে পৃথিবীর আলো দেখতাম!'

ঘড়িতে ইংরেজি তারিখ বদল এর পূর্বমুহূর্তে,
সদ্য ত্রিশ-উত্তীর্ণা গৃহবধূর ফিসফিসানি---
'স্যরি, একটু দেরি হয়ে গেল ।
আসলে ছেলেটা ঘুমোতে আজ এত দেরী করলো---
আর আপনার দাদারও তো দিনান্তে 
তিন-চার পেগের আগে চোখ বন্ধ হয় না ।
ও হ্যাঁ, কবিতাটা ঠিক একবার শুনে 
মতামত দেবার মত নয় ।
আমার কিন্তু একটা কপি চাই, দেবেন তো ? প্লিইইজ্---'

শুধু 'তার'-ই কোন ফোন এলো না ।
গহীন রাতের মায়াবী মোম-জোছনা 
আমার সারা শরীরে মাখিয়ে,
আমার সকল অঙ্গ ও তন্ত্র মথিত করে, 
আমার কায়া ও ছায়ার মিলন ঘটিয়ে,
আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একাকার করে দিয়ে,
সেই কাল-হরিণী বাসন্তী বাতাসী ভাষায় বলে গেল,
'কবিতা লেখ বা না লেখ, 
যদি এই বিশ্বসংসার সত্য হয়---
জেনে রেখো, আমি শুধু তোমারই'।
-----

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল