শ্রীরামকৃষ্ণ ও ভাবীকাল/প্রীতম সেনগুপ্ত

শ্রীরামকৃষ্ণ ও ভাবীকাল

প্রীতম সেনগুপ্ত 


'দাস তব জনমে জনমে দয়ানিধে'-- যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরুদেব সম্পর্কে এই মনোভাব পোষণ করতেন। অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণদেব সম্পর্কে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আবির্ভাবের দু'শো বছর হতে চলল, যতদিন যাচ্ছে তাঁর ভাবাদর্শের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে যেন উপলব্ধি করা যাচ্ছে। মাত্র পঞ্চাশ বৎসর (১৮৩৬-১৮৮৬)জীবৎকালের মধ্যে তিনি যে আধ্যাত্মিক তরঙ্গে জগতকে প্লাবিত করেছেন তার ব্যাপ্তি সুদূরপ্রসারী। কতভাবে তিনি প্রতিভাত হচ্ছেন মানবমননে ! মার্কিন সাহিত্যিক ক্রিস্টোফার ঈশারউড তাঁর 'Ramakrishna and his disciples ' গ্রন্থের শুরুতে লিখছেন-- 'This is the story of a phenomenon. 

      I will begin by calling him simply that,rather than 'holy man','mystic','saint'or 'avatar', ...A phenomenon is often something extraordinary and mysterious. Ramakrishna was extraordinary and mysterious,... '

       কোন মন্ত্রবলে শ্রীরামকৃষ্ণের এই সর্বগ্রাসী আধ্যাত্মিকতা ? এই বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দশম সঙ্ঘগুরু স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী বলছেন--'দেশসেবা, সমাজসেবা, সমগ্র মানবজাতির সেবায় ত্যাগই মূলমন্ত্র। ত্যাগ যুগধর্ম। মা ও স্বামীজীকে সঙ্গে এনে ঠাকুর জীবনে তাই-ই দেখিয়ে গেলেন। ' বাস্তবিকই শ্রীরামকৃষ্ণদেব ত্যাগীর রাজা ছিলেন। মানবজীবনের উদ্দেশ্য ভগবানলাভ এবং এর জন্য কামিনীকাঞ্চন ত্যাগ করতে হবে। একথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ  করলে একথা বুঝতে ও জানতে পারা যায়। ঈশ্বর ছাড়া তিনি কিছুই জানতেন না ও বুঝতেন না। কৃষ্ণপ্রিয়া মীরা যেমন বলতেন--'মেরে তো গিরিধর গোপাল দুসরা না কোঈ। / যাকে সির মোর মুকুট মেরে পতি সোঈ... '

         যুগধর্ম পালনের রূপটি ঠিক  কেমন হতে পারে সেই বিষয়ে কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ ব্রাহ্মদের যে উপদেশ দিচ্ছেন তা লক্ষ্য করার মতো। 

       শ্রীরামকৃষ্ণ (কেশবাদি ভক্তের প্রতি) -- তোমরা বল ''জগতের উপকার করা।" জগৎ কি এতটুকু গা! আর তুমি কে, যে জগতের উপকার করবে? তাঁকে সাধনার দ্বারা সাক্ষাৎকার কর। তাঁকে লাভ কর। তিনি শক্তি দিলে তবে সকলের হিত করতে পার। নচেৎ নয়। 

            একজন ভক্ত-- যতদিন না লাভ হয়, ততদিন সব কর্ম ত্যাগ করব ?

         শ্রীরামকৃষ্ণ -- না, কর্মত্যাগ করবে কেন ? ঈশ্বরের চিন্তা, তাঁর নামগুণগান, নিত্যকর্ম --এসব করতে হবে। 

         ব্রাহ্মভক্ত-- সংসারের কর্ম?  বিষয়কর্ম? 

       শ্রীরামকৃষ্ণ -- হাঁ,তাও করবে, সংসারযাত্রার জন্য যেটুকু দরকার। কিন্তু কেঁদে নির্জনে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যাতে ওই কর্মগুলি নিষ্কামভাবে করা যায়। আর বলবে, হে ঈশ্বর, আমার বিষয়কর্ম কমিয়ে দাও, কেননা ঠাকুর দেখছি যে, বেশি কর্ম জুটলে তোমায় ভুলে যাই। মনে করছি, নিষ্কামকর্ম করছি, কিন্তু সকাম হয়ে পড়ে। হয়তো দান সদাব্রত বেশি করতে গিয়ে লোকমান্য হতে ইচ্ছে হয়ে পড়ে। 

         শম্ভু মল্লিক হাসপাতাল, ডাক্তারখানা, স্কুল, রাস্তা, পুষ্করণীর কথা বলেছিল। আমি বললাম, সম্মুখে যেটা পড়ল, না করলে নয়, সেটাই নিষ্কাম হয়ে করতে হয়। ইচ্ছা করে বেশি কাজে জড়ানো ভাল নয়-- ঈশ্বরকে ভুলে যেতে হয়। কালীঘাটে দানই করতে লাগল, কালীদর্শন আর হলো না। (হাস্য)  আগে জো-সো করে, ধাক্কাধুক্কি খেয়েও কালীদর্শন করতে হয়, তারপর দান কর আর না কর। ইচ্ছা হয় খুব কর। ঈশ্বর‌লাভের জন্যই কর্ম। শম্ভুকে বললুম, যদি ঈশ্বর সাক্ষাৎকার হন, তাঁকে কি বলবে কতকগুলো হাসপাতাল, ডিস্পেন্সারি করে দাও? (হাস্য) ভক্ত কখনও তা বলে না বরং বলবে,'ঠাকুর! আমায় পাদপদ্মে স্থান দাও, নিজের সঙ্গে সর্বদা রাখ, পাদপদ্মে শুদ্ধাভক্তি দাও। '

       "কর্মযোগ বড় কঠিন। শাস্ত্রে যে-কর্ম করতে বলেছে, কলিকালে করা বড় কঠিন। অন্নগত প্রাণ। বেশি কর্ম চলে না। জ্বর হলে কবিরাজী চিকিৎসা করতে গেলে এদিকে রোগীর হয়ে যায়। বেশি দেরি সয় না। এখন ডি গুপ্ত!  কলিযুগে ভক্তিযোগ, তোমরা হরিনাম কর, মায়ের নামগুণগান কর,  তোমরা ধন্য!  তোমাদের ভাবটি বেশ। বেদান্তবাদীদের মতো তোমরা জগৎকে স্বপ্নবৎ বল না। ওরূপ ব্রহ্মজ্ঞানী তোমরা নও , তোমরা ভক্ত। তোমরা ঈশ্বরকে ব্যক্তি বল, এও বেশ। তোমরা ভক্ত। ব্যাকুল হয়ে ডাকলে তাঁকে অবশ্য পাবে। "

        শ্রীরামকৃষ্ণ জীবন এক অতি উচ্চমানের সাহিত্যে লিখিত হয়েছে তাঁর দুই অন্তরঙ্গ শিষ্যের দ্বারা। একজন গৃহী, অপরজন সন্ন্যাসী। প্রথমজন হলেন শ্রীম, অর্থাৎ শ্রী মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, শ্রীরামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে যিনি মাস্টারমশাই নামে অধিক পরিচিত। তাঁর রচনা 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত' আজ বাঙালির ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছে। কথামৃত রচনা বিষয়ে শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটী থেকে ২১শে আষাঢ়, ১৩০৪ সালে মাস্টারমশাইকে পত্র লিখছেন--

                                               'বাবাজীবন, 

    তাঁহার নিকট যাহা শুনিয়াছিলে সেই কথাই সত্য। ইহাতে তোমারকোনও ভয় নাই। এক সময় তিনিই তোমার কাছে ওই সকল কথা রাখিয়াছিলেন। এক্ষণে আবশ্যকমত তিনিই প্রকাশ করাইতেছেন। ওই সকল কথা ব্যক্ত না করিলে লোকের চৈতন্য হইবে নাই জানিবে। তোমার নিকট যে সমস্ত  তাঁহার কথা আছে তাহা সবই সত্য। আমি একদিন তোমার মুখে শুনিয়া আমার বোধ হইল যে তিনিই ওই সমস্ত কথা বলিতেছেন। ' অন্যদিকে  কথামৃত প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠান্তে স্বামী বিবেকানন্দের  প্রতিক্রিয়া অসাধারণ। ১৮৮৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আঁটপুর থেকে  শ্রীম'কে লিখছেন--

                                                          Thanks! 100000 master! You have hit Ramkristo in the right point. Few alas, few understand him!! আবার দেরাদুন থেকে ১৮৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর লিখলেন-- "P. S. Socratic dialogues are Plato all over. You are entirely hidden... "

            দ্বিতীয়জন হলেন, স্বামী সারদানন্দ। পূর্বাশ্রমে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর রচনা 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ'  একটি অসামান্য ধ্যানঋদ্ধ ,মননশীল আকর গ্রন্থ। শ্রীরামকৃষ্ণ জীবন অনুধ্যানে যে গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এই দু'টি ক্লাসিক গ্রন্থ চির ভাস্বর হয়ে রয়েছে। যাঁর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বস্তুতপক্ষে তাঁকে কেন্দ্র করে যেন নতুন এক সাহিত্য ধারার সৃষ্টি হল !ফরাসি মনীষী রোমাঁ রোল্যাঁ কিংবা মার্কিন ঔপন্যাসিক ক্রিস্টোফার ঈশারউডের লেখনীতে যথাক্রমে রামকৃষ্ণ জীবনী ও ও রামকৃষ্ণ মিশন আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ পরিচিতি ও সমাদর লাভ করে। 

            শ্রীরামকৃষ্ণ বিস্তবিকই ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। তিনি মা ভবতারিণীর কাছে প্রার্থনা করতেন, আমায় রসেবশে রাখিস মা, আমি শুকনো সাধু হতে চাই নে। চূড়ান্ত রসিক হয়েও ছিলেন ত্যাগের রাজা-- King of renunciation. বলেই দিলেন --'কামনা থাকতে --ভোগ লালসা  থাকতে-- মুক্তি নাই। তাই খাওয়া -পরা রমণ -ফমণ সব করে নেবে।' আরও বলেছেন--' ভোগ লালসা  থাকা ভাল নয়। আমি তাই জন্য যা যা মনে উঠতো অমনি করে নিতাম। বড়বাজারের রঙ করা সন্দেশ দেখে খেতে ইচ্ছে হল। এরা আনিয়ে দিলে। খুব খেলুম--তারপর অসুখ।... ধনেখালির খইচুর,খানাকুল কৃষ্ণনগরের সরভাজা, তাও খেতে সাধ হয়েছিল।... একবার মনে উঠল যে খুব ভাল জরির সাজ পরব। আর রূপার গুড়গুড়িতে তামাক খাব। সেজোবাবু নূতন সাজ, গুড়গুড়ি,  সব পাঠিয়ে দিলে। সাজ পরা হল। গুড়গুড়ি নানারকম করে টানতে লাগলুম। একবার এপাশ থেকে, একবার ওপাশ থেকে, --উঁচু থেকে নিচু থেকে। তখন বললাম, মন এর নাম রূপার গুড়গুড়িতে তামাক খাওয়া! এই বলে গুড়গুড়ি ত্যাগ হয়ে গেল। সাজগুলো খানিক পরে খুলে ফেললাম-- পা দিয়ে মাড়াতে লাগলাম-- আর তার উপর থু থু করতে লাগলাম--বললাম, এর নাম সাজ! এই সাজে রজোগুণ হয় !'

           নরেন্দ্রনাথ, উত্তরকালে যিনি স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণের ভালোবাসায় প্লাবিত হয়েছিলেন। নরেন্দ্রর জন্য কেঁদেছেনও। বলছেন--"ছোকরাদের ভালবাসি কেন? --ওদের ভিতর কামিনীকাঞ্চন এখনও ঢুকে নাই। আমি ওদের নিত্যসিদ্ধ দেখি !"

      ১৮৮১ সালে নরেন্দ্রকে প্রথম দেখেন তিনি। সেই প্রসঙ্গে বলছেন--"নরেন্দ্র যখন প্রথম এলো--ময়লা একখানা চাদর গায়ে-- কিন্তু চোখমুখ দেখে বোধ হল ভিতরে কিছু আছে। তখন বেশি গান জানতো না। দুই-একটা গান গাইলে : 'মন চল নিজ নিকেতনে ' আর 'যাবে কি হে দিন আমার বিফলে চলিয়ে। '

        "যখন আসত --একঘর লোক-- তবু ওর দিক পানে চেয়েই কথা কইতাম। ও বলত, এঁদের সঙ্গে কথা কন'-- তবে কইতাম। 

        "যদু মল্লিকের বাগানে কাঁদতুম --ওকে দেখবার জন্য পাগল হয়েছিলাম। এখানে ভোলানাথের হাত ধরে কান্না !-- ভোলানাথ বললে, 'একটা কায়েতের ছেলের জন্য মশায় আপনার এরূপ করা উচিত নয়।'

    পরবর্তীকালে এহেন শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে বিবেকানন্দের মূল্যায়ন ছিল -- LOVE personified. 

   রচনা করলেন সেই সুবিখ্যাত স্তব -- ওঁ স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিণে/অবতারবরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায় তে নম:।। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর নামাঙ্কিত মিশন (রামকৃষ্ণ মিশন) বিষয়ে বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক অধ্যাপক বিনয় সরকার বলছেন-- 'Ramakrishna has steadily been growing into a topic of researchers and investigations by the intellectuals of East and west. And the Ramakrishna Mission,  which is the product of Ramakrishna multiplied by Vivekananda, is also becoming one of the most interesting as well as instructive themes of philosophical research by the academicians of the two hemispheres... 

      The Ramakrishna mission today is a world force. With its branches and sub -branches this mission constitutes a new empire of the Indian people.'

           বস্তুতপক্ষে ভাবীকাল অপেক্ষা করে আছে এই সাম্রাজ্যের অবিশ্বাস্য বিজয়গাথার দিনগুলিকে প্রত্যক্ষ করার জন্য। যার সূচনা হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শুভ জন্মতিথির ক্ষণ থেকেই। একশো পঁচাশি বছর আগে।

                                                                       তথ্যসূত্র                                                                       ১. শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ---শ্রীম -কথিত(অখণ্ড,উদ্বোধন কার্যালয়) 

 ২.Ramakrishna and his disciples --Christopher Isherwood (Advaita  Ashrama)

 ৩.Benoy Sarkar and Ramakrishna --Vivekananda movement --Haridas  Mukherjee (The Ramakrishna Mission Institute of Culture) 

 ৪.কৃষ্ণপ্রিয়া মীরা --স্বামী বুধানন্দ (উদ্বোধন কার্যালয়) 


জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 


Comments

  1. তথ্যনিষ্ঠ সুন্দর লেখা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া