উত্তর আমেরিকা (নেটিভ ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী)-র লোকগল্প /স্বভাব গুনে রাজার জামাই/ চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- উত্তর আমেরিকা (নেটিভ ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী)

স্বভাব গুনে রাজার জামাই 

চিন্ময় দাশ 

 একেবারে গাঁয়ের একটেরে থাকতো এক বুড়ি। উলুঝুলু একটা ঝুপড়ি তার। চালগুলোও ফুটোফাটা। সুয্যিদেব একটু উপরে উঠলো, কি রোদ ঢুকে পড়ল বুড়ির ঘরে। বাদলার দিনে তো কথাই নাই। মাটিতে দু'ফোঁটা  পড়বার আগে, বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ করে বুড়ির ঘরে পড়তে শুরু করে দেয়। তবে হ্যাঁ, যখন চাঁদ থাকে আকাশে, মিষ্টি আলোয় ভরে যায় কুঁড়েটা। তখন ভালো লাগে বটে, কিন্তু জ্বালাও কম নয়। সে মায়াময় আলো থেকে না যায় চোখ ফেরানো, না যায় ঘুমানো।

  বয়স হয়েছে বুড়ির। কোনরকমে টলোমলো পা দুটি নিয়ে চলাফেরা তার। দু'বেলা পেটের অন্ন জোটাতেই  হিমশিম খেয়ে যায় মানুষটা। ঘরের ছাউনি সারানো কি তার সাধ্য?

  ব্যাপারটা হল, ঝুপড়িতে বুড়ি কিন্তু একা থাকে না। সোমত্ত একটা নাতি আছে বুড়ির। তবে, নাতি আছে-- এই পর্যন্তই। রাজ্যের কুঁড়ে সে ছেলে। কুটোটিও নাড়ানো যায় না তাকে দিয়ে।

  রাত-দিন কত করে বোঝায় তাকে বুড়ি-- কাজকম্ম না করলে, পেট চলবে কী করে তোর? আমি আর ক'দিন আছি? যাওয়ার তো সময় হয়ে এলো আমার। তখন তোকে কে দেখবে? 
তা কোন কথা কানে নিলে তো? 
বুড়ি বলে-- তোর বয়েসী ছেলেদের দ্যাখ দিকিনি, কেউ কি ঘরে বসে থাকে? কেউ কাঠ কেটে আনে বন থেকে। কেউ যায় চাষের জমিতে। 

  সাড়া না পেয়ে, বুড়ি উদাহরণ টেনে আনে-- তোরই বয়েসী সব ছেলেরা। যেমন সুন্দর তাদের চেহারা। তেমনি ধোপদুরস্ত পোশাক-আশাক। পয়সাও আছে তাদের সকলের পকেটে। খাটা-খাটুনি করে, তাই আনন্দ -ফুর্তি করতে আটকায় না তাদের।

  সবই জানে ছেলেটা। বোঝেও সবই। কিন্তু তার এসব ভালো লাগে না। আলসে, অকর্মন্য বলে, তাকে টিটকিরি দেয় লোকে। কারোও কথা গায়েই মাখে না সে।
তাই বলে, মানুষ হিসাবে ছেলেটা কিন্তু আদৌ মন্দ নয়। অলস বলে তাকে গালাগাল দেয় সবাই। কিন্তু সেটা তার নিজের বেলায়। ছেলেটা যেমন উদার, তেমনি পরোপকারী। চেনা হোক, কি অচেনা-- দরকার পড়লে, সকলের পাশে গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে সে। সাধ্যমত সাহায্যও করে সকলকে। কিন্তু এজন্যই ছেলেটা যেমন অভাবী, তেমনি তার পোশাক-আশাকেরও ভারী মলিন দশা।

  একদিন গাঁয়ের বাইরে একটা ফাঁকা রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। হঠাৎই একটা বুনো শূকর চোখে পড়ল। কেবলই ছটফট করছে সেটা। একদন্ডও স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। ছেলেটা অবাক হয়ে বলল-- ব্যাপারটা কী? কী হয়েছে তোমার? এমন পাগলের মত নাচানাচি করছ কেন? 

শূকর বলল-- সত্যিগো, পাগল হওয়ারই জোগাড় হয়েছে। তুমি একটু উপকার করবে আমার? 
ছেলেটা বলল-- হ্যাঁ, করবো না কেন? বলো না তুমি, কী করতে হবে।

  আমার পিঠটা একটু চুলকে দাও না, ভাই। কতজনকে যে বললাম, তার নাই ঠিক। গ্রাহ্যই করল না কেউ। একটা বুনো শূকরকে কারই বা দায় পড়েছে সাহায্য করতে। 

 --ছাড়ো তো ওদের কথা। এস এদিকে। বলেই শূকরের পিঠ চুলকাতে বসে গেল ছেলেটা। কতক্ষণ পিঠ চুলকে দিল ভারী যত্ন করে। তারপর বলল-- যখনই তোমার দরকার হবে, বলবে আমাকে। 
ঠিক পরের দিন আবারও এসেছে শূকরটা। আবারও তার পিঠ চুলকে দিচ্ছে সে। কিন্তু শূকর বুঝতে পেরেছে, কাজটা গতকালের মত হচ্ছে না। শূকর বলল-- কী হয়েছে তোমার। মন ভালো নাই মনে হচ্ছে। হয়েছেটা কী?

 -- মন আর কী করে ভালো থাকে, বলো? নববর্ষের উৎসবের দিন আজ। গাঁয়ের সব যুবক ছেলে রাজার বাড়ি গিয়েছে। আমিই শুধু পড়ে আছি।
-- কেন, কেন? তুমি যাওনি কেন?
-- কী করে যাবো বলো তো? আমার কি কোনও ভালো কাপড়-চোপড় আছে? আর যাবোই বা কীসে?
শূকর হেসে বলল-- হায় ভগবান! এই কথা? এর জন্য মন খারাপ করে বসে আছো তুমি! দাঁড়াও, এখুনি সব বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। 
ছেলেটা তো কিছুই বুঝতে পারছে না। এদিক ওদিক তাকিয়ে, শুকর বলল-- ওই যে গাছটার নিচে একটা শুকনো ডাল পড়ে আছে, দেখতে পাচ্ছ।
-- হ্যাঁ, পাচ্ছি তো।
-- যাও, ওইটা তুলে নিয়ে এসো। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে এখুনি।

  যদিও, কিছুই মাথায় ঢুকলো না, ডালটা কুড়িয়েই আনলো ছেলেটা। হেসে বলল-- এবার কি এটাতে চেপেই রাজার বাড়ি পৌঁছে যাবো না কি?
শূকর সে কথায় কান না দিয়ে, বলল-- এই লাঠি দিয়ে কষে কয়েক ঘা লাগাও দেখি আমার পিঠে। লাগাও, লাগাও। জোরে লাগাবে কিন্তু।
ছেলেটা তো আকাশ থেকে পড়লো। এ আবার কেমন কথা! বলল-- না, না। ছিঃ। সে আমি পারবো না। 
শূকর বলল-- তুমি অতো ভাবছো কেন? আমিই তো বলছি কাজটা করতে। দেরি কোর না। যা বলছি করো তাড়াতাড়ি।
কী আর করে? অগত্যা লাঠি দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো শুকরের পিঠে।

  অমনি তাকে অবাক করে দেওয়া এক কাণ্ড। সামনে হাজির ধবধবে সাদা একখানা তরতাজা ঘোড়া। আলো ঠিকরে যায়, এমনই চকচকে গা ঘোড়াটার। পিঠে জরি বসানো ঝলমলে জীন চাপানো। লাগামখানাও কী চটকদার। যেন আকাশ ফুঁড়ে নেমে এল প্রাণীটা! চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল সেই ছেলের। 
তখন চোখ গেল নিজের দিকে। এই ছেঁড়া-খোঁড়া উলুঝুলু পোশাক পরে কি এমন ঘোড়ায় চড়া যায়? না কি, রাজার বাড়ি যাওয়া যায়? 

  শুকর তো দেখছিল ছেলের হতভম্ব অবস্থা। মুচ্কি হেসে বলল-- জিনটা তোল, পোশাকও পেয়ে যাবে। সত্যি সত্যি, জিনের তলা থেকে বেরুল-- জমকালো সব পোশাক। মখমলের আচকান, হরিণের চামড়ার দামি কাফতান। আলোয়ানখানাও মহার্ঘ পশমের। পশমেরই কল্কাপাড় দেওয়া পাগড়ী। তাতে ময়ূর পালক গোঁজা। হরিণের চামড়ার শুঁড় তোলা নাগরা জুতো। 
সেসব গায়ে চাপাতে, একেবারে রাজকুমারের মত লাগছে ছেলেটাকে।
  শূকর হাসি মুখ করে বললো-- দেখছটা কী? চেপে পড়ো ঘোড়ায়। রওনা হয়ে যাও। আর দেরি কেন?
 রাজার বাড়ির উৎসব বলে কথা। কত লোকজন। নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া।  ঘরে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
এদিকে খুব চিন্তা হচ্ছিলো বুড়ির। সারাদিন গেল কোথায় ছেলেটা? নাতিকে জিজ্ঞেস করলো-- ছিলে কোথায় সারাটা দিন। আমি এদিকে ভেবে ভেবে সারা।
ছেলে তো সেদিন ভারী খুশি। ভারী আনন্দ তার মনে। বললো-- ঠাকুমা, আজ তো রাজার বাড়ি গিয়েছিলাম। নতুন বছরের উৎসব ছিল যে সেখানে। ভারী আনন্দে কেটেছে সারা দিন। হঠাৎ করে গেলাম তো, তোমাকে বলে যেতে পারিনি। লক্ষ্মী ঠাকুমা আমার, রাগ কোর না।
খুশি হবে কী, শুনে, ভারী কষ্ট হল বুড়ির। তার অলস নাতি এখন মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে? কথাটা ভাবতেও পারছে না সে।

  দিন চার-পাঁচ পরের কথা। আবার দেখা হয়েছে দু'জনে। শূকর দেখেই বুঝতে পারল, ছেলেটার মন ভালো নাই। জিজ্ঞেস করলো-- কীগো, হয়েছেটা কী? আজ আবার মন ভার কেন? 

  ছেলেটা এড়িয়ে যেতে চাইল। বললো-- ও কিছু নয়।  
শূকর বললো-- দুনিয়ায় সব চেয়ে ভারী জিনিষ কী, জানো? সেটা হল মনের ভার। পাহাড়ের চেয়েও ভারী। সে ভার একা একা বয়ে বেড়ানো যায় না। যে তোমার আপনজন, তাকে খুলে বলতে হয় সব কথা। তখন দেখবে, সব ভার কোথায় উবে গিয়েছে। মন তখন পালকের চেয়েও হালকা।

 -- আসলে, তোমার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা। 
ছেলেটার কথা শুনে, শূকর পড়লো আকাশ থেকে-- কেন গো, আমি আবার কী করলাম তোমার? 
ছেলেটা করুণ গলায় বলল-- তুমিই তো আমাকে পাঠালে রাজার বাড়িতে। সেখানে গেলাম বলেই তো গোলমালটা বাধলো। 

-- কেন, গোলমাল আবার কী?
-- রাজার মেয়েকে ভালো লেগে গেছে আমার। সারা দিন সারা রাত তার কথাই ঘুরছে মাথায়। খেতে পারি না। ঘুমাতে পারি না। কী ঝামেলাতেই যে পড়েছি।
-- রাজার মেয়েকে ভালো লেগে গেছে তোমার। এর চেয়ে ভালো কথা আর কী হতে পারে? তা এর মধ্যে ঝামেলা এলো আবার কোথাথেকে? 
ছেলেটা অবাক হয়ে বললো-- ঝামেলা নয়? বলো কী তুমি? আমার মতো গরীব মানুষকে বিয়ে করবার কথা, বলতে যাই কী করে? এক কোপে আমার মুণ্ডটাই কেটে নেবে রাজা।

-- রাজামশাই তোমার মুণ্ড কেটে নেবে, না কি, কোলে তুলে নেবে-- সে তো আমার ভাবনা। তুমি ভেবে মরছো কেন? শূকর হেসে বলল-- যাও , ওই লাঠিটা আবার নিয়ে এসো। সপাং সপাং করে লাগাও কয়েক ঘা আমার পিঠে। তোমার রাজকুমারী বউ পাক্কা।

  আজ আর কোনও দোনামোনা নাই ছেলের। লাঠি নিয়ে বেশ করে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল বন্ধুর পিঠে। অমনি আবার সেই ঘটনা। ভোজবাজির মতো সব এসে হাজির এক লহমায়। দু'-দুটো সাজানো ঘোড়া। একটা ঘোড়ার পিঠে বরের সাজ-পোশাক। সাথে ইয়া লম্বা আর ধারালো একখানা তলোয়ার, ঝাঁ-চকচকে।

  আজ আর কোনও দোনামোনা নাই ছেলের। লাঠি নিয়ে বেশ করে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল বন্ধুর পিঠে। অমনি আবার সেদিনের মত একই ঘটনা। একেবারে ভোজবাজি যেন! সব এসে হাজির হয়ে গেল তার সামনে। আজকে দু'-দুটো সাজানো ঘোড়া। একটা ঘোড়ার পিঠে আবার বরের সাজ-পোশাক। সাথে ইয়া লম্বা আর ধারালো একখানা তলোয়ার, ঝাঁ-চকচকে।
শূকর হাসিমুখে বলল-- আর তো ভাবনা করার কিছু নাই, বন্ধু। চেপে পড়ো ঘোড়ার পিঠে। সোজা রাজার বাড়ি। 

  ছেলেটাও আর দেরি করল না। একটা ঘোড়ায় চেপে, আর একটাকে সাথে নিয়ে রওনা দিল।
ঘোড়া তো নয়, যেন দুটো পক্ষীরাজ। মাটিতে পা ফেললো, কি ফেললো না। কোনও শব্দ নাই, যেন উড়তে উড়তে এসে হাজির হল রাজবাড়ির সামনে। 
রাজবাড়িতে ঢুকতে যাবে, দেখল, ফটকের সামনে একটা জটলা। ঘোড়া দাঁড় করিয়ে ছেলেটা জানতে চাইল-- কী হয়েছে এখানে? এমন জটলা কেন?
দেখতে একেবারেই রাজপুত্রের মত লাগছে ছেলেটাকে। অনেকে এসে ঘিরে ধরলো তার ঘোড়াকে। সবাই চেঁচাচ্ছে। সবাই একসাথে কথা বলতে চায়। 

  মোদ্দা কথা যেটা বোঝা গেল-- খানিক বাদে রাজা যাবে নদীতে নাইতে। মাঝে মাঝেই এমনটা যায় রাজা। রাজা বেরুবার আগে, তিনটে সেপাই যায় ঘোড়া ছুটিয়ে। রাজার রাস্তা সাফ রাখতে। আজ যখন গেল, সেপাইদের ঘোড়া একজনকে আছড়ে দিয়ে গিয়েছে। রক্ত বইছে কী ভীষণ! এই যায় এই যায় অবস্থা মানুষটার।
কারও বিপদের কথা শুনলে, নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না ছেলেটা। সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যতটুকু তার সাধ্য, করতে লেগে যায়।

  ঘোড়ার পায়ে পিষে গিয়ে, একজন মরতে বসেছে-- একথা শুনে কি আর চুপ করে থাকা যায়? সাথে সাথে এক লাফে নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। লোকটার কাছে গিয়ে হাজির হল ছেলেটা। সত্যিই রক্ত বয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি নিজের অত দামি পোশাক ছিঁড়ে, বেঁধে দিল লোকটার পায়ে।

  এদিকে হয়েছে কী, সে সময়েই বউ-মেয়েকে নিয়ে, রাজা বেরিয়েছে গাড়ি চেপে। সদর দেউড়ি পেরিয়ে, রাজাও দেখতে পেল ফটকের সামনে একটা জটলা। এত লোক কেন এখানে? 
একটা সেপাই ছুটল খবর নিতে। ফিরে এসে যা বলল, রাজা শুনে একটু অবাক। একজন লোক চাপা পড়েছিল সেপাইদের ঘোড়ার নিচে। কোন দেশের এক রাজার ছেলে আসছিল রাজবাড়িতে। দেখতে পেয়ে, সে নিজেই সেবা করতে লেগে গেছে আহত লোকটাকে। 
চোখ গোল গোল করে, সেপাই বলল-- কী বলব রাজামশাই, কত দামি পোশাক সেই ছেলের। নিজের হাতে ছিঁড়ে, বেঁধে দিয়েছে লোকটার পায়ে। ধন্য ধন্য করছে সবাই।
-- বলো কী হে! নিজের পোশাক ছিঁড়ে রাস্তার লোকের পায়ে বেঁধেছে! তা-ও কি না আবার নিজের হাতে? চলো তো দেখি।
বলেই রাজা নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। ভিড়ের দিকে চলল রাজা।

  রাজা নেমেছে দেখে, রানী নামল রাজার পিছন পিছন। রানি নেমেছে দেখে, রাজার মেয়ে নামল রানির পিছন পিছন। দুজনেই শুনেছে কথাগুলো। দুজনেই চলল রাজার সাথে।
ভিড় ঠেলে, রাজা নিজের চোখে সব দেখল ভিতরে ঢুকে।
রাজাকে দেখে, লোকজন ছিটকে-ছাটকে সরে গেল দিক ওদিক। ছেলেটাও উঠে দাঁড়িয়ে, একটা সেলাম ঠুকল লম্বা করে। ভয়ডর নাই গলায়,  বলল-- একটা কথা বলব, রাজামশাই? 
রাজা বলল-- বলো, কী বলবে? 
-- ওষুধপত্র দিতে হবে লোকটাকে। অনেক রক্ত গেছে। বৈদ্যমশাইকে ডাকা দরকার এখুনি। একটা মানুষের জীবন বলে কথা! 
শেষ কথাটায় সম্বিৎ ফিরল রাজার। সত্যি তো, একজনের জীবন বলে কথা। হলোই বা সাধারণ এক প্রজা। 

  একজন সেপাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হোল, কোবরেজ মশাইকে নিয়ে আসবার জন্য।
রাজা বলল-- চিকিৎসার ব্যবস্থা তো হল। এবার বলো তো, তুমি কে? যাচ্ছো কোথায়। একজন মানুষ তুমি, ঘোড়া দেখলাম দুটো। ব্যাপারটা কী?
ছেলেটা এখন অকুতোভয়। কোন জড়তা নাই কথায়। বলল-- এক এক করে বলি। প্রথম কথা, এই রাজ্যেই বাড়ি আমার। দুই হোল, অন্য কোথাও নয়। এই রাজবাড়িতে এসেছি আমি। শেষ কথা হোল, বিয়ে করে বউকে নিয়ে যাবো, সেজন্য বাড়তি একটা ঘোড়া এনেছি সাথে।
রাজা প্রশ্ন করল শেষ কথাটা দিয়ে-- বিয়ে? কোথায় বিয়ে করতে এসেছ তুমি? 
-- রাজকুমারীকে বিয়ে করবার সাধ আমার। অবশ্য রাজকুমারীর যদি অমত না হয়। সেজন্যই একটা বাড়তি ঘোড়া। 

  রাজার মনে তখন হাজার প্রশ্ন। একটিমাত্র মেয়ে তার। অন্য কোন ছেলেপুলে নাই।  অমন সুন্দর একটা ছেলে। এই রাজ্যেরই কোথাও থাকে। তার মানে তেমন দূরে নয়। সবচেয়ে বড় কথা হল, খোঁজাখুঁজি করতে হল না। এমন গুণবান সোনার চাঁদ ছেলে, নিজে এসে হাজির হয়েছে ঘরে। সৌভাগ্য আর কাকে বলে। 
রাজা ভারী খুশি মনে মনে। মেয়েকে জিজ্ঞেস করবার আগে, রানির মত নেওয়া দরকার।
রানির দিকে তাকাতে, রাজা দেখল, জ্যোৎস্নার মত আলোয় ঝলমল করছে রানির মুখ। প্রশ্ন করতেই হল না। 

  রাজা এবার মেয়ের দিকে চাইল। সে মেয়ের তখন কোন দিকে হুঁশ নাই। অপলক চোখে চেয়ে আছে ছেলেটার দিকে। জ্যোৎস্নার আলো নয়। একেবারে আস্ত একখানা চাঁদের মত উজ্বল হয়ে উঠেছে তার মুখখানা।
কাউকে কিছু প্রশ্ন করতে হল না। রাজা ঘোষণা করে দিল-- সাত দিন বাদে, এই ছেলের বিয়ে হবে রাজকুমারীর সাথে।

 সাতদিন ধরে ভোজ চলল রাজার বাড়িতে। হাজার হাজার লোক ভুরিভোজ খেল পেট ভরে। 
তারপর, দারুণ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল রাজার মেয়ের। বউকে সাজানো ঘোড়ায় বসিয়ে, ঘরে ফিরে চলল ছেলেটা।

পথে চলেছে, আর হাজারো ভয়, হাজারো ভাবনা জাঁকিয়ে বসেছে ছেলেটার মনে। ঝোঁকের বসে এমন একটা কাজ করে ফেলেছে। ভাঙা ঝুপড়ি ঘরে কী করে নিয়ে যাবে রাজার মেয়েকে? 

 গাঁয়ে ঢোকার মুখে, এদিক ওদিক কত তাকালো। কত খুঁজল। কোথাও দেখা গেল না শুকরটাকে। দেখতে পেলে, একটু সাহায্য নেওয়া যেত। 
শুধু তো দুটো ঘোড়া নয়। পিছনে আসছে সারি সারি গাড়ি। রাজামশাই দামি দামি উপহার দিয়ে গাড়িগুলো ভরিয়ে দিয়েছে। বাদ্যি-বাজনার দল চলেছে। তাদের বাজনার দাপটে কান পাতা দায়। গোটা গ্রামের লোকজন রাস্তায় এসে ভেঙে পড়েছে। 
সবাই আনন্দ করছে। আনন্দ নাই কেবল ছেলেটার মনে। আষাঢ়ের কালো মেঘের দল এসে চেপে বসেছে তার মুখে। 

 কিন্তু এক ঝটকায় কেটে গেল সব মেঘ। গ্রামে ঢুকে নিজেদের ঝুপড়ির সামনে এল যখন, আকাশ থেকে পড়ল ছেলেটা। কোথায় তাদের সেই উলুঝুলু ভাঙাচোরা ঝুপড়ি ঘর? বিশাল একটা প্রাসাদ খাড়া হয়ে আছে সেখানে। লোকলস্কর ছোটাছুটি করছে। নতুন বউকে বরণ করবে বলে, প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার ঠাকুমা বুড়ি।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া