ধুলামন্দিরের স্থপতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লিওনার্দ এল্ম্‌হার্স্ট/অনমিত্র বিশ্বাস

ধুলামন্দিরের স্থপতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লিওনার্দ এল্ম্‌হার্স্ট

অনমিত্র বিশ্বাস

'Come and see me in New York. Rabindranath Tagore.' টেলিগ্রামের প্রাপক লিওনার্দ এল্ম্‌হার্স্ট যে সেটা পেয়ে কী ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন, তা প্রণেতার কল্পনার অতীত ছিল। এল্ম্‌হার্স্ট পরবর্তীকালে লিখেছেন, ‘I was still puzzled as to how he had ever heard of my existence.' তাও তো রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী প্রস্তাব সম্পর্কে এল্ম্‌হার্স্ট তখনও অজ্ঞাত। ‘গীতাঞ্জলী’ পড়ার পর থেকে প্রাচ্যের যে ঋষির তিনি গুণমুগ্ধ ভক্ত ছিলেন, সেই ‘Dr. Tagore’ তাঁর হাতে তুলে দিতে চাইছিলেন সুরুল গ্রামে যুগান্তরকে তরান্বিত করার ভার।
    নিউ ইয়র্কের সাক্ষাতে রবীন্দ্রনাথ এল্ম্‌হার্স্টকে বলেছিলেন ১৮৯০তে পিতা দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে শিলাইদহের জমিদারি সামলাতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। ‘গল্পগুচ্ছ'র গল্পগুলো পড়লেই বোঝা যায় কী নিবিড়ভাবে তিনি ‘পদ্মা’ বোট থেকে লক্ষ্য করেছিলেন ডাঙায় ছায়াসুনিবিড় গ্রামগুলোকে; আর তখনই তিনি দুটো তথ্যও আবিষ্কার করেছিলেন। এল্ম্‌হার্স্টের ভাষায়, ‘...first, the villagers seemed to have lost all ability to help themselves; secondly, that both research and technical assistance would be needed if they were ever to learn how to rescue themselves from their creeping decay.’
    ‘Mr. Elmhirst, I have established an educational enterprise in India which is almost wholly academic.’ পরিবেষ্টনকারী গ্রামগুলোর দারিদ্র্য, ক্ষয়, প্রাণহীনতার মাঝখানে আলোকোদ্ভাসিত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মতো শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে ভাবিয়ে তুলেছিল অন্য এক চিন্তা। কাদের জন্য এই সারস্বত উদ্যান? বাকী বঙ্গের সাধারণ জনসমুদ্রের সাথে শান্তিনিকেতন-নামক দ্বীপটির কোনো সংযোগই নেই। ‘For some reason these (surrounding) villages appear to be in a state of steady decline. In fact they are all in decay,’ এল্ম্‌হার্স্টকে বলেছিলেন তিনি। ‘... you might be interested in going to live and work on such a farm in order to find out more clearly the causes of this decay.’

    রবীন্দ্রনাথ একই উদ্দেশ্যে তাঁর একমাত্র জীবিত পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন আমেরিকায়। এটা সত্যিই ভেবে দেখার মতো বিষয়, যে সেই যুগের একজন অভিজাত ‘absentee landlord’ ছেলেকে বিদেশে পাঠাচ্ছেন-- সাহেব হতে নয়, ICS বা ব্যারিস্টার হতে নয়-- ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যা শিখে এসে দেশের জন্য কাজ করতে।
    গ্রাম্য সভ্যতাই যে ভারতীয় সভ্যতা এবং অর্থনীতির ধারক, বাহক ও প্রাণকেন্দ্র তা রবীন্দ্রনাথ জানতেন, এল্ম্‌হার্স্টও কয়েকদিনের মধ্যেই উপলব্ধি করেছিলেন। অথচ সেই গ্রামের ঐশ্বর্য্যই নগরসভ্যতা ক্রমাগত শোষণ করে তার অঢেল প্রাণশক্তিকেও প্রায় নিঃশেষিত করে ফেলেছিল। পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিছুই তৈরী হয় নি গ্রামে। ফলতঃ দারিদ্র্য, ঋণ, শোষণ। অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের কারণে প্রায়শই মহামারী। অশিক্ষাজনিত সামাজিক ব্যাধিতে জর্জরিত এই দেশ। রবীন্দ্রনাথের নিজের কথায়, 'Man has been digging holes into the very foundations not only of his livelihood but of his life. The reckless waste of humanity which ambition produces is best seen in the villages where the light of life is gradually being dimmed, the joy of existence dulled, and the natural bonds of social communion are being snapped every day.'
    আজও যে এই মাতৃহন্তারক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে তা বলতে পারি না।
    এল্ম্‌হার্স্টের নেতৃত্বে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালীমোহন ঘোষ, গৌরগোপাল ঘোষ আর সন্তোষ মজুমদার জনাদশেক ছাত্র নিয়ে সুরুলে যে কাজ শুরু করলেন, তা কেবল এই সমস্যার মূল পর্যন্ত পৌঁছতেই নয়, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তার সমাধান বের করতে আর সেই সমাধানকে বাস্তবায়িত করতে। জন স্নো যেভাবে মহামারীর প্রকোপ থেকে বাঁচিয়েছিলেন ইংল্যান্ডকে, সেইভাবে proper hygieneএর দ্বারা কলেরার মতো মহামারী আটকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা করতে। ‘It should be our mission to restore the full circulation of life's blood into these martyred limbs of  society; to bring to villagers health and knowledge; a wealth of space in which to live, a wealth of time in which to work, to rest and enjoy mutual respect which will give them dignity; sympathy which will make them realise their kinship with the world of men, and not merely their position of subservience.’ এই উদ্যোগের ট্রাস্টিদের মধ্যে ছিলেন আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু। সিংহ পরিবারের কাছে থেকে ক্রয় করা সুরুল গ্রামকে কৃষিনির্ভর শিল্পে ভারতের আদর্শ করে তুলতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; তাঁর ইচ্ছে ছিল, এই একটি অভিক্রিয়ার উদাহরণ বাকী ভারতবর্ষকে পথ দেখাবে।
    ১৯২১ সালে সুভাষচন্দ্র বসু দেশবন্ধুকে লেখা তাঁর দ্বিতীয় চিঠিতে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় যে, কংগ্রেসের একটা স্থায়ী আড্ডা চাই।... সেখানে একদল Research Student থাকিবেন-- যাঁহারা আমাদের দেশের ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা লইয়া গবেষণা করিবেন।’ (মনে রাখা প্রয়োজন, কংগ্রেস তখন কোনো দলবিশেষ নয়, সমান্তরাল ন্যাশনালিস্ট পার্লিয়ামেন্ট।) সুপরিকল্পিতভাবে দেশের কাজে লাগবেন বলে দেশবন্ধুর অভিভাবকত্বে বিদেশী সরকারের সিবিল সার্ভেন্টের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এলগিন রোডের বাড়িতে ফিরে এলেন সুভাষ। একই জাহাজে ফিরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি তখন ঠিক সেই চিঠিতে উল্লেখিত কাজটাই করবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। দেশকে শুধু স্বাধীন করাই নয়, তাকে সাবালক করা আর নিজের পায়ে দাঁড় করানোকে তিনি গুরুত্ব দিতেন।
    ১৯০১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত ৪০ বছরে ভারতবর্ষের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল মানুষটার জীবনবোধের যা যা বিবর্তন ঘটেছে, তার আয়না তাঁর শান্তিনিকেতন। শহুরে সভ্যতার চাপিয়ে দেওয়া sophisticationএর থেকে মুক্ত হবার দুর্নিবার ইচ্ছায় তিনি আজীবন ছুটে গেছেন প্রকৃতির, আদিমের, আরও আরও কাছে।
    ব্রহ্মচর্যাশ্রমের উপনিষদ-অনুমোদিত নিয়মাবলী তাকে শিক্ষিত সমাজে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের তাতে মন ভরে নি। তিনি দেয়ালকে ঘৃণা করতেন, তিনি চার দেয়ালের যান্ত্রিক গণ্ডিকে ভেঙে ফেলেছিলেন তাঁর স্বপ্নের এই বিদ্যালয়ে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঠাট্টা করে বলেছিলেন, গাছের তলায় পড়তে হলে ছাত্রদের "rainy day"র ছুটির জন্য আর আলাদা করে অজুহাত লাগে না। কিন্তু তাও ঠিক নয়। এমন অনেক নিদর্শন আছে, যে মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে, অনেক কুঁড়েঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, সেদিন ক্লাস হতে পারবে কেউ ভাবে নি। ছাত্ররা সেই বৃষ্টি-কাদার মধ্যে ভিজতে ভিজতে ‘শ্যামলী’ বা ‘কোনার্ক’এ ক্লাস করতে এসেছে। তাদের মনেও হয় নি যে তাতে গুরুদেব বিরক্ত হতে পারেন। আর তাদের গুরুদেব তাঁর শিক্ষকতার এই সাফল্যের কথা সোৎসাহে চিঠি লিখে জানিয়েছেন বন্ধুদের। আসলে সেখানে দেয়াল ছিলো না কোথাও। ঘর আর বাইরের মধ্যে, কাজ আর খেলার মধ্যে, গুরু আর শিষ্যের মধ্যে— কোথাও। সব দেয়াল সেখানে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বলেই ছাত্রদের উৎসাহও পরীক্ষা আর নিয়মাবলীর বেড়াকে অতিক্রম করেছিল।
    সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের কংক্রিটের আবহে তাঁর নিজের যেরকম claustrophobic লাগত, এখানে যাতে তা না হয়, সেই খেয়াল তিনি রেখেছেন। আকাশ পোড়ানো রোদ্দুরের মাঝে একটুখানি গাছের বা খড়ের ছায়ায়, খোলা প্রান্তর আর অরণ্যের হাওয়ায়, দূরে গোরুর গাড়ি বা সাঁওতাল মেয়েদের জল আনার শব্দের মধ্যে তিনি নিশ্বাস নিয়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু কী তিনি পড়াবেন এখানে? কলোনিয়াল য়ুনিভার্সিটির টেক্সটবুক? অবৈজ্ঞানিক ধর্মচর্চা? তাতে তাঁর মন ভরে নি... তিনি যেটা খুঁজছিলেন সেটা পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি আবার তাঁর আগের আদর্শে ফিরে গেলেন, দেয়াল ভাঙার আদর্শ। এবার নতুন করে ভেঙে ফেলতে হবে আরও বড়ো আরেকটা দেয়াল। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মধ্যেকার, দেশ আর কালের দেয়াল।
    প্রাচ্যসংস্কৃতির যে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে, তার ছায়ায় শান্তিনিকেতনে অনেকগুলি মহান মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। চার্লি অ্যাণ্ড্রুজ, পীয়রসন, সিলভিয়ার লেভি। বিশ্বভারতীর বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে সেখানে বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার সঙ্কটকে উপেক্ষা করে একত্রিত হয়েছিল অনেক মনীষা।
    শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন এসেই পড়ে, কারণ রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম একটু ব্যতিক্রমী। সেটা যথাসম্ভব সংক্ষেপে বলছি।
    ১৯১৫র পরে কংগ্রেসে এলেন মোহনদাস গান্ধী নামে এক ভদ্রলোক যিনি প্রবল জনপ্রিয়তায় কংগ্রেসের সর্বাধিনায়ক হয়ে উঠলেন অচিরেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে গান্ধী তাঁর প্রথম দেশব্যাপী সত্যাগ্রহ আন্দোলনের তোড়জোড় করছেন, আর সিম্বল হিসেবে তিনি বেছে নিলেন চরকাকে। ইংরেজরা তাদের ম্যানচেস্টার কাপড়ের বাজার তৈরীর জন্য মসলিনের মতো সূক্ষ্ম দেশজ শিল্পের ফালা ফালা অবস্থা করেছে ভারতে। হাতে-বোনা কাপড় বলতে তখন কর্কশ খাদিই শুধু পাওয়া যায়। সেই হাতে-বোনা খাদিকে ম্যাসকট করে গান্ধীজী দেশ স্বাধীন করতে চললেন। রবীন্দ্রনাথকে দলে পেলে সবারই সুবিধা হয়; গান্ধী রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘স্বদেশী আন্দোলনে তো আপনি এককালে খুব উৎসাহী ছিলেন।’
    স্বদেশী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ উৎসাহী তো অবশ্যই। তিনি যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই, যিনি বিলেতি কোম্পানির সাথে প্রতিযোগিতায় স্বদেশী জাহাজের ব্যবসা করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছিলেন।
    বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগ দেখে রবীন্দ্রনাথ ক্ষেপে উঠেছিলেন আরও অনেকের মতোই। সেই মুহুর্তে ‘বণিকের মানদণ্ড’র স্বরূপ বুঝতে পেরে বঙ্গ মেতে উঠেছিল স্বদেশী শিল্প নিয়ে। প্রফুল্লচন্দ্র রায় আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য তাতে অনেক আগেই উদ্যোগী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলন যখন বিলিতি জামাকাপড় পোড়ানোর মতো ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করল, রবীন্দ্রনাথ সব সমালোচনা অগ্রাহ্য করে নীরবে সরে এলেন তা থেকে। তাঁর স্বদেশপ্রেমের মধ্যে যখন তিনি ঘৃণার অনুপ্রবেশ দেখলেন, তিনি রাজনীতি থেকে সরে এলেন তাঁর নিভৃত বানপ্রস্থে, তাঁর কবিতার অন্তঃপুরে। মনে মনে প্রার্থনা করলেন, ‘নিজহস্তে নির্দয় আঘাত করি পিতঃ / ভারতেরে সেই স্বর্গে কর গো জাগরিত।’
    ‘ঘরে বাইরে’র কাহিনীক্রম মনে আছে? নিখিলেশ যখন কম্ফর্টেবল্‌ বিলিতি জিনিস ছেড়ে দেশী কাপড় দেশী আসবাব কিনতে লেগেছিল, প্রথমে তার স্ত্রী বিমলা তাতে বিরক্তই হয়েছিলো। এরপর এল সন্দীপ তার স্বদেশীর ক্রেজ নিয়ে; সে যা বলতে চায় দারুণ করে বলতে পারে আর convince করতে পারে। সন্দীপ নিখিলেশকে বলে বিলিতি জিনিস বিক্রি বন্ধ করে দিতে তার জমিদারীতে। নিখিলেশ উত্তর দেয়, অন্যদের জোর করার অধিকার তার নেই। দেশী জিনিস যা যা বিক্রি হবে না, তার সব সে কিনে নিতে রাজী। সন্দীপ ইকোনমিক্স বোঝে, একা নিখিলেশকে কেনানো তার উদ্দেশ্য নয়। সন্দীপের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ বিমলার seductive অনুরোধেও নিখিলেশ রাজী হয় না। বিমলা আবার বিরক্ত হয়।
    ১৯১১র পরে সেসব ব্যাপার কবে চুকেবুকে গেছে। ১৯২০তে গান্ধীজী যে কথা দিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে এক বছরের মধ্যে স্বরাজ আসবে, তা যে আদপে দিবাস্বপ্ন, তা বুঝতে বুদ্ধিমান লোকেদের বাকী ছিলো না। কিন্তু কথা হলো, আজ বাদে কাল সে স্বরাজ তো আসবে; আর তখন দেশটাকে চালাতেও হবে। আজকে যে কেরানি কলম পিষছে সরকারী দফতরে, সে যদি যন্ত্রের মতো কলম পিষেই চলে, তবে তো দেশ চলবে না, আর চললেও গোল্লায় যাবে। গান্ধী রাষ্ট্রীয় কলেজ-ইউনিভার্সিটি ‘বয়কট’ করার উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বভারতীকে পাশে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ রাজী হন নি। দেশ স্বাধীন হবার পরে সেই দেশ চালানোর জন্য কিছু শিক্ষিত লোকের প্রয়োজন হবে, যে কাজটা কলেজ-ড্রপ দেওয়া রাজনৈতিক দলের ইন্টার্নকে দিয়ে হবার নয়।
    গান্ধী বললেন, ‘তাহলে অন্ততঃ আপনি প্রকাশ্যে চরকা চালান। আপনাকে দেখে অনেক মানুষ উৎসাহ পাবে।’
    রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমি পদ্য লিখতে পারি শুধু। আমার হাতে চরকা পড়লে তুলোর ওপরই সেটা অত্যাচার হবে।’
    শিক্ষাপ্রাঙ্গণে যে-কোনোরকম রাজনীতি-চর্চাকেই রবীন্দ্রনাথ অশ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তাছাড়া কটেজ ইন্ডাস্ট্রি যে ম্যানচেস্টারের কটন মিলের সাথে কোনোদিনই পাল্লা দিতে পারবে না, সেটাও রবীন্দ্রনাথ জানতেন। এটা হাস্যকর কথা। স্বদেশী শিল্পকে প্রসারিত করতে হলে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নবতম প্রযুক্তির সাহায্যে তার নবজাগরণ প্রয়োজন। যেটা রবীন্দ্রনাথ করার চেষ্টা করেছিলেন সুরুল গ্রামে।
    তাঁর অল্পবয়সের স্বপ্ন পরিণতি পেয়েছিল শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে। এখানে এসেই তিনি বুঝতে পারেন গ্রাম্য সভ্যতার মাহাত্ম্য। তাঁর জীবনের দ্বিতীয়ার্ধের আরো পরিণত মনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন সুরুল বা শ্রীনিকেতনে।
    রবীন্দ্রনাথ যদি সারাজীবন শুধু কবি বা চিন্তানায়ক হয়ে কাটিয়ে দিতেন, তবে তাঁর পক্ষে অনেক সহজ হত, তিনি বিদ্বজ্জনদের বাহবাও অনেক বেশী পেতেন; কিন্তু সেটা তাঁর স্বভাব ছিলো না। দেশাত্ববোধ বলতে কূপমণ্ডুকতার প্রচার চলছে তখন সারা ভারতে। সেই একই বছর সমুদ্রপারাবারের অপরাধে মাদ্রাজের আয়েঙ্গার ব্রাহ্মণসমাজ ভারতবর্ষের স্মরণাতীত কালের শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ রামানুজনের শেষকৃত্যে পর্যন্ত যায় নি। এই আবহাওয়ারই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ লিওনার্দ এল্ম্‌হার্স্টকে আহ্বান জানালেন। এই ঘটনার গুরুত্ব ভারতীয় নারীদের উত্থানের উদ্দেশ্যে স্বামী বিবেকানন্দর ডাকে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের ভারত-আগমনের চেয়ে কিছু কম নয়। সত্যিকারের ভারতপ্রেমিক ছিলেন এল্ম্‌হার্স্ট— জিম করবেট, রাস্কিন বন্ড, ভগ্নী নিবেদিতা বা অ্যানি বেসান্তের মতো। কিন্তু জাতে তো ছিলেন ইংলিশ। তাই নিয়ে গোল বাধাতে ওস্তাদ কিছু লোক তখন বাংলায় রাজনীতি করছিল।
    এখানে প্রাসঙ্গিক একটা গল্প বলি। ততদিনে অসহযোগের আগুন জ্বলে গেছে এখানে। রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে গান্ধীর অনুরাগী চার্লস অ্যান্ড্রুজের হাত ধরে তার ধ্বংসাত্মক দিকটার বিষ প্রবেশ করেছে শান্তিনিকেতনেও। রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে দেখলেন এক অশুভ বিশৃঙ্খলা।
    এর মধ্যে শুরু হলো শ্রীনিকেতনের (তখনো নামটা ঠিক হয় নি) কাজ, সুরুলে। এল্ম্‌হার্স্ট ইংরেজ বলে একদফা আপত্তি করেছিল কিছু স্বদেশীভাবাপন্ন ছাত্র, রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সেসবে পাত্তাই দেন নি। বোলপুর থেকে সুরুল যাবার রাস্তা খুব খারাপ। এল্ম্‌হার্স্ট সরকারী দফতরে চিঠি লিখলেন তারা যেন অবিলম্বে রাস্তা সারানোর ব্যবস্থা করে, গাড়ি চলাচলের অসুবিধে হচ্ছে ইত্যাদি। এল্ম্‌হার্স্ট আর রবীন্দ্রনাথের নামের ব্র্যান্ড ভাল্যুর জন্য কাজটা হয়েও গেল। স্বদেশী ছাত্ররা খারাপ রাস্তা ঠেঙিয়ে যেতে এতোদিন কোনো আপত্তি করে নি, হঠাৎ তারা প্রবল আপত্তি করল। গান্ধীজী বলেছেন সরকারী দফতরকে বয়কট করতে, তুমি কেন তার সাহায্য নেবে? এল্ম্‌হার্স্ট তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে সরকারী দফতরের সাহায্য নাও বা না নাও, ট্যাক্স তোমরা সবাই দিচ্ছ ওদের; আর ট্যাক্স যখন দিচ্ছ তখন তার দামটা আদায় করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হলো না।
    বিশ্বভারতীতে অ্যগ্রিকালচারের কোর্স শুরু হল। এবার এক ছাত্র, নাম সত্যেন বোস (বিজ্ঞানী সত্যেন বোস না, এ অন্য সত্যেন বোস) বেঁকে বসল যে স্বদেশী গ্রামের উন্নতির কাজ কংগ্রেসের ফ্ল্যাগের নীচে হওয়া উচিত। সেখানে তারা কংগ্রেসের অফিস খুলবে। এতদিন সেইই কংগ্রেসের ম্যানিফেস্টো নিয়ে অন্য ছাত্রদের উস্কাচ্ছিল। এল্ম্‌হার্স্ট রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হলেন। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘যে যে ছাত্র রাজনীতি করতে চায়, তারা অবিলম্বে সুরুল ছেড়ে চলে যাক্‌। আর কেউ সত্যেনের সাথে যেতে চাইলে যেন এখনই চলে যায়।’ সত্যেনের বোলপুর থেকে কলকাতার টিকিট কাটা হয়ে গেল। সুরুলে ফিরে সত্যেনকে সেটা জানালেন এল্ম্‌হার্স্ট। সত্যেন বেঁকে বসল; সে কিছুতেই যাবে না, তাকে সেখানে থেকে কংগ্রেসের প্রচারের কাজ করতে দিতেই হবে। যাবার দিন সকালে পথের মধ্যে লোক জড়ো করে সত্যেন আরেক প্রস্থ প্রতিবাদের চেষ্টা করেছিল। শান্তিনিকেতনের আলু রায়-নামক একজন লরি-চালক তাকে চ্যাংদোলা করে তুলে ট্রেনের মধ্যে নিক্ষেপ করে, এবং ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কলকাতা পাঠানোর ব্যবস্থা করে। অবশেষে সত্যেন আর কংগ্রেসের অপপ্রভাব থেকে কিছুদিনের জন্য শান্তিনিকেতন মুক্তি পায়।
    তবু সুরুলের কাজ থেমে থাকে নি। এল্ম্‌হার্স্ট এই মহৎ কাজটিকে গাইড করে গেছেন অক্লান্তভাবে, কিন্তু যেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আগেই বলেছিলেন, তিনি ‘indispensible to this enterprise like any foreign missionary’ হয়ে ওঠেন নি। তাঁর অধীনে তাঁর সহকর্মীরা কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর কর্মপদ্ধতি যথসাধ্য আয়ত্ত্ব করে নিয়ে শ্রীনিকেতনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন।
    কৃষ্ণ কৃপলানী লিখেছেন, ‘Rabindranath Tagore was fortuante in his many foreign friends, English, European and American.’ এটা তো সত্যি বটেই। যেমন তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুরা ছিলেন ইয়েটস্‌ বা রোথেনস্টাইনের মতো, তেমনই তাঁর গঠনমূলক উদ্যোগে যথাসম্ভব নিঃস্বার্থ সাহায্য করেছিলেন আরো অনেকে। এঁরা রবীন্দ্রনাথের বন্ধুও, আবার সহকর্মীও। এল্ম্‌হার্স্ট যখন ভারতে কাজ করছিলেন, সেই কাজের অর্থসাহায্য এসেছিল ডেভনশায়ারের শ্রীমতী ডরোথি স্ট্রেটের কাছ থেকে। ইনি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী না হলেও লিওনার্দের অনুরক্তা ছিলেন, এবং পরবর্তীকালে ভারতপ্রবাসপ্রত্যাগত এমহার্স্টের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। রবীন্দ্রনাথ সুরুলের কার্য্যভার এল্ম্‌হার্স্টের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন, এবং কোনোভাবেই তার মধ্যে interfere করেন নি। নন্দলাল বসুর ফ্রেসকোয় আমরা যে রবীন্দ্রনাথকে দেখি লাঙল হাতে, সে কেবল প্রতীকীভাবে। সুরেন্দ্রনাথ কর বলেছেন, ‘Mr. Elmhirst is the chief architect of Sriniketan which he built up with his own labour and later gave financial stability to the project with funds from his own resources.’ রবীন্দ্রনাথ যে যোগ্যতম ব্যক্তিটির ওপর এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তা সন্দেহহীন।
    এল্ম্‌হার্স্টকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে আমরা দেখতে পাই, তিনি লিখেছেন, ‘I wish I were young enough to be able to join you and perform the meanest work that can  be done in your place, thus getting rid of that filmy web of respectability that shuts me off from intimate touch with Mother Dust.’ ‘ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক ধুলাবালি’, তবু সেই কর্মযোগকেই রবীন্দ্রনাথ শ্রেষ্ঠ সাধনা বলে মনে করতেন। আর রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করেছেন, ‘... the small beginning which you (Elmhirst) have made of this institution at a remote corner of the world carries in it a truth for which men today are groping in bewilderment.’

তথ্যসূত্র:
1. Leonard K. Elmhirst, Poet and Plowman, Visva-Bharati, Calcutta, 1975.
২। শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু, সমগ্র রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৬২।
3. Rabindranath Tagore, 1922, 'The Robbery of the Soil', lecture at University of Calcutta (‘Poet and Plowman’ গ্রন্থে সংযোজিত).
৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভানুসিংহের পত্রাবলী, প্রথম সংস্করণ, বিশ্বভারতী গ্রন্থন-বিভাগ, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি