আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪৯/ শ্যামল জানা


আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৪৯

শ্যামল জানা
সাররিয়েলিজম্ (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব)
    
ফ্রয়েড-এর যে দর্শনকে মূলত সাররিয়েলিজম্-এর ভিত্তি হিসেবে ধরা হল, তা যদি অতি সংক্ষেপে বলা যায়, তাহলে বলতে হয়— 

  ১. ভাবনাকে অবাধ করা, বা যুক্তি দিয়ে পরিচালনা না করা(Free association)৷ ঘুমের মধ্যে অবচেতনে দেখা স্বপ্নকে জাগ্রত অবস্থায় সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা(Dream analysis)৷ এবং অসচেতন স্মৃতির ভাঁড়ারকে(Unconscious mind)যতদূর সম্ভব সচেতনভাবে ব্যবহার করা৷ এগুলোকেই সাররিয়েলিস্টরা তাঁদের সৃষ্টির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেন৷ নিজেদেরকে উন্নত করার একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিলেন৷ এবং সেজন্য কল্পনাকে কত বেশি স্বাধীন করা যায়(যা একেবারেই Fantasy নয়, Surreal.৷ যাকে বলে Liberate imagination), সেই চর্চা বা অনুশীলনের ক্ষেত্রে জোর দিল৷

  ২. তাঁরা পাগলাটে বা খামখেয়ালিপনার(Idiosyncrasy) দ্বারা নিজেদেরকে জড়িয়ে রাখতেন৷ অনেকটা নিজেকে পাগল বা উন্মাদতুল্য করে গড়ে তোলার প্রয়াস বলা যেতে পারে৷ সাধারণভাবে মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকে, সচেতন অবস্থায়, ততক্ষণই সে কিছু না কিছু করে তার অভিজ্ঞতার সাহায্যে, যুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে! ফ্রয়েড-এর কথা অনুযায়ী চিন্তা, স্মৃতি, অনুভব ও ইচ্ছার সাহায্যে৷ কিন্তু পাগল বা উন্মাদদের ব্যবহারিক জীবনে যুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই চারটি পরস্পরসংলগ্ন বিষয়ের সূত্রটি একেবারে ছিন্ন হয়ে যায়৷ ফলে, তাদের ব্যবহার হয় একেবারে অনির্দেশ্য(Unpredictable)৷ সাররিয়েলিস্টরা পাগল বা উন্মাদ না হয়েও, সুস্থ অবস্থাতেই তাঁদের মানসিক অবস্থানকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার(Adopt) অনুশীলন করতেন, যাতে তাঁদের সৃষ্টিতেও তার প্রতিফলন ঘটে৷ সালভাদোর দালি প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন(Proclaimed)— "There is only one difference between a madman and me. I am not mad."

 ৩. ফ্রয়েড-এর মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব(Psychoanalytic theory)-র সাহায্যে স্বপ্নকে বিশ্লেষণ করে, তাকে সৃষ্টিতে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সাররিয়েলিস্টদের পদ্ধতি কী হবে, তা ব্রেতোঁ ১৯২৪ সালের পরাবাস্তব ইস্তাহারে(Surrealist manifesto)স্পষ্ট করলেন— "one could combine inside the same frame, elements not normally found together to produce illogical and startling effects.”  অর্থাৎ, মনের ভেতরে(Inside), অবচেতনে বা স্বপ্নে যে ছবিটা তৈরি হয়েছিল, তার সাথে মেলাতে হবে সচেতন অবস্থায় দেখা ঠিক ওই রকমই আর একটা ছবি, একই ফ্রেমের ভেতরে(যাকে বলা হয় Juxtapositions)৷ এই রকম স্বপ্নে দেখা কোনো ছবির মতো হুবহু দেখতে আর একটা সচেতন অবস্থায় দেখা ছবির মিল খুঁজে পাওয়া সাধারণভাবে প্রায় অসম্ভব৷ তার ওপর এই ছবি হতে হবে অযুক্তি দিয়ে নির্মিত এবং অত্যন্ত চমকপ্রদ! এবং এই চমকপ্রদ হওয়াটা ঘটবে জাক্সটাপজিশনের জন্য৷ এই চমকপ্রদ জাক্সটাপজিশন(Startling juxtapositions) কথাটা তিনি খুব স্পষ্ট করেই উল্লেখ করলেন ওই ১৯২৪ সালের ম্যানিফেস্টোতে৷

  এই কথাগুলি আন্দ্রে ব্রেতোঁ ১৯২৪-এর সাররিয়েলিস্ট ম্যনিফেস্টোতে প্রথম বললেন তা কিন্তু নয়৷ এই কথা পর্যায়ক্রমে অনেকেই বলেছেন তাঁরও আগে৷ এখানে বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন এক ফরাসি কবির কথা— নাম, পিয়েরে রিভার্দি(Pierre Reverdy)৷ যিনি আমাদের জীবনানন্দ ও নজরুলের থেকে মাত্র ১০ বছরের বড় ছিলেন৷ ১৮৮৯ সালে জন্মেছিলেন৷ যাঁর কাজ বা কবিতা সেই সময়ে ছিল অত্যন্ত স্বতন্ত্র, অথচ অন্যদেরকেও দারুনভাবে অনুপ্রাণিত করত৷ শুধু তাইই নয়, পরবর্তীকালেও তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তা-ভাবনা, চিত্রশিল্প আন্দোলনকে উত্তেজিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল৷ বিশেষ করে সাররিয়েলিজম্, দাদাইজম্, এবং কিউবিজম্-এর ক্ষেত্রে৷ একাকীত্ব এবং আধ্যাত্মিক চেতনা তাঁর কবিতার মাধ্যমে প্রচণ্ড আবেদন রেখেছিল সাররিয়েলিস্টদের মতবাদে৷ তিনি ভাবতেন— সাররিয়েলিস্ট-এর মতো এই প্রচণ্ড শক্তিশালী মতবাদ(Ism)-এর মধ্যে আরও কিছু স্বাধীন চিন্তা বা সম্ভাবনা থেকে গেল কিনা, যা এখনো আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি৷ এই মতবাদগুলির যে সাধারণ সংজ্ঞা, তাকে ছাড়িয়েও তার ভেতরে এমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় কিনা, যা সেই মতবাদকে আরও শক্তিশালী করবে৷ তাঁর এই ভাবনা সাররিয়েলিস্টদের ভাবনাকে আরও মজবুত করেছিল৷ সাররিয়েলিস্টদের সৃষ্টির মধ্যে যে রহস্যময়তা তৈরির প্রচেষ্টা অথচ তাকে উপস্থাপন করার জন্য যে সহজ-সরল বাস্তবতাকে প্রয়োগ করা, সেখানেও পিয়েরে রিভার্দি-র লেখা তাঁদেরকে অনুপ্রাণিত করেছিল৷ কারণ তিনি লিখেছিলেন— "The sublime simplicity of reality." অর্থাৎ, প্রকৃতি বা বাস্তবতার রূপই সর্বশ্রেষ্ঠ।

  এবার আমরা আগের কথায় ফিরে আসব, যেখানে আন্দ্রে ব্রেতোঁ জাক্সটাপজিশন ব্যবহার প্রসঙ্গে ১৯২৪-এর সাররিয়েলিস্ট ম্যানিফেস্টোতে যেটা লিখলেন— "one could combine inside the same frame, elements not normally found together to produce illogical and startling effects.” 
ঠিক এই কথাটাই পিয়েরে রিভার্দি তারও ছয় বছর আগে ১৯১৮ সালে আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন— "a juxtaposition of two more or less distant realities. The more the relationship between the two juxtaposed realities is distant and true, the stronger the image will be−the greater its emotional power and poetic reality."

  কমবেশি দুটি বাস্তব দৃশ্য বা বস্তু; তারা এমন হবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে বাস্তবে যে পার্থক্য, তা অনেক বেশি(Distant) হবে, অথচ তাদের একই ফ্রেমে বা ভাবনায় মেলাতে হবে(Juxtaposition)৷ মেলানোর পরে তাদের মধ্যে অনেক বেশি পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা একটি সত্যের জন্ম দেবে, যা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী৷ আর, যে দৃশ্যটি তৈরি হবে, তা হবে আবেগময়তার শক্তি ও কাব্যিক বাস্তবতার থেকেও বৃহত্তর৷

  আমরা বিষয়টি বোঝার সুবিধার জন্য আবার পুরোনা দুটি উদাহরণে ফিরে যাব৷ একটি সালভাদের দালি অঙ্কিত পেন্টিং “মেটামরফোসিস অফ নার্সিসাস”(ছবি-১)৷ 

দ্বিতীয়টি জীবনানন্দ-র লেখা কবিতা “বেড়াল”-এর অংশবিশেষ৷

  পাঠককে অনুরোধ— ছবি-১/১-এর সঙ্গে ১/২ মেলান৷ দুটো ছবি হুবহু এক রকম দেখতে৷ অথচ একটু লক্ষ করলেই বোঝা যাবে, এরা দৃশ্যত এক রকম হলেও বাস্তবে বিস্তর ফারাক(Distant realities)৷ ১/২-এর যেটা মানুষের মাথা, সেটাই ১/১-এ ডিম হয়ে গেছে৷ মাথার চুল হয়ে গেছে ডিম ফেটে বেরোনো ডাঁটি সমেত ফুল৷ শুধুমাত্র হাতের পাঁচটা আঙুল হয়ে গেছে হাঁটুতে মাথা রেখে বসে থাকা পূর্ণাবয়ব মানুষ৷ এই যে এত বেশি বাস্তবের ফারাক(Distant realities)থাকা সত্ত্বেও তাদের একই ফ্রেমে বা ভাবনায় দৃশ্যত হুবহু মেলানো হল(Juxtaposition)৷ এই যে চমকপ্রদ দৃশ্য, তা সাধারণ আবেগময়তার শক্তি ও কাব্যিক বাস্তবতার থেকে অনেক বেশি বৃহত্তর, কার্যকর৷

    সাহিত্যে কবিতার ক্ষেত্রেও আমরা এর অনুরূপ ব্যবহার পাই—
“হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান রঙের সূর্যের নরম শরীরে
শাদা থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে;
তারপর অন্ধকারকে ছোটো ছোটো বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনল সে,
সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিল৷”
                    (জীবনানন্দ দাশ-এর লেখা “বেড়াল” কবিতার অংশবিশেষ)
সূর্যের সঙ্গে একটা বলের বাস্তবে কতটা ফারাক(Distant realities)আশা করি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না! অথচ দৃশ্যত উভয়েই গোল(Juxtaposition)৷ একটা বলকে নিয়ে থাবা বুলিয়ে বুলিয়ে যেভাবে খেলে বেড়াল, সেই খেলায় কবি ওই গোলাকার দৃশ্যকে কমন ফ্যাক্টর করে বলের সঙ্গে সূর্যের জাক্সটাপজিশন করলেন৷ এতে, এই যে চমকপ্রদ দৃশ্যটি তৈরি হল, তা সাধারণ আবেগময়তার শক্তি ও কাব্যিক বাস্তবতার থেকে অনেক বেশি বৃহত্তর ও কার্যকর হয়ে উঠল৷

    তবে, কবি পিয়েরে রিভার্দি সাররিয়েলিস্টদের সৃষ্টিশীল ভাবনা-চিন্তার ক্ষেত্রে অনেকটা পথ দেখালেও, তাঁর আধ্যাত্ম-চেতনাকে সাররিয়েলিস্টরা একেবারেই গ্রহণ করেননি৷ তাঁদের স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল— মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর, তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, তার সংস্কৃতি, সমাজ, ও রাজনৈতিক দিকগুলির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো৷ অবাস্তব যুক্তিশাসন, নিয়ন্ত্রণমূলক আচার-আচরণ-প্রথা-গোঁড়ামি ইত্যাদি প্রাচীন কাঠামো থেকে মানুষকে মুক্ত করা৷ আন্দ্রে ব্রেতোঁ প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে, সাররিয়েলিস্টদের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে— "long live the social revolution, and it alone!"৷ এবং এই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাঁরা বহুবার তৎকালীন কমিউনিজম্ ও অ্যানার্কিজম্(শাসকদের ঘোষণা অনুযায়ী)-এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন৷          (ক্রমশ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

  1. ৪৮ ও ৪৯ তম অধ্যায়,যা ইতিমধ্যে
    সংযোজিত হয়েছে, পড়লাম।সাথে
    সাথে ঋদ্ধ হচ্ছি।কারণ এত ব্যাপক
    বিস্তৃত গভীরতায় ডুবে,শ্রমসাধ্য চেষ্টা
    করে,পাঠককে যে সুলুক সন্ধান দিয়ে চলেছে তা এক কথায় অনবদ্য
    বললেও কম বলা হয়। বেশ লাগছে।
    চলুক। ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া