দুটি অণুগল্প/ অমর সাহা

দুটি অণুগল্প     

অমর সাহা


খাট
         
খাটটা ছিল তার খুব প্রিয় ৷ এমন কিছু দাম নয়, পাঁচ হাজার টাকা ৷ পঁচিশ বছর আগে এই দাম ছিলো ৷ আজ তার পরিমান দশ থেকে বারো গুণ বেশি ৷ হিসেব মত পঞ্চাশ ষাট হাজার টাকা ৷

  এই খাটটিতেই তার বাসর সাজানো হয়েছিলো ৷ অমিতেশ মনে মনে ভাবতো এই খাটটিতেই তার মৃত্যু শয্যাও সাজানো হোক ৷

  সংসারের জন্য সে অনেক কিছু করেছে। সংসারের উন্নতির জন্য কী অক্লান্ত পরিশ্রমই না সে করে ৷ নতুন বাড়িটাতে আজ যখন সে দামী দামী আসবাবপত্র বানালো তখনও তার দামী খাটের প্রতি মনোনিবেশ ঘটলো না ৷ বরং পাঁচ হাজার টাকার খাটটিতেই সে বেশি সড়গড় ৷ সেটাতে ঘুমাতেই সে বেশি পছন্দ করে ৷ তার উপর শুয়েই সে টিভি দেখে, বই পড়ে ৷ উবু হয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প লিখতে পারে ৷

    পুজোয় আত্মীয় স্বজনরা এলেও সে আধুনিক উন্নতমানের ডিভানের উপর শুতে চায় না ৷ অমিতেশের স্ত্রী কতবার প্রশ্ন করেছে, কেন তুমি আধুনিক ডিভান খাটের ব্যবহার করো না ? অমিতেশ শুধু হাসে ৷ সে বলে ওই ফেলনা খাটটিতেই আমার স্বস্তি বেশি ৷ সুখের চেয়ে স্বস্তি ভালো ৷

    অমিতেশের বাবা, মা, দিদি সবাই বলে পুরনো খাটটা বেচে নতুন একটা ডিভান খাট নিয়ে নিতে ৷ কথাটা শুনে রেগে যায় ৷ খাটটিকে সে মায়ের চেয়েও ভালোবাসে ৷ ছোটোবেলাটা আমাদের কীভাবে কাটে আমরা জানি না, তবে বড়বেলায় অনুভব করি সন্তানের ছোটোবেলা দেখে৷ এই খাটটিতেই অমিতেশ দশ বছর কাটিয়ে দিয়েছে মেয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ৷ মেয়ের মুখের দুধালো গন্ধ সে খুঁজে পায় ৷ খুঁজে পায় প্রিয়ার বাহু জড়ানো ঘুমন্ত রূপ ৷ মা ও মেয়ের রাত জাগা পালাতে সে কখনও কখনও অংশ নেয় ৷ সন্তানের শরীর অসুস্থ হলে তার মধ্যে জেগে ওঠে সন্তানের মুখচ্ছবি ৷ জীবনে বেঁচে থাকার আনন্দ আর কী হতে পারে ৷ খাটটা অমিতেশের কাছে আজও বেঁচে আছে সোমাসোক্তিতে ভূষিত হয়ে ৷ 

আসন
    
বাইশ বছর সংসার জীবন কাটালেও দীপ্তি শাশুড়ির মনঃপুত হয়নি। ছেলে বাইরে বাইরে ট্রান্সফারের চাকরির জন্য ঘুরে বেড়ায়। দীপ্তি কেও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে হচ্ছে। বিভিন্ন স্কুলে ঘুরে ঘুরে ছেলের মন মেজাজ ভালো নেই। এ কি জীবন!

       দীপ্তি মনে করে সংসারে খুঁটিনাটি দ্বন্দ্ব-কলহ অশান্তি থাকবে তবেই তো আনন্দ। দুঃখ কষ্ট না থাকলে সুখ পাবো কোথা থেকে?    ‌
 ‌
        দু'মাসের জন্য শাশুড়ি ছেলের কোয়াটারে এসেছে। বৌমা দেখলো শাশুড়িকে সুস্থ রাখতে গেলে তাকে কাজের মধ্যে রাখতে হবে। বলা নেই কওয়া নেই হাজার টাকার মতো খরচ করে আসনের চট,সুতো,নানা রকমের রঙিন কাপড় কিনে এনে বলে : মা, আপনি তো কাজ ছাড়া থাকতে পারে না তাই বউ আসন করে দিন পাঁচ-ছয়টা। আমি আপনার ছেলেকে নিয়ে সমান মাপের কাপড় কেটে দেবো।  

    শাশুড়ি মনের আনন্দে দিন রাত আসন বানাতে লাগলো। বিল্লু বলল: ঠাম্মি, এত সুন্দর হাতের কাজ জানো।

  ঠাম্মি প্রশংসা শুনে আরো সুন্দর করে আসুন বুনতে শুরু করলো।

     দু'মাস ছেড়ে চার মাস গড়ালো। এবার দেশে ফেরার সময় হলো। দেশয়ালিদের মুখ দেখতে না পেলে মন ছট্পট্ করছে। অলস মাথা শয়তানের আড্ডাখানা দীপ্তি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিল। দীপ্তির শাশুড়ি কাজে-কর্মে যেমন চৌকষ দ্বন্দ্ব-কলহ ও তেমনি পটু। শ্বশুরবাড়িতে থাকাকালীন এই অভিজ্ঞতা দীপ্তি অর্জন করে। 

      কাপড়ের টুকরো দিয়ে বউ আসন বোনার  আনন্দে দীপ্তি শাশুড়ির মন জয় করে নেয় প্রতিবেশীদের তা দেখিয়ে। শাশুড়ি মায়ের যে এত গুণ সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দীপ্তির শাশুড়ি মা খুব খুশি।

     মাসচারেক শাশুড়ি থাকলেও কোনদিন তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি কিংবা তর্ক বিতর্ক হয়নি। সংসার জীবন মধুময় হয়ে ওঠে। 

    বউ আসনের মধ্য দিয়ে দীপ্তির মনে এক সাংসারিক শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ ঘটে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া