অবনী, বাড়ি আছো? আমার খুব ভয় করছে /সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অবনী, বাড়ি আছো? আমার খুব ভয় করছে 
সন্দীপ কাঞ্জিলাল


অ্যারিষ্টটলের পলিটিক্স গ্রন্থের বিখ্যাত উক্তি-- "মানুষ রাজনৈতিক জীব।" মানুষ প্রাণধারী কোন ইতর শ্রেণীর প্রাণীবিশেষ বা জীব নয়। অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য হচ্ছে, জীবের জীবন আছে কিন্তু তাতে কোন রাজনীতি নেই। বা অন্য কোনও জীবের মুখে ভাষা নেই। কিন্তু মানুষের একটা জীবন আছে যা রাজনৈতিক। মানুষের মুখে একটি ভাষা আছে, যে ভাষা রাজনৈতিক। রাজনীতি মানেই মানুষের সামাজিক রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক মুক্তির সংস্কৃতি। মুক্তি শব্দের সর্বোচ্চ রূপ হল সুন্দর জীবন। সুন্দর জীবনের চেয়ে, আর কিছু সুন্দর নেই। সুন্দর জীবন সৃষ্টি সংস্কৃতির লক্ষ্য। তাই রাজনীতির সর্বোচ্চ লক্ষ সুন্দর জীবন সৃষ্টি। 

আর রাজনীতি বলতে রাষ্ট্র সম্পর্কিত নীতি, যা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ বা পরিচালনায় অংশগ্রহণ করার জন্য আন্দোলনকে বুঝি। মাওসেতুং বলেছিলেন- "রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীত।" এই রাজনীতিকে এগিয়ে এগিয়ে নিয়ে যায় কে? উত্তর হল নেতা। নেতা কাকে বলবো? এ নিয়ে অনেক রকম বাখ্যা আছে। একটি বাখ্যা হল, প্রভাবিত করাই নেতৃত্বের প্রাথমিক কাজ। নেতা মানুষকে লক্ষে পৌঁছাতে প্রভাবিত করেন। আর নেতা যে কাজ কর্মের মাধ্যমে মানুষকে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় তাই হল রাজনীতি। রাজনীতি আবার সংস্কৃতির অংশ। অবধারিতভাবে প্রশ্ন এসে পড়ে সংস্কৃতি কাকে বলে?  সমাজবিজ্ঞানী টেলরের মতে- সংস্কৃতি হচ্ছে জ্ঞান বিশ্বাস আচার-ব্যবহার ভাষা খাওয়া-দাওয়া নৈতিকতা মূল্যবোধ সবকিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। এক কথায় বলা যায়, যা কোনো সময়ে একটি জনগোষ্ঠীর আচরণকে পরিচালিত করে তাই হচ্ছে সংস্কৃতি। ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার বলেন- "মানুষ আসার আগে পৃথিবী যে অবস্থায় ছিল, আর মানুষ আসার পর পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়ালো এই দুইয়ের তফাৎ হল সংস্কৃতির তফাৎ।"
কিন্তু আমরা কি দেখছি?  আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিভোর। তাঁরা যেকোনও মূল্যে ক্ষমতায় যেতে বদ্ধপরিকর। গণতন্ত্র চর্চার মতো যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য সেগুলো থেকে তাঁরা বহু দূরে। দুর্নীতি আমাদের বিরাজমান ক্ষমতার রাজনীতির প্রধান কারণ। জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর কল্যাণ-ই ক্ষমতায় যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ। এর কারণ হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতি সমাজ ব্যবস্থা ও আমাদের পরিবর্তিত সংস্কৃতি। মানুষ সামাজিক জীব হওয়া সত্ত্বেও পুঁজিবাদ দ্বারা সৃষ্ট। আজকের জীবন যাপন ব্যবস্থা এর জন্য মূলত দায়ী। অর্থাৎ ভোক্তা বা ক্রেতা সৃষ্টিকারী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, আমাদের সমাজ ও সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের কাঠামো দুর্বল করে দিয়ে প্রচলিত সংস্কৃতির ভেতর আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের রাজনীতিতে সংস্কৃতিতে চিন্তা-চেতনায় সামগ্রিক জীবনবোধে। পরস্পর সামাজিক সম্পর্কের স্থলে ঠাঁই করে নিয়েছে, ব্যক্তিকে অপর ব্যক্তি থেকে বিচ্ছিন্নকরণের প্রক্রিয়া। ব্যক্তিকে ক্রেতায় রূপান্তর ও মানুষের মধ্যে মুনাফার সম্পর্ক। ভোগবাদী স্বার্থবাদী সম্পর্কের ফলে সর্বত্র একটাই হিসাব আমার লাভ কিসে,আমার ক্ষতি কিসে? আর এই হিসাবের যাঁতাকলে মধ্যে গরিব মানুষ আরও গরিব হচ্ছে। তাদের বিভিন্ন দাক্ষিণ্য দিয়ে ভিখারিতে পরিণত করা হচ্ছে। সরকারের যেখানে উচিত ছিল বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার সুষম বন্টন করা, তা না করে দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।  কারণ সরকারও এই ক্ষমতালোভী নেতাদের ভয়ে মুখ খুলছে না। পাছে তারা ক্ষমতা হারায়। এটাই হচ্ছে এখনকার রাজনীতি। 
রাজনীতি কাকে বলে একটু বুঝিয়ে বলি। ধরুন আমাদের পরিবারে আমি আমার স্ত্রী আর একটি দশ বছরের ছেলে এবং  দু বছরের বাচ্চা। এবং ঘরের কাজ কর্মের জন্য একটি পরিচারিকাও আছে। আমি চাকরি করি। মাসের শেষে বেতন যা পাই, সব তুলে দিই বউয়ের হাতে। আমার বউ আমার সংসার চালায়। অর্থাৎ আমার সরকার আমার বউ। একদিন রাত্রে বাচ্চা ছেলেটি বিছানায় পেচ্ছাপ করার পর কাঁদছে।সেই কান্না শুনে আমার দশ বছরের ছেলেটি জেগে উঠেছে। বউ কিন্তু নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। আমি আমার বউকে না ডেকে, পরিচারিকাকে ডেকে বাচ্চার খাবার তৈরি করতে বললাম। এসব দেখার পর আমার বড় ছেলেটি বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই, উপার্জন করি আমি --পুঁজিবাদী। আমার স্ত্রী সরকার, বড় ছেলেটি জনগণ, ছোট ছেলেটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আর পরিচারিকা শ্রমজীবী মানুষ। 

পুঁজিবাদী সমাজ যখন শ্রমজীবী সমাজের উপর শোষণ অত্যাচার করে, সরকার তখন নাক ডেকে ঘুমায়। জনগণ সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বাস করে নোংরা পরিবেশে।

ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মস্তান পোষে, সরকারি দলের পক্ষে যা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। অনেকদিন থেকেই আমাদের রাজনীতিতে তাই চলে আসছে। তোলাবাজি কাটমানি অন্যান্য দুষ্কৃতকারী কর্মের ফলে মস্তানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এরা অনেকেই বর্তমান মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তোলাবাজি টেন্ডারবাজি ও দখলদারি  ইত্যাদি অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে যাচ্ছে। এইসব দুষ্কৃতিকারীরা কেউ কেউ টাকা ও পেশীশক্তি খাটিয়ে মন্ত্রী এমপি বিধায়ক বা পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ইত্যাদি পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের কারণে ক্রমাগতভাবে মস্তানতন্ত্র প্রবেশ করছে। এই জন্য সৎ যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা এই রাজনীতির অঙ্গন থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতেও আসবেন কিনা ঠিক নেই। তার ফলে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের পক্ষে কখনো মঙ্গল নয়। যা জাতির জন্য বিপদের। দেশে অযোগ্য অদক্ষ দুর্নীতিবাজ ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে এর মাশুল পুরো জাতিকেই দিতে হবে। কারণ অপরাধীদের শাসনে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ভবিষ্যতে উগ্রবাদী শক্তির উত্থানের পথকে সুগম করবে ধর্মাশ্রিত শক্তি। এরই মধ্যে আমাদের দেশে তাদের কুৎসিত চেহারা প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশে উগ্রবাদের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করবে। 

কিন্তু এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কি? এসব থেকে যদি আমরা বেরুবার পথ না খুঁজি, তবে আমরা নিজেদের এবং আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের মধ্যে রেখে যাব। যখন পলিটিক্যাল সমাজ অন্ধকার ডেকে আনে, তখন সুশীল সমাজকে ভোর আনতেই হবে। সুশীল সমাজ মানে আধুনিক মানুষ। বোদলেয়ার পড়লে বুঝতে পারি--আধুনিকতার আসল সাবজেক্ট হলো হিরো। কারণ আধুনিক জীবনে বাঁচতে হলে নায়কোচিত ধাত থাকা প্রযোজন। তাঁর মত অনুযায়ী কবি শিল্পী লেখক অভিনেতা অধ্যাপক শিক্ষক ও অন্যান্য যারা জিনিয়াস, যারা যুগের ঊর্ধ্বে উঠে, তার সময়ের সারাৎসার ভবিষ্যতের জন্য লিপিবদ্ধ করবেন এবং বর্তমানকে উজ্জ্বল আলোকে পরিণত করবেন। সেই আধুনিক ব্যক্তি, যিনি বুর্জোয়া জীবনের নিরাপত্তা ও স্বত্বাধিকার ভেঙ্গে রাস্তায় নেমে আসেন অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। এই আধুনিক জীবন যাপন করার করার জন্য, তার জীবনে যে ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয় তা থেকে তিনি পিছিয়ে আসেন না। তাঁরা নির্ভীক, জীবনরসিক-- কোনো সংকটে তাঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হন না। অসাধারণ এই মানুষরা ধীরস্থির প্রসন্নচিত্ত, বিপদের মধ্যে তাঁরা বাস করতে ভালোবাসেন। দার্শনিক নীটশে, শিল্পী লেখক অভিনেতা অধ্যাপক শিক্ষক ও সমাজের অন্যান্য সৃষ্টিশীল মানুষকে এই সমাজের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন এই সুশীল সমাজ অতিমানব। কারণ বিভক্ত বিখণ্ড নিষ্প্রাণ উপাদানসমূহকে তাঁরা প্রাণবন্ত করে তোলে। 

বর্তমানে সুশীল সমাজকে আমি ঠিক চিনতে পারি না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জামাকাপড়, গায়ে আতরের গন্ধ, বড় বড় বাতেলা, রাস্তাঘাটে টিভি শোয়ে, তাঁরাই কি সুশীল সমাজ? তাঁদের হাবভাব দেখে মনে হয় সুশীল সমাজের কোনো অস্তিত্ব তাঁদের মধ্যে নেই। কারণ তাদের আত্মমূল্যায়নের অহংকার তাঁদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তাই প্রকৃত সুশীল সমাজ যদি না জেগে উঠে, তবে বর্তমানের দাঙ্গাবাজ তোলাবাজ পলিটিক্যাল সমাজ, দেশকে সমাজকে ধ্বংস করে দেবে। আর কালো রাত একটু ভোরের আলোর জন্য দরজায় কড়া নাড়বে- অবনী, বাড়ি আছো? আমার খুব ভয় করছে।

পেজ-এ লাইক দিন👇
আরও পড়ুন

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি