মেদিনীপুরের বিজ্ঞানী নারায়ণ চন্দ্র রানা : শূন্য থেকে 'শূন্যে' উড়ানের রূপকথা― (চতুর্থ পর্ব)/পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

বিজ্ঞানের অন্তরালে বিজ্ঞানী ।। পর্ব ― ২৩

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানী নারায়ণ চন্দ্র রানা : শূন্য থেকে 'শূন্যে' উড়ানের রূপকথা― (চতুর্থ পর্ব)

পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা


রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। সেখানকার একতলা এবং তিনতলায় মূলত গবেষণার কাজ চলে। একটি কক্ষ বাদে পুরো একতলায় প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ল্যাবরেটরি, এক্স-রে চেম্বার, আরও কত কী ডিপার্টমেন্ট! একতলা আর দোতলার বড় বড় দুটি ঘরে স্নাতকোত্তরের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস হয়। মোট স্টুডেন্ট সংখ্যা একশত কুড়ি। এ হেন বিজ্ঞান কলেজে স্নাতকোত্তরের সমস্ত বিষয়ের ক্লাস হয় না। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকের অপ্রতুলতা এর বড় কারণ। যেসব বিষয়ের ক্লাস বিজ্ঞান কলেজে হয় না, সে-সমস্ত ক্লাসের বন্দোবস্ত হয়েছিল প্রেসিডেন্সি কলেজে। সায়েন্স কলেজ থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ শহরের গলির ভেতর দিয়ে শর্টকাটে পনেরো-কুড়ি মিনিটের হাঁটা পথ। সপ্তাহে একদিন বিজ্ঞান কলেজের পরিবর্তে প্রেসিডেন্সিতে ক্লাস করতে আসতে হত বিদ্যার্থীদের। আবার কোনও কোনও দিন প্রথম দুটি ক্লাস হত বিজ্ঞান কলেজে। মাঝে ঘণ্টা খানেক বিরতি। তৃতীয় পিরিয়ডের ক্লাস হবে প্রেসিডেন্সি কলেজে। পড়িমরি করে ছুটত সেখানে। তৃতীয় পিরিয়ডের ক্লাস অ্যাটেন্ডে করতে। প্রেসিডেন্সিতে তখন নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ক্লাস নেবেন অধ্যাপক সমরেন্দ্রনাথ ঘোষাল, সলিড স্টেট ফিজিক্স নেবেন অধ্যাপক সমর সেনগুপ্ত। আর ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক ড. অমল কুমার রায়চৌধুরী।

  তো, কোনও এক সোমবার অধ্যাপক ড. অমল কুমার রায়চৌধুরী'র ক্লাস আছে প্রেসিডেন্সি কলেজে। অধ্যাপকের ক্লাস কলেজ ক্যাম্পাসের দোতলায় একটি ঘরে। রায়চৌধুরী স্যার তখন এম. এস. সি'র ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স পড়াতেন। গ্র্যাজুয়েশন লেভেলে তিনি অবশ্য প্রথম বর্ষে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স আর তৃতীয় বর্ষে ফিল্ড থিওরি পড়াতেন। ফিল্ড থিওরি হচ্ছে পদার্থবিদ্যার আপাত দুরূহ একখানা সাবজেক্ট। অথচ রায়চৌধুরী স্যারের পড়ানোর কৌশল এত মোলায়েম, এত প্রাণবন্ত যে সহজে বোধগম্য হয়ে যেত বিদ্যার্থীদের।

  সেদিন প্রথিতযশা অধ্যাপকের ক্লাস শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। দৌড়চ্ছে স্নাতকোত্তরের এক বিদ্যার্থী। নাম শ্রী চিন্ময় ঘোষ। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক কলেজের ছাত্র সে। এখন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে মাস্টার ডিগ্রির একজন স্টুডেন্ট। টপাটপ সিঁড়ি ভেঙে উপরে দোতলায় ক্লাসে চলেছে। অন্য কোনও দিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই। তার মতো অনেক স্টুডেন্ট আছে যারা অধ্যাপকের ক্লাস কামাই করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এত ব্যস্ততা সেজন্যই। সিঁড়ির ধাপগুলো ভেঙে দৌড়ে উপরে উঠতে উঠতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। দেখল, খুব সন্তর্পণে এক ধাপ এক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে নারায়ণ। ঠিক যেন খরগোশের মতো। বালাই ষাট, ব্যস্ততার নামগন্ধ নেই! কোনও তাড়াহুড়ো নেই। তাকে দেখে খুব রাগ হল চিন্ময়ের। নারায়ণ তার ক্লাসমেট। আলতো রাগত স্বরে সে বলল―
'কী! এত আস্তে আস্তে উঠছ কেন? প্রফেসর চৌধুরী এসে গেলেন বলে।'
  কোনও উত্তর না দিয়ে ইশারায় চিন্ময়কে এগিয়ে যেতে বলে 'ও আসছে'।
  কথাটুকু শেষ হয়েছে কি হয়নি, চিন্ময় দে ছুট, দোতলায়। ধৈর্য্য সহকারে সব কথা শুনবার অবকাশ এখন নেই। শুরু থেকে প্রফেসর চৌধুরীর লেকচার হাতছাড়া হয়ে যাবে তাহলে। আর চৌধুরী স্যারের ক্লাসে বিলম্ব তার না-পসন্দ। তাই এত ব্যস্ততা! এত কৈফিয়ত! 
  নারায়ণ আবার যে কে সেই! তাড়াহুড়ো নেই। টুকটুক সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছে। শ্লথ গতি। সবার শেষে ক্লাসে পৌঁছানো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। 
এ যেন সেই ইঁদুর আর খরগোশের গল্প। টানটান উত্তেজনার রোমহর্ষক কাহিনী। একসঙ্গে দৌড় শুরু করল দুটি প্রাণী। ক্ষিপ্রতার প্রশ্নে আলুথালু খরগোশকে বলে বলে দশ গোল দেবে চতুর ইঁদুর। সেজন্য দৌড় প্রতিযোগিতায় সকলের বাজি ইঁদুর। অথচ, শেষ বেলায় অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী সকলে। প্রতিযোগিতায় বাজিমাত করে খরগোশ। শেষ পর্যন্ত জিত হয় তার। এক্ষেত্রে সে রকম ঘটনা ঘটবে না তো? অবশ্য ভবিষ্যৎ-ই বলবে শেষ কথা।
ক্লাসের শেষে নারায়ণকে পাকড়াও করে চিন্ময়। জিজ্ঞেস করল― 'কী ব্যাপার! তখন এত স্লো হাঁটছিলে কেন?'
  'আমার হার্টের অসুখ আছে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বারণ। দ্রুত ওঠানামা করতে পারি না। জোরে হাঁটলে হাঁপিয়ে উঠি'― জবাব দেয় নারায়ণ।
শুনে খুব মর্মাহত বন্ধু চিন্ময়। তখন মিছিমিছি রাগ করেছিল সে। মনে মনে তার কান্না পেল নারায়ণের জন্য। অজান্তে বন্ধুর উপর রুষ্ট হওয়ার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত সে। দুঃখ ভাগ করে নেওয়া আর শান্তনা দেওয়া ব্যতীত আর কী করতে পারে সে? বাকি সকলে কেবল পাঠ্যপুস্তকের বিষয় জটিলতার প্রতিবন্ধকতায় ঠোক্কর খাচ্ছে নিয়মিত। তাতেই হিমশিম অবস্থা। আর নারায়ণ সেখানে নিজের জীবনের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে একা একা। শুধু পড়াশুনা সেখানে বিবেচ্য নয়। হার্টের প্রতিকূলতার সঙ্গে তার অসম লড়াই রীতিমত অনুসরণীয়। অনুকরণীয় তার অদম্য জেদ, অনন্য নিষ্ঠা আর অসীম অধ্যবসায়। এম এস সি চলাকালে তার হৃদযন্ত্রের বিকলতা ক্রমশ বাড়ে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শারীরিক অসুস্থতা। এ সময় বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজগণের চেষ্টায় চিকিৎসা শুরু হয় তার। বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আর এন চ্যাটার্জি চেকআপ করলেন নারায়ণকে। চেকআপ করে খুব বেশি আশার কথা তিনি শোনালেন না। যা শোনালে হয়তো রাতের তারারা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শূন্যতা খানিক আশ্বস্ত হত এই ভেবে, অদূরে তাদের রহস্য উন্মোচনে আবির্ভাব ঘটতে চলেছে এক মহাজ্ঞানী তপস্বীর যার খেলার সঙ্গীসাথী রাতের অনন্ত আকাশ আর রাত-আকাশে জ্বলে থাকা লক্ষ নিযুত কোটি তারকার কেরামতি।
     
  ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাস। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এম. এস. সি.-তে ভর্তি হল নারায়ণ। চিন্ময় ঘোষের সঙ্গে আলাপ-বন্ধুত্ব সেখানেই। একঝাঁক তারকা সহপাঠী তার― শ্যামল সরকার, অচিন্ত্য পাল, চিন্ময় ঘোষ প্রমুখ। এদের মধ্যে শ্যামল স‍রকারের ঠিকানা বেলঘরিয়া রামকৃষ্ণ মিশন হোস্টেল। নারায়ণ ও সে একসঙ্গে বিজ্ঞান কলেজে যাতায়াত করে। শ্যামল খুব অধ্যয়নাসক্ত। সারাক্ষণ পড়া আর পড়া। দিনে ষোল থেকে আঠারো ঘণ্টা পড়ে সে। পড়া ব্যতীত দ্বিতীয় বৃহৎ কাজ বোধহয় নিদ্রা। নারায়ণ এত দীর্ঘ সময় পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না। তার হার্ট অতীব দুর্বল। পড়াশোনার মাত্রারিক্ত চাপ তার ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই মাঝেমধ্যে খুব চিন্তা হয় তার। স্নাতকোত্তর পাশ করতে পারবে তো? মনে সংশয় জাগে, এম এস সি'তে ফেল না করে বসে সে! অথচ ১৯৭৬-এ স্নাতকোত্তরের রেজাল্ট ঘোষণা হতে দেখা যায়; এম এস সি'তে প্রথম হয়েছে শ্যামল, দ্বিতীয় নারায়ণ, তৃতীয় অচিন্ত্য আর চতুর্থ চিন্ময় ঘোষ।

  আসলে জীবনের কতগুলো ক্ষেত্রে নারায়ণের 'ব্রডবেস এপ্রোচ' ছিল। যা বাদবাকি বিদ্যার্থীদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। যে বিষয়গুলো পড়তে গিয়ে যেখানে বারে বারে হোঁচট খায় আম ছাত্র, অবোধ্য ঠেকে আপাত সামঞ্জস্যহীন সমীকরণগুলো; সে-সবের  ওপর অসম্ভব দখল নারায়ণের। প্রখর জ্ঞান। আলোচনায় স্পষ্ট ধরা পড়ত তফাৎ। কোয়ান্টাম মেকানিক্স, সলিড স্টেট ফিজিক্স, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি, এমনকি কণা বলবিজ্ঞানে তার জ্ঞানের পরিসর রীতিমত ঈর্ষণীয়। বন্ধুবান্ধবদের আলোচ্য বিষয়। প্রাথমিক পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ মাত্রায় বিষয় গভীরতা তার ট্রেডমার্ক বৈশিষ্ট্য। সেজন্য বন্ধু মহলে আলাদা সমীহ আদায় করে নিয়েছিল সে।

  এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ্য। স্নাতকোত্তরে পড়া চলাকালীন বিজ্ঞান কলেজে একটি দেওয়াল পত্রিকা 'দিশারী' প্রকাশ পায়। পত্রিকা সম্পাদনা করে বন্ধু চিন্ময়। সেই পত্রিকায় নারায়ণের একখানা প্রবন্ধ ছাপা হয়। সেটি পড়ে বন্ধু চিন্ময়ের বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা রইল না। নিজের অহংকার এর আগে এভাবে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেনি সে। চুরমার হয়ে গেছিল তার সমস্ত আত্মগরিমা। হৃদয়ের দৈন্যতা প্রকট আকার ধারণ করে। তার স্পষ্ট স্বীকারোক্তি― 'প্রথম মাস ছয়েক বেশ ভালো ছাত্র বলেই জানি। কিন্তু ও যে এত জেনে ফেলেছে তা আমায় দারুণ চমকে দিয়েছিল, যখন আমারই সম্পাদনায় বিজ্ঞান কলেজে 'দিশারী' নামের দেওয়াল পত্রিকায় নারানের প্রথম লেখা বেরোয়। আমার নিজের প্রতি বেশ কেমন সন্দেহ হল, 'আমি ভাল ছাত্র ত বটে, কিন্তু নারান যে আমার থেকে আরও কত বেশি জানে।' ক্লাসে স্যারেরা তাকে কোনো অঙ্ক বা থিওরি বোঝাতে বললে ও জিনিসটাকে একেবারে 'ফান্ডামেন্টাল আইডিয়া' থেকে শুরু করে যেখানে গিয়ে কালমিনেট করত তাতে মনে হত, 'এই সোজা জিনিসটাই আমার মাথায় এল না!' এসব দেখে আমার 'ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স' জেগে উঠত। আজ দেখছি, নারানের মানব জাতির প্রতি অবদান সর্বজন বিদিত আর আমার প্রায় শূন্য।'

  প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসেও নারায়ণের জুড়ি মেলা ভার। অধ্যাপক নিত্যরঞ্জন পান প্র্যাকটিক্যাল করাতেন। প্রতিটি প্র্যাকটিক্যাল খুব যত্ন সহকারে আগ্রহভরে কমপ্লিট করে নারায়ণ। এমনভাবে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করত যে, মনে হবে, পৃথিবীতে সে প্রথম প্র্যাকটিক্যাল করছে। কিছু কিছু প্র্যাকটিক্যাল সেটআপ পদ্ধতিগতভাবে বেশ জটিল ও কঠিন। প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে বসেই সে-সব প্র্যাকটিক্যালের সহজ মডিফিকেশন কিংবা সংশোধন করেছে সে। তার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যবহারিক ফিজিক্সে, অত্যন্ত প্রখর। হাতেকলমের যাচাই বিদ্যায় হাতেখড়ি সেই স্কুল জীবন থেকে। গুরু মাধ্যমিকের মাস্টার মশাই মণীন্দ্র নারায়ণ লাহিড়ী। এ বিষয়ে, সন্দেহের অবকাশ নেই, ইতিমধ্যে পাকাপোক্ত সে। সেজন্য ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যায় তার এপ্রোচ যথেষ্ট স্পষ্ট এবং সঠিক। 
      
  স্নাতকোত্তরের পদার্থবিদ্যা বিভাগে সব মিলিয়ে মোট ৮০০ মার্কসের পরীক্ষা। ৫০০ নম্বরের থিওরি আর ৩০০ নম্বরের প্র্যাকটিক্যাল। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাস। এম এস সি ফিজিক্সের রেজাল্ট ঘোষণা হল। কলকাতা ইউনিভার্সিটি'র স্নাতকোত্তর ফিজিক্স বিভাগে দ্বিতীয় নারায়ণ। থিওরির প্রাপ্ত নম্বর ৩৫৩ আর প্র্যাকটিক্যালে ২১৩। সব মিলিয়ে মোট ৫৬৬ মার্কস; ৮০০-এর মধ্যে। শতকরা হিসাবে ৭০.৭৫%।

(দুই)
স্বাধীন ভারতের এক নামকরা প্রতিষ্ঠান 'টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ'। সংক্ষেপে, টি এফ আই আর (TIFR)। বোম্বাই (অধুনা মুম্বাই)-এ আরব সাগরের তীরে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এ হেন প্রতিষ্ঠান মূলত রিসার্চের জন্য বিখ্যাত। TIFR-ফেরৎ সফল বিদ্যার্থীদের এক একজন জিনিয়াস গণ্য করা হয়। তাদের বিষয় গভীরতা অতুলনীয়। যা একজন সাধারণ স্টুডেন্ট কল্পনা করতে পারবে না।

  ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসের একত্রিশ তারিখ। TIFR-এ পি এইচ ডি পরীক্ষার দিন ধার্য হয়েছে সেবার। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫৬ জন। যার মধ্যে নারায়ণও আছে। জগৎ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ড. জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার TIFR পরীক্ষা নিয়ামক। তিনি-ই নেবেন পরীক্ষা। অত্যন্ত কঠিন একখানা টেস্ট। আর এর প্রশ্নপত্রের কথা যত কম বলা হয়, তত মঙ্গল। ভারতে যতগুলি পি এইচ ডি এন্ট্রান্স টেস্ট নেওয়া হয়, তাদের মধ্যে কঠিনতম টেস্ট সম্ভবত এই TIFR রিসার্চ এন্ট্রান্স টেস্ট। তো, সেবছর এন্ট্রান্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হতে দেখা গেল, সারা ভারতে মাত্র সতেরো জন পরীক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে। আর সফলদের মধ্যমণি অবশ্যই নারায়ণ, নাকফুড়ি দেবীর আদরের 'বাবু'। TIFR-এ প্রথম স্থান অধিকার করেছে সে। 

  প্রথম নির্বাচিত হয়ে এক অভাবনীয় সুযোগ এসে গেল নারায়ণের কাছে। কসমোলজিস্ট ড. নারলিকার-এর অধীনে রিসার্চ করার দুর্লভ সুযোগ। সেই সঙ্গে মাসিক বৃত্তি ৬৫০ টাকা। রিসার্চের বিষয় 'কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন' (Cosmic Microwave Radiation)। 
        
কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন কী?

  এই অপূর্ব সুন্দর ব্রম্ভাণ্ডের শুভ জন্মক্ষণটি কবে ? পণ্ডিতদের ধারণা, ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি মহাবিস্ফোরণ থেকে এই মহাজাগতিক বিশ্বের জন্ম। কেন ? কোন তথ্য বা তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে তারা এমন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন ? কোনো টাইম মেশিনে চড়ে আলোকের বেগে  অতীত ভ্রমণ করলেও তো কোটি কোটি বছর লেগে যাবে সে-ক্ষণে পৌঁছতে ? তাহলে কীভাবে সম্ভব নির্ভুল গণনা ?

  এমন কোন জিনিস আছে যা বিগ-ব্যাঙ সময় থেকে আজ পর্যন্ত শূন্যস্থানের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে ? তারই সন্ধানে পণ্ডিতরা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দীর্ঘ সময়। অবশেষে সাফল্য আসে ১৯৬৪ সালের ২০শে মে তারিখে। সেদিন বিজ্ঞানীদ্বয় পেনজিয়াস এবং উইলসন ঘোষণা করেন, মহাকাশের ফসিলস-এর খোঁজ তাঁরা পেয়ে গেছেন। এই ফসিল অন্য কিছু নয়, বরং কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন। এ হেন ফসিলস-এর পতনহার গণনা করে সহজে অনুমান করা যায় ব্রম্ভাণ্ডের বয়স কত। কিন্তু মহাকাশের ফসিলস ? সে আবার কী জিনিস ?

  আসলে বিগব্যাঙ বিস্ফোরণকালে ক্ষুদ্র কিন্তু নব্য ব্রহ্মাণ্ডে খুব উচ্চ শক্তির তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণে পরিপূর্ণ ছিল। তখন না ছিল পদার্থ অথবা না কোনও ভর। দশদিকে কেবল আলো আর আলো। সেই আলো থেকে সবার প্রথম জন্ম নেয় ওজনহীন পদার্থ। তারপর সমতার নীতি ভেঙে পদার্থে ভরের আগমন ঘটে। শূন্যস্থানে এখনও সে-খেলা প্রতিনিয়ত চলে। অত্যাধিক উত্তাপে বিকিরণ থেকে জন্ম নিচ্ছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণিকা ও কণা থেকে বিকিরণ। অবশ্য এ হেন বিনিময়ের একটি সূচনা শক্তি (Threshold Energy) আছে। যে কোন শক্তিতে বিকিরণ থেকে যেমন কণা ও বিপরীত কণা জন্ম নেয় না, আবার উপযুক্ত বাহ্যিক কারণ ছাড়া পারটিক্যাল-অ্যান্টিপারটিক্যাল জোড়া লেগেও জন্ম নেবে না আলোক তরঙ্গ। আবার প্রত্যেক কণার সূচনা শক্তিও আলাদা আলাদা রকমের, সামঞ্জস্য নেই একজনের সঙ্গে অন্যের। যে পরিমাণ ন্যুনতম শক্তিতে বিকিরণ থেকে প্রোটন জন্ম নেয়, সেই একই ক্ষমতায় ইলেকট্রন জন্মায় না। বরং তার থেকে অনেক কম শক্তি পেলে ইলেকট্রন তৈরি করা যায়। আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য তা নয়।

  এ হেন ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিলগ্নে দু'রকম জিনিসের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায় ― প্রথমতঃ বিকিরণ এবং দ্বিতীয় বিস্ফোরণের পর অসমতা থেকে আবির্ভূত ভরযুক্ত কণিকা ইলেকট্রন, প্রোটন, কোয়ার্ক ইত্যাদি। পদার্থের এই প্রাথমিক স্থিতিশীল কণাসমূহের মধ্যে একমাত্র প্রোটন কণার ক্ষয় আছে। কিন্তু সেই প্রোটন কণার বিনাশ দেখার সৌভাগ্য বোধ হয় মহাবিশ্বে কারও পক্ষে সম্ভব না। কারণ তার দীর্ঘ জীবনকাল। একটি প্রোটনের আয়ু ১০^৩১ বছর বা তার বেশি। আর এখন ব্রম্ভাণ্ডের বয়স মাত্র ১৩.৮ × ১০^১০ বছর। সেক্ষেত্রে বিগব্যাঙের অব্যহতি পরে যে প্রোটনের আবির্ভাব, তার লয় দেখতে হলে আমাদের ১০^৩১ বছর বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। অথচ পণ্ডিতদের অনুমান তার অনেক আগেই শুধু পৃথিবী কেন, এই ব্রম্ভাণ্ড থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাবে প্রাণের স্পন্দন। তখন না থাকবে জীবন, না থাকবে গ্রহ-তারা-নক্ষত্রের আলাদা অস্তিত্ব। পড়ে থাকবে নিকষ কালো কিছু বস্তু।

  তাছাড়া প্রোটন ক্ষয়ের নিখুঁত হিসাব কষে একদম বিগ-ব্যাঙ বিস্ফোরণকালে পৌঁছনো সম্ভব কি ? সম্ভবত না। বড়জোর বিস্ফোরণের অব্যহতি পরে প্রোটনের উৎপত্তি কালে পৌঁছনো যেতে পারে, এর বেশি নয়। 

  সুতরাং ব্রম্ভাণ্ডের বয়স নির্ণয়ের একমাত্র সঠিক ও শেষ উপায় হল বিগব্যাঙ সময়কালে উৎপন্ন তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের সন্ধান করা। তার ছেড়ে যাওয়া পথের চিহ্ন ধরে হয়তো বা তার সন্নিকটে পৌঁছনো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এত উচ্চ শক্তির বিকিরণের সাক্ষাৎ শূন্যস্থানের খোলা জায়গায় এখন পাওয়া অসম্ভব। একমাত্র কোন নক্ষত্র বা তারকার পেটের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে সে। সেখানেও সমস্যা আছে। তারকার অভ্যন্তরে যে বিকিরণ, তার ভাঙাগড়া নির্ভর করে একটি ঘটনার ওপর। তা হল নিউক্লিয় সংযোজন। এ হেন সংযোজন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত শক্তির মধ্যে খুবই ক্ষুদ্র থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের শক্তি মিশে থাকে। তা থেকে বিশ্বের শুরুর সময়ের বৃহৎ শক্তি আলাদা করে শনাক্ত করা মুশকিল। জটিলও বটে। তাই তেমন শক্তি তারার গর্ভে খোঁজ করে লাভ নেই। খোঁজ পেলেও তাকে সনাক্ত করা চাট্টিখানি কথা নয়। তাছাড়া বিগব্যাঙের উচ্চ কম্পাঙ্কের শক্তি বিশ্বের প্রসারণের ফলে এতদিনে নীচু কম্পাঙ্কের শক্তিতে নিশ্চয়ই পরিনত হয়েছে। কারণ প্রসারিত হতে হতে ব্রম্ভাণ্ড এমন একটি আয়তনে পৌঁছে গেছে এখন, আদিম বিকিরণের লাল সরণের অর্থাৎ শক্তি তরঙ্গের কম্পাঙ্ক কমে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অধিক মাত্রায় বেড়েছে। এমন বিশালাকার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক এখন মাইক্রোওয়েভের পাল্লায় পাওয়া সম্ভব।  

  তাই খোলা আকাশে শূন্যস্থানে যেখানে এখনও পৌঁছয়নি তারার আলো, সেখানে শিকারি বাঘের মতো খুঁজতে হবে তাকে। সেক্ষেত্রে প্রসারণশীল বিশ্বের প্রসারণশীলতার জন্য বিগ-ব্যাঙ সময়কার উচ্চ বিকিরণের উত্তাপ এখন কমে মাইক্রোত‍রঙ্গে নেমে গেলেও এ হেন উষ্ণতার সঠিক মান কত ?

  সোভিয়েত-আমেরিকান ফিজিসিস্ট জর্জ গ্যামো (১৯০৪ ― ১৯৬৮) চটজলদি একটি কাগজে হিসেব করে বললেন বিগব্যাঙের অবশেষ এখন বিশ্বের তাপমাত্রা হবে প্রায় ৫০° কেলভিন। সেটা ১৯৪৮ সাল। কিন্তু তাঁর সহযোগী মহাকাশবিজ্ঞানী রালফ আলফার (১৯২১ ― ২০০৭) ও গনিতজ্ঞ রবার্ট হারম্যান (১৯৩১ ― ২০২০) গ্যামোর হিসেবে দু-একটি সংশোধন করে দেখালেন, বিশ্বের পটভূমি বিকিরণের উষ্ণতা হবে প্রায় ৫° কেলভিন। কতটা বিশ্বাসযোগ্য এমন গণনা ?

  এবার উন্নততর অ্যান্টেনার সাহায্যে পটভূমি বিকিরণের নির্ভুল উষ্ণতার পাঠ দিলেন বেল ল্যাবরেটরির দুই বিজ্ঞানী অর্নো অ্যালান পেনজিয়াস (জন্ম : ২৬ এপ্রিল, ১৯৩৩) ও রবার্ট উইলসন (জন্ম : ১০ জানুয়ারি, ১৯৩৬)।

  ১৯৬৪ সাল। দশ হাজার ভাগের এক ভাগ সূক্ষ্মতায় অঙ্ক কষে তারা বলে দিলেন, মহাবিশ্ব আসলে ডুবে আছে প্রায় ০.১ সেন্টিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘের মাইক্রোত‍রঙ্গে। আর এ হেন মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের উষ্ণতা মাত্র ২.৭২৫° কেলভিন বা –২৭০.৪১৫ ℃। এই উষ্ণতা সারা বিশ্বে নয়েজের মতো সবদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এটাই সম্ভবত মহাবিশ্বের কসমিক মাইক্রোত‍রঙ্গ পটভূমি বিকিরণের সমতুল্য উষ্ণতা। আর একেই মহাকালের ফসিলস নামে চিহ্নিত করেছেন পণ্ডিতগণ। এই আবিষ্কারের জন্যে ১৯৭৮ সালের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন বিজ্ঞানীদ্বয়। কিন্তু মহাবিস্ফোরণকালের ফসিলের উষ্ণতার পাঠ সঠিক মাত্রায় পরিমাপ কতখানি সম্ভব ? 
       
  পরে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মহাকাশে পাঠান হল কৃত্রিম উপগ্রহ COBE (Cosmic Background Explorer)। এতে আরও সুক্ষ্ম পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত Differential Microwave Radiometer যন্ত্রের রিডিং থেকে CMB (Cosmic Microwave Background ― কসমিক মাইক্রোত‍রঙ্গ পটভূমি) বিকিরণের উষ্ণতার পাঠ লক্ষভাগের একভাগ সূক্ষ্মতায় যাচাই করে নিশ্চিত হলেন পণ্ডিতগণ ― শূন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়া ২.৭৩৫ °K উষ্ণতার মাইক্রোত‍রঙ্গ সেই আদিম বিশ্বসৃষ্টির ফসিল, এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এ হেন কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন নিয়ে শুরু হল নারায়ণের গবেষণা। অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনা তার বরাবরের অভ্যেস। সেজন্যই মহাশূন্যের জঠরে নিক্ষিপ্ত তার তীক্ষ্ম দৃষ্টি।

(তিন)
১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাস। নারায়ণের জীবনে নেমে এল এক বড়সড় দুর্ঘটনা। দুঃস্বপ্নের কালো দিন। এতদিনের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে তার দুর্বল হার্টে বড়সড় অ্যাটাক হল। কিছুক্ষণ আগেও দিব্যি সুস্থ সে। বাসা থেকে বেরিয়ে TIFR-এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। প্রিয় নারলিকার স্যারের ল্যাবরেটরি। TIFR-এর মূল বিল্ডিং-এর তে-তলায়। সিঁড়ি ভাঙার ঝক্কি নেই। লিফট ধরে ধাঁ করে পৌঁছে যাওয়া যায় নিজের ইপ্সিত ফ্লোরে। কোনও কষ্ট নেই। ঝুঁকি কম। হাঁপিয়ে ওঠার ভয় নেই। অল্প পরিশ্রমে সোজা ক্লাস রুমের নরম কেদারায়। লিফটে চড়ে উপরে ওঠার সময় আরোহী শুধু সামান্য ভারী মনে করবে নিজেকে। ব্যাস, এ ব্যতীত দ্বিতীয় ঝঞ্ঝাট নেই। অথচ সেদিন নেমে এল বড়সড় অঘটন। অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা। জ্ঞান হারিয়ে লিফটের মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল নারায়ণ। সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন সে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের এমার্জেন্সি বিভাগে ভর্তি করা হল তাকে। হার্টের এক্স-রে করা হল। মেডিক্যাল বুলেটিন তৈরি হল। সে রিপোর্ট মোতাবেক নিশ্চিত জানা গেল― এ যাবৎ কালের সবচেয়ে বড় হার্ট অ্যাটাক ঘটে গেছে তার। হৃৎপিণ্ডের অধিকাংশ ভালভ বিকল। অলিন্দ-নিলয় প্রকোষ্ঠ কাজ করছে না ঠিক মতো। অতি সত্তর পেস-মেকার বসানো আবশ্যক। বিস্তর খরচ সাপেক্ষ অপারেশন। খবর পেয়ে ছুটে এল অসময়ের বন্ধুবান্ধব― বোম্বের 'ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার'-এ গবেষণারত অচিন্ত্য পাল, নবকুমার মণ্ডল, সুবীর ঘোষ প্রমুখ। হাসপাতালে সব সময় নারায়ণকে ঘিরে থাকে তারা। 

  ওদিকে, দীর্ঘ চল্লিশ ঘণ্টা বাহ্যিক জ্ঞানশূন্য নারায়ণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এমার্জেন্সি'র বেডে শুয়ে সংজ্ঞাহীন। জরুরী ভিত্তিতে কৃত্রিম পেস-মেকার বসাতে হবে। বেশি দেরী হলে আরও বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে যেকোন সময়। অপারেশনের খরচ আকাশ সমান। প্রায় এক লক্ষ টাকা। এত টাকার সংস্থান আসবে কোত্থেকে? কে দেবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ? এগিয়ে এল TIFR। ভবিষ্যতের প্রতিভাবান এই বৈজ্ঞানিকের পেস-মেকার বসানোর যাবতীয় খরচের পাহাড় প্রমাণ বোঝা নিজেদের বলিষ্ঠ কাঁধে নিয়ে নিল TIFR কর্তৃপক্ষ। সেই প্রথম বার, TIFR-এর কল্যাণে লক্ষাধিক অর্থ ব্যয়ে পেস-মেকার বসল নারায়ণের শরীরে। সফল অস্ত্রোপচারের পরে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল তার। TIFR-এর এই দান তথা ঋণ জীবনে কোনও দিন ভোলেনি সে।

  দ্রুত সেরে ওঠার পর আরও গভীর পড়াশুনায় নিজেকে নিয়োজিত করে সে। এবারের অধ্যবসায় কসমোলজী'র তত্ত্ব কিংবা সমীকরণ নয়; বরং শারীরবিদ্যার তাবড় তাবড় গ্রন্থ অধ্যয়ন শুরু করে সে। নিজের হৃৎপিণ্ডের ভেতর যে ডামাডোল চলছে, সে বিষয়ে অবহিত হওয়া। আগাম সতর্কতা হিসাবে সচেতন থাকাই লক্ষ্য। এ হেন শারীরবিদ্যার সম্পূর্ণ সিলেবাস কমপ্লিট করতে গড়পড়তা একজন স্টুডেন্টের চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগা'র কথা। রিসার্চের সমূহ কাজ ফেলে একটানা এত দীর্ঘ সময় লেগে থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়ন কার্যত অসম্ভব তার পক্ষে। সে-জায়গায় বাড়িতে বসে মাত্র পাঁচ মাসে শারীরবিদ্যার সম্পূর্ণ পাঠ রপ্ত করেছিল নারায়ণ। যা এককথায় অলৌকিক ঘটনা! অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! কোনও মতেই সম্ভব না। আসলে নারায়ণের অভিধানে 'অসম্ভব' বলে কোনও শব্দগুচ্ছ হয়তো নেই। তাই এত স্বল্প সময়ে তার দ্বারা এমন অসাধ্য সাধন সম্ভব হল। কোত্থেকে আসে এত মনের জোর? কোন গোপন শক্তি থেকে স্থির করেন নিজের লক্ষ্য? কে জোগায় এই অসীম শক্তি? এর সদুত্তর বোধহয় রহস্যপূর্ণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতো রহস্যময় থেকে যাবে। জানা যাবে না। আসলে জিনিয়াসরা সবসময়ই ব্যতিক্রমী। ব্যতিক্রমী তাদের চিন্তাভাবনা, জীবন যাপন আর কর্মপন্থা।
       
  তো, ১৯৮১ সালে ড. নারলিকার স্যারের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ হল তার পি. এইচ. ডি. (Ph.D.)। রিসার্চের বিষয়বস্তু ছিল জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা। তার গবেষণা পত্রের শিরোনাম 'অ্যান ইনভেস্টটিগেশন অফ দ্য প্রোপার্টিজ অফ ইন্টারগ্যালাকটিক ডাস্ট' (An Investigation of the Properties of Intergalactic Dust)। (চলবে)

তথ্য সহায়তা :
'নিউটনের আপেল ও নারায়ণ'― ড. সন্তোষ কুমার ঘোড়াই,
'মেদিনীপুরের বিশ্বজয়ী ড. নারায়ণ চন্দ্র রানা জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানী'― বাদল চন্দ্র দে
'বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানী নারায়ণচন্দ্র রানা'― নন্দগোপাল পাত্র,
'N C Rana : Life and His Contribution on Astrophysics Science'― Utpal Mukhopadhyay and Saibal Ray,
'মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা'― ভাষ্করব্রত পতি,
উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন ব্লগ

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া