স্নেহলতার স্নেহচ্ছায়া/মিতা ঘোষ

ফোটোগ্রাফি - সৈয়দ স্নেহাংশু 

স্নেহলতার স্নেহচ্ছায়া

মিতা ঘোষ         


টুলে বসার আগে স্নেহলতা গায়ের পশমের চাদরটা একটু গুছিয়ে নিলেন। যদিও পৌষ সংক্রান্তি, তবু এখানে তেমন একটা ঠান্ডা পড়ে না। গতকাল স্থানীয় জনতা বাজার থেকে নীচু একটা টুল এনে দিয়েছে সুমি। আজকাল আর নীচে বসতে পারেন না স্নেহলতা, তাই। কাজের এদেশীয় মেয়েটি যাবার আগে যতটা সম্ভব কাজ গুছিয়ে দিয়ে গেছে। সামনে খবরের কাগজের উপর কোরা নারকেল আর চালের গুঁড়োর স্তূপ। স্নেহ এখনকার আধুনিক সব গ‍্যাজেট চালাতে পারেন না। শেখার ইচ্ছে যে আছে, তেমনটাও নয়। অথচ বছর দশেক আগেও এসব তাঁর 'বাঁয়ে হাত কা খেল' ছিল। বড়ো বড়ো পরাত ভর্তি পিঠে, দুধে ডোবানো আশকে,পুলি, পাটিসাপটা, চুষির পায়েস...কি না বানাতে পারতেন তিনি! কেমন যেন গতজন্মের মতো লাগে তাঁর! সত্যিই ওই দিনগুলো, ওই মানুষগুলো তাঁর সঙ্গে ছিল!! সুমিটা ছোটবেলায় খুব পিঠে পায়েস খেতে ভালোবাসতো। মাকে তো পায়নি, ঠাম্মির কাছেই যাবতীয় আবদার ছিল তার। যদিও ইচ্ছে থাকলেও সবসময় যে স্নেহ তার আবদার পূরণ করতে পেরেছেন এমনটা নয়। একপাল নাতি নাতনির মধ্যে সুমিকে আলাদা করে যত্ন নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তদুপরি সুমি মেয়ে, স্নেহলতার স্বামীর জীবিতাবস্থায় নাতনি নিয়ে আদিখ্যেতা করা অপরাধ গন‍্য করা হতো। একরত্তি মেয়ে যখন মা-হারা হলো, আর ছ'মাস না পেরোতে সুমির বাবা, স্নেহলতার সেজোছেলে, বাচ্চা মেয়ের যত্নের অজুহাতে আবার বিয়ে করে বৌ নিয়ে এলো...সেই তবে থেকেই সুমির নাওয়া, খাওয়া, শোয়া সব ঠাকুমা কেন্দ্রিক। এ নিয়ে সুমির দাদু নিশানাথের সঙ্গে কম অশান্তি হয়েছে স্নেহলতার! লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করতো তাঁর। নিশানাথের শরীরের খেলার আগ্ৰহ এতটুকু কমেনি ততদিনেও। তার মধ্যে মূর্তিমতী রসভঙ্গ ছিল সুমি। 

বড়বৌ..এ আপদ কি এহন থিকা আমাগো ঘরে রইবে নাহি?..

ভয়ংকর বিরক্ত নিশানাথ। স্নেহলতা যুগপৎ লজ্জিত এবং অপ্রস্তত। ছোট্ট সুমিকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দিতে দিতে বলেন...

ছি ছি..কেমন কথা কন? ওইটুখানি মাইয়া!! মা তো মইরা বাঁচসে। এহন আমরা না দেখলি ও যায় কনে?

ক‍্যান? ওর বাপ নাই? বিয়া কইরা তো আরেক খান তুলসে ঘরে। তারা দেহুক। আমাগো কিয়ের ঠ‍্যাহা?

আইচ্ছা আপনি এট্টু থামেন। মাইয়াডা এহনো ঘুমায় নাই।

তার লিগাই তো কইতাসি। 

ক্ষিপ্ত নিশানাথ। তাঁর প্রবৃত্তির উজ্জীবন ঘটেছে। অথচ পরম রসভঙ্গ মূর্তিমতী সুমি।

 অর চোহে তো ঘুম নাই। দেহো, আমি সিধা কইয়া দিতাসি, এসব ঝামেলা আমি নিমু না। অর বাপেরে কয়‍্যা দিও, তার মেয়েরে দেখা আমাগো কাম না। এহন আমায় অর ঘুমের জন্য অপেক্ষা করতে হইবো!!

কত সহ‍্য করেছেন স্নেহলতা!! সুমিকে বেশি খেয়াল রাখতে গেলে ঘরের তিন বৌয়ের কোপে পড়তে হতো। খুব বিঁধিয়ে কথা বলতে পারতো মেজবৌ। দুই ছেলের মা হবার গর্বে মাটিতে পা পড়তো না তার। তার সঙ্গে ধরতাই দিতেন তার শ্বশুরমশাই। ম্লান হাসি ফুটে উঠলো স্নেহলতার মুখে। সেই ছেলে, বৌ, নাতিরা নিশানাথের জীবনের শেষ সময়টুকুতে হাত তুলে নিয়েছিল। অসুস্থ মানুষটা হয়তো ঘরে পচেই মরতো, সুমি না থাকলে শেষ সময়ের ট্রিটমেন্ট টুকুও হতো না।  বয়স্ক মানুষের যখন মরে যাওয়া নির্ধারিত, তার পেছনে পয়সা খরচ করার মতো আহাম্মক শুধু সুমিই ছিল। 

          তারপর গঙ্গা দিয়ে কত জল বয়ে গেল। গত চার বছর যাবৎ স্নেহলতা কর্ণাটকের হুবলির বাসিন্দা। ভয়ঙ্কর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে সুমি। হিমোগ্লোবিন ছয়ের ঘরে নেমে এসেছিল তাঁর। সুমি এখানকার বিখ্যাত কিমস হাসপাতালের ডাক্তার। মানুষের হৃদয় সারায়। শুধু সুমির হৃদয়ের ক্ষত, যা কেবল তার ঠাম্মি জানে...এ জীবনে আর সারানোর লোক জুটলো না। বড়ো চিন্তা হয় আজকাল তাঁর, সুমির জন্য। যতদিন তিনি আছেন, চলে যাচ্ছে… তাঁর পর সুমির সঙ্গে পরিবারের লোকেদের শেষ সূত্র টুকুও ছিঁড়ে যাবে, জানেন তিনি। বিয়েও করলো না মেয়েটা। সুমির বয়সে তাঁর সবার বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে তিনি শাশুড়ি পর্যন্ত হয়ে গেছিলেন, ভাবছিলেন স্নেহ। অবশ্য যে সময়ের যা, এখনকার সঙ্গে কি তার তুলনা হয়?

          স্নেহলতার বিয়ে হয়েছিল তেরো না পুরোতেই, রাজসাহীর পাবনাতে। গ্ৰামের নাম রাধানগর। সেখানকার বিখ্যাত রাধানগর মজুমদার অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষক তাঁর শ্বশুরমশাই, পুরো পাবনা জেলার অত্যন্ত সম্মানীয় একজন ব‍্যক্তি। যদিও বিয়ের পর আটটি মোটে বছর শ্বশুরবাড়ি থাকতে পেরেছিলেন তাঁরা। একাত্তরের যুদ্ধের সময় প্রাণ হাতে করে কোনক্রমে এদেশে চলে এসেছিলেন, সপরিবারে। প্রাণটুকু হাতে নিয়ে প্রায় নিঃস্ব কলকাতায় পৌঁছে বাকি জীবনটা উত্তর কলকাতার পুরোনো ভিজে ভিজে সোঁদা  গন্ধওলা বাগবাজারের বাড়িতে। রাধানগরের ফেলে আসা পূর্বপুরুষের সমৃদ্ধির স্মৃতি নিয়ে আমৃত্যু বাস করে গেলেন তাঁর অহঙ্কারী, দুর্মুখ স্বামী। বিয়ের পরের সেই প্রথম আট বছরের সুখস্মৃতি আজো মনের সিন্দুকে তোলা আছে স্নেহলতার। 

অঘ্রানের প্রায় শেষ। সদ‍্য সদ‍্য বিয়ে হয়েছে স্নেহলতার। ভৌমিক পরিবারের শিবনাথ ভৌমিকের বড়ো ছেলে নিশানাথের বৌ তিনি। গ্ৰাম বাংলায় তখন রীতিমতো ঠান্ডা পড়ে যেতো কালীপূজো পেরোলেই। পরের মাসেই পিঠে উৎসব। শ্বশুরবাড়িতে তখন কত লোকজন! নতুন বৌয়ের আলতার দাগ তখনো ভালোমতো ফিকে হয়নি। তাঁর শ্বশুরবাড়িতে পৌষপার্বনের প্রস্তুতি সাধারণত শুরু হয়ে যেতো অনেক আগে থেকেই। সেবার নতুন বৌয়ের আগমনে খুশি শ্বশুরমশাই নিমন্ত্রণ করে এসেছেন পাড়া প্রতিবেশীদের। বিয়েতে আমন্ত্রিত আত্মীয়স্বজন তখনও কেউ কেউ থেকে গেছেন। ধুমধাম করে হয়েছিল সেবার পিঠে উৎসব। শ্বশুরবাড়িতে এর জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছিল। কেউ বা ঢেঁকি ঘরে চাল কুটে গুঁড়োর স্তূপ বানিয়েছে, উঠোনে নারকেলের পাহাড়। দুজন মুনিশ নারকেল ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে ছোবড়ার ঢিপি বানিয়েছে। সমুর মা নামের একজন ঝি ছিল, সর্বঘটের কাঁঠালী কলা। সে ক্রমাগত সেই ছোবড়া তুলে ঠাকুর ঘরের পাশে স্টোর রুমে রাখছে আর বকবক করে লোকের মাথা ধরাচ্ছে। দুজন আত্মীয়া গোছের মহিলা সমানে নারকেল কুরিয়ে স্তূপ বানাচ্ছেন। সে এক হইহই রইরই ব‍্যাপার। অত কাজের লোকের মধ‍্যেও তাঁর শাশুড়ি মায়ের কাজের বিরাম নেই, দেখেছিলেন স্নেহলতা। ঘর ভর্তি ছেলেপুলে সামলে অসীম প্রাণশক্তি নিয়ে সকল খুঁটিনাটি দেখে বেড়াচ্ছেন তিনি। স্নেহ তার দিদিশাশুড়ির কোলের কাছে বসে ঘোমটার ফাঁক দিয়ে অবাক হয়ে সারাবাড়ির কর্মচাঞ্চল্য দেখছিলেন। দিদিশাশুড়ির কথায় কথায় ছড়া কাটা অভ‍্যেস ছিল। পৌষের ঠান্ডায় তাঁর কোলের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা স্নেহলতাকে আরো কাছে টেনে নিয়ে শরীরের ওম দিতে দিতে বলেছিলেন...

             জষ্টি মাসে আম কাঁঠাল
                   আষাঢ় মাসে ইলিশ
             ভাদ্দর মাসে তালের তত্ত্ব
                 পুজোয় কুটুম পালিশ
             অঘ্রান মাসে শাল দোশালা
                  পোষে গুড়ের নাগরী
             ফাগুন মাসে দোলের তত্ত্বে
                   পিচকিরি আর পাগড়ী।

তারপর নতুন বৌয়ের ফাঁদি নথ পরা টুকটুকে মুখে ঠোনা দিয়ে ফোকলা মুখে একগাল হেসে বলেছিলেন, 'কিছু বুঝবা পারছস, নাতবৌ?'

সন্ধ্যার সময় চাষীপাড়ার একদল ছেলে হুড়মুড়িয়ে অন্তঃপুরের উঠোনে এসে সমস্বরে সোনা রায়ের গান ধরেছিল। এ গান কিংবা এমন রীতি স্নেহলতা আগে কখনো দেখেন নি। তার বাপের বাড়ির দেশে এমন রীতি ছিল না। সে সব ছেলেপুলেদের কারো হাতে ধামা, কারো বা হাঁড়ি, কেউ বা তেলের বোতল নিয়ে এসেছে সোনা রায়ের নামে ভিক্ষা চাইতে। এটা স্থানীয় রীতি। পৌষপার্বনের আগে থেকেই পাশাপাশি পাড়ার ছেলেপিলের দল সোনা রায়ের গান গেয়ে চাল, গুড় ইত্যাদি সংগ্ৰহ করে। পার্বনের দিন নদীর ধারে নতুন মাটির পাত্রে পায়েস রেঁধে তারা সোনা রায়কে ভোগ দেয়। সোনা রায় বনের দেবতা। তারপর সেই ভোগের প্রসাদ খেয়ে তারা উৎসব পালন করে। তাদের ভিক্ষা চাওয়ার গানটি একটু একটু মনে পড়ে স্নেহলতার। কি যেন ছিল গানটা!!!

     আইলাম রে অরণে সোনা রায়ের চরণে
     সোনার ঠাকুর দিল বর ধান চালে ঘর ভর
     সোনার ঠাকুর বিভা কর‍্যা ব‍্যাভার পালে কি?
     আটপৌরা ধুতি একখান ব‍্যাভার পায়াছি।

শাশুড়ি কাঠা ভরে চাল দিতেন, বাটি ভরে ভরে খেজুর গুড়। প্রদীপ জ্বালানোর জন্য মাটির ভাঁড়ে তেল ঢেলে দিতেন। সে প্রথা যতদিন তাঁরা দেশের বাড়িতে ছিলেন, শাশুড়ি মারা যাবার পর ও চালু রেখেছিলেন স্নেহলতা। তাঁর শাশুড়ির কপালে এদেশে আসার দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। স্নেহলতা তাঁর স্নেহের স্পর্শ খুব কম দিন পেয়েছিলেন। সেসব বড়ো স্বপ্নের দিন ছিল।  স্বামী দুর্মুখ, খিটখিটে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ির অগাধ ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। আজো সে সৌভাগ্যের কথা স্মরণ করে দুহাত জড়ো করেন  ঈশ্বরের কাছে।

          কত কথা মনে পড়ে স্নেহলতার! ঘর থেকে সুমি বেরিয়ে যাবার পর অনন্ত অবসর তাঁর। কাজের সাহায‍্যকারিনী স্থানীয় কান্নাডিগা মেয়েটির ভাষা দুর্বোধ্য। কড়মড় করে সে যে কি বলে স্নেহলতা প্রথম দিকে কিছুই বুঝতে পারতেন না। সুমি হসপিটালে যাবার আগে তার ভাষায় কি করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে যায়। কিছু কিছু কাজ চালানো গোছের হিন্দি কথা অবশ্য চার বছরে শিখেছেন তিনি। কাজের মেয়েটি ভালো। আকারে ইঙ্গিতে অনেক কথা বলার চেষ্টা করে। অল্প অল্প করে শিখছেন তিনিও। কদিন ধরে খেয়াল করছেন, পাশের ফ্ল্যাটের দিকে হাত দেখিয়ে কিছু বলতে চায় মেয়েটি। মৃদু হাসি ফুটে ওঠে স্নেহলতার ঠোঁটে। এই বয়সে নতুন ভাষাও শিখতে হচ্ছে তাঁকে। জীবন যে কাকে কখন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়!!

          আজকে স্নেহলতাকে স্মৃতিচারণায় ভর করেছে। পিঠে পার্বণের আনুষঙ্গিক ঘটনা গুলো বড়ো মনে পড়ছে । তাঁর বাপেরবাড়িতে ঢেঁকি ছিল না। ঠাকুমা পিঠের চাল গুঁড়ো করতে দিতেন ভারানীদের। কুনকে মেপে চাল দিতেন, পাঁচ কুনকে দেওয়া, নেবার সময় চার কুনকে ফেরৎ। বাকিটা ভারানীদের মজুরি। শ্বশুরবাড়িতে প্রথম ঢেঁকিতে পাড় দিতে শেখেন তিনি। সেখানে কারো জন্য কোনো কাজ নির্দিষ্ট ছিল না। যে যখন যেটা করতে বসতেন, সেটা শেষ করে উঠতে হতো।  প্রথম দিকে ঢেঁকিতে পাড় দিতে মজা পেতেন স্নেহ। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝেছিলেন, এ বড়ো সহজ কাজ নয়। গোলগাল থপথপে ছোটখাটো বধূটির গা ঘেমে যেত, গলা শুকিয়ে যেত তেষ্টায়। তিনি হাত দুটো ভাঁজ করে আড়াবাঁশের উপর ভর দিয়ে পাড় দিতেন ঢেঁকিতে। নাদনা সপাটে এসে পড়তো নোটে, শাশুড়ি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কোলের ছেলেকে দুধ দিতে দিতে এলিয়ে দিতেন চাল। তখনও তাঁর শাশুড়ির কোলে একটি এবং পেটে একটি সন্তান। গুঁড়ো চাল আলটানোর জন্য থাকতো সমুর মা। এখনো যেন মনের মধ্যে সেই ঢেঁকির পাড় দেবার আওয়াজ পান স্নেহলতা। সেই ঢেকুস-কুস ঢেকুস-কুস শব্দটা!!

বড়ো দেরী হয়ে যাচ্ছে। এবারে কাজ শুরু না করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ক্লিক্স-গ‍্যাসের বার্নার অন করে পিতলের কড়াটা চাপিয়ে দুধ ঢাললেন কড়ায়। আগের দিন চুষি কেটে রেখেছেন তিনি। আজ চুষি আর পুলির পায়েস করবেন বলে। করবেন আরো অনেক কিছু। হাতের নাগালে চাল, গুড়, নারকেল গুছিয়ে রাখলেন। তখনই পাশের ফ্ল্যাট থেকে বিশাল জোরে একটা ঝনঝন করে পাত্র পড়ার আওয়াজ এবং তার সঙ্গে মহিলা কন্ঠের তীব্র চিৎকার শুনে আপাদমস্তক শিউরে উঠলেন স্নেহলতা। অটোমেটিক রিফ্লেক্সে তাঁর হাত চলে গেল বার্নারের সুইচে।

(2)

এই জায়গাটার নাম হুবলি। কর্ণাটকের একটি ছোট্ট অঞ্চল। মাত্রই চারশো চার বর্গ কিলোমিটার এর আয়তন। এখানে একে লোকে মিনি মুম্বাই বলে ডাকে। সুমির এখানে পাঁচ বছর হয়ে গেল জয়েনিং। যখন এখানকার বিখ্যাত কিমস হাসপাতালে অ্যাপ্লাই করেছিলো সে, এখানকার সিনিয়র সার্জন মি.নারেকুলি তার রেজুমে দেখে অবাক হয়েছিলেন। সুমি জানে তার ঝকঝকে বায়োডেটা নিয়ে সে দেশের সবচেয়ে বড়ো হাসপাতালেও অনায়াসে চান্স পেতে পারতো। কিন্তু এই নির্বাসন সে নিজে বেছেছে। কলকাতা তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। হার্টে স্পেশালাইজেশন করা সুমনা ভৌমিক কখন যে তার নিজের হার্টের একটা বিট মিস করে গেছিলো, বুঝতে পারে নি। যখন সচেতন হলো, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হৃদয় জুড়ে তখন তনুময়। পেডিয়াট্রিক সার্জন। কিন্তু সেকথা সে কখনো বলতে পারেনি তনুময়কে। বলা ভালো, সুযোগই পায়নি। ততদিনে জেনেছে তনুময় অনেক অল্প বয়স থেকেই স্টেডি রিলেশনশিপে আছে অহনার সঙ্গে। অহনা, চুপ করে থাকা ক্লাসের শান্ততম মেয়েটা। বিনা যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছে জীবনের প্রতি মুহূর্তে হারতে থাকা সুমনাকে।  তারপরই নিঃশব্দে এখানে চলে আসা।

     হাসপাতালের ব‍্যস্ত করিডোরে কেমন থম মেরে দাঁড়িয়ে ছিল সুমি। দূর থেকে খেয়াল করছিলেন ড: নারেকুলি। প্রথম দিন থেকেই মেয়েটির মায়ায় পড়ে গেছেন তিনি। ইন্টারভিউ বোর্ডে ওর বায়োডেটা দেখে চমকে গেছিলেন। কিন্তু কোনো অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করেন নি। মেয়েটির চোখে কি কোনো বেদনা দেখেছিলেন তিনি? এখন অত আর মনে নেই। আস্তে করে পিছন থেকে সুমির কাঁধে হাত রাখলেন ডাক্তার। 

'হাই ভৌমিক',...বললেন ডাক্তার। 'ওভার ফ‍র টুডে? আই উড লাভ টু ড্রপ ইউ অফ, ইফ ইউ ওয়ান্ট।' 

       সুমি থমকালো। এই মানুষটির স্নেহ প্রথম দিন থেকেই সে অবিরত পেয়ে আসছে। সেও বড়ো শ্রদ্ধা করে মানুষটিকে। কিন্তু আজ সে কিছুক্ষণ একটু একা থাকতে চাইছে। নিজের মুখোমুখি হতে চাইছে। তাই স‍্যারকে না বলতেই হবে।

থ‍্যাঙ্কস স‍্যার। বাট আই হ‍্যাভ প্রায়ার এনগেজমেন্ট টুডে। রোমি হ‍্যাস ইনভাইটেড মি টুডে। আই হ‍্যাভ টু গো টু ধরোয়াড নাও। আই উইল টেক আ ক‍্যাব।'

ক‍্যারি অন দেন। এনজয় ইওরসেলফ।' 

      সুমির মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন নারেকুলি স‍্যার। খারাপ লাগছিল সুমির, স‍্যারকে ফিরিয়ে দিতে। যদিও রোমি সত্যিই তাকে পৌষসংক্রান্তিতে প্রত‍্যেকবারের মতো এবারও নেমন্তন্ন করেছে, কিন্তু সুমি জানে ওদিকে ঠাম্মি অপেক্ষা করবে তার জন্য। তাই ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। নাহলে এদের পৌষসংক্রান্তি উৎসবের অনুষ্ঠান তার খুব ভালো লাগে। আর গত চার বছর যদি কেউ তার মনের এতটুকু কাছাকাছি আসতে পারে, সেটা রোমি। রোমিলা কোপ্পিকার। অঙ্কোলজিস্ট। ধরোয়াডে থাকে। সুমি থাকে জনতা বাজার, কোপ্পিকার রোডে। অনেকটা রাস্তা। অ্যাপে একটা ক‍্যাব ডেকে নিলো সে।

        মায়ের কথা মনে পড়ে না সুমির। তার ছোটবেলা পুরোটাই ঠাকুমার আঁচলে। বাবা যখন নতুন মাকে নিয়ে এলো, তিনি সুমির সঙ্গে সরাসরি খারাপ ব‍্যবহার না করলেও তার প্রয়োজন অপ্রয়োজন নিয়ে বরাবরই উদাসীন ছিলেন। তাছাড়া ভৌমিক বাড়িতে সারাজীবন ছেলেদের কদর বেশি। তাই নতুন মা আসার এক বছরের মধ্যে যখন একটি টুকটুকে ভাই হলো সুমির, বাড়ির সবাই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলো... তাদের সেজো ছেলের পরকাল সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে। সুমির পাকাপাকি ব‍্যবস্থা হলো ঠাম্মির ঘরে। সেখানেও খুব স্বস্তি পায়নি সে। বেশ মনে আছে তার, দাদু একেবারেই তাকে সহ‍্য করতে পারতেন না। হয়তো ঠাম্মির সময় থেকে ভাগ বসাতো বলে। সুমি তাই প্রায় অদৃশ্য হয়ে ঘুরে বেড়াতো বাড়িময়। কখনো সিঁড়ির নীচের ছোট্ট জায়গায়, কখনো বা কারো ঘরের খাটের নীচে। সঙ্গী বলতে বই। সেটা নিয়ে এক ঠাম্মি আর সবার বড়ো জ‍্যাঠতুতো দিদি ছাড়া বাকি সবার দাঁত খিঁচুনি শুনতে হয়েছে। ব‍্যঙ্গ কানে এসেছে,' বিদ্যে দিগগজ' বলে। পড়াশোনায় যতই সে বাকি ভাইবোনদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে, ততই ঈর্ষায় জ্বলে মরেছে তার মা, জেঠিমারা। একদিন ন‍্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে গেল সুমি। নিতান্ত পড়াশোনায় মাত্রাছাড়া ভালো থাকার কারণে তার পড়া বন্ধ করার সাহস পাননি দাদু। প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের কাছে কৈফিয়ৎ দেবার মতো সিচ‍্যুয়েশন হোক, চাননি তিনি। তারপর সময়ের হাত ধরে বিখ্যাত কার্ডিও সার্জন হয়ে গেল সুমি, ডাক্তার সুমনা ভৌমিক।
(3)

 দিদি, তোর সঙ্গে দরকার ছিল। একটু সময় লাগবে। তুই তো আবার কালই বুড়িকে নিয়ে রওনা দিচ্ছিস। তার আগে সুযোগ না মিলতে পারে। তাই এখনই চলে এলাম।

        রাত গভীর হয়েছে। পরের দিন সকালে ফ্লাইট, রওনা দেবার। নাহ্, সুমি এখানে আর ঠাম্মিকে রাখবে না। তাহলে ঠাম্মি আর একবছরও টানতে পারবে না নিজের জীবনটাকে। টুকটাক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শেষ মুহূর্তে গোছাচ্ছিল সুমি। একবার নিজের হ‍্যান্ডব‍্যাগটা খুলে সব চেক করে নিচ্ছিল। সকালে একটা ক‍্যাব ডেকে নেবে। এমন সময়ে ভাইয়ের আবির্ভাবে ভেতরে ভেতরে চমকালেও, বাইরে নির্লিপ্ত সুমি। খবর পেয়েছে সে দিদির কাছে, ভাইটা তার একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। মাতলামি, রাস্তায় মেয়েদের সঙ্গে অসভ‍্যতা, ফেরেববাজি… গুণের শেষ নেই তার। বাড়ি আসার পর থেকে গত দুদিনে একবারের জন্যও ভাই তার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি। বলা ভালো ধারকাছ মাড়ায়নি। সুমিরও যে খুব ইচ্ছে ছিল এমনটা নয়। তবু ভাই কেন এসেছে সে আজ শুনবে।

আমার সঙ্গে? আচ্ছা বল, শুনি কি কথা।

না মানে দেখ, আমি অত তোদের মতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই সোজাসুজি বলছি। আমার কিছু টাকা চাই।

টাকা? কি করবি? কত টাকা চাই?

আপাতত লাখ তিনেক দে। একটা বিজনেস করার ইচ্ছে। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে। হিসেব করে দেখেছি, টার্ণওভার ভালো। ঠিকঠাক চালাতে পারলে ছ মাসে টাকা উঠে আসবে। 

     ভাইয়ের দাঁড়ানোর ভঙ্গি বেপরোয়া। বডি ল‍্যাঙ্গোয়েজে মিথ‍্যাচারের ছাপ স্পষ্ট। সুমিকে কঠোর হতেই হবে।

তিন লাখ টাকা! অত টাকা আমি কোথায় পাবো? আর কিসের বিজনেস করবি? গাঁজার? তোর গাঁজা পার্টির বন্ধু তো?

    পলকে মুখ লাল ভাইয়ের। প্রথমে ধরা পড়ার। তারপর রাগ, হিংস্রতা, কুটিলতা...পরপর খেলে গেল মুখের উপর।

তোর খুব বাড় বেড়েছে দেখছি। দিদি বলে সম্মান দিলাম বলে নাকি, হ‍্যাঁ!! তোর মতো ওর'ম ডাক্তার না, আমার পকেটে পুরি দুবেলা, বুঝলি? নিতান্ত ভৌমিক বাড়ির ছেলে, আর মা বারবার বলে দিয়েছে ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে, তাই। নাহলে তোর মতো দুপয়সার ডাক্তারকে এই শর্মা পোঁছে না।

    মাঝরাতে সুমির ঘরে ভাইয়ের অভিযানের পেছনের রহস্য পরিষ্কার। মা পাঠিয়েছে ওকে। হয়তো বাবারও সম্মতি আছে। মলিন হাসি ফুটে উঠলো সুমির মুখে। ভৌমিক পরিবারে তার জায়গার কোনো বদল আদতে নেই। আর হবে বলে মনেও হয় না। দৃঢ় সংকল্পে স্থির হলো সুমি, ঠাম্মিকে নিয়ে এই যে সে ফিরে যাচ্ছে… ফিরেই যাচ্ছে। সব বেদনা, অভিমান, আকাঙ্ক্ষা, পরিবার...সব, সব কিছু বরাবরের মতো ফেলে রেখে। আপাতত মাথা ঠান্ডা করে কথা বলতে হবে। ঠাম্মিকে নিয়ে বিনা বাধায় যেন সে ফ্লাইট ধরতে পারে।

বেশ। শুনলাম। বুঝলাম ও সবটা। কিন্তু এখন তো আমার কাছে এত টাকা নেই। অ্যারেঞ্জ করতে হবে। আমার একটু সময় লাগবে।

    আবার লোভে চকচক ভাইয়ের মুখ। হাত কচলে বিনয়ের অবতার।

সে ঠিক আছে। তুই আপাতত হাজার পঞ্চাশ দে। তোকে কাল এয়ারপোর্ট ছেড়ে আসি, হ‍্যাঁ? অত সকালে ঠাম্মিকে নিয়ে একা একা যাবি? খুব রিস্কের হয়ে যাবে। কাছে টাকাপয়সা আছে। বিপদ হতে কতক্ষণ?

না রে। টাকা পয়সা বিশেষ কিছু নেই কাছে। সময় পাইনি তো। ঠাম্মির খবর পেয়েই দৌড়েছি। দেখ না, অন্য ব‍্যাগ নিয়ে এসেছি বলে কার্ড টার্ড সব ফেলে এসেছি। আমি ফিরে গিয়ে দেখছি, কতটা কি করতে পারি।

যাঃ শালা! তার মানে খালি হাতে এসেছিস? মাইরি দিদি। তুই যে ক‍্যালানে ছিলি, তাই রয়ে গেলি। তাহলে ক‍্যাব ভাড়া করবি যে? আমার কাছে কিন্তু কিছু পাবি টাবি না। 

   জ্বলে গেল সুমির কান। এত অশালীন হয়েছে ভাই!! মুখে অমলিন হাসি সুমির। সংযত হও সুমি, সংযত হও...

আরে, তোকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আর অত সকালে উঠতেও হবে না তোকে। আমি ঠিক ম‍্যানেজ করে নেবো।

বলছিস?...

                  ভাইয়ের মুখে নিশ্চিন্ততা। বেশিক্ষণ ভালোমানুষের মুখোশ পরে থাকা তার স্বভাব বিরুদ্ধ। তারপরই অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন...সুমির হাড় অবধি ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।

তনুময়দার খবর রাখিস এখন?

তনুময়!! চিনিস নাকি ওকে তুই?

বাহ্! চিনবো না? আমার দিদি কার সাথে কি মারিয়ে বেড়াচ্ছে, খবর রাখার দায়িত্ব নেই আমার?

ভাই, সভ‍্যতার মাত্রা ছাড়াচ্ছিস কিন্তু…

               সুমির মুখ লাল। হাত শক্ত মুঠিতে। ক্রুর চোখে ভাই। পলকে স্বাভাবিক হাসি। সহজ করে নেবার চেষ্টা।

আরে নাহ্… আমি জাস্ট মজা করছিলাম তোর সঙ্গে। ওকে, গুডনাইট। শুয়ে পড়। ভোরে উঠতে হবে তোর। তাহলে ওই কথাই রইলো। ফিরে একটু চেষ্টা কর। তাড়াতাড়ি কিন্তু, ঠিক আছে?

     বেরিয়ে গেছিল ভাই, সুমিকে আদ‍্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে। কলকাতা ছাড়ার পর বেশ কয়েকবার সুমিকে ফোন করেছে ভাই, টাকার আশায়। শেষের দিকে অকথ্য গালিগালাজ করে। সুমি মাকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল, সে এই মুহূর্তে কোনো টাকা খরচ করার মতো অবস্থায় নেই। সেটা শোনার পর অমন রত্ন ভাইটি কি তাকে পূজো করতো?

পৌঁছে গেছে ক‍্যাব, রোমির বাড়ি। মুখে একটা আলগা হাসি নিয়ে নেমে পড়লো সুমি। আলতো করে রোজকার মুখোশ টেনে নিলো মুখে। এখন থেকে এটাই তার মুখ। আজ ডিউটি শেষ হবার কিছুক্ষণ আগে ফোন এসেছিল ভাইয়ের। তনুময় বিয়ে করেছে অহনাকে। খবরটা প্রত‍্যাশিত ছিল। অবাক হয়নি সুমি ঠিকই, কিন্তু সেটা দেবার মধ্যে ভাইয়ের গলায় যে হিংস্র আনন্দ পেয়েছে সে, তাতেই আলোড়িত, বিষন্ন তার মন। কেন এমন হচ্ছে! তনুময় অহনা সুখী হোক, তাদের ভালোবাসা সফল হোক... এটাই তো হওয়া উচিত! ভালোই হয়েছে। সুমি আর ভাববে না ওদের কথা। জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের কাছে আজকের দিনে জালিকাট্টুর মতো একটা খেলা হয়, ওটাই আবার সুমির ফেরার রাস্তা। জ‍্যাম হয়ে যাবে। তাই তাড়াতাড়ি ফেরার চিন্তা মাথায় রেখে রোমির বাড়ি ঢুকে পড়লো সুমি। ওকে দেখতে পেয়েই রোমি দৌড়ে এলো। কলকলিয়ে উঠলো মাতৃভাষায়…'মা, সুমি নিভু সেভিসিদ্দিরা'...ইউ নো সুমি...মা নিম্মাগাগি অসহানিন্দা কায়ুদিদ্দানি…!!'

সুমি হাসলো… 'গেট ইট রোমি। আন্টি ইজ ওয়েটিং ইগারলি ফর মি...রাইট?'

রোমি একগাল হেসে সুমিকে জড়িয়ে ধরলো…'রাইট'।...

(4)

এবাড়ির তেতলায় মালকিন থাকেন, একলাই। মধ‍্যবয়সী কোঙ্কনী মহিলা। ছেলেমেয়েরা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। খবরাখবর যেটুকু, তা ফোনে এবং ভিডিও কলে। নিজে একেবারেই পরমুখাপেক্ষী নন, তাই দোতলার দুটো ফ্ল্যাট ভাড়া, এবং একতলায় তিনটে দোকান ভাড়া ছাড়াও ঘরে বসে তিনি একটি জনপ্রিয় মশলা, গানপাউডার বানান। স্নেহলতা দোতলা থেকে সে মশলার গন্ধ পান। প‍্যাকেট করা মশলা লোক এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। মুকুলিকা কেলেকার নামের ওই শক্তপোক্ত মহিলার প্রতি একটি স্নেহমিশ্রিত শ্রদ্ধা আছে স্নেহলতার। সুমির সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব ভালো। মাঝে মাঝে সুমি তাঁর সঙ্গে কাছের কোপ্পিকার রোডের  জনতা মার্কেটে যায়। ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে দুই অসমবয়সীর। সন্ধ‍্যেবেলায় মাঝে মাঝে কাছের চাট গলিতে যায় দুজন। এখানে চাট খুব বিখ্যাত। একদিন জবরদস্তি করে খাইয়েছিল তাকে সুমি। 

     হাতে কাজ না থাকলে মুকুলিকা কখনো সখনো স্নেহলতার কাছে নেমে আসে গল্প করার জন্য। মোটামুটি কাজ চালানোর মতো হিন্দি শিখেছেন স্নেহলতা, তার সঙ্গে থেকে থেকে। সামনের ফ্ল্যাটের বৌটি যদিও বাঙালি, কিন্তু বড়ই উন্নাসিক। কারো সঙ্গে কথা বলেনা সে। দুটি ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে বাস করে। প্রথম দিকে স্নেহলতা চেষ্টা করেছিলেন কথা বলার। কিন্তু অপরপ্রান্তে উৎসাহ না দেখে ক্ষান্ত হয়েছেন। ওরা এখানে এসেছে মাস ছয়েক। কিন্তু দু তিন দিনের বেশি দরজা খোলা দেখেননি স্নেহ। মাস দুয়েক আগে বেশ চেঁচামেচি কানে এসেছিল তাঁর। সম্ভবত স্বামী স্ত্রীর মধ্যে। তারপর থেকে ওদিক আরো চুপচাপ। 

     গতকাল দুপুরবেলা মুকুলিকা গল্প করতে এসেছিল তাঁর কাছে। তার কাছ থেকে অদ্ভুত সব খবর পেলেন তিনি। এসব গল্পে তাঁর উৎসাহ না থাকলেও বাড়ির মালকিনকে চটানো ঠিক হবে না, তাই চুপ করে ছিলেন। বলছিল বটে মুকুলিকা, 'আন্টিজি, আপনে কুছ সুনা কেয়া?'

            স্নেহলতা কাঁথা বানাচ্ছিলেন। তাঁর কিছু পুরোনো কাপড় জমেছে। সুমি পুরোনো কাপড়ের নরম কাঁথা গায়ে দিতে বড় ভালোবাসে। দাঁত দিয়ে সুতোটা কেটে তিনি চোখ তুললেন…

কেয়া রে?

আপকো পতা নহী, উস ঘমন্ডীকা সোহর তো ভাগ গয়া!...ফিসফিসে গলা মুকুলিকার।

ভাগ গয়া! ...বলে কি এ মেয়ে! স্নেহলতার অবশ হাত পড়ে রইলো কাঁথার উপর।

হানজি! বহী তো বোল রহী হুঁ। উসদিন জো দোনোমে অনবন হো রহা থা না, তবসে...

ফির? উসকা খানাপিনা?...স্নেহলতা বলতে চান অনেক কিছু। ভাষা আটকায়।

বহী তো!!...মুকুলিকা স্নেহলতার না বলা কথা বুঝতে পারে। 

দেখিয়ে না। হমে তো অ্যাডভান্স দেকে রখ্খা হ‍্যায় দো মহিনেকা। লেকিন উনকা বাকি কাম ক‍্যায়সে সমহাল রহা হ‍্যায়, পতা নহী।

    স্নেহলতার মুখে চিন্তার ভাঁজ। গতকালও মেয়েটিকে দুপুরবেলা চুপিচুপি একটা বড়ো কাপড়ের ব‍্যাগ নিয়ে বেরোতে দেখেছেন তিনি। বাচ্চাগুলোকে তালাবন্ধ করে রেখে। বেশ ভালো জামাকাপড় পরা। সুশ্রী অল্পবয়সী মেয়েটির চোখমুখে একটা নরম মায়া জড়ানো থাকে। তার ব‍্যবহারের সঙ্গে যেন চেহারা খাপ খায়না। নাহ্, কোথাও একটা মিলছে না হিসাব।

লেকিন উসকা জামাকাপড় তো আচ্ছা হ‍্যায়, দেখতি হুঁ!...স্নেহলতার নতুন শেখা ভাষা বিদ‍্যা এর বেশি নেই।

কপড়ে তো রহতা হ‍্যায় না আন্টিজি, ঘরমে দো দশ? লেকিন খানেকা ইন্তেজাম ক‍্যায়সে কর রহী হ‍্যায়, কওন জানে!!...রহস‍্যের সুর মুকুলিকার গলায়।

লেকিন উসকা ঘর সে তো খানা কি আচ্ছা গন্ধ...মানে কি বলে… খুশবু আতা হ‍্যায়!!...এটুকু বলতে পেরে হাঁপিয়ে উঠলেন স্নেহ।…'সায়দ চিকেন, মছলী কা!!'

ওহ তো পতা নহী আন্টিজি। মেরা তো ব‍্যস এক হী চিন্তা… রেন্ট ক‍্যায়সে দে পায়েগী আগে!!!


      এসব কথা গত সপ্তাহে হলো না? পাশের ফ্ল্যাটে চিৎকার আর বাসন পড়ার আওয়াজ পেয়ে ক্লিক্স বন্ধ করতে করতে ভাবছিলেন স্নেহলতা। এখন বাচ্ছাদের চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ আসছে। কোনমতে পরণের শাড়িটা গাছকোমর করে দৌড়লেন পাশের ফ্ল্যাটে। আওয়াজ পেয়ে মুকুলিকাও 'কেয়া হুয়া..কেয়া হুয়া' করতে করতে নামছিলো। ততক্ষণে এক ধাক্কায় দরজা খুলে ফেলেছেন স্নেহলতা। খুলেই স্থির। সারা ঘরময় খবরের কাগজ ছড়ানো। তার উপরে ঝোলের স্রোত। আদা রসুন পেঁয়াজ কষানোর গন্ধ। বেশ কয়েকবার প্রেসার কুকারের সিটি ও শুনেছেন একটু আগে। কিন্তু ঘরময় যে ঝোল পড়ে আছে, তাতে তো কিছুই নেই! না চিকেন, না মাছ, না সবজি!! শুধু জল!! এর মানে…!!

        ঘন্টাখানেক পর কিছুটা সিচ‍্যুয়েশন সামলে দিয়ে এলেন মুকুলিকা আর স্নেহলতা। বাচ্ছাদুটোকে আপাতত মুকুলিকা তার ঘরে নিয়ে গেছে।  স্নেহলতা বৌটিকে টেনে নিয়ে এসেছেন তাঁর ঘরে। বেশ অনেকটা পুড়েছে মেয়েটির পা। ধৈর্য আছে মানতে হবে মেয়েটির। যতক্ষণ পেরেছেন বরফ জলে পা ডুবিয়ে রেখেছিলেন মেয়েটির। এখন হালকা করে পোড়ার মলমের আস্তরণ দুই পায়ের উপর দিয়ে নিজের কাছে একটা টুলে বসিয়ে রেখেছেন। একটু একটু করে নর্মাল হয়েছে মেয়েটি। আজ প্রেসার কুকার নামাতে গিয়ে বার্স্ট করে সারা ঘর না হলে জীবনের আরো একটা দিক স্নেহলতার অজানা থেকে যেতো।

       মেয়েটির নাম মৃদুলা। কোন্নগরের মেয়ে। কলকাতায় গার্লস হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার সময় বরুণের সঙ্গে আলাপ। অদম্য, উদভ্রান্ত প্রেম। বাড়ির অমত হবে জানতোই, তাই লুকিয়ে বিয়ে করেছিল। তবে থেকেই বাড়িছাড়া। এখন দুটি বাচ্ছা হবার পর জেনেছে, তার এ বিয়ে কোনো বিয়েই নয়। বরুন আগে থেকেই বিবাহিত, আরো দুই সন্তানের বাবা। এ নিয়ে অশান্তি শুরু হতেই বরুণ তাকে এখানে নিয়ে আসে। গতমাসে আবার গন্ডগোল হবার পর কিছু না বলে চলে গেছে বরুণ। এখন কোথায় আছে, কি করছে… কিছু জানেনা মেয়েটি। ফোনের সিম পর্যন্ত বদলে নিয়েছে বরুণ।

এখন কি করবে ভেবেছো? তোমার চলছে কি করে? রোজ দুপুরে তোমাকে বেরোতে দেখি। কোথায় যাও তুমি?...স্নেহলতার মনে অজস্র জিজ্ঞাসা।


জানিনা ঠাম্মি।… মেয়েটির চোখ ছলছল।...চেষ্টা করছি লড়াই করবার। বাচ্ছাদুটোকে তো বাঁচাতে হবে। কিছু তো পারিনা। ঘরে কিছু খবরের কাগজ ছিল। একটা ঠোঙা ছিঁড়ে সেটা দেখে ঠোঙা বানানো শিখেছি। রোজ ওগুলো নিয়ে বেরোই। যা বিক্রি করতে পারি। এদের ভাষাও তো ভালো বুঝতে পারিনা। 

...অঝোরে জল গড়াচ্ছে মেয়েটির চোখ দিয়ে। পর্দা উঠে গেছে। সবটাই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। সামনে অস্বচ্ছ ভবিষ্যৎ।

ঘরে টাকা পয়সা কিছু রেখে যায়নি? তোমার ব‍্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই?... গালে হাত অবাক স্নেহলতার…

না ঠাম্মি, বাইরের কোনো কাজ কখনো করতে হয় নি। সবটাই বরুণ দেখতো। এখন আমি কি করবো বলতে পারো? বাচ্ছাগুলোর জন্য তো মরতেও পারছি না। ফেরার কোনো জায়গা নেই।..

কি অসহায় এখনো আমরা, মেয়েরা...ভাবলেন স্নেহলতা। ক্লিক্স অন করলেন আবার। দুধটা এবার নষ্ট হয়ে যাবে। সময় ও চলে গেছে অনেকটা।

আর তোমার বাড়ি থেকে যে রোজ ভালোমন্দ রান্নার গন্ধ পেতাম? সেটা কি ছিল?... 

কড়াইয়ে হাতা চালালেন স্নেহলতা। বড়ো আশ্চর্য লাগছে তাঁর। মেয়েটি অধোবদন। চোখে টুপিয়ে ওঠা জল।

যা দেখলে ঠাম্মি। অভাবের কথা লোক জানাতে একদম ভালো লাগে না। ঘরে অল্প কিছু চাল ডাল পড়েছিল। ভাবছিলাম রাগ পড়লে বোধহয় বরুণ ফিরবে। কিন্তু সিম পালটে নিয়েছে যখন… চুপ করলো মেয়েটি।

বাচ্ছারা পিঠে খেতে নিশ্চয়ই ভালোবাসে। আমার সঙ্গে হাত লাগাও দেখি। দুজনে মিলে পিঠেগুলো বানিয়ে ফেলি। তারপর একসঙ্গে খেতে বসবো। তুমি দুটো চাল ওই কৌটো থেকে নিয়ে আলু দিয়ে উপরের গ‍্যাসে বসিয়ে দাও। বাচ্ছাদের খিদে পেয়ে গেছে এতক্ষণে। পরের ভাবনা পরে ভাবি। চলো চলো, শুরু করো।

সুমির এখানে ভালোই জানাশোনা হয়ে গেছে। মুকুলিকা আছে সঙ্গে। মেয়েটার একটা ব‍্যবস্থা হয়েই যাবে। তার যুদ্ধে এ বাড়ির তিনটে মানুষ পাশে থাকতে পারবে না? বুড়ো বয়সে স্নেহলতার আর একটি নাতনি লাভ হলো, এই যা।

জোরে জোরে কড়াইয়ের মধ্যে হাতা চালাতে লাগলেন স্নেহলতা। দুধ ঘন হয়ে এসেছে। ঠিকমতো না নাড়লে ধরে গন্ধ বেরিয়ে যাবে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি