আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪০/ শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪০

শ্যামল জানা

দাদাইজম্ ও অ্যান্টি আর্ট

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, যাদের কারণে যুদ্ধ লেগেছিল, সেই বুর্জোয়া পুঁজিপতিরা যে আধুনিক সমাজের জন্ম দিয়েছিল, তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে শিল্পও থেকে গেছিল৷ ফলে সেই শিল্প অবশ্যই তাদেরই Reason, Logic ও Aesthetics অনুযায়ীই তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক৷ তাহলে, তাদের ভাবধারার সেই শিল্প দিয়ে কখনো তাদেরই বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিরোধী(Anti-War) আন্দোলন করা যায় না৷ তাই, দাদাইস্টরা শিল্পের হাতিয়ার-স্বরূপ ‘অ্যান্টি-আর্ট’-কে বেছে নিলেন৷ আর, অ্যান্টি-আর্ট-এর মূল উপাদান হচ্ছে— Nonsense (অর্থহীনতা) ও Irrationality (অযুক্তিকতা)৷ এদের প্রকাশ-মাধ্যম হচ্ছে অত্যন্ত উঁচু মানের তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-ঠাট্টা-উপহাস, যা সাধারণভাবে, সাধারণ মানুষের পক্ষে অন্তর্নিহিত অর্থে ধরতে পারা প্রায় অসম্ভব বলাটাই ঠিক৷ অথচ সময়ের প্রেক্ষিতে তা এত অভিনব হয়, যে, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝুক না বুঝুক মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দেয় তার দ্ব্যর্থক প্রেক্ষিতের জন্য৷ তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য না বুঝলেও উপরিতলের যে মজা তা যে কোনো সাধারণ মানুষকেই আকর্ষণ করে৷ সেজন্য তা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা দাদাইস্টদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল৷
    এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সুকুমার রায়৷ আমরা যদি তাঁর “আবোল-তাবোল”-এর ‘বোম্বাগড়ের রাজা’ ছড়াটি থেকে দুটি পংক্তি বেছে নিই— “পাউরুটিতে পেরেক ঠোকে কেন রানীর দাদা?” বা “কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি?” আপাতভাবে অর্থহীন(Nonsense)এই পংক্তিদুটি৷ কিন্তু সাধারণভাবে কেউ খেয়াল না করলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটি হচ্ছে— রাজা বা রানীর যারা নিকট আত্মীয়, তাদের পরিশ্রম করে রোজগার করতে হয় না৷ রাজকোষের অর্থ(যা সাধারণ মানুষের অর্থ) দিয়েই তাদের বিলাসবহুল জীবন-যাপন সমাধা হয়৷ ফলে, তাদের কোনো কাজ থাকে না! নেই কাজ তো খই ভাজ-এর মতো তাদের কেউ পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকে, বা কেউ কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে৷
ধরা যাক মার্শেল দুশাম্প-এর ‘ফাউন্টেন’ নামের শিল্পকর্মটি(ছবি-১)৷ 
  একটি পেডেস্টালের ওপর একটি প্রস্রাব করার বেসিনকে বসিয়ে দেওয়া আছে৷ যেন এটি একটি উৎকৃষ্ট ভাস্কর্য৷ এই গা ঘিনঘিনে আপাত অর্থহীনতার(Nonsense) অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে— সেই সময়ের বুর্জেয়া পুঁজিপতিরা ছিল অত্যন্ত খারাপ ও ঘৃণ্য মানুষ৷ সাধারণ মানুষদের অমানবিকভাবে শোষণ করে ব্যক্তিগত পুঁজি বাড়াত তারা৷ অথচ ক্ষমতার জোরে তারাই ছিল সমাজের সবচেয়ে উঁচু তলার গন্যমান্য ও অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ! এই একই ধারণা(Concept) এই ‘ফাউন্টেন’ শিল্পকর্মটির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে৷ যেন, একটা গা ঘিনঘিনে নোংরা প্রস্রাবের বেসিনকে দেখানো হল একটি উৎকৃষ্ট শিল্পকর্ম বা ভাস্কর্যরূপে৷
  ধরা যাক মার্শেল দুশাম্প-এর ‘বাইসাইকেল হুইল’ শিল্পকর্মটি(ছবি-১)৷ ফ্রক সমেত একটি সাইকেলের চাকাকে একটি কিচেন টুলের ওপর ভাস্কর্যের মতো রাখা আছে৷ আমরা জানি, একটি সাইকেলের নির্মাণের যুক্তিটি হল— একজন আরোহী নিকট-দূর এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় খুব দ্রুত যাওয়ার জন্য না হেঁটে সাইকেল ব্যবহার করে৷ আর সাইকেলের মূল যন্ত্র হচ্ছে তার দুটি চাকা, যে দুটি ঘোরে বলেই সাইকেলটি সামনে এগিয়ে যায় আরোহীকে নিয়ে৷ আর এটিই হচ্ছে তার ব্যবহারিক দিক৷ কিন্তু যখন সেই সাইকেল ভেঙে, তার ফ্রক সমেত একটি চাকাকে আলাদা করে ভাস্কর্য হিসেবে দেখানো হয়, তখন সাইকেল নির্মাণের যুক্তিটি আর থাকে না, দর্শনগতভাবে সম্পূর্ণ খণ্ডিত হয়ে যায় [Irrationality (অযুক্তিকতা)]৷ আমরা যদি এইভাবে ভাবি— একজন মানুষ যখন বেঁচে থাকে, তার বেঁচে থাকার একটি নির্দিষ্ট যুক্তি থাকে, এবং সেই অনুযায়ী তার একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারিক দিকও থাকে৷ কিন্তু আমি যদি তাকে তার প্রাপ্য না দিয়ে, তাকে বঞ্চিত করি, তাহলে তার বেঁচে থাকার যুক্তি পাল্টে যাবে৷ ওই সাইকেলের একটি চাকার ভাস্কর্যের মতন৷
এই যে দাদাইস্টরা Nonsense  ও Irrationality-কে উপাদান করে অ্যান্টি-আর্ট-কে শিল্পে প্রয়োগ করল; এবং আমরা এই যে লক্ষ করলাম, এই প্রয়োগের দর্শনগত দিকটি, এবং সহজে বুঝতেও পারলাম৷ তবে, আজ থেকে একশো বছরের অধিক দিন আগে সেদিনের অধিকাংশ মানুষেরা কিন্তু এত সহজে বিষয়টা গভীরে গিয়ে বোঝেনি, বিশেষ করে শিল্পী নয় এমন সাধারণ মানুষেরা৷ এবং এটাই স্বাভাবিক৷ অথচ ননসেন্স-এর উপরিতলের যে আকর্ষণ, তা কিন্তু ক্ষুণ্ণ হয়নি৷
   তবে, সেই সময় ও পরবর্তীকালেও, বেশ কিছু ক্ষেত্রে দাদাইস্টদের প্রতি বিরূপতাও লক্ষ করা গেছে৷ অনেকে মনে করতেন, এগুলি স্রেফ পাগলামো ছাড়া আর কিছু নয়, যা শিল্প হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না৷ বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু কাজকে৷ যেমন লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চির জগৎ বিখ্যাত মোনালিসা-র ছবির প্রিন্টে মার্শেল দুশাম্প পেন দিয়ে ছাগল দাড়ি ও পালোয়ানি গোঁফ এঁকে দিয়েছিলেন(ছবি-১)৷ এই কাজটিকে অধিকাংশই মেনে নিতে পারেনি, এক্তিয়ার অতিক্রম করে যাওয়া পাগলামো ছাড়া আর অন্য কিছু ভাবেনি৷
  আসলে, দাদাইস্টরা মনে করতেন— যে কোনো শিল্প-সৃষ্টির পিছনে একটি নিহিত সত্য থাকে৷ এবং ওই সত্যই ওই শিল্পের মূল উপাদান, যা প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন৷ ঘটনাচক্রে লিওনার্দো-দা-ভিঞ্চি ছিলেন সমকামী৷ তিনি নিজেকে মডেল করেই আয়না দেখে মোনালিসা ছবিটি আঁকেন৷ তাই, এই সত্যকে সরাসরি না বলে মার্শেল দুশাম্প দাড়ি-গোঁফ-এর সাহায্যে মোনালিসাকে পুরুষ করে দিয়ে বিনির্মাণ করেছিলেন৷
  এতৎসত্ত্বেও দাদাইজম্ সারা পৃথিবী জুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল, তার একটাই কারণ— সেই সময়ের যে শিল্প, সেই শিল্পের মান যে প্রচলিত অর্থে বুর্জোয়াজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, তাকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে এই অ্যান্টি-আর্ট-এর মাধ্যমে নিজেদের শিল্পকে তুলে ধরেছিলেন এই দাদাইস্টরা৷ কারণ, তাঁরা একমাত্র যুদ্ধ-বিরোধী রাজনীতিকে পাখির চোখ করে তাঁদের শিল্পে ঘনীভূত করেছিলেন, যা সম্পূর্ণভাবে সাধারণ মানুষের পক্ষে থাকতে তাঁদের সাহায্য করেছিল৷ সেই জন্যেই দাদা-আন্দোলনের সূত্রপাতের সময় থেকেই এঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সব ধরনের দৃশ্যশিল্প, সাহিত্য, কবিতা, শিল্প-ইস্তাহার, শিল্পতত্ত্ব, থিয়েটার, ও গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত এত রকমের মানুষেরা৷ এবং সারা পৃথিবী জুড়ে৷                       (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি