দূরদেশের লোকগল্প-- আফ্রিকা (নাইজিরিয়া)- চাঁদ-সূর্যের ঘরবাড়ি/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- আফ্রিকা (নাইজিরিয়া)

চিন্ময় দাশ
চাঁদ-সূর্যের ঘরবাড়ি

বিরাট এই দুনিয়ার সকলেই তো নিচে মাটিতে বাস করে। কিন্তু চাঁদ আর সূর্য আকাশেই থাকে কেন-- এই নিয়ে অনেক ভাবনা পুরানো দিনের মানুষদের।অনেক কল্পনা। অনেক গল্পগাছা। নানা গল্প শোনা যায় পৃথিবীর দেশে দেশে।  আজকের এই গল্পটা আফ্রিকার নাইজিরিয়ায় খুব প্রচলিত। 
গল্পটা অনেক অনেক কাল আগের। কত কাল আগের, সেটাও জানা নাই অনেকের। তাছাড়া, গল্পই বা বলি কেন একে?  ঘটনাটা ঘটেছিল বাস্তবেই। ব্যাপারটা ছিল একেবারে গল্পকথার মত তো, তাই গল্প বলা হয় এটাকে। 
  যাক, ঘটনাই হোক, বা গল্প-- শুনে নেওয়াই ভালো।
তখনকার দিনে সূর্য আর সমুদ্রের ছিল ভারী বন্ধুত্ব। দুটিতে একেবারে গলায় গলায় ভাব যাকে বলে, এই আর কী। আসলে,  দুজনেই তখন বাস করত পৃথিবীতে। আর একই এলাকায় বাস হলে, যা হয়। প্রথমে ভাবসাব।  তারপর বন্ধুত্ব হতেও দেরি লাগেনি। পরে তো একেবারে বেশ গলায় গলায়। দুটো দিন কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারে না। 

  সূর্য আবার একটু বেশি অধীর। দু'দিন বন্ধুকে না দেখলেই, তার মন আনচান করে ওঠে।  সোজা এসে হাজির হয়ে যায় সমুদ্রের কাছে। কথাবার্তা কী হয় দুজনের, তা কেউ জানে না। কিন্তু, আলাপ-সালাপ যে চলে অনেক সময় ধরে,  সেটা সবাই দেখে, সবাই জানে। 
  তবে ব্যাপার হল, সূর্যই গিয়ে হাজির হয় সমুদ্রের কাছে। সমুদ্র কিন্তু কোনদিন সূর্যের বাড়ি আসে না।  অবশ্য এই নিয়ে কোনও দিন কিছু মনে হয়নি সূর্যের। সাদাসিধে মানুষ সে। বন্ধুর সাথে দেখা হয়। গল্পগুজব হয় দুজনে।  এতেই তার মনে শান্তি। এতেই সে খুশি। 
কিন্তু তার বউও যে স্বামীর মত ভালোমানুষটি হবে, তার তো কোন কথা নাই। সূর্যের বউ হল চাঁদ।  একদিন সূর্যের এই একতরফা যাওয়া নিয়ে খটকা দেখা দিল চাঁদের মনে। 

  চাঁদ একদিন বলেই ফেলল তার স্বামীকে-- একটা কথা জানতে চাই তোমার কাছে।  অনেক দিনই বলব বলব করেও বলতে পারি না। 
সূর্য একটু গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে, বলল-- আরে, সে কী? তোমার কাছে না বলবার মত কী কথা আছে? বলো, কী বলবে। 
  চাঁদ বলল-- সমুদ্রের সাথে তোমার বন্ধুত্ব, সে বেশ ভালো কথা। দু'দিন বন্ধুর সাথে কথা না বললে, মন ছটফট করে তোমার।  দু'দিন না যেতেই বন্ধুর বাড়ি দৌড়াও-- সব ঠিক আছে। কোনদিনই কিছু বলিও না আমি। কিন্তু-- 
  চাঁদ থেমে যেতে, সূর্য বলল-- কিন্তু বলে থেমে গেলে কেন? মনে কোনও কিন্তু চেপে রাখতে নাই। বলে ফেলো। 
  -- চিরকাল দেখি তুমিই যাও বন্ধুর কাছে। তোমার বন্ধু তো কখনোও আমাদের বাড়ি আসে না। কেন গো?  
সূর্যের তো কোনদিন মনেই আসেনি কথাটা। কী জবাব দেয় বেচারা!
  বউ জিজ্ঞেস করল-- তুমি কোনও দিন সমুদ্রকে বলোনি আমাদের বাড়ি আসবার কথা?
সূর্য আমতা-আমতা করে বলল-- সত্যিই তো, আমি কিন্তু কোনদিন বলিনি। কথাটা ঠিক বলেছো, গিন্নি।
বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলল-- কোন কাজটা তোমাকে দিয়ে ঠিক-ঠাক হয়েছে, বলতে পারো আমাকে? যাও, এখুনি যাও তুমি।  আর শোন, দায়সারা ভাবে বলো না যেন। বেশ খাতির করে, আগ্রহ করে বলবে। রাজি না হলে, জোরাজুরি। কেমন? 
 
  সূর্য এবার যেন বেশ চাঙ্গা। এতদিনের এত বড় একটা ভুল-- আজ শুধরে নেওয়া যাবে। মনে  মনে বউকে তারিফ করতে করতে, উঠে পড়ল সে। বাধ্য ছেলেটির মত বেরিয়ে পড়ল সমুদ্রের সাথে কথা বলতে।
তখনই সূর্য এসে হাজির হয়েছে সমুদ্রের কাছে। পাছে গল্পগাছার ভিড়ে, আসল কথাটা ভুলে যায়,  তাই প্রথমেই নিমন্ত্রণের ব্যাপারটা পেড়ে ফেলল-- একটা কথা বলবার ছিল, বন্ধু।
  সমুদ্র বলল-- কী কথা, বলো। 
-- আমি নিয়মিত আসি তোমার বাড়ি। তুমি তো কোনও দিন আমার বাড়িতে আসো না। বিশেষ কোনও কারণ আছে? 
  এ কথার কী জবাব দেবে। একটু চুপই করে রইল সমুদ্র। 

  সমুদ্রকে চুপ করে থাকতে দেখে, সূর্য একটু ঘাবড়ে গেল। নিশ্চয় গুরুতর কিছু আছে তাহলে। সে বলল-- চুপ  করে থেকো না, বন্ধু। বলতেই হবে, কেন আমাদের বাড়ি যাও না তুমি।
  -- না, না। চুপ করে থাকবো কেন? সমুদ্র জবাব দিল বটে, একটু কিন্তু কিন্তু করে। বলল-- আসলে,  বললে তুমি হয়তো মনে কষ্ট পাবে, তাই চুপ করে আছি। হয়েছে কী, তোমার বাড়িটা একটু বেশি ছোট তো। আমাকে ধরবে না তাতে। 
  সূর্য অবাক হয়ে বলল-- বলছো কী, বন্ধু? এত বড় বাড়ি আমার। তোমাকে ধরবে না! 
সমুদ্র বলল-- নাগো, ধরবে না। জানো তো, কত বড় সংসার আমার। এই প্রথম যাবো তোমার বাড়ি।  একা একা তো আর যেতে পারি না। সবাইকে নিয়েই তো যেতে হবে। 
  সূর্যের তখন 'কুছ পরোয়া নাই' ভাব। বন্ধু আসবে তার বাড়িতে, এর চেয়ে আনন্দের কথা আর কী আছে। সে বলল--  ঠিক আছে। তোমার জন্য নতুন বাড়ি বানিয়ে দেব আমি। দুটো দিন সময় দাও তুমি আমাকে। মাত্র দুটো দিন--  একেবারে হাতে গোনা। ভরা সংসার নিয়েই এসো তুমি। তুমি আমার বাড়ি আসবে, এর চেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে? 

  সমুদ্র এবার হাসল একটু-- দেখো, বাপু। আমি পৌঁছালে, তোমাদের দুটিকেই না ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়।  তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিও না যেন। 
সূর্যও হেসে জবাব দিল-- রাখো তো তোমার দোষ দেওয়া না-দেওয়ার কথা। বিশাল প্রাসাদ বানিয়ে দেব তোমার জন্য। 
  সমুদ্র বলল-- ঠিক আছে তাহলে। ওই কথা রইল। ঠিক দুদিন বাদে, আমি পৌঁছে যাব তোমার বাড়ি। 
সূর্য ভারী খুশি। বলল-- এই দুদিন কিন্তু আর আসতে পারব না আমি। বাড়ি বানাবার কাজটা রয়েছে তো। তুমি আবার ভুলে যেও না যেন।
চোরা একখানা হাসি সমুদ্রের মুখে-- নাগো, না। এই প্রথম বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। তাও আবার পুরো সংসার নিয়ে।  একি ভুলে যাওয়ার কথা? তুমি যাও, আজ থেকেই কাজ শুরু করে দাও গিয়ে। 

  বাড়িতে দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়েছিল চাঁদ। সূর্য কখন ফিরবে, সেই অপেক্ষায়। এ যা মানুষ, কী বলেছে,  কী জবাব নিয়ে ফিরে আসে, কে জানে। সূর্যকে হাসি মুখে ফিরতে দেখে, চাঁদের মুখেও হাসি ফুটল। যাক, রাজি করাতে পেরেছে তাহলে। 
  সমস্ত কথা বউকে খুলে বলল সূর্য। চাঁদ বলল-- তাহলে আর সময় নষ্ট করা নয়। এখনই কাজে লেগে পড়তে  হবে আমাদের। 

  ঠিক আড়াই দিনে যা একখানা বাড়ি বানানো হল, সে বলবার নয়। দুনিয়ায় কেউ দেখেনি কোনদিন-- এমন একখানা বাড়ি।  বিশাল একখানা প্রসাদ। যতদূর চোখ যায়, শুধু কামরার পর কামরা। পাথরের উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সেটাকে। 

  ঠিক দু'দিন লাগল বাড়িখানা বানাতে। সব কাজ সারা হল যখন, তখন চাঁদ আর সূর্যের শরীর আর বইছে না।  দারুন খাটাখাটুনি গিয়েছে। বিছনায় গড়িয়েই, ঘুম এসে গেল চোখে। 
 
  ঘুম কখন ভাঙতো, কে জানে। ভেঙে গেল একটা ভীষণগুরু-গুরু গুম-গুম শব্দে। চাঁদ সূর্য দুজনেই উঠে পড়ল ধড়ফড় করে। দরজা খুলেই চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য। বিশাল এক জলরাশি এগিয়ে আসছে সামনে। হাসিতে মুখ ভরে গেল দুজনের। কথা রেখেছে সমুদ্র। বন্ধুর বাড়িতে এসেছে এতদিনে।
সূর্য দরজা ধরে হাসি মুখে বলল-- এসো বন্ধু, ভারী খুশি হয়েছি আমরা। 

  সমুদ্র তখন একেবারে সামনে এসে গিয়েছে। বলল-- এখনও সময় আছে। ভেবে বলো,  আমার ভিতরে যাওয়াটা কি সমীচীন হবে? বিপদ হবে না তো তোমাদের? 
  -- আরে, না না। বিপদ কীসের?  সূর্যের তখন আনন্দ ধরে না মনে-- বিশাল প্রাসাদ তৈরী হয়ে আছে তোমাদের জন্য।  খুশি মনে ভেতরে চলেএসো।
আসলে, ভুল হয়েছে সূর্যেরই। সমুদ্র আর তার ভরা সংসার কতটা বড়, তার কোনও ধারনাই ছিল না সূর্যের। নিয়মিত যায়,  গল্পগুজব করে সমুদ্রের সাথে। কিন্তু সমুদ্রের অবয়ব বা আয়তন কতখানা-- সে সম্পর্কে কিছুই জানা নাই তার। 

  এবার জল ঢুকতে শুরু করল সূর্যের নতুন প্রাসাদে। শুধু কি জল? হাজারো রকমের মাছ, হাঙর-কুমির, বিরাট-বপু তিমির দলও। জলের সব রকম জীবকে সাথে নিয়ে এসেছে সমুদ্র। তার কোনও দোষ নাই। ভরা সংসারই আসবার নিমন্ত্রণ  পেয়েছে-- তা-ই না এসেছে সবাই। 

  জল যখন ভিতরে ঢুকে চাঁদ-সূর্যের পায়েরপাতা ডুবল, সমুদ্র বলল-- কি বন্ধু, আর ঢুকবো? জবাব এলো-- বলছোটা কী?  ঢুকবে না কেন? ওসব প্রশ্ন করো না তো। ভেতরে এসো। 

  সমুদ্র যত ঢুকলো, জল বাড়তে লাগল। হাঁটু ডুবলো। কোমর ছাপিয়ে জল চড়ল চাঁদ আর সূর্যের বুক সমান। তারপর,  দেখতে দেখতে জল যখন গলা ছুঁয়ে ফেললো, সমুদ্র আবার জানতে চাইলো-- পেছনে কিন্তু এখনও অনেকে আছে।  সবাইকে কি আসতে বলবো?  
এখন সমস্যা বুঝতে পারছে চাঁদআরসূর্যও। কিন্তু এখন তো আর না করা যায় না। জবাব দিলো-- অবশ্যই বলবে।  তারা কি বাইরেই রয়ে যাবে না কি?  
জল একসময় ঘরগুলোর ছাদ ছুঁয়ে ফেলল। অগত্যা কী আর করে? চাঁদ আর সূর্য পিছোতে পিছোতে বাইরে বেরিয়ে, ছাদে উঠে পড়ল। তাতেও রেহাই হল না দুজনের। জল বাড়ছে তো বাড়ছেই। একসময় এতবড় প্রাসাদটা কোথায় হারিয়ে গেল, অথৈ জলের তলায়। চিহ্নটুকুও রইল না কোথাও। জল যত বাড়তে লাগলো, চাঁদ আর সূর্য উঠে যেতে লাগল উপর দিকে।
তারপর এক সময় সমুদ্র স্থির হল, বাড়লো না আর একটুও। তখন খেয়াল হল দুজনের-- আগের ঘরবাড়ি তো গেছেই।  নতুন করে পেল্লাই প্রাসাদ বানানো হল একখানা। সেটাও তলিয়ে গিয়েছে জলের তলায়। 
রাজ্যের চিন্তা এসে জড়ো হল সূর্যের মাথায়-- এখন তাহলে থাকব কোথায় দুজনে?   

  আকাশ সব দেখছিল উপরে বসে বসে। দেখছে, আর হাসছে মনে মনে। তার এতদিনের সাধ পূরণ হবে আজ।  বন্ধু পাওয়া যাবে। তাও আবার একজন নয়, একসাথে দু'জন বন্ধু। 
  সূর্যের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েছে। আকাশ তাকে ডেকে বলল-- ভাবনা কোর না, বন্ধু। যেখানে এসে পড়েছ দুটিতে,  এটা কিন্তু আমার বাড়ি। এসেছ যখন, থেকেই যাও এখানে। 
শুনে, বেশ ভালো লাগলো সূর্যের। কিন্তু দোনামনা করতে লাগল-- থেকে যাবো বলছো?  
আকাশ হাসি মুখ করে বলল-- কেন থাকবে না? আজ থেকে বন্ধুত্ব হল তোমাদের সাথে। নিজের বাড়ি ভেবে,  এখানেই থেকে যাও চিরকালের মত। মিলেমিশে থাকব তিন জনে। 

  সেই থেকে আকাশেই থাকে সূর্য আর চাঁদ। আকাশই হয়েছে দুজনের ঘরবাড়ি।তাতে অবশ্য লাভই হয়েছে সূর্যের।  নিত্যদিন দেখতে পায় সমুদ্রকে। ঘুম থেকে উঠে, আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত, পুরানো বন্ধুকে চোখে পড়ে তার।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া