দূরদেশের লোকগল্প-- জাপান(যুবক জেলের মাছ বউ)/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- জাপান

চিন্ময় দাশ 

যুবক জেলের মাছ বউ

গ্রামের গা ছুঁয়ে  বয়ে গেছে একটা নদী। সেই গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় জেলেদের পাড়া। নদীতে মাছ ধরে দিন গুজরান হয় তাদের। তা বলে, গরীব নয় কেউ। অভাব নেই কারও ঘরে। বরং হেসেখেলেই দিন কাটে মানুষগুলির।

  পাড়ায় একজনই আছে, যে মানুষটা একটু খাপছাড়া। যুবক বয়স তার। দেখতেও নেহাৎ মন্দ নয়। যেটা বেশি ভালো, তা হলো তার স্বভাব। পেট চালাবার জন্য যতটুকু দরকার,  ঠিক ততটুকুর বেশি মাছ ধরে না সে। জালে মাছ বেশি উঠলেও, দরকার মতো রেখে, বাকি মাছ নদীতে ছেড়ে দেয় যুবকটি।
পাড়ায় সবাই হাসাহাসি করে তার বোকামি নিয়ে।  তবে, সেসবে গা করে না সে কোন দিন। মনে লোভ নাই বলে, দরকারের বেশি মাছ ধরে না। তাই টাকাকড়ি তেমন নাই তার ঘরে। তা নিয়েও কোন দুঃখ নাই ছেলেটার মনে। 

  একটাই অসুবিধা। সকলের  ঘরে বউ আছে, কেবল তার ঝুপড়ি ঘরে কোন বউ নাই। আসলে, এমন অভাবী ছেলের সাথে কে আর মেয়ের বিয়ে দিতে চায়? 
একদিন ভারি আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটল। নদী থেকে ফিরছে ছেলেটা। কাঁধে ভেজা জাল। ঘরের সামনে এসে দেখে, একটি সুন্দরী মেয়ে বসে আছে ঘরের সামনে। ছেলেটা তো আকাশের থেকে পড়লো। এ মেয়ে আবার কে? এল কোথা থেকে!
মেয়েটা বললো, তিন কুলে কেউ নাই আমার। তোমার ঘরে একটু থাকতে দেবে আমাকে?
ছেলেটা বললো, নাগো মেয়ে, তা কী করে হয়? অভাবী মানুষ আমি। আমারই ভালো করে দিন চলে না। তোমাকে খাওয়াবো কী করে? যাদের ঘরে অভাব নাই, তাদের কাছে যাও।
মেয়েটা কিছুতেই শুনবে না। সে বললো-- তুমি যে অভাবী, সে আমিও জানি। তবে কি না, তুমি মানুষটা ভালো। তাই তোমার কাছেই এসেছি। একটুখানি দয়া করো আমাকে। তবে, একটা কথা বলি, আমার মতো বউ তুমি দুটো পাবে না।
ছেলেটা তবু্ও রাজি নয়-- নাগো মেয়ে, তা হয় না। তোমার মতো সুন্দরী বউ এই ঝুপড়ি তে মানায়ও না। তুমি ফিরে যাও।

  মেয়েটি কোন কথাই শুনতে চায় না। যাকে বলে, একেবারে নাছোড়বান্দা। কী আর করা যাবে? রাজি হতেই হোল। বউ হয়ে সেই মেয়ে রইলো ঝুপড়ি ঘরে।
সেদিন বাজার থেকে কিছু বিন কিনে আনল ছেলেটি। বউকে বললো-- মাছ তো আছেই। তোমার জন্য বিনও আনলাম। তা দিয়ে স্যুপ বানাও আজ।

  মেয়েটি বললো-- আমি কিন্তু মাছ খাই না। বিন এনে তুমি ভালোই করেছ। দুজনের জন্য বিনই রাঁধি বরং। 
খেতে বসে ছেলেটা ভাবল, মাঝেমধ্যে বিন তো আমিও রাঁধি। এমন সুন্দর স্বাদ তো কখনও হয় না! কী দারুণ রান্নার হাত এই মেয়ের!

  বেশ কয়েক দিন গেল। স্যুপ যেন লেগে থাকে মুখে। একদিন অবাক হয়ে বলেই বসল বউকে-- তোমার হাতে স্যুপ এত সুন্দর হয় কী করে বলো তো? 
ভারি মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল বউয়ের মুখে। তবে, ওই হাসিটুকুই শুধু। কোন উত্তর দিল না মেয়েটি। 
আরও কয়েক দিন গেল। কৌতুহল জমছে ছেলেটার মনে। কিছু একটা রহস্য আছে নিশ্চয়ই। চেষ্টা করেও কিছু জানতে পারল না যখন, মাথা খাটিয়ে একটা ফন্দি বার করলো ছেলেটা। 
  নিত্যদিন যেমন বের হয়, জাল ঘাড়ে ফেলে, বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কিন্তু নদীর পথে না গিয়ে, খিড়কির রাস্তা ধরে ঝুপড়ির চালে উঠে বসে রইলো। 
দুপুর গড়িয়ে বিকেল এল। বউ রান্নাঘরে এল এল স্যুপ রাঁধবে বলে। ঝুপড়ির ফুটো দিয়ে দেখছে ছেলেটা। বাক্স থেকে বিন নিয়ে কুচি কুচি করে কাটা হলো।  মাটির হাঁড়িতে বিনগুলো ভরে দেওয়ার পর, যাকরল মেয়েটি, চোখ কপালে উঠে গেল তার। হাঁড়িতে প্রস্রাব করে, বিনসহ উনুনে চাপিয়ে দিল।
চুপিসাড়ে চাল থেকে নেমে, ঘরে এল ছেলে। কিচ্ছুটি বললো না বউকে। যেন কিছুই দেখেনি, কিছুই জানে না সে।
  তবে, সেদিন খেতে বসে, স্যুপ ছুঁয়েও দেখল না ছেলেটা। বউ বললো -- কীগো,  স্যুপে হাতও দিলে না যে বড়! ব্যাপার কী?
ছেলেটা বললো-- এই ক'দিনে তুমি অনেক করেছ আমার জন্য। কোন কড়া কথা বলতে পারব না তোমাকে। শুধু একটাই কথা। এরকম নোংরা কাজ কোর না কখনও। 

  বউ বুঝতে পারল, সে ধরা পড়ে গেছে। মুখ কালো করে বললো-- ঠিক করেছিলাম, সারা জীবন তোমার সাথেই কাটিয়ে দেব। সুখী করার চেষ্টা করব একজন ভালো মনের মানুষকে। কিন্তু তা হওয়ার আর পথ রইল না। চলেই যেতে হবে আমাকে। যাওয়ার আগে, সত্যি কথাটা বলে যাই তোমাকে।
বউ চলে যাবে শুনে, ছেলেটা চমকে গেল। বললো-- বলো, কী কথা তোমার।
-- আমি ফিরে যাচ্ছি আমার নিজের জগতে। তবে, তোমার দয়া কোনদিন ভুলবো না আমি। তোমাদের মতো মানুষ নই আমি। একটু থিম গিয়ে আবার বলল-- একটা অনুরোধ করব। কাল নদীর ঘাটে এসো একবার। কাছেই একটা পাথর দেখতে পাবে সেখানে। সামান্য একটা উপহার নিয়ে হাজির থাকব তোমার জন্য। এসো কিন্তু। আর তো দেখা হবে না আমাদের।
ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে, অন্ধকারে মিলিয়ে গেল মেয়েটি। 

  পরদিন নদীর ঘাটে এসে হাজির হোল ছেলেটি। মেয়েটি অপেক্ষা করে আছে কথা মত। হাতে একটা বাক্স। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল ছেলেটি। চোখ যেন ফেরানো যায় না। কী জমকালো পোষাক আজ মেয়েটির পরণে। অপূর্ব সুন্দরী  দেখাচ্ছে আজ তাকে। মুখে আরও মিষ্টি হাসি। বাক্সটা ছেলেটার হাতে তুলে দিয়ে বললো-- আসলে আমি একটা মাছ। এই নদীতেই বাস আমার। একদিন ধরা পড়েছিলাম তোমার জালে।সেদিন জালে ধরেও, আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলে তুমি। জীবন ফিরে পেয়েছিলাম তোমার হাতে। আমার এ জীবন তোমারই দেওয়া। এই বাক্স তারই সামান্য প্রতিদান। দয়া করে নাও এটি। ঘরে ফিরে যাও। কোন দিন আর নদীতে আসতে হবে না তোমাকে। 

  এই বলে ঝুপ করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটি। চিহ্নটিও রইল না কোথাও।
বাক্স খুলে চোখ ধাঁধিয়ে গেল জেলে যুবকটির। সোনাদানায় ঠেসে ভরা বাক্স। ভালোমানুষীর পুরষ্কার দিয়ে গেছে প্রাণ ফিরে পাওয়া জলকুমারী।
সুখে স্বচ্ছন্দেই দিন কেটে যায় যুবকটির। সত্যি সত্যিই জাল ঘাড়ে করে আর কোন দিন নদীতে যেতে হয়নি তাকে। তবে, গাঁয়ের লোকেরা দেখে, কোন কোনও দিন নদীর পাড়ে যায় ছেলেটি। জলের দিকে তাকিয়ে, আনমনে বসে থাকে সেই পাথরটির উপরে।

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি