ল্যাটিন আমেরিকা (মেক্সিকো)-র লোকগল্প / চিন্ময় দাশ


দূরদেশের লোকগল্প-- ল্যাটিন আমেরিকা (মেক্সিকো)
চিন্ময় দাশ   

উকুনের চামড়ায় রাজার কোট 

রানি আর একমাত্র কন্যাটিকে নিয়ে এক রাজার সংসার। বেশ সুখেই দিন যায় তিনজনের।
একদিন রাজপ্রাসাদের ছাদে বসে গল্প করছে মায়ে-ঝিয়ে। রাজা পায়চারি করছে আপন মনে। মেয়ের কী সাধ গেল, কে জানে! বলল-- মা, আমার উকুন বেছে দাও।

রানী তো পড়ল আকাশ থেকে। এ কেমন সৃষ্টিছাড়া কথা। বলল-- কী যে বলিস, পাগলী, তার নাই ঠিক।  রাজকন্যার মাথায় উকুন?
মেয়ে নাছোড়বান্দা-- নাগো, মা। মাথার মধ্যে কে যেন কামড়ায় কুটকুট করে। তুমি দেখে দাও একটি বার। 
কী আর করে? অগত্যা রানি বসল মেয়ের মাথার উকুন বাছতে।
কতক্ষণ বাদে সত্যি সত্যিই একটা উকুন চোখে পড়ে গেল রানির। ছোট্ট একটুখানি চেহারার একটা পোকা। ঘাপটি মেরে বসে আছে চুলের গোড়ায়। 
কোমল পদ্মকলির মত আঙ্গুল রানির। নখের ডগায় পোকাটাকে তুলে এনে, রাজাকে হাঁক পাড়ল-- তাড়াতাড়ি এসো এদিকে। দ্যাখো, কী কাণ্ড হয়েছে।
রাজা প্রথমটায় বিশ্বাসই করতে পারল না। রাজকুমারীর মাথায় উকুন! ভাবতেই পারছে না রাজা। রানি গজগজ করত লাগল-- কতবার বলেছি, যার-তার সাথে মেলামেশা করতে দিও না মেয়েকে। মন্ত্রী হোক, কি সান্ত্রী; উজির হোক বা নাজির-- আজ থেকে কারও ছেলেমেয়ের সাথে মেলামেশা করবে না আমাদের মেয়ে। 
এসব কথায় রাজার কান নাই। রাজা বলল-- মেরো না পোকাটাকে। আমায় দাও। 
রানি অবাক-- উকুন নিয়ে কী করবে তুমি? মাথায় পুষবে?
রাজা বলল-- হ্যাঁগো, রাজরানি। ঠিক বলেছ। পুষব পোকাটাকে। কতজনকেই তো পুষতে হয় একজন রাজাকে। ছোট্ট একটা পোকাকেও না হয় পুষলাম।
একটা কাঁচের জারে ঢুকিয়ে উকুনটাকে রেখে দিল রাজা। রাজার মনে সাধ হয়েছে, রাজরক্ত খেয়ে একটা উকুন কত বড় হতে পারে, সেটা পরীক্ষা করে দেখবে। প্রতিদিন একবার করে পোকাটাকে বার করে, বসিয়ে দেওয়া হয় রাজকন্যার মাথায়। এক প্রহর বাদে, তুলে নিয়ে আবার ঢুকিয়ে দেওয়া হয় কাঁচের জারে। সবই হয় ভারী সন্তর্পণে। রাজা, রানি আর রাজকন্যা-- তিনজন ছাড়া, কাকপক্ষীটিও টের পায় না কোন কিছু।

রাজার অনুমানই সত্যি হল। আড়ে-বহরে বেশ বাড়তে লাগল পোকাটা। বাড়া বলে বাড়া। এমন হল, জার বদল করতে হল রাজাকে। বড় দেখে একখানা জারে ঢোকানো হল পোকাকে।
দিন যায়, পোকাও বাড়তে থাকে। দেখা গেল, বড় জারেও আর আঁটছে না। তখন একটা ব্যারেলের ভেতর রাখা হল তাকে। রাজরক্ত খাওয়ানো কিন্তু চলছে একেবারে নিয়ম করে। পোকাটাও রক্ত খাচ্ছে আর বাড়ছে। বাড়ছে আর রক্ত খাচ্ছে। এবার ব্যারেল পাল্টে, বড় দেখে একটা পিপের ভেতর রাখা হল পোকাকে। 
যেদিন পিপেতেও আর আঁটছে না, সেদিন মেয়ের দিকে চোখ গেল রাজার। হায়, হায়! পোকা বাড়ছে, কিন্তু রাজকন্যা তো আর বাড়ছে মনে হচ্ছে না। কী সর্বনাশ!
তখন রানির হুকুমে, সব  বন্ধ করে দেওয়া হল। রেগেমেগে, পা আছড়ে রানি বলল-- ঢের হয়েছে তোমার পরীক্ষা। শেষে তোমার এই উকুন হাতি হয়ে উঠবে। ততদিনে আমার মেয়েটাই না উকুন হয়ে যায়।
এখন এত বড় ঢাউস একটা পোকা নিয়ে কী করা যায়? লুকিয়েও তো রাখা যায় না। খাদ্য যোগাবে কে? রানীর মাথা তখনও গরম। সে বলল-- মেরেই ফেলো ব্যাটাকে। অনেকখানি চামড়া বেরোবে। তা দিয়ে একখানা কোট বানিয়ে নাও বরং। খুব ভালো হবে।
রাজারও মনে ধরল কথাটা। চুপি চুপি মুচিকে ডেকে, চামড়া ছাড়ানো হল উকুনের। সেই লোকই ক'দিন লেগে থেকে, পাকা করে তুলল কাঁচা চামড়াকে। ভারী সুন্দর হয়েছে জিনিষটা। জীবনে কারও কাছে মুখ খুলবে না-- এই কড়ার করিয়ে, নিজের গলা থেকে একখানা হার খুলে লোকটার হাতে দিয়ে দিল রাজা।
এবার ডেকে আনা হোল রাজার দর্জিকে। বহু দিনের কর্মী। রাজার বাবা আর ঠাকুরদার পোশাক-আসাকও এরই হাতে বানানো। ক'দিন সময় নিয়ে, ভারী যত্ন করে একটি কোট বানিয়ে দিল বুড়োমানুষটি। দারুণ চেকনাই হয়েছে কোটটি। কী নিপুন কারুকাজ! চোখ ফেরানো যায় না যেন। দর্জিকেও অনেক পুরষ্কার দেওয়া হল, মুখ বন্ধ রাখার শর্তে। 
-- প্রাণে মারবো না। কিন্তু মুখ খুলেছো, কি অন্ধকূপে কাটাতে হবে বাকি জীবন। এটি ভুলে যেও না। রাজার হুঁশিয়ারি নিয়ে বেরিয়ে গেল দর্জি।
যেদিন কোট গায়ে চাপিয়ে দরবারে এল রাজা, সকলের চোখ আটকে গেল জিনিষটার উপর। এমন জিনিষ কেউ কোনদিন চোখেই দেখেনি। ভারী কৌতুক হল রাজার। জানতে চাইল--কেউ বলতে পারবে, কার চামড়ায় তৈরী হয়েছে এটা? 
সবাই বলতে চায়, এ ওকে টপকে, প্রথমে বলতে চায়। কেউ বলল-- এটা হরিণের চামড়া। কেউ বলল-- না, না. এটা নেকড়ের। 
এভাবে নানাজনের নানান অনুমানের বন্যা বয়ে গেল। আসল কথাটা কেউ বলতে পারল না। পারবে কী করে? উকুনের চামড়া থেকে কোট বানানো যেতে পার, কল্পনাও করা যায় না এমন কথা। 
ভারী মজা পেয়ে গেল গেল রাজা। এবার যার সাথে দেখা হয়, তাকেই জানতে চায়-- বলো তো দেখি, রাজার কোট কার চামড়ায় তৈরী?
কেউ বলতে পারে না। তখন হোল কী, রাজার ভারী মন খারাপ হয়ে গেল। ভাবতে লাগল-- দারুণ কল্পনাশক্তি আছে, আমার রাজ্যে এমন একজন মানুষও নাই! 

এবার একটা পণ করে বসল রাজা। ঘোষণা করে দিল-- যে লোক রাজার কোটের ধাঁধা সমাধান করে দিতে পারবে, তার সাথে বিয়ে দেওয়া হবে রাজকুমারীর।
ঘোষণা শুনে, রানি ভারী গাঁই -গুঁই করতে লাগল-- এ কেমন কথা? কেউ না কেউ এসে আন্দাজে ঢিল মেরে দিল। আর, তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবে তুমি? 
-- পাগল হয়েছো তুমি, রানি? রাজার মুখে এক গাল হাসি। বলল-- কেউ আন্দাজই করতে পারবে না। আর, সত্যিই যদি পারে কেউ, তাহলে তো সেটা বিরাট ব্যাপার হবে। প্রচন্ড কল্পনাশক্তির অধিকারী হবে সেই লোক। এমন লোকের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে আপত্তি হবে কেন আমাদের? 
তাতেও রানীর আপত্তি যায় না-- কী জানি বাবা। আমার কিন্তু মোটেই ভালো লাগছে না।
গোটা রাজ্যে ঢেঁড়া পিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই জেনেছে রাজার ঘোষণা। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে সর্বত্র একই আলোচনা চলতে লাগল। লোকও  আসতে লাগল দল বেঁধে। রাজার মেয়ের সাথে বিয়ে বলে কথা। লোক আসবার বিরাম নাই। কিন্তু ওই আসা পর্যন্তই। সবাই অনুমান করে এটা বলে, ওটা বলে। আর, মুখ শুকনো করে ফিরে যায়। দেখতে দেখতে একদিন দরবারে লোক আসা বন্ধ হয়ে গেল।
হয়েছে কী, সেই সময়ে এক মেষপালক এসেছে রাজধানীতে। সঙ্গে একপাল ভেড়া। রাজধানীর বাজারে বেচলে, ভালো দাম পাওয়া যাবে ভেড়ার-- এই আশা নিয়ে এসেছে লোকটা।

রাজবাড়ীর সামনের মাঠে ভেড়ার পাল রেখে, বিশ্রাম নিতে লাগল মেষপালক। পাঁচিলের গায়ে উনুন জ্বেলে রান্না-খাওয়া সেরে, সেখানেই শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙল যখন, বিকেল হয়ে এসেছে। উঠে দাঁড়িয়েছে, অমনি কানে এল কাছাকাছি কেউ কথা বলছে। আশে-পাশে তো কেউ নাই। পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে বোঝা গেল, ভিতরে কথা বলছে কেউ।
আসলে হয়েছে কী, পাঁচিলের ঠিক ওপারে, রাজার বাগান। রাজা-রানি বেড়াতে এসেছে বাগানে। তারাই কথা বলছে। একটু কান পাততেই, সব কথাই কানে আসছে লোকটার।

রানি বলছে-- রাজ্য ভেঙে লোক তো এল। একজনও তো কোটের রহস্য ভেদ করতে পারল না।
রাজা বলল-- পারবে কী করে, রানি? রাজরক্ত খাইয়ে একটা উকুনকে বড় করা হয়েছে। সেই উকুনের চামড়ায় আস্ত একটা কোট বানানো হয়েছে-- এটা কেউ কখনও ভাবতে পারে না কি?
রানি বলল-- সে পারুক না পারুক, তুমি এবার ভালো দেখে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা দেখো বাপু।
রাজধানীতে ঢুকেই রাজার কোটের কথাটা তারও কানে গিয়েছিল। রাজা-রাজড়াদের ব্যাপার। তখন কোনও গা করেনি। এখন মাথাটা কেমন চিড়িক করে উঠল মেষপালকের। মেষপালকের ঘরে রাজার মেয়ে যাবে বউ হয়ে! কী কপাল করেই না এসেছিল এখানে।
তখনকার মত চুপি চুপি সরে পড়ল লোকটা।
পরদিন পুঁটলিতে বাঁধা জামাকাপড় পরে, একটু ধোপদূরস্ত হল। রাজার সামনে যাওয়া বলে কথা! উলুঝুলু পোষাকে কি আর যাওয়া যায়?
দেউড়িতে পাহারাদার আটকে দিল। কিন্তু ধাঁধার উত্তর দিতে এসেছে বলতে, ভিতরে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। রাজার সামনে গিয়ে লম্বা একটা সেলাম ঠুকল লোকটা। রাজা বলল-- তুমি কে হে? পরিচয়টা শুনি তোমার।
লোকটা বলল-- হুজুর, আমি অতি সাধারণ একজন লোক। একজন মেষপালক। ভেড়া বেচব বলে, আপনার বাজার এসেছি। 
লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে, মন্ত্রী বলল-- রাজামশাই, শেষে কি না একজন মেষপালক? আমি বলি কী, এখানেই শেষ হোক। আর নয়, আজই ইতি হোক কোটের রহস্য সমাধানের।
লোকটা তো জানে, যুদ্ধ সে জিতেই গিয়েছে। একটু বাদে রাজার জামাই হয়ে যাবে সে। এখন একটু কেরামতি দেখানো যাক বরং। রাজাকে কিছু জবাব দিতে না দিয়ে, বলল-- কাউকেই হেলাফেলা করতে নাই, মন্ত্রীমশাই। কার কী ক্ষমতা আছে, কার মাথায় কত বুদ্ধি, সে কি আর বাইরেটা দেখে বোঝা যায়?
মন্ত্রীর একটু আঁতে লাগল কথাটা। মুখের ওপর কথা। তাও আবার ভরা দরবারে। গম্ভীর গলায় বলল-- তাই বুঝি? এত বুদ্ধি তোমার? 
লোকটা বলল-- তাহলে আর বলছি কী? দেশসুদ্ধ লোক তো এল। পারল কেউ? 
বিবাদ বাড়তে দিতে নাই। রাজা বলল-- ওসব কথা থাক। তুমি বলতে পারবে, আমার গায়ের এই কোট কার চামড়া থেকে তৈরী?
-- মনে হচ্ছে পারব? তবে একবার ছুঁয়ে দেখতে দিতে হবে।
রাজা কোট খুলে দিতে, লোকটা উলটে-পালটে, ছুঁয়ে নানান ভাবে দেখবার নাটক করল খানিক। তারপর বলল-- আমার মনে হচ্ছে, একটা উকুনকে ভালো করে রক্ত খাওয়ানো হয়েছে। তাতেই ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়েছে উকুনটা। তারই চামড়া দিয়ে হয়েছে রাজার কোট। 
প্রথম মন্ত্রী হেসে উঠল-- উকুনের চামড়ায় কোট! দারুন দৌড় তোমার কল্পনা শক্তির। বাহবা দিতেই হয়।
ব্যাঙ্গ শুনে, সারা দরবার হো-হো করে হাসিতে ফেটে পড়ল। কেবল দুজনের মুখে হাসি নাই-- রাজা আর সামনে দাঁড়ানো মেষপালকটি।
রাজা হাসছে না। তবে মুখখানা বেশ আলোয় মাখা। আসল ঘটনা তো রাজার জানা নাই। রাজা ভাবছে,  এত দিনে একজন কল্পনার অধিকারী মানুষ পাওয়া গেছে। তাতেই রাজার আনন্দ। 

বেশ ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন হয়েছিল। মেরাপ বাঁধা হয়েছিল রাজবাড়ির সামনের মাঠ জুড়ে। সাত দিন ধরে ভোজ খেল প্রজারা। আর মেষপালক? কোথায় গেল তার ভেড়ার পাল। রানিমার কথায় রাজপ্রাসাদেই থেকে গেল সে রাজার জামাই হয়ে।

পেজ-এ লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি