পথ যখন সঙ্গী - ৫

পথ যখন সঙ্গী (বাংরিপোসি) পর্ব - ৫ 
  
ন রে ন  হা ল দা র                                                                                                        রাস্তা অজানা। তবু এগিয়ে চলেছি বনের পথ দিয়ে। গুগুল পথ দেখাতে পারছে না। রাস্তার দুধারে কিছু কিছু ফাঁকা মাঠ আর দু একটা আদিবাসিদের বাড়ি। ফাঁকা মাঠে ছড়ানো ছিটান দু’একটা বড় বড় আসান, শাল বা অন্য কিছু নাম না জানা গাছ। কোথাও কোথাও গরু চরে বেড়াচ্ছে। ‘আরণ্যক’-এর সেই বনপথের কথা বারবার মনে পড়ছে। চোখ বারবার ‘রাজু’, ‘যুগল প্রসাদ’, ‘কুন্তা’, ‘নকছেদি’, ‘রাজা দব্রুপান্না'
'ভানুমতী’- এদের দেখার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠছিল। 
দেখা না হোক অন্তত কুণ্ডটা তো দেখে আসা যাক। কিছুদূর যাবার পর একটা ছোট্ট গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম। সেখান থেকেই খোঁজ নিয়ে জানলাম কুণ্ডে পৌঁছাতে গেলে আরো এগিয়ে যেতে হবে। চললুম এগিয়ে। আঁকাবাঁকা বনপথ। আরো চার কিলোমিটারের মতো এগিয়ে দেখা পেলাম কুণ্ডের। সুন্দর সাজানো কুণ্ড। মনে হয় সরকারী উদ্যোগেই সাজানো হয়েছে। কুণ্ডের পাশে একটা পুজোর স্থানও করে রাখা হয়েছে। কুণ্ডের তিনদিকে উঁচু পাথর, মাঝখানে গোল কুণ্ড। জল খুব ঠাণ্ডা এবং স্বচ্ছ। বড় বড় মাছ তার ভিতর কিলবিল করছে। ধরার অনুমতি নেই। কুণ্ডের একদিকের উঁচু স্থান থেকে জলপ্রপাতের মতো পতিত হচ্ছে জল, অপরদিকে অতিরিক্ত জল বয়ে চলেছে। একি প্রকৃতির সৃষ্টি নাকি ব্রহ্মার ? প্রকৃতি আর ব্রহ্মা যদি একই হয় তাহলে প্রশ্নের উত্তর খুব সহজেই মিলে যায়। 
ফিরে এলাম বাংরিপোসিতে প্রাকসন্ধ্যা মুহুর্তে। কিন্তু একটা সমস্যা। রাত কাটাবো কোথায়? যে দুটো হোটেল ছিল, খোঁজ নিয়ে দেখলাম রুম খালি নেই। এতটা বুঝতে পারিনি, নইলে আগে থেকেই হোটেল বুক করে আসতাম। অগত্যা দশ কিলোমিটার পিছিয়ে গিয়ে বোম্বে রোডের কাছে একটা হোটেলে রুম পেলাম। আমি একা থাকলে কোনো এক গ্রাম্য পরিবারে থেকে যেতাম। এক চা দোকানের দিদি অফারও করেছিল, কিন্তু সেখানে বাথরুম নেই। প্রাতঃকৃত সারতে জঙ্গলে যেতে হবে। সঙ্গে স্ত্রী আছে, অতএব নাকচ। বাংরিপোসিতে এরকমই একটি বাড়িতে থাকার ইচ্ছে ছিল আমার। কিন্তু… 
পরেরদিনের গন্তব্য বারিপদা হয়ে সীতাকুণ্ড। বাংরিপোসি থেকে বারিপদার দূরত্ব পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। বারিপদা থেকে সীতাকুণ্ডের দূরত্ব প্রায় বাইশ কিলোমিটার। সিমলিপাল রিসার্ভ ফরেস্ট যেখান থেকে শুরু হয়েছে তার পাশেই সীতাকুণ্ড। এপথও জনহীন প্রান্তরের মতো। তবে দশ কিলোমিটারের মতো যাওয়ার পরেই চোখের সামনে দেখা দিল পাহাড়শ্রেণি। লম্বা বিস্তৃত পাহাড়। মাঝখানের উপত্যকা দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে ভিতরে। এপ্রান্তে আবার সমতল ভূভাগ। মাঝে মাঝে বড় বড় গাছ। কোথাও দু’একটা বাড়ি। তারমধ্য দিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি। জঙ্গলের মধ্যে এ কুণ্ড, তবে একটু আলাদা। এ কুণ্ডে জল অনেকটা উপর থেকেই পতিত হচ্ছে। এখানেও পুজো করার জন্য একটি স্থান নির্দিষ্ট করা আছে, তবে স্থানটি প্রাকৃতিক উপায়েই সৃষ্টি। এ কুণ্ডে মানুষের সুদৃষ্টি পতিত হয়নি, তাই একটু অগোছাল; আর পুরোটাই প্রাকৃতিক।
কুণ্ডের পাশেই সিমলিপাল রিজার্ভ ফরেস্ট। সেখানে ঢুকতে গেলে অনুমতি নিতে হয়। আর আমার ছোটো বাইকের অনুমতি তো দেবেই না। অতএব পরের বার পরিকল্পনা করেই আসার ইচ্ছে প্রকাশ করে বেরিয়ে এলাম। 


Comments

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো