মেদিনীপুরের বিজ্ঞানী নারায়ণ চন্দ্র রানা : শূন্য থেকে 'শূন্যে' উড়ানের রূপকথা― (পঞ্চম পর্ব)/পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

বিজ্ঞানের অন্তরালে বিজ্ঞানী ।। পর্ব ― ২৪

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানী নারায়ণ চন্দ্র রানা : শূন্য থেকে 'শূন্যে' উড়ানের রূপকথা― (পঞ্চম পর্ব)

পূর্ণ চন্দ্র ভূঞ্যা


সময়টা বেশ কাকতলীয়। ১৯৭৭ সাল। সেবছর ঘর ছাড়ল তিনজন। তিনমুর্তির দুজন পাড়ি দিল অন্তরীক্ষে। আর তৃতীয় জন ঘর ছেড়েছে টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR)-এ গবেষণা করবে বলে। অন্তরীক্ষে যে দুই যমজ বোন পাড়ি জমাল, তাদের প্রথম জন 'ভয়েজার-২' আর দ্বিতীয় জন 'ভয়েজার-১'। আসলে এরা দুটো মহাকাশযান। নাসা'র স্পেস লঞ্চিং স্টেশন থেকে মহাশূন্যে পাঠানো হয়েছে তাদের। প্রথম জনকে উৎক্ষেপণ করা হয় ১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট আর দ্বিতীয় জনের উৎক্ষেপণ কাল ঠিক তার ষোলো দিন পর, সেপ্টেম্বরের পাঁচ তারিখে। প্রথম জনের উদ্দেশ্য পৃথিবী বাদে সৌর পরিবারের বাকি সদস্য গ্রহগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা। দ্বিতীয় জনের গন্তব্য সৌর পরিবারের বাইরে― বহির্বিশ্বে এবং লক্ষ্য অন্তরীক্ষ পর্যবেক্ষণ। তিনমূর্তির শেষজন কোনও স্পেসশিপ নয়, বরং তৃতীয় পাণ্ডবসম তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী শ্রী নারায়ণ চন্দ্র রানা। ভয়েজার শূন্যে পাড়ি দেওয়ার ক'মাস আগে ঘর ছেড়েছে সেও। TIFR-এ পি এইচ ডি সম্পূর্ণ করে মহাকাশের সত্য অনুসন্ধান হেতু। 

  খটকা লাগল, প্রিয় পাঠক? বেশ অবাক হলেন কি? আসলে তিনজনের সামঞ্জস্যও বেশ অভিনব। মিল বলতে তিনজনেরই শিকারি চোখ অন্তরীক্ষে নিবদ্ধ। তৃতীয় জনের চোখ যেন এককাঠি উপরে। তার জিজ্ঞাস্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে। তার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি গ্যালাক্সি-নিহারিকা-ছায়াপথের সৃষ্টি রহস্য ঘিরে। কী ঘটেছিল এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শুভ জন্মক্ষণে? বিবর্তনের হাত ধরে কেমন করে সে পৌঁছে গেল আজকের অবস্থায়? ইত্যাদি। এমন আজগুবি কল্পনায় ঝালাপালা তার অস্থির হৃদয়। তার কল্পনাশক্তি ভয়েজার-এর লক্ষ্য ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরে। স্থান-কালের বর্তমান মাপকাঠির উর্ধ্বে; সূদুর অতীতে। মহাকাশের বক্রতায়। চতুর্মাত্রিক বিশ্বের উত্থান-পতনের ক্রমিক হারে।
    
  ইতিমধ্যে তিন বছর কাল অতিক্রান্ত। ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাসের বারো তারিখ। ওইদিন ভয়েজার-১ শনি গ্রহের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল। ৬৪,২০০ কিলোমিটার (৪০,০০০ মাইল) দূর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শনির বলয়ের অনেক তথ্য পাঠায়। আর সে-সব তথ্য জানতে উদগ্রীব হয়ে প্রিয় ছাত্রের চিঠির অপেক্ষায় দিন গোনে পল্লীগ্রামের এক বিজ্ঞান শিক্ষক মণীন্দ্র নারায়ণ লাহিড়ী। ২৪/১১/১৯৮০ তারিখে নারায়ণকে লেখা এক চিঠিতে তার কৌতূহল ঝরে পড়ে― 'শনি সম্বন্ধে ভয়েজার কী জানালো জানতে পারলে জানাবে'।
      
  এ হেন শিক্ষকের স্নেহ ছায়ায় আকাশের প্রতি তার মধ্যে প্রগাঢ় প্রেমের অনুভূতি সঞ্চারিত হয়েছিল। স্কুলের দিনগুলোতে তিনি হাতে কলমে বুঝিয়ে দিতেন আকাশে রাতের তারাগুলো―সপ্তর্ষি মণ্ডল, শুকতারা, বুধ ইত্যাদি। স্কুল উত্তীর্ণ হয়ে কলেজে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পড়ার সময়েও আকাশ দেখায় ছেদ পড়েনি। অবারিত দ্বার সর্বদা খোলা থাকত তার জন্য। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে স্কুলের মাঠে অনেক রাত পর্যন্ত আকাশ পর্যবেক্ষণ চলত। স্যারের তৈরি ছয় ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপে। মণীবাবু আর নারায়ণের সঙ্গে সেখানে তখন আরও অনেকেই উপস্থিত থাকত। খুকুড়দা স্কুলের রসায়ন শিক্ষক বঙ্কিম বিহারী মাইতি, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র মাইতি সহ আরও চার-পাঁচ জন।
  ১৯৮৫―৮৬ সাল নাগাদ এক ক্ষুদে সদস্য সেই গুণীজনের আড্ডায় উপস্থিত থাকত। তখন সে নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি আর কেউ নন, সাউরি ভোলানাথ বিদ্যামন্দিরের ছাত্র অতনু মিত্র―বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং একসময় আনন্দবাজার পত্রিকার নিয়মিত লেখক। তারও লেখালেখির অনুপ্রেরণা মণীন্দ্র স্যার। কিশোর বয়সে গুণীজনের কথাবার্তা শুনে খুব বেশি বোধগম্য হত না তার। তবে গুণীজনের সঙ্গ বেশ উপভোগ করত সে। আকাশ পর্যবেক্ষণ আড্ডায় তার কাজ ছিল চা বানিয়ে সার্ভ করা। আনন্দের সঙ্গে সেই কাজ সে পালন করে।  

(দুই)
'তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে আঁকা? 
ওই যে সুদূর নিহারিকা―
যারা করে আছে ভীড়,
আকাশের নীড়
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী,
গ্রহ তারা রবি...'

অথবা

'আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ।'

―কবির ভাষায় যেন সম্বিৎ ফিরে পায় নারায়ণের কল্পনা। ছয় ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপের ক্ষুদ্র লেন্সে চোখ রাখলে কবিগুরুর কবিতার লাইনগুলো গড়গড় করে কণ্ঠে চলে আসে তার। তখন মনে হয় সমগ্র আকাশটা যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক অন্ধকার ক্যানভাস। অনন্য সুন্দর পট। বিশ্বস্রষ্ঠার রঙিন তুলির টানে ক্যানভাসে চির উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সুদূরের নিহারিকা, লক্ষ নিযুত কোটি গ্রহ তারা রবি। প্রকৃতই তারা অন্ধকারের যাত্রী। দিবারাত্রি-অহর্নিশ পাড়ি দেয় আলো থেকে অন্ধকারের গর্ভে, অনিশ্চয়তার মাঝে। অনিশ্চিতকে জানার আগ্রহ তাই মানুষের চিরদিনের। নারায়ণের কৌতূহলও তা-ই। মিটিয়াও যেন মিটিল না সাধ।

  লক্ষ তারকার ভীড়ে আলাদা নজর কাড়ে কোজাগরী চাঁদ। তার নিজস্ব আলো নেই। অথচ পূর্ণিমা রাতে ঔজ্জ্বল্যের জন্য তার জগৎজোড়া খ্যাতি। বাচ্চার ঘুমপাড়ানি গান হোক কিংবা বড়দের অতি রোমান্টিসিজম, সবেতেই চাঁদ যেন পরম আদরের, এক ভালোবাসার প্রতীক। এ হেন চাঁদও নিষ্কলুষ নয়। কলঙ্ক তার শরীরে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই কলঙ্কগুলো খুব গর্বের সঙ্গে বিশ্বের কাছে উদ্ভাসিত করে চলেছে সে। আসলে কলঙ্কগুলোর উৎস কিছু গিরিখাত। ইংরেজিতে বলে 'ক্রেটার'। এমন অনেক ক্রেটার আছে চাঁদের বুকে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম―টাইকো, অ্যারিস্টারকাস, বেইলি, ক্ল্যাভিয়াস, কোপারনিকাস মেটিয়াস ইত্যাদি। নরম কাদামাটির ওপর জলের বড় ফোঁটা পড়লে যে আকৃতি হয়, টেলিস্কোপে ক্রেটারগুলো অবিকল সেরকম দেখতে লাগে। দৈর্ঘ্যে এক একটা ক্রেটার দু'শ কিমির অধিক হয়। 
        
  মণীবাবুর তৈরি টেলিস্কোপে খুব স্পষ্ট ধরা পড়ে ক্রেটারগুলো। টি এফ আই আর ফেরত তরুণ বিজ্ঞানী নারায়ণ সেগুলো দেখিয়ে দেয় গ্রামের কৌতূহলী মানুষ আর অজ পাড়াগাঁয়ের অবুঝ ছাত্রছাত্রীদের। আসলে গ্রামে থাকলে আকাশ যত পরিস্কার দেখা যায়, শহরে দূষণের জন্য তত ভালোভাবে তারা দেখা যায় না। স্কুলের মাঠে সবসময় যে আকাশ দেখা হত, তা কিন্তু নয়। মাঝেসাঝে গানের আসর বসে। মণীন্দ্র স্যার গান ধরেন। খোলা হাওয়ায় দরাজ কণ্ঠে তার গাওয়া ভক্তিগীতি সকলের হৃদয় স্পর্শ করে যেত। খালি গলায় অতুল প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত গাইতেন তিনি। TIFR- থাকলে সে-কথা খুব মনে পড়ে নারায়ণের। আর মনে পড়ে গাঁয়ের কথা, মায়ের কথা। ঘরের কথা ভাবলেই মনটা বড্ড ভারী হয়ে ওঠে।

(তিন)
খড়ের ছাউনি আঁটা কুঁড়ে ঘর। ঘর বলতে, মাথা গোঁজার ন্যুনতম ঠাঁই। বাঁশের কঞ্চি আর কাদা মাটির প্রলেপ দেওয়া ছিটে-বেড়ার দেওয়াল। ঈষৎ হেলানো। তার ভেতর একটিমাত্র কক্ষ। কক্ষের মধ্যে প্রবেশের জন্য রয়েছে দরজা। শুকনো বাঁশ ফাটিয়ে প্রস্তুত 'বাতা' দিয়ে তৈরি। দরজায় ঝুলছে মান্ধাতার আমলের তালা। মস্ত বড় সাইজ, তবে জং ধরা। তালা'র গা থেকে মেরুন রঙের মরিচা খসে পড়ছে। এ তালা'র বিশেষত্ব হল একে আনলক্ করতে চাবির প্রয়োজন পড়ে না। লক অবস্থায় তালাটি ধরে সামান্য ঝাঁকুনি দিলে খুলে যায় সেটি। কক্ষের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম জুড়ে মাটির উঠোন। সম্মুখের খামার থেকে সামান্য উঁচু। উঠোন জুড়ে ডবল বাঁশের খুঁটি পোতা। বেশ কয়েকটা, আট-দশ ফুট দূরত্ব ছেড়ে ছেড়ে; চারধারে। তাদের ওপর ভর দিয়ে খড়ের একচালা টঙ যেন নিশ্চিন্তে ঝুঁকে পড়ছে খামারে। সেজন্য ঘরে ঢুকতে গেলে সামান্য নত করতে হয় চির উন্নত শির। অন্যথায়, মস্তিষ্কের সঙ্গে খড়ের চালের সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী। তখন মস্তকে পীড়ার উদ্রেক হতে কতক্ষণ?

  নারায়ণের ছোটবেলা কেটেছে দক্ষিণ কোটবাড় গ্রামে; এমন কতগুলো ছোট ছোট গ্রাম যা এখন সাউরি নামে পরিচিত। ছেলেবেলার অনেক স্মৃতি বিজড়িত রয়েছে এই কুঁড়ে ঘরে। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বারোমাস অসম্ভব কষ্টে কেটেছে তাদের। বর্ষার আগমনে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। পুরনো খড়ের ছাউনি তখন প্রতারণা শুরু করে দেয়। ছাউনির খড়ের ফাঁক গ'লে টপটপ ঝরে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা; ঘরের ভেতর, উঠোন সর্বত্র। সেজন্য ফি-বছর বর্ষার অভিষেকের পূর্বে বদলে ফেলতে হয় খড়। না-হলে একরাশ ঝামেলা পোহাতে হয়। 
     
  নারায়ণ তখন টি আই এফ আর-এ গবেষণারত; মাঝে মধ্যে তাঁর অবুঝ মন ডুকরে কেঁদে ওঠে। দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। এখনও না জানি বর্ষায় কত কষ্টই না পোহাতে হয় তার মা-বোন-ভাইকে। এমন ভাবনায় সদা আচ্ছন্ন তাঁর কোমল মন-প্রাণ। সেজন্য, ১৯৮০ সালের শেষের দিকে নারায়ণ মনস্থির করল― কাঁথের দেওয়াল ঘেরা মাটির বাড়ি তৈরি করবে। মাটির বাড়ি তৈরি করতে তখন বিস্তর খরচ। আর্থিক ভরসা বলতে টি আই এফ আর-এ রিসার্চ বাবদ স্কলারশিপের অর্থ। মান্থলি ৬৫০ টাকা। নিজের খরচ বাঁচিয়ে যতটুকু যা করা যায়, সেদিকে মনঃসংযোগ করল সে। চিঠি মারফৎ নিজের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করল তার প্রাণাধীক প্রিয় হাইস্কুলের মাস্টার মশায়দের কাছে। দেখাশোনা করতে রাজি হলেন স্কুলের মাস্টার মশায়গণ― শ্রীনিবাস নন্দ স্যার, বীরেন সাউ স্যার আর মণীন্দ্র বাবু। মূলত বীরেন স্যারের উপর দায়িত্ব বর্তাল। ঘর তৈরির সমস্ত পরিকল্পনা-তত্ত্বাবধান তাঁর। স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে সে-দায়িত্ব তুলে নিলেন তিনি। চেক আসবে হেডস্যারের নামে। হেডমাস্টার শ্রীনিবাস নন্দ মশাই ব্যাঙ্কে চেক জমা করবেন। চেক ভাঙানো হয়ে গেলে তিনি মিস্ত্রি-মজুরের বকেয়া টাকা মিটিয়ে দেওয়া হবে। সেটা ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাস। মূলত বীরেন সাউ স্যারের পর্যবেক্ষণে মাটির বাড়ির ভিত খোঁড়ার কাজ শুরু হল। নভেম্বরে টি এফ আই আর থেকে প্রথম একটি ২০০ টাকার চেক এল সাউরি ভোলানাথ বিদ্যামন্দিরের ঠিকানায়। হেডমাস্টার শ্রীনিবাসবাবুর নামে। সেই চেক হেডমাস্টার মহাশয় ব্যাঙ্কে জমা করে দিলেন।

  তো, জোরকদমে এ সময় ঘরের কাজ আরম্ভ হয়েছে। মিস্ত্রীর দল এক ফুট এক ফুট করে উঁচু কাঁথের উপর একটু একটু মাটির মণ্ড ঢেলে চলেছেন। ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে দেওয়াল। মাটির মণ্ড লাগানো হলে দেওয়াল মসৃন করার কাজ তৎক্ষণাৎ সম্পূর্ণ করতে হয়। অন্যথায় মাটি একবার শক্ত হয়ে বসে গেলে মসৃন বানানো বেশ কঠিন ব্যাপার হবে। তখন দেওয়াল এবড়ো খেবড়ো সাইজের হয়ে যায়। মসৃণ করার পর দু-তিন দিন রৌদ্র খাওয়াতে হয়। তাতে মজবুত হয় মাটির দেওয়াল। এভাবে শীত-বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম কাল চলে এল। খুব সম্ভবত ১৯৮১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ (০৬/০৫/১৯৮১ তারিখ) নাগাদ শেষ হল দেওয়াল তোলার কাজ। অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখনও অনেক কাজ বাকি। জানলা-দরজার কাঠামো তৈরি করতে হবে এবং কাঠের পাল্লা বসানো বাকি। বাকি বারান্দায় কড়ি-বরগা সেট করা। তার উপরে তক্তা বসানো। টঙের ছাউনির ফ্রেম প্রস্তুত করা ইত্যাদি। এতসব কাঠামো বসানোর জন্য বিস্তর কাঠের প্রয়োজন। কিন্তু কোত্থেকে আসবে এত কাঠ? অবশেষে বন্দোবস্ত করা গেল কাঠের জোগান। নিজেদের বাড়ির চতুর্সীমানায় যে সব গাছ আছে, তার থেকে প্রয়োজন মতো কেটে নিলে ঘরের কাঠামোর কাঠ সবই প্রায় পূরণ হয়ে যাবে। সুতরাং কাঠের দিক দিয়ে সুরাহা হলে বারান্দা সহ ঘর সম্পূর্ণ করার কথা ভাবা যায়― এমনই অভিমত শ্রীনিবাস বাবুর। 

  এতদাঞ্চলে কাঠের মিস্ত্রী হিসাবে গুণধর মিস্ত্রীর খুব নামডাক তখন। তাই বারান্দাসহ পুরো বাড়ির কাঠামো তৈরির ডাক পড়ল গুণধর মিস্ত্রীর। কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে বাকি থাকে কেবল ছাউনি। সেটা সম্পূর্ণ করতে পারলে নিশ্চিন্তি। বর্ষার আগে ঘরের টঙ ছেয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু ঘরের টঙ কী দিয়ে ছাওয়া হবে? সে আর এক প্রস্থ চিন্তার ব্যাপার। খোঁজ শুরু হল মজবুত টিনের। নূতন টিনের বর্তমান বাজার দর আকাশ ছোঁয়া; প্রতি বাণ্ডিল ১২০০ টাকা। তায় আবার টিনের 'গেজ' অত ভালো নয়, খুব পাতলা। এর থেকে অনেক ভালো আর সস্তা পুরাতন টিন। খোঁজ পাওয়া গেল সেরকম টিনের। দামে যেমন সস্তা, তেমনি টেকসই লা-জবাব। দামও প্রায় অর্ধেক; দর ৬০০ টাকা বান্ডিল। নূতনের চাইতে বেশ মোটা। আর, টেম্পারামেন্ট ও লঙজিবিলিটির প্রশ্নে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। পৌনে চার বান্ডিল পুরাতন টিন কেনা হল। প্রথমে যে আন্দাজে টিনের হিসাব করা হয়েছিল; বাস্তবে দেখা গেল, তাতে কুলোবে না। আরও নূতন টিন কিনতে হবে। কেবলমাত্র পুরাতন টিনে পুরো টঙ ছাওয়া হবে না। প্রথমে আর এক বান্ডিল নূতন টিনের কথা বলা হলেও টঙ খানিকটা আলগা থাকায় প্রকৃতপক্ষে চার বান্ডিল অর্ডার দিয়েছেন শ্রীনিবাসবাবু। গ্রীষ্মের শেষার্ধে তখন বর্ষার ভয়। বৃষ্টির ভ্রুকুটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই একেবারেই এত বান্ডিল টিনের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। সেজন্য, শেষের দিকে খরচ খানিকটা বেড়ে গেল। প্রথমে আন্দাজ করা হয়েছিল সম্ভাব্য খরচের হিসাব দশ হাজার টাকার মধ্যে থাকবে। পরে তা বেড়ে হয় চোদ্দো―পনেরো হাজার টাকা। অতিরিক্ত টাকা শ্রীনিবাস বাবু এবং স্কুলের বাকি মাস্টার মশায়দের প্রভিডেন্ট ফান্ড (P.F.) থেকে অ্যাডজাস্ট করা হয়েছিল। সমস্ত টাকা পরে নারায়ণ কিস্তি কিস্তি শোধ করে।

  শুধু মাথার ওপর ছাদ নয়, কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুজনের পড়াশুনার ব্যাপারে বেশ চিন্তিত নারায়ণ। স্কুলের মাস্টার মশায়দের বলে-কয়ে রাজি করায় সে। সরোজবাবু কথা দিয়েছেন সপ্তাহে তিন দিন সুজনের স্পেশাল ক্লাস নেবেন। সুবোধ স্যার রাজি হয়েছেন। তাঁর কাছে সপ্তাহে তিন দিন অঙ্ক শিখবে সুজন। এবার যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত নারায়ণ। খানিক ভারমুক্ত সে।

(চার)
ছুটিছাটায় অথবা বিশেষ কারণে বাড়ি এলে নিঃশ্বাস ফেলার জো থাকে না নারায়ণের। ঘরে সবসময় ভীড় লেগে থাকে। গ্রামের শুভানুধ্যায়ী বয়স্ক মানুষজন, বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রীর দল এসে ভীড় জমায়। রানা-বাড়িতে তখন ভীষণ ব্যস্ততা। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন রকম আবদার মেটাতে নাজেহাল দশা গৃহকর্তার। কেউ এসেছে হাত গণনা করতে, কেউ জন্মকুষ্ঠি বানাতে, কেউ আবার শুধু খোশগল্প করতে। যদিও জ্যোতিষ শাস্ত্রে খুব একটা বিশ্বাস ছিল না তার। অভ্যেসবসত কৌতুকের বশে দু-এক বার বন্ধুবান্ধবের হাতের রেখার ভুত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান ভবিষ্যৎবাণী করে দেয় সে―এই যা। সে-থেকে চার গ্রামের মানুষ অন্ধবিশ্বাসে কাতারে কাতারে ভীড় জমায় সেখানে। আর হাসিমুখে তাদের আবদার মেটায় নারায়ণ।

  আসলে বিবিধ বিষয়ে নারায়ণের বিশাল জ্ঞান। প্রচুর পড়াশোনা করা তার চিরকালের অভ্যেস। কোনও দিন-ই পড়াশোনায় বাঁধাধরা বিষয় তার ছিল না। আধ্যাত্মিক বিষয় থেকে কঠিন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সব তার নখদর্পণে। ক্লাস নাইন-টেনে স্কুলে পড়াকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ 'রামায়ণ' আর 'মহাভারত' সমাপ্ত করে ফেলেছে সে। বেদ, উপনীষদ, গীতা প্রভৃতি গ্রন্থের শ্লোকগাথা হুবহু তার কণ্ঠে, স্মরণে। এসব জ্ঞানের ভাণ্ডার সে উজাড় করে দেয় গ্রামের মানুষজনকে। এতটুকু অহংকার নেই, দেখন-দারীত্বের প্রয়োজন পড়ে না। সহজ সরল নিরহংকার জীবন যাপন তার আজীবনের সঙ্গী। তবে সত্য কথা বলতে একদম ভয় পায় না সে। নিজের চোখের সামনে কেউ মিথ্যা কথা কিংবা অসত্য তথ্য পরিবেশন করলে তার মাথার ঠিক থাকে না। তর্ক জুড়ে দেয়। আসলে সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলবার সৎসাহস তার আছে। মনের জোরও তীব্র। সেজন্য আগুপিছু ভাবে না সে। এমন নির্ভীক সত্য কথা বলার জন্য দিনকে দিন অজান্তে অনেক শত্রু তৈরি হয়ে গেছিল তার। যদিও ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ঈর্ষা বা অসম্মান করা তার উদ্দেশ্য নয়। শুধুমাত্র সত্য ঘটনা পরিবেশন-ই তার ইচ্ছা, লক্ষ্য। সত্যের মর্যাদা সম্বন্ধে একটা অতি তীব্র শ্রদ্ধাবোধ-ই হয়তো এর কারণ।

 অসুস্থ শরীরের কারণে ঘরের সামনে যে পুকুর আছে, তার জলে স্নান করা বারণ। স্নান সারত টিউবওয়েলে। পেতলের ঘটিতে জল ভরে দণ্ডায়মান অবস্থায় উঁচু থেকে মাথায় জল ঢালত সে। মাথা থেকে সর্বাঙ্গ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত টিউবওয়েলের চাতালে। মাথায় জল ঢালবার সময় গড়গড় করে সংষ্কৃত-মন্ত্র আবৃত্তি করে যেত। সংষ্কৃতে খুব ভালো দখল ছিল তার। ফলে নিঁখুত স্পষ্ট উচ্চারণে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হত বেদ-উপনীষদের বিমূর্ত চরিত্রগুলোয়। সে যেন তখন সাক্ষাৎ দেবতুল্য ঋষিপুরুষ। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেই শেষ হত তার স্নান পর্ব। বাড়িতে কোনও বয়ষ্ক অতিথি এলে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছিল। শুধু সম্মানিত অতিথি নয়, বাড়িতে কোনও ভিখারি এলেও চেষ্টা করত তাকে সাধ্যমত সাহায্য করার। কারণ তার কাছে অতিথি নারায়ণ। সাক্ষাৎ ভগবানের অংশ। সেজন্য দক্ষিণা দেওয়া কমপ্লিট হলে'পর আগত ভিখারিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে দ্বিধাবোধ করত না সে। এতে যারপরনাই অপ্রস্তুতে পড়ে আগন্তুক ভিখারি। নারায়ণ কিন্তু ভাবলেশহীন। যেন এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। দস্তুর মত এটাই নিয়ম।

  নিজের কাজ নিজে করতেই ভালোবাসে সে। অন্যের উপর নির্ভরশীলতা নয়। অপরের মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা নয়। এটা তার জীবনের মূলমন্ত্র। হয়তো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। হাতে ধরা মস্ত বড় সুটকেস। হেঁটে চলেছে গন্তব্যে। দেখে মায়া হল বন্ধুর। এমনিতেই সে হার্টের রুগী। একটু হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠে। জোরে জোরে শ্বাস নেয়। তায় আবার হাঁটা পথ। হয়তো তার কষ্ট হচ্ছে― এই ভেবে কোনও বন্ধু বলল―
'সুটকেসটা আমাকে দে।'
'কেন? তুই সুটকেস নিয়ে হাঁটবি কেন? আমি কি একেবারেই অথর্ব হয়ে গেছি যে সুটকেস নিয়ে হাঁটতে পারব না'― সপাটে প্রত্তুত্তর দেয় নারায়ণ।
অথবা একজন বন্ধু হয়তো বলল―
'একটা ট্রলি ডেকে দিই। তুই তাতে চড়ে এগো, আমরা পিছু পিছু আসছি।'
  'তোদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে! কী ভেবেছিস তোরা, বলত? চল, সবাই একসঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরি'― নারায়ণ নাছোড়বান্দা। চুপ করে যায় সবাই। তারা জানে, এ বৃথা তর্ক। কাকস্য পরিবেদনা! কোনও ভাবে দমানো যাবে না তাকে। বোঝানো দূর অস্ত। এমনই তার গাঢ় বন্ধুত্ব আর জেদ। শেষমেশ হাল ছেড়ে দেয় ছেলেবেলার তার সঙ্গীসাথীরা। একসঙ্গে পথ হাঁটে তারা। খোশগল্পে লঘু হয়ে ওঠে পরিবেশ।

(পাঁচ)
বোম্বের কলোবা অঞ্চলের হোমিও ভাবা রোডে অবস্থিত টি আই এফ আর (TIFR) হোস্টেল। নারায়ণ তখন হোস্টেলের ২০৬ নম্বর রুমের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। এ ঘরে বসেই মণীন্দ্র স্যারের সঙ্গে চিঠিচাপাটি আদানপ্রদান চলছে। নিজের বাড়ি তৈরির হালহকিকত, ভাইয়ের টিউশনির মাস্টার খোঁজ প্রভৃতি সংবাদ লেনদেন চলছে চিঠিতে।

  ২৪/১১/১৯৮০ তারিখে নারায়ণকে লেখা মণীন্দ্র বাবুর একটি চিঠি উল্লেখ করলাম।

"প্রিয় নারায়ণ,

 তোমার পাঠানো ২০০ টাকা পেয়েছি। তোমার চিঠিও পেয়েছি। তোমার ঘরের কাজ আরম্ভ হয়েছে। তোমাদের যে সমস্ত গাছ আছে তার থেকে প্রয়োজন মত গাছ কেটে নিলে ঘরের কাঠামোর কাঠ প্রায় সবই হয়ে যাবে। শ্রীনিবাসবাবু বলছিলেন কাঠের দিক দিয়ে এই সুরাহা হলে বারান্দাসহ ঘর এইবারই কমপ্লিট করার কথা ভাবা যায়।
তুমি চেকআপ-এর ব্যবস্থা করলে কিনা জানাবে। আর বিলম্ব করছো কেন? 
   তোমার রিপোর্ট চেয়ে প্রফেসর ভট্টাচার্য্য-কে চিঠি দিয়েছিলাম। তিনি লিখেছেন রিপোর্ট বই হিসাবে ছাপতে গেছে। ছাপা হয়ে এলে আমাকে এক কপি পাঠাবেন। ভূপতি একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছিল। তারপর আমি ২/৩ টি প্রশ্ন করেছিলাম। তার উত্তর দিয়েছে। খুব ভালো। অচিন্ত্যের রিপোর্ট চেয়েও আমি ২/৪ টা প্রশ্ন করেছিলাম। অনেকদিন আগে খুব সম্ভব তোমার চিঠির সঙ্গে। তুমি কি সেই চিঠি অচিন্ত্যকে দাওনি? তোমার চেক শ্রীনিবাসবাবু ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছেন।
তোমাদের খবর জানিয়ে চিঠি দিও। নিজের ক্ষমতার বেশি পরিশ্রম করতে যেয়োনা। ধীরে সুস্থে যা হয় তাই ভাল। তোমার বন্ধুদের আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিও। তুমি আমার ভালোবাসা নিও। 

                                               ইতি
                                  মণীন্দ্র নারায়ণ লাহিড়ী

পূন: খাটুনির ভয় না আলস্য জানি না কিন্তু ভীষণ ইচ্ছা করলেও নূতন কোন বইতে হাত দেওয়া হয়ে উঠছে না। শনি সম্বন্ধে ভয়েজার কি জানালো জানতে পারলে জানাবে।"
পত্রখানি ২৭/১১/১৯৮০ তারিখে প্রাপকের পড়া হয়েছে।
       
  সময়টা ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ। দিনটা ছিল খুব সম্ভবত ফেব্রুয়ারির ছাব্বিশ তারিখ। সেদিন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নারায়ণের একটি 'টক' (Talk) সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছিল। মহাকাশের ভেতর ঘটে চলা বহু অজ্ঞাত রহস্যের রোমহর্ষক কাহিনী শোনাচ্ছিল সে, রেডিওতে। অল্প সময়ে সময়োপযোগী অসম্ভব ভালো একখানা বিষয় নিয়ে বক্তব্য রেখেছিল সেদিন। তাতেই সাউরি অঞ্চলে সে কী হুলুস্থুল কাণ্ড! যে অল্প সংখ্যক মানুষের মহাকাশ সম্বন্ধে সামান্যতম নলেজ আছে কিংবা যারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ; তারাও কান খাড়া করে শুনেছে তার বক্তব্য। রেডিও'র নব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চ্যানেল ধরেছে। নির্ধারিত সময়ে অধীর প্রতীক্ষায় ধৈর্য্য ধরে বসে থেকেছে। বিষয়টা যে সকলের বোধগম্য হয়েছে, তা নয়; তবে সকলেই বেশ অভিভূত, উৎফুল্ল। তারা আনন্দিত, গর্বিত এলাকার মেধাবী নারায়ণের জন্য। কারণ রেডিও ঘোষক নারায়ণের নামের পূর্বে 'ডক্টর' উপাধিতে সম্বোধিত করেছে তাকে। এটাতে তারা যারপরনাই আপ্লুত। কেবল গ্রামের মানুষ নয়, নামের পাশে 'ডক্টরেট' উপাধি বসার জন্য স্কুলের মাস্টার মশায়েরা পর্যন্ত বেজায় খুশি। দুহাত তুলে তাদের আশির্বাদ বর্ষিত হচ্ছিল সেদিন। মণীন্দ্র স্যারের চিঠিতে সে-তথ্য জ্ঞাত হয়েছে নারায়ণের।

  ১৯৮১ সালে গবেষণার থিসিস 'অ্যান ইনভেস্টটিগেশন অফ দ্য প্রোপার্টিজ অফ ইন্টারগ্যালাকটিক ডাস্ট' (An Investigation of the Properties of Intergalactic Dust) নথিভুক্ত হয়। তাঁর এই গবেষণা পত্রটির জন্য এ সময় একটি ভালো পুরস্কার পান তিনি। 'Geeta Udgonkar Medal ― 1 st awarded medal' পুরস্কার। পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ হু হু বেগে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতে। ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের আকাশে এক নূতন তারকার উদয় হয়। এ হেন গবেষণা পত্রটি ড. রানা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের শ্রীচরণ কমলে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু― কীভাবে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর প্রথম মৌলদ্বয় হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম প্রচণ্ড শক্তি থেকে সৃষ্টি হল এবং কীভাবে নক্ষত্রের মধ্যে অন্যান্য মৌলসমূহ সংশ্লেষিত হয়ে তা সম্পূর্ণ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, তার উপর নতুনভাবে আলোকপাত করল তাঁর গবেষণা। পি এইচ ডি সম্পূর্ণ করে তিনি TIFR-এ 'পার্মানেন্ট রিসার্চ ফেলো' হিসাবে নিযুক্ত হন। মাইনে ৯২০ টাকা মান্থলি। TIFR-এ গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিল। ১৯৮৩ সালে ভারতবর্ষের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শ্রী হাত থেকে 'বেস্ট ইয়ং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড' গ্রহণ করেন। এই পুরস্কারটি 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমি' ( সংক্ষেপে, INSA) প্রদান করে। (চলবে)

তথ্য সহায়তা :
'নিউটনের আপেল ও নারায়ণ'― ড. সন্তোষ কুমার ঘোড়াই,
'মেদিনীপুরের বিশ্বজয়ী ড. নারায়ণ চন্দ্র রানা জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানী'― বাদল চন্দ্র দে
'বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানী নারায়ণচন্দ্র রানা'― নন্দগোপাল পাত্র,
'N C Rana : Life and His Contribution on Astrophysics Science'― Utpal Mukhopadhyay and Saibal Ray,
'মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা'― ভাষ্করব্রত পতি,
উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন ব্লগ"

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি