আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫১/শ্যামল জানা

আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাস -৫১

শ্যামল জানা

সাররিয়েলিজম্ (সূত্রপাত)

 সাররিয়েলিজম্ সারা ইয়োরোপে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল৷ ১৯২৫ সালে বেলজিয়াম-এর ব্রাসেলস্-এ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী স্বশাসিত সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ তৈরি হল৷ এই সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ সর্বশিল্পসমন্বয় হিসেবেই তৈরি হল৷ এটি সম্ভব হল এই কারণে যে, সাররিয়েলিজম্-এর দর্শন এমনই ব্যাপ্ত, যে সব শিল্পেই তাকে অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব৷ যেমন, এই গ্রুপে সংগীতকার, কবি, লেখকরা যেমন ছিলেন, সেইসঙ্গে একাধারে লেখক ও শিল্পী এরকম গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন ছিলেন৷ যাঁরা লেখক লুই স্কুটেনীয়ার-এর হাত ধরে ওই গ্রুপে এসেছিলেন৷ এঁরা হলেন— ই এল টি মেসেন্স, রেনে ম্যাগরিতে, পল নৌগে, মার্শেল লেকম্তে ও আন্দ্রে সৌরিস৷ এই ব্রাসেলস্ সাররিয়েলিজম্ গ্রুপ অন্যান্য গ্রুপের সঙ্গে, বিশেষ করে প্যারিসের সাররিয়েলিস্ট গ্রুপের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত৷ ১৯২৭ সালে গোয়েম্যানস এবং ম্যাগরিত্তে সরাসরি প্যারিস চলে গেছিলেন৷ এবং আন্দ্রে ব্রেতোঁ-র যে সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ, কেন্দ্রীয় গ্রুপও বলা যায়, তাদের সঙ্গে খুব ঘন ঘন যোগাযোগ রাখতেন৷

একটা লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে— যত জায়গায় সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ তৈরি হয়েছিল, এবং সেই গ্রুপে যত শিল্পী ছিলেন, তাঁরা যে প্রথম সাররিয়েলিস্ট গ্রুপ করছেন, তা কিন্তু নয়! প্রত্যেকেরই আগে কোথাও না কোথাও শিকড় ছিল৷ বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয়— দাদাইজম্, কিউবিজম্, ভ্যাসিলি কান্দেনেস্কি-র অ্যাবস্ট্রাকশন আর্ট, এক্সপ্রেশনিজম্, পোস্ট-ইম্প্রেশনিজম্, এগুলোই ছিল সাররিয়েলিজম্-এর সলতে পাকানোর ইতিহাস, এক কথায় যাকে বলা হয়— প্রোটো-সাররিয়েলিজম্৷ আর ইতিহাসের নিয়মে এটাই স্বাভাবিক৷ পৃথিবীতে কোনো কিছুই হঠাৎ করে শুরু হয় না! আর, কিছু কিছু গ্রেটম্যান থাকেনই, যাঁরা কালের পদধ্বনি অনেক আগেই শুনতে পান৷ সাররিয়েলিজম্-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি৷ সাররিয়েলিজম্-এর সূত্রপাতের প্রায় চারশো বছর আগে হুবহু সাররিয়েলিজম্-এর মতো কাজ আমরা দেখেছি চিত্রশিল্পী হিয়েরেনেমাস বচ্(Hieronymus Bosch)-এর পেন্টিং-এ(ছবি-১)৷ 

প্রায় একই সময়ে দেখেছি চিত্রশিল্পী গিউসেপ্পে আর্কিম্বোল্দো(Giuseppe Arcimboldo)-র পেন্টিং-এ(ছবি-২), যাঁকে সালভাদোর দালি বলতেন— "father of Surrealism"৷ ওই সময়ের আর একজনের কথাও বলতে হয়, যাঁর নাম— যুস দে মম্পের(Joos de Momper)৷ 

যাঁর অধিকাংশ পেন্টিং-এর বিষয় হত অ্যানে্থ্রোপোমরফিক্(Anthropomorphic) ল্যান্ডস্কেপ(ছবি-৩)৷ 

যাকে সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে— যে ল্যান্ডস্কেপ পেন্টিং-এ দেবতাদেরকে ব্যক্তিরূপ আরোপ(Personification) করে ব্যবহার করা হয়৷এখানে যে পেন্টিংটি দেখানো হয়েছে, সেটি গ্রীক পুরাণের গল্প থেকে নেওয়া৷ পেনটিংটির নাম— “ল্যান্ডস্কেপ উইদ দ্য ফল অফ ইকারুস”৷ আমাদের যেমন দেবতা বিশ্বকর্মা ছিলেন সর্বস্রষ্টা৷ গ্রীক পুরাণে ‘ডিডেলাস’ ছিলেন তাই৷ তার ছেলের নাম ছিল ‘ইকারুস’৷ রাজা ‘মাইনস’ এই পিতা-পুত্রকে একবার কারাগারে বন্দি করেছিল৷ কারাগার থেকে পালবার জন্য ডিডেলাস পাখির পালক ও মোম দিয়ে নিজের ও ছেলের জন্য দুটো দুটো চারটে ডানা তৈরি করে৷ তারপর দুজনে উড়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়৷ অল্প বয়েস হওয়ার জন্য ইকারুস প্রথম ওড়ার আনন্দে উড়তে উড়তে অনেক ওপরে সূর্যের কাছে চলে যায়৷ ফলে প্রচণ্ড গরমে তার ডানার মোম গলে ডানা খুলে যায়৷ অত উঁচু থেকে ইকারুস পড়ে গিয়ে সমুদ্রে এসে পড়ে ও তখুনি তার মৃত্যু ঘটে৷ এই আধুনিক সময়ে সাররিয়েলিজম্-এর সূত্রপাত হওয়ার পরে অ্যানে্থ্রোপোমরফিক্ ল্যান্ডস্কেপকে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞরা মনে করতেন মম্পের-এর এই ছবিগুলি প্রোটো-সাররিয়েলিজম৷ যদিও, তার বিপরীতে আরও একটা মত ছিল৷ তাঁরা মনে করতেন এই ছবিগুলি মূলত Fantastic art, যা সাধারণত ফ্যান্টাসি থেকে আসে, কখনই সাররিয়েলিজম্ নয়৷ এটাই ঠিক৷ কেন না, পিঠে ডানা যুক্ত হওয়ার ফলে, এদের কোনো মৌলিক পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি(Metamorphosis), বা তৃতীয় কোনো সত্যে উপনিত হতে পারেনি৷ তবুও তৎকালীন সময়ে কেউ কেউ এই ছবিকে সাররিয়েলিজম্ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন৷
এবার আমরা চলে আসব চারশো বছর পেরিয়ে সাররিয়েলিজম্-এর সূত্রপাতের ঠিক আগে৷ 

  সমসাময়িক সময়ে। ১৯২৩ সালে আন্দ্রে ম্যাশোঁ করলেন ‘অটোমেটিক ড্রইং’৷ এ বিষয়ে আমরা আগে পর্ব-৪৫-এ আলোচনা করেছি, ছবিও দেখিয়েছি। যে, অবচেতন মন কীভাবে কাজ করে তা বোঝাতে Automatism বলা হয়৷ অর্থাৎ, কোনো ছবি আঁকার আগে, কী আঁকব, কীভাবে আঁকব, কোন রঙে আঁকব, ইত্যাদি কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া, ছবি আঁকতে বসে আমার ইচ্ছার নির্দেশ না মেনে আমার হাত যেভাবে তার মতো স্বাধীনভাবে(Automatic) চলবে, এবং সেই অনুযায়ী যে ড্রইং তৈরি হয়, তাকে Automatic Drawing বলা হয়৷ যেহেতু এই ড্রইং তৈরি হয় সম্পূর্ণ অবচেতন মনের সাহায্যে, এবং সাররিয়েলিজম্ও তৈরি হয় একইভাবে অবচেতন মনের সাহায্যে, তাই অটোমেটিক ড্রইং-কে প্রোটো-সাররিয়েলিজম্ বলা হয়৷ শুধু তাইই নয়, ম্যাশোর এই অটোমেটিক ড্রইং-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে৷ দাদাইজম্ থেকে ভেঙে যে সাররিয়েলিজম্ হল, তা বোঝার ক্ষেত্রে আন্দ্রে ম্যাশো-র এই অটোমেটিক ড্রইং মাঝখানে থেকে, তা চিহ্নিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল৷ পাশাপাশি অ্যালবের্তো গিয়াকোমেত্তি(Alberto Giacometti)-র একটি ভাস্কর্যের কথা একই কারণে উল্লেখযোগ্য৷ নাম – টোর্সো(ছবি-৪)৷ 

এটির বিশেষত্ব হল—এটি প্রি-ক্ল্যাসিক্যাল স্কাল্পচার থেকে অনুপ্রাণিত, অথচ তার গঠন(Form) অত্যন্ত সহজ-সরল৷

    তবে, এই ছবিগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও, তাদের একটুও অস্বীকার না করেও, বলা যায়— দাদাইজম্ থেকে সাররিয়েলিজম্-এ পরিবর্তিত হওয়ার ক্ষেত্রে সূত্রপাতের সময়ে যে সূক্ষ্ম বদল ঘটেছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে যে ছবিটিকে বিশ্বের শিল্প-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেটি হল— “লিটল মেশিন কনস্ট্রাক্টেট বাই মিনিম্যাক্স দাদাম্যাক্স ইন পার্শন”(ছবি-৫) ১৯২৫ সালে আঁকা৷ 

এবং এর সঙ্গে আর একটি ছবির কথাও উল্লেখ করা হয়৷ যার নাম— “দ্য কিস”(ছবি-৬), যেটি ১৯২৭ সালে আঁকা৷ আর, এই দুটি ছবিরই স্রষ্টা হলেন— ম্যাক্স এর্নস্ট (Max Ernst)৷


    ধরা যাক, উত্তরাধিকারসূত্রে দুই ভাই বাবার একটি জমি পেয়েছে৷ কার জমি কতটুকু বোঝার জন্য মাঝখনে আল দেওয়া হল৷ স্পষ্ট হল, আলের এ দিকটা ছোটো ভাইয়ের, আর ওই দিকটা বড় ভাইয়ের৷ ম্যাক্স এর্নস্ট-এর আঁকা এই ছবিদুটি দাদাইজম্ ও সাররিয়েলিজম্-এর মাঝখানে আলের কাজ করেছিল৷ তবে, উদ্দেশ্য অনুযায়ী সফল হলেও, একই লোকের আঁকা হলেও, দুটি ছবির বিশেষত্ব এবং ধরন কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা ছিল৷ প্রথম ছবিটি, ১৯২৫-এ যেটি এর্নস্ট আঁকছেন “লিটল মেশিন কনস্ট্রাক্টেট বাই মিনিম্যাক্স দাদাম্যাক্স ইন পার্শন”, তাতে প্রেমজ পাঠ বা অনুষঙ্গকে(Erotic subtext)দূরত্বে রেখেছিলেন৷ কিন্তু এমন কিছু অভিনবত্ব তিনি ক্যানভাসে রেখেছিলেন, যা ওই সময় ছিল ভাবনাতীত৷

  পাশাপাশি, তাঁর দ্বিতীয় ছবিটি(“দ্য কিস”), যেটি ১৯২৭ সালে আঁকা, তাতে প্রকাশ্যে এবং সরাসরি প্রেমজ দৃশ্যকে ক্যানভাসে রাখলেন৷ সেইমতো নামকরণও করলেন সরাসরি৷ আর, শৈলীর ক্ষেত্রেও আগের ছবি থেকে সম্পূর্ণতই আলাদা৷ স্পষ্ট দেখা গেল এবং বোঝা গেল সেই শৈলী হোয়ান মিরোর দ্বারা প্রভাবিত আর, ড্রইং-স্টাইল অনেকটাই পিকাসোর মতো৷ এবং সেই ড্রইং-এ রেখার(Line) চলনে কোনো তীক্ষ্ণ বাঁক(Hard carve) ছিল না৷ রেখার সমস্ত চলনটাই ছিল অত্যন্ত নমনীয়(Fluid curving)৷ আর, রং আর রেখা একে অপরকে ছেদ করছে(Intersecting lines and colour)৷

    প্রথম ছবিটির ক্ষেত্রে আরও একটি ঐতিহাসিক মূল্য আছে৷ এর্নস্ট ছবিটি আঁকতে গিয়ে ক্যানভাসে যেভাবে সরাসরি অক্ষর বা অভিনব সব বস্তু ব্যবহার করেছেন, তা এতটাই অভিনব ছিল যে শুধু সাররিয়েলিজম্ নয়, আরও একাধিক আন্দোলন, বিশেষ করে “পপ আর্ট”-এরও দিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে৷                                 (ক্রমশ)


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

  1. ৫০ ও ৫১ তম পর্বও পড়লাম।সাররিয়েলিজম্ নিয়ে বিস্তারিত
    আলোচনা কেবল মুগ্ধ নয় আমাকে ঋদ্ধও করছে বটে। বারংবার বলার
    নয়, এই অসামান্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের দলিল হিসেবে থেকে যাবে। ধন্যবাদ শ্যামলকে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া