দূরদেশের লোকগল্প-ইউরোপ(রক্ত-বর্ণ কেশগাছি)/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- ইউরোপ 
চিন্ময় দাশ 

রক্ত-বর্ণ কেশগাছি 

বন-পাহাড়ের দেশ। সেখানে এক গ্রামের একেবারে একটেরে একটা ঝুপড়ি। বউ আর ছেলেপুলে নিয়ে তাতে বাস করে এক গরিব মানুষ।  ভারী অভাব লোকটার। দু'বেলা বউ-ছেলেদের দানা জোটাতে হিমশিম খেয়ে যায় বেচারা। বনের কাঠকুটো কেটে দিন চালাতে হয় তাকে।
একদিন একটা গাছের তলায় বসে ভাবছে-- এবার দেখছি মেরেই ফেলতে হবে বউ-বাচ্চাগুলোকে। দিন-রাত পেটের জ্বালা সইবার চেয়ে, মরে গেলেই  বরং বেঁচে যাবে তারা।
 একটা ঘুঘু পাখি বসে ছিল গাছের ডালে। পাখিটা বলে উঠল-- কাউকে মেরে ফেলবার কথা ভাবতে নাই বাছা। ওটা ভুল পথ।
ঠিক পথ আর পাচ্ছি কোথায় আমি? -- লোকটা জবাব দিল।
কাল সকালে এসো এইখানটিতে। পথ বলে দেব। সারা জীবনের মত অভাব দূর হয়ে যাবে তোমার। এই বলে, উড়ে চলে গেল পাখিটা।
পরদিন আবার বনে এসেছে কাঠুরিয়া। কাজ সেরে, কাঠের বোঝা আর কুঠার নামিয়ে গাছটার তলায় এসে বসল। ঘুঘু ঘুঘুপাখিকে বলল-- ঠিক পথ দেখাবে বলেছিলে। বলো, কী সেই পথ।
পাখি বলল-- যা বলছি, মন দিয়ে শোন। কথার খুঁটি-নাটিও মনে রাখতে হবে কিন্তু। তা নইলে সমূহ বিপদ।
-- কোন ভুল হবে না। মনে রাখব সবই। বলো তুমি।
পাখি বলে চলল-- কাল ভোরে যখন ঘুম থেকে উঠবে, মাথার নিচে হাত চালিয়ে দেখবে। একটা আয়না, একটা রুমাল আর একটা চাদর হাতে পাবে। কাউকে কিছুই বলবে না। কাপড়ের তলায় লুকিয়ে বেরিয়ে পড়বে বাড়ি থেকে।
  তোমার তো বাড়ি থেকে বেরুলেই পাহাড়। সেটা পার হয়ে, আরও দুটো পাহাড় পার হবে। এই তিনটা পাহাড় পার হলে, দেখবে একটা নদী। সেই নদীর পাড় ধরে চলতে থাকবে। কিছুদূর চলার পর, দেখবে একটি সুন্দরী মেয়ে স্নান করছে নদীতে। অপরূপ সুন্দরী মেয়ে। তবে, সেই মেয়ে, যার মাথা ভরা এক ঢাল সোনালী চুল। এই চুল দেখেই তুমি চিনবে মেয়েটিকে।
শুধু তুমি দেখবে না। সেই মেয়েও দেখবে তোমাকে। অনেক কথা বলবে তোমার সাথে। গল্প করবে মিষ্টি গলায়। চলে যেও না কিন্তু। দাঁড়িয়ে সব শুনবে মন দিয়ে। কিন্তু ভুলেও একটি কথা বোল না যেন। তাহলেই তোমাকে মাছ বানিয়ে নদীতেই রেখে দেবে সেই মেয়ে।
তারপর চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিতে বলবে তোমাকে। মুখে কথা বলবে না, কিন্তু চুল আঁচড়ে দিও। তার মাথা ভরা সোনালী চুলের ভিতর, একটা চুল আছে লাল রঙের। রক্তের মত টকটকে লাল। ভারী দামি সেই চুল। সেই চুলটা উপড়ে নিতে হবে তোমাকে। তাতেই কপাল ফিরে যাবে তোমার।
 এই বারে বলি শোন, চুলটা উপড়ে নিয়ে দৌড় লাগাবে তুমি। মেয়েটিও দৌড়বে তোমাকে ধরতে। প্রথম পাহাড়টা পার হয়ে, লুকিয়ে রাখা চাদরটা ফেলে দেবে রাস্তায়। তা দেখে মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়বে। সেই সুযোগে তুমি খানিকটা এগিয়ে যেতে পারবে। দ্বিতীয় পাহাড় পেরিয়ে রুমাল ফেলবে। আর সব শেষে তৃতীয় পাহাড় পেরিয়ে আয়নাটা ফেলে দিও। তাতেই নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে যাবে তুমি। আর পিছু নেবে না মেয়ে।
সেই চুল বেচে দিও হাটে গিয়ে। কপাল খুলে যাবে তোমার। কাঠ আর কুঠারের জীবন বইতে হবে না আর তোমাকে।
ঘুঘুপাখি যেমন বলেছিল, ঠিক তেমন তেমনটিই ঘটতে লাগল পর পর। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রাতে শুয়েছে কাঠুরে। ঘুম ভেঙে গেল ভোর না হতেই। মাথার তলায় হাত দিতেই পেয়ে গেল একটা নকশা করা চাদর, একটা রঙ্গীন রুমাল আর একটা ঝকঝকে আয়না। অমনি কাপড়ের ভিতর তিনটা জিনিষ লুকিয়ে, চুপিসারে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল কাঠুরে। বউ-ছেলেপুলে, কাউকেই বলল না কিছু। 
চলতে চলতে পর পর তিনটা পাহাড় পার হয়ে, সামনে পড়ল একটা পাহাড়ি নদী। কুল কুল করে বয়ে চলেছে। নদীটার গা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সেই মেয়েকে দেখতে পেল কাঠুরে। সত্যিই ভারী সুন্দরী। আলো যেন ঠিকরে পড়ছে তার শরীর থেকে। আর পিঠভরা একঢাল সোনালী চুল। কোমর ছাড়িয়ে নেমে গেছে কেশরাশি। যেন সোনালী জলের ঝর্ণা নামছে পাহাড় থেকে।

মেয়েটিও দেখেছে কাঠুরেকে। এক গাল হেসে, মেয়েটি কথা বলতে শুরু করল কাঠুরের সাথে। কোথায় থাকো, কোথায় বাড়ি, যাচ্ছো কোথায়-- এই সব। শুনছে সব, কিন্তু উত্তর দিচ্ছে না কাঠুরে। ঘুঘু পাখির মানা করা আছে যে। 
  উত্তর না পেয়ে, মেয়েটি বলল-- ঠিক আছে, না-ই বা বললে কথা। আমার চুলগুলো একটু ধুয়ে দাও তো। পারছি না একার হাতে।
কাঠুরে জলে নেমে চুল ধুতে আরম্ভ করল। আহা, কী বাহার সেই চুলের। যেমন তার সোনার মত রঙ, তেমনি বটের ঝুরির মত লম্বা।  আর যেমন ঘণ, তেমনি রেশমের মত মোলায়েম! দু'হাতেও গোছা করে ধরতে পারছে না কাঠুরে।
সরু সরু গুছি করে চুল ধুচ্ছে কাঠুরে। আসলে, সোনালী চুলের ভেতর লুকিয়ে আছে লাল রঙের একগাছি চুল। সেটারই  খোঁজ করছে সে। এক সময় পেয়েও গেল চুলটা। শুকনো খসখসে, আর কোঁকড়ানো একটি গাছি। তবে, সত্যিই রক্তের মত টকটকে লাল তার রঙ। দেখেই চোখে মুখে আলো জ্বলে উঠল  তার।
  খুব সন্তর্পণে চুলের গাছিটা আঙ্গুলে জড়িয়ে নিল কাঠুরে। তারপর একটানে উপড়ে নিয়েই, জল ছেড়ে দৌড়। মেয়েটাও উঠে পড়েছে জল ছেড়ে। সেও দৌড় লাগিয়েছে। ছুটতে ছুটতে প্রথম পাহাড়টা পেরিয়েছে যখন, মেয়েটি কাছাকাছি এসে পড়ল। অমনি পাখির কথা মত, চাদরখানা রাস্তায় ফেলে দিল কাঠুরে।
কী সুন্দর নক্সাকাটা চাদর! থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটি। 
  কাঠুরে দৌড়েই চলেছে। দ্বিতীয় পাহাড়ের কাছে মেয়েটি আবার কাছাকাছি। এবার রুমাল ফেলে দিয়ে, তাকে দাঁড় করাল। এইভাবে শেষ পাহাড়ের কাছে পৌঁছালো কাঠুরে। নিজের ঝুপড়িও আর দূরে নয়। এদিকে মেয়েটিও এসে গিয়েছে প্রায়। এবার রাস্তার উপর আয়নাখানা রেখে দিল চিৎ করে। 
সেখানে পৌঁছে, মেয়েটির আর পা নড়ে না যেন। আয়নায় ছবি পড়েছে তার। এই প্রথম নিজেকে মুখোমুখি দেখতে পেয়ে, আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল সেই মেয়ে। এত রূপ তার শরীরে, নিজেই যেন জানত না এতদিন। কাঠুরের কথা মনেই রইল না তার।
পাখিটার সব কথাই ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে। কাঠুরের মন বলল, হোক না সামান্য একগাছি চুল। নিশ্চয়ই এটা দামি।
হাতুড়ি-বাটালি নিয়ে রাত জেগে সুন্দর ছোট্ট একটা বাক্স বানাল লোকটি। ওক কাঠের বাক্স। দেখতেও ভারী সুন্দরটি হয়েছে। 
পরদিন। চুলের গাছিটি বাক্সে ভরে, হাটে গিয়ে হাজির হল কাঠুরে। রাজার হাট বলে কথা। কত দূর দূর দেশের বণিকেরা আসে এই হাটে। হাজার জিনিসের পসরা নিয়ে বসেছে দোকানিরা। তার মধ্যে একগাছি চুল! যে দেখে সে-ই হেসে যেন বাঁচে না। কেউ কেউ বলেও ফেলল-- বিকোবে তোমার এই সামান্য জিনিষ?
কাঠুরের এক কথা-- সমঝদার খদ্দের কি হাটে নেই ভেবেছ?  
  সেদিন সারা হাটময় একটাই আলোচনা-- লাল রঙের চুল। দেখতে দেখতে সমঝদার খদ্দেরও জুটতে লাগল। দূর দেশের বণিক তারা। সবাই কিনতে চায় সেই চুলের গাছি। কিন্তু কে নেবে? 
কাঠুরে বলল-- যে দর বেশি দেবে, নেবে সে। 
শুরু হল নিলাম। এক বণিক বলল-- এক হাজার। তখন এগিয়ে এল আর একজন-- আমি দু'হাজার দেব। 
 গুঞ্জন চলছে ভিড়ের ভিতর। একগাছি চুলের দাম দু'হাজার টাকা?  তার ভিতরেই একজন বলল-- চার হাজার দাম দিলাম আমি। 
বেশ শোরগোল পড়ে গেল তাতে। সারা হাট ভেঙে পড়েছে কাঠুরের সামনে। সবাই কৌতূহলী। সবাই অবাক।
এবার প্রথম জন বলল-- আমার দাম রইল পাঁচ হাজার।
 এদিকে হয়েছে এক ঘটনা। রাজার পেয়াদা গিয়ে ব্যাপারটা তুলে দিয়েছে রাজার কানে। রাজা চমকে গেল চুলটার কথা শুনে। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে রাজা শুনে এসেছে চুলটার কথা। চুলটা চিরে ফেললে দেখা যাবে, একটা দীর্ঘ ইতিহাস লেখা আছে ভেতরে। প্রকৃতির হাজারো বিবরণ দিয়ে ঠাসা সেই ইতিহাস।
রাজা সোজা এসে হাজির হয়ে গেল হাটে। সব দেখেশুনে রাজা নিজে কিনে নিল চুলের গাছিটা। 
আহ্লাদে আটখানা হয়ে, রাজবাড়িতে ফিরে গেল রাজা। গুণে গুণে দশ হাজার টাকা হাতে নিয়ে, ঘরে ফিরে গেল কাঠুরেও। সেও আহ্লাদে আটখানা। সেদিন থেকে সত্যিই আর কুঠার ঘাড়ে করতে হয়নি মানুষটাকে। জমি-জিরেত, গরু-মোষ নিয়ে তার সংসার এখন দিব্বি চলে যায়।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি