লেখা ও রেখায় খড়্গপুর
অর্ণব মিত্র
ইউনিয়ন চার্চ
আমেরিকান ব্যাপ্তিস্ট মিশনারিরা উনিশ শতকের শেষের দিকে খড়গপুরে তাদের কাজ শুরু করে ও ১৯০২ সালে খড়গপুরে তারা একটি অস্থায়ী অফিস থেকে কাজ চালাতে থাকে। খড়গপুরে আমেরিকান ব্যাপ্তিস্ট মিশনের একটি চার্চ নির্মাণ করার ভাবনা সেই সময় থেকেই শুরু হয় ও ১৯০৫ সালে নিশ্চিত হয় যে খড়গপুরে একটি চার্চ নির্মিত হতে চলেছে। সিদ্ধান্ত হয় যে চার্চটি হবে প্রয়াত আমেরিকান ব্যাপ্তিস্ট মিশনারি জেরেমিয়া ফিলিপ্সের নামে। এবং এই চার্চটি নির্মাণের জন্য সেই সময় চাঁদার মাধ্যমে পাঁচ হাজার ডলার সংগৃহীত হয়। আমেরিকান ব্যাপ্তিস্ট মিশনারি জেরেমিয়া ফিলিপ্স তাঁর স্ত্রীর সাথে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলা ও ওড়িশার জনগণের মধ্যে ব্যাপ্তিস্ট মিশনের ভিত্তি স্থাপন করেন ও প্রচার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নেন। জানা যায় মিশনারি মিস্টার ও মিসেস অক্সরাইডার মেদিনীপুর থেকে এসে চার্চ নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বগুলি পালন করতেন। খড়গপুরের বাংলো সাইডে ফোরথ এভিনিউতে সাউথ ইন্সিটিউট ভবনের পশ্চিম দিকে ৮৩৬ এবং ৮৪১ নম্বর প্লট দুটি পাওয়া যায়। একটি চার্চের জন্য এবং অপরটি যাজকের বাসভবন, অফিস প্রভৃতির জন্য। জানা যায় যে প্রয়াত মিশনারি জেরেমিয়া ফিলিপ্সের তৃতীয় স্ত্রী Hannah.w.Cummings ১৯০৬ সালে খড়গপুরে ইউনিয়ন চার্চ বা ফিলিপ্স মেমোরিয়াল চার্চের প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন উপস্থিত ছিলেন। ইউনিয়ন চার্চ নির্মাণ-এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন জেরেমি ফিলিপ্সের এক কন্যা ও জামাতা আই এল স্টোন। এই চার্চের দরজার কাছে একটি ফলকে লেখা আছে এটি ফিলিপ্স মেমোরিয়াল চার্চ, রেভারেন্ড জেরেমিয়া ফিলিপ্সের নাম স্মরণ করে নির্মিত, যিনি দুজন প্রথম ফ্রি -ব্যাপ্তিস্ট মিশনারিদের একজন ছিলেন ।
🍂
সাউথ- ইন্সটিটিউট
খড়গপুরের দক্ষিণে বাংলো সাইডে ফোরথ এভিনিউতে ইংরেজদের দ্বারা তৈরি এই প্রাচীন ভবনটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ইংরেজরা গত শতাব্দীর প্রথম দশকে এই ভবনটি তৈরি করেন ও সেই সময় এখানে হত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পার্টি । সম্ভবত ১৯৩০ সালে ইংরেজ ফোটগ্রাফার বিল মর্ডেন-এর তোলা সাউথ- ইন্সটিটিউট-এর একটি ছবি (সাদাকালো )ইন্টারনেটে দেখতে পাওয়া যায়। সেই সময় ভবনের বাঁ –দিকে ছিল একটি ব্যান্ড- স্ট্যান্ড। বর্তমানে সেই লুপ্ত ব্যান্ড- স্ট্যান্ডটি দেখতে পাওয়া যায় সাউথ- ইন্সটিটিউট-এর পিছনে অঙ্কুর ইংলিশ মিডিয়ম স্কুলের দিকে। ভবনটির ভিতরে বলরুমের কাঠের পাটাতনের মেঝের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষও ছিল। শোনা যায় ওখান থেকেই নাকি সুড়ঙ্গ পথ সিএমই বাংলো অবধি চলে গেছে। স্বাধীনতার পর ষাট-এর দশকে এটি সিনেমা হল হিসেবে চালু হয়। আজ এই ভবনের সামনে যেখানে থমাসের চা-এর দোকান ( যেখানে মহেন্দ্র সিং ধোনি চা খেতে আসতেন ) সেখানে ছিল সিনেমা হলে ঢোকার প্রধান গেট ও টিকিট কাউন্টার। সিনেমা-হল হিসেবে এই ভবনটি চালু ছিল প্রায় ছয় দশক। সম্ভবত ২০০৫ সাল নাগাদ সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর নতুন করে রঙ করা হয়েছে এই ভবনটির। সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার পর এখানে একটি লাইব্রেরি চালু হয়। তবে সেটি বর্তমানে বন্ধ আছে। খুব ভালো হতো এই সুদৃশ্য ভবনটি কে যদি রেল মিউজিয়াম হিসেবে গড়ে তোলা যেতো।
খড়গেশ্বর মন্দির
খড়গপুরের উত্তর-পূর্বে ইন্দা নামক স্থানে পূর্বমুখী এই শিবমন্দিরটি অবস্থিত।এই মন্দিরটি অনেক প্রাচীন মনে করা হয়।কেউ বলেন ধারেন্দার অন্যতম রাজা খড়গসিংহ এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আবার কেউ বলেন বিষ্ণুপুরের মল্লবংশীয় রাজা খড়গমল্লই এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। জনশ্রুতি আছে যে খড়গেশ্বর শিবমন্দির থেকেই খড়গপুর শহরের নামকরণ হয়েছে। জানা যায় একসময়ের মেদিনীপুর শহরের খ্যাতনামা উকিল কৃষ্ণলাল মজুমদার ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে খড়গেশ্বর মন্দির সহ সমগ্র ইন্দা মৌজা ইজারা হিসেবে নিয়ে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন।মন্দিরের কাছেই একটি উচ্চ-বিদ্যালয় আছে। সেটি কৃষ্ণলাল মজুমদার-এর নামেই নামকরণ করা হয়- ইন্দা কৃষ্ণলাল শিক্ষা নিকেতন। কৃষ্ণলাল মজুমদার-এর সময়ে খড়গেশ্বর মন্দিরের বিমান ও জগমোহনের চূড়াসহ ওপরের অংশ ভাঙ্গা অবস্থায় ছিল। কৃষ্ণলাল মজুমদার এই ভগ্ন মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন। কৃষ্ণলাল মজুমদার-এর পুত্র কামাখ্যাচরণ মজুমদার। কামাখ্যাচরণ মজুমদার-এর তিন পুত্র লহর,দীপক ও জীবক। লহর মজুমদারই এই মন্দিরে সেবা পুজার ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। মেদিনীপুরের মজুমদার পরিবারই এখনো মন্দির ও সংলগ্ন সম্পত্তির মালিক ও দেবতার সেবাইত হিসেবে বহাল আছেন।বিশেষ উৎসবগুলি পরিচালনার জন্য একটি কমিটি আছে। খড়গেশ্বর মন্দির মাকড়া পাথরের তৈরি। পিছনের বিমান আয়তাকার। তারপর অন্তরাল,এর সামনে জগমোহনটি বর্গাকার। বিমান ও জগমোহনের ভিতরের ছাদ নির্মিত হয়েছে লহরা রীতিতে। প্রতিষ্ঠা লিপিহীন এই মন্দিরের কিছু অংশে ওড়িশারীতির স্তাপত্য লক্ষ করা যায় ও আকার প্রকারে খ্রিস্টীয় সতেরো শতকে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়।
বি,এন,আর রেলওয়ে স্কুল
১৯০৪ সালে খড়গপুরে ইংরেজদের দ্বারা শুরু হয়েছিল এই রেলওয়ে স্কুলটি।এই স্কুলটি স্বাধীনতার পরবর্তীকালে রেলওয়ে বয়েজ স্কুল নামে পরিচিতি পায়। ইংরেজদের সময় পড়াশুনার মাধ্যম বা ভাষা ছিল ইংরেজি। স্বাধীনতার পরে পড়াশুনার মাধ্যম বা ভাষা হয় ‘বাংলা’। রেলশহর খড়গপুরের মতই এই বিদ্যালয়টিও ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ এই আদর্শের ভাবধারা বহনকারী এক ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্ররা মারাঠি, গুজরাতি, পাঞ্জাবী, বিহারী,তামিল,তেলেগু পরিবার থেকে ও হিন্দু,মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় থেকে আসত। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর স্কুলজীবন শুরু হয় খড়গপুরের গোলবাজারের কাছে পূর্বদিকে অবস্থিত এই স্কুল থেকে। রমাপদ চৌধুরীর মাতামহ মানগোবিন্দ রায় একসময় এই বি,এন,আর ইন্ডিয়ান স্কুল-এর প্রধান শিক্ষক ছিলেন। স্বাধীনতার আগে ইংরেজ পাদরি রেভারেন্ড মেলনি এই স্কুলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৩০ সালে মানগোবিন্দ রায়-এর অবসরের পর এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে আসেন শ্রুতিনাথ চক্রবর্তী। তিনি ১৯৪৭ সাল অবধি ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পরে আসেন ক্ষুদিরাম দাশ যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে স্কুলটি একশো বছর পূর্ণ করে। রমাপদ চৌধুরী ছাড়াও বি,এন,আর রেলওয়ে স্কুলের কৃতি ছাত্র ছিলেন নারায়ণ চৌবে। তিনি পরে সাংসদ হয়েছিলেন। এই স্কুলের প্রাক্তন সেরা ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ডঃমনীন্দ্রনাথ সরকার। তিনি পরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ কুমার চৌধুরী ১৯৭৬ সালে ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন। আর প্রণব ঘোষ সন্তোষ ট্রফিতে বাংলার হয়ে খেলেছিলেন ১৯৮২ সালে।
সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর বাড়ি
রেলশহর খড়গপুরে সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে। তাঁর কিশোরবয়স অবধি ছোটবেলা কেটেছিল এই রেলশহরে। রমাপদ চৌধুরীর পিতামহের নাম ছিল ক্ষেত্রনাথ চৌধুরী।তাঁর পরিবার বর্ধমান থেকে খড়গপুরে আসে। রমাপদ চৌধুরী-র বাবা খড়গপুর শহরে রেলওয়ের চাকরিতে একটি বড় পদে ছিলেন এবং তিনি চাকরিসূত্রে যে বাংলোটি পেয়েছিলেন সেটি গোলবাজারের দুর্গামন্দিরের সামনে ডানদিকে অবস্থিত। রমাপদ চৌধুরী তাঁর আত্মজীবনী ‘ফেলে আসা জীবন’-এ লেখেন ‘সেই রেলশহরে আমাদের বাংলোর তিন মিনিটের দূরত্বে ছিল বাঙ্গালিদের দুর্গামন্দির’। তিনি তাঁর আর এক আত্মজীবনী ‘হারানো খাতায়’-য় লিখেছেন ‘আমরা ভারতীয়দের জন্য নির্দিষ্ট উত্তরাংশে অর্থাৎ গোলবাজারের দিকে থাকতাম। উত্তরের এই অংশে, কী কারণে জানি না, বাগানঘেরা একটিই দোতলা বাংলো ছিল এবং সেখানেই আমার জন্ম এবং স্কুলজীবন কেটেছিল। এই বাংলোর দেওয়ালে নম্বর লেখা ছিল সেভেন্টি সিক্স সেভেন্টি সিক্স। তার নিচে একটি রুল এবং রুলের নীচে ওয়ান অর্থাৎ সেভেন্টি সিক্স সেভেন্টি সিক্স ডিভাইডেড বাই ওয়ান’।তিনি তাঁদের বাংলোর বিবরণ দিয়ে ‘হারানো খাতায়’য় লিখেছেন ‘আমাদের বাংলোটা ছিল দোতলা,বড় বড় ঘর, কাঠের সিঁড়ি। চতুস্পার্শে ফুলের বাগান, থেকে যার তদারকির জন্য রেল থেকেই একজন মালি দেওয়া হত। বাংলোর দু’খানি ঘর বেশ বড়,একটি ছোট আর তার সামনের দিকে যেমন জাফরি ঘেরা করিডর ঘেরা চওড়া বারান্দা ছিল তেমনই পিছনের দিকেও। পিছনে সিমেন্ট-বাঁধানো উঠোন, দুপাশে একদিকে রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, অন্যদিকে স্নানের ঘর,টয়লেট।কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলে বিশাল একখানা হলঘর,বারান্দা’। রমাপদ চৌধুরী খড়গপুরের রেলওয়ে বয়েজ স্কুল থেকে মাধ্যমিক বা ইন্টার-মিডিয়েট পাশ করার পর ১৯৩৯ সালে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। চলে আসেন কলকাতায়। তাঁর জন্ম ১৯২২ সালে দুর্গামন্দিরের সামনের এই বাংলোটিতেই। কলকাতা যাওয়ার আগে কিশোর বয়সের শেষ পর্যায় অবধি প্রায় ১৭ বছর কাটিয়েছেন এই রেলওয়ে বাংলোটিতে।
0 Comments