দূরদেশের লোকগল্প-- মায়ানমার (এশিয়া)/চার পুতুলের গল্প /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- মায়ানমার (এশিয়া)

চার পুতুলের গল্প 
চিন্ময় দাশ 
 

( ১৮৫৭ সাল। মায়ানমার বা ব্রহ্মদেশের রাজা অমরাপুরা থেকে তুলে এনে, মান্দালয় পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। চার দিকে চারটি নদী দিয়ে ঘেরা ছিল রাজধানীটি। তাছাড়াও, অনেক উঁচু পাথরের মজবুত পাঁচিল দিয়েও ঘেরা হয়েছিল তাকে।
নতুন শহরকে দেশের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে গড়েছিলেন রাজা। উল্লেখ করবার মত এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর মধ্যে ছিল-- রেশম বয়ন, টেপেষ্ট্রি বা কাপড়ের উপর অলংকরণ, 
পাথর ও কাঠ খোদাই কাজ, মার্বেল ও ব্রোঞ্জের মূর্তি, মন্দিরের অলঙ্কার এবং সোনার পাতা ও রূপার কাজ, দেশলাই উৎপাদন ইত্যাদি। অমরাপুরা থেকে তুলে আনা হয়েছিল অধিকাংশ শিল্পীকেও । তাদেরই এক কাঠখোদাই শিল্পীর জীবনকথা নিয়ে আমাদের এই গল্প।)

মান্দালয় শহরের গা দিয়ে বয়ে চলেছে ইরাবতি নদী। নদীর অন্য পাড়ে বাস করে এক কাঠুরিয়া। কাঠ খোদাই করে নানান পুতুল বানায় মানুষটা। একটি মাত্র যুবক ছেলে তার। মনে খুব আশা-- ছেলে বড় হয়েছে, এবার সেও পুতুল গড়ায় হাত লাগাবে। কিন্তু মানুষ যা চায়, তা কি আর সব সময় সত্যি হয়! 
সারাদিন বাটালি আর হাতুড়ি নিয়ে ঠুক-ঠুক করা ছেলেটার একেবারেই পোষায় না।
ছেলেটি একদিন বাবাকে বলল-- বাবা, আমি বাইরে কোথাও যাবো ভাবছি। দেখি ভাগ্যে কী আছে। 
বাবা মনমরা হয়ে বলল-- কাঠ থেকে পুতুল গড়ে তোলা, ভারী সম্মানের কাজ। আমার সারা জীবনের ইচ্ছ, তুমি ভালো পুতুলশিল্পী হবে। খুব নাম হবে তোমার। কিন্তু তুমি যখন তা চাও না, আমি তোমাকে আটকে রাখব না।
  ভিতর থেকে একটা ঝোলা এনে ছেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, কাঠুরে বলল-- একা এক পথ চলায় অনেক সংকট। এরা রইল তোমার পথের সাথী হিসাবে। 
ঝোলায় ছিল চারটি কাঠের পুতুল। তার নিজের হাতে গড়া। পুতুলগুলি ভারী যত্ন করে রঙ করা, পোশাক পরানো।

ছেলে তো অবাক এমন কথা শুনে। পুতুল আবার সঙ্গী হবে কী করে! আর হলেওবা, সংকট এলে, এরা কী কাজে লাগবে?
বাবা বলল-- প্রতিটি পুতুলেরই আছে নিজের নিজের জ্ঞান আর ক্ষমতা। সময় হলে, তুমিও এসবের কদর বুঝতে পারবে।

বলতে বলতে একটি পুতুল বের করে, বলল-- এটি হলেন দেবরাজ। দেবতাদের গুণ হল তাঁদের অভিজ্ঞতা।
দ্বিতীয় পুতুলটার মুখের রঙ সবুজ। সেটা এক দৈত্য। কাঠুরে বলল-- দৈত্যের গুণ হল তার অগাধ শক্তি। 
তৃতীয় পুতুল এক মায়াবী যাদুকরের। কাঠুরে বলল-- যাদুকরের  গুণ হল তার জ্ঞান। 

শেষ পুতুল ছিল এক সন্ন্যাসীর। এবার কাঠুরে বলল-- সন্ন্যাসীর গুণ হল তার দয়া আর সাধুতা।
পুতুলগুলো আবার ঝোলায় ঢুকিয়ে, বাবা ছেলেকে বলল-- এই চারটি পুতুলই দরকার পড়লে, নিজের নিজের জ্ঞান নিয়ে, তোমাকে সাহায্য করবে। তবে ভুলে যেও না-- অভিজ্ঞতা আর শক্তি কখনওই জ্ঞান আর সাধুতার চেয়ে বড় নয়।   

পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়ল ছেলেটি। একটা বাঁশের বাঁক বানিয়ে নিয়েছে। একদিকে খাবার আর জলের একটা পুঁটলি। বাঁকের অন্য দিকে সুতোয় ঝোলানো চারটি পুতুল। 

কাঁধে বাঁক নিয়ে চলেছে। চলতে চলতে ছেলেটা যখন এক ঘন বনের ভিতরে পৌঁছেছে, তখন রাত নেমে এলো। একটা বটগাছের তলায় পৌঁছে থামল ছেলেটি। মনে ভাবল, ঘুমোবার পক্ষে তো জায়গাটা বেশ ভালো। কিন্তু নিরাপদ হবে তো? 

ভাবতে ভাবতে, বাবার কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার। বেশ কৌতুক বোধ হল তখন-- খুব ভালো হয়েছে। পুতুলের কী কেরামতি, একবার পরখ করে দেখা যাক।
বাবা যে পুতুলটি তাকে প্রথম দেখিয়েছিল, সেটিকেই প্রথম খুলে নিল সে। চোখের সামনে তুলে ধরে বলল-- তা হ্যাঁগো, দেবরাজ! বল তো দেখি, আজকের রাত কাটানোটা নিরাপদ হবে এখানে?  

কোথায় উধাও হয়ে গেল তার কৌতুক। তাকে অবাক করে দিয়ে, জীবন্ত হয়ে উঠল পুতুলটা। বলল-- শোন বাছা, চোখ খুলে রাখবে সব সময়। সামনে কী আছে যদি খেয়াল না করো, অন্যেরা তোমাকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে।
কথা শেষ করেই, আবার বাঁকে ফিরে গিয়ে ঝুলে পড়ল পুতুলটি।

চমক কাটল যখন, চার পাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখল ছেলেটি। নরম ধুলোর ওপর বাঘের পায়ের ছাপ চোখে পড়ল তার। আর মাটিতে নয়, রাত কাটাবার জন্য গাছে উঠে পড়ল চটপট। মাঝ রাতে সত্যিই দেখল, বড়সড় এক বাঘ এসে ঘুরঘুর করছে বটগাছটার চার পাশে। 

পরদিন। সূর্য যখন ডুবতে বসেছে, একটা পাহাড়ের তলায় পৌঁছেছে ছেলেটা। রাস্তা ছেড়ে খানিকটা উপরে উঠে গিয়ে, ঘুমের জোগাড় করল সেদিনের মত।
সকালে উঠে রওনা হতে যাবে, ছেলেটা দেখল-- দশ-বারোটা গরুর গাড়িতে দামীদামী ধনরত্ন মজুদ করা একটা কাফেলা চলেছে নিচের পথ দিয়ে। ছেলেটার মনে হল, নিশ্চয় কোনও ধনীলোকের জিনিষ। আহা, আমারও যদি এমন সম্পদ থাকতো! 

অমনি পুতুলের কথা মাথায় এসে গেল। দৈত্য-পুতুলের দিকে চেয়ে বলল-- বলো তো, কী করে আমারও এমন সম্পদ হতে পারে? 
তাকে চমকে দিয়ে, বিশাল চেহারা নিয়ে পুতুল নিজেই নেমে এল বাঁক থেকে। বলল-- শক্তি থাকলে, দুনিয়ার কোনও সম্পদই কারো অধরা নয়। দাঁড়াও, দেখাচ্ছি।
সামনের জমিতে জোরে একটা লাথি কষাল দৈত্যটা। ভূমিকম্পের মত, মাটি-পাথর-গাছপালা সব থরথর করে কেঁপে উঠল তাতে। পাথরের ছোট-বড় টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল নিচের দিকে। ধুলোর মেঘ উঠল আচমকা। তাতে ভয় পেয়ে গেল গাড়োয়ানগুলো। ঘাবড়ে গিয়ে গাড়ি ছেড়ে, বলদ ছেড়ে যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালাল।

বিকট হাসি হেসে দৈত্য বলল-- দেখলে তো নিজের চোখে। এবার মানবে তো, শক্তির কত দাম? 
ছেলেটার সেসব শোনায় মন নাই। দৌড়ে নেমে গেল গাড়িগুলোর দিকে। মূল্যবান সব রেশমের কাপড়। দামী গয়নাগাঁটি। উৎকৃষ্ট সব বাসন-কোসন, আসবাবপত্র। এখন সবকিছুই তার! বিশ্বাসই হচ্ছে না ছেলেটার। একটার পর একটা গাড়ির কাছে গিয়ে, হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখতে লাগল সব।

তখনই একটা গোঁঙানির শব্দ শুনতে পেল ছেলেটা। তার সাথে ফুঁপিয়ে কান্না। একটা গাড়ির ভিতর জড়সড়ো হয়ে বসে আছে একটি সুন্দরী মেয়ে। একেবারে তারই সমবয়সী। দেখেই ভালো লেগে গেল ছেলেটার। কাছে গিয়ে বলল-- ভয় পেয়ো না। কোন ক্ষতি করব না তোমার। কে তুমি?
এক  ঝলক তাকিয়ে নিয়ে, মেয়েটি বলল-- আমার নাম মালা। এইসব গাড়ি ভর্তি জিনিষ আমার বাবার। এসব নিয়েই আমি বাবার কাছে যাচ্ছি। 
ছেলেটা বলল-- চিন্তা কোর না। আমার সাথে চলো। যত্ন করেই নিয়ে যাব তোমাকে। 

মেয়েটা রাগের গলায় বলল-- চলো তাহলে। সব জিনিষপত্রও তো তুমি নিয়ে যাচ্ছ। কিন্তু জেনে রাখো, জীবনে একটা কথাও বলব না আমি তোমার সাথে। আসলে, তুমি তো একটা ডাকাত। 
শুনে ভারী কষ্ট হল ছেলেটার। সত্যি কি সে ডাকাত? 
ততক্ষণে দৈত্যটা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বলল-- ভাববার দরকার নাই। ক'দিন গেলেই মন বদলে যাবে। কাজের কথা হল, যা চেয়েছিলে, পেয়ে গিয়েছ। এখন চলো, এগোনো যাক।

চোখের পলক পড়ল না। রাস্তাঘাট সাফসুতরো করে ফেলল দৈত্য। কাফেলা এগোতে লাগল সামনের দিকে।
চলতে চলতে বিকেলের দিকে, দূরে শহর দেখা গেল একটা। ছেলেটা বলল-- এতসব জিনিষ নিয়ে কী করব এবার? 
দৈত্য বলল-- আমাকে নয়। একথাটা তুমি যাদুকরকেই জিজ্ঞেস করো বরং। 
ছেলেটা তখন মায়াবী যাদুকরের দিকে চেয়ে বলল-- তুমি কিছু বলতে পারবে? 
পুতুলটা জীবন্ত হয়ে সামনে এসে, বাতাসে ভাসতে লাগলো। মালা ফ্যালফ্যাল করে বিস্ময়ে চেয়ে রইল সেদিকে। যাদুকর বলল-- কোন জিনিষেই সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতে নাই। সম্পদ বাড়াতে চাইলে, নিজের চারপাশের প্রকৃতিকে জানতে বুঝতে হবে তোমাকে। 
হাতে একটা সোনালী ছড়ি ছিল যাদুকরের। সেটা ছেলেটার গায়ে ছুঁইয়ে দিতেই, শোঁ-শোঁ করে উপরে উঠে যেতে লাগলো দু'জেনে। 

উপর থেকে সব কিছু নতুন চোখে দেখতে বুঝতে পারল সে। বুঝতে পারল, চাষের জন্য কোন জমি বেশি উর্বর। তাল তাল সোনা জমে আছে কোন পাহাড়ের তলায়। এই সব।

যাদুকরকে জিজ্ঞেস করল-- বলো তো, আমি যা জানলাম, তা দিয়ে মানুষের কী উপকার করতে পারি আমি?
অন্যের উপকার তুমি করতেই পারো। যাদুকর জবাব দিল-- কিন্তু মনে রেখো, জ্ঞান হল একটা শক্তি। সেটা নিজের জন্য রেখে দাও। বিলিয়ে দেবে কেন? দেখতে পাও না, চার পাশের আর পাঁচ জন কী করছে? 
মাথা নেড়ে সায় দিল ছেলেটি। 
শহরে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করা হল। দৈত্য আর যাদুকর সাথে আছে। ক'দিনেই সবচেয়ে বড় আর ধনী ব্যবসায়ী হয়ে উঠলো ছেলেটি। বিশাল অট্টালিকা বানানো হল মালাকে খুশি করবে বলে। তারই একটা ঘরে সাজিয়ে রাখা হল পুতুলগুলোকে। 
কিন্তু সুখ নাই ছেলেটার মনে। মালা মুখ ফুটে একটিও কথা বলেনি তার সাথে। 

একদিন একটা সোনার মুকুট বানিয়ে আনা হল। হীরে, চুনী, পান্না-- পৃথিবীর যত দামি রত্ন বসানো সেই মুকুটে। দেখলে চোখ ঝলসে যায়।
মালা একঝলক তাকিয়ে দেখল কেবল। মুখে কথাটি নাই। হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল জিনিষটা।
দেখে, বুক ভেঙে গেল ছেলেটির। বলল-- মালা, তুমি জানো না, আমি তোমাকে কত ভালোবাসি। 
কিন্তু রা-টিও কাড়ল না মালা।

সারা রাত ছেলেটির চোখে ঘুম নাই। সকালে উঠেই হাজির হল পুতুলের ঘরে। যাদুকর-পুতুলকে বলল-- সবকিছু খুইয়ে মালার বাবা নিশ্চয় এখন খুব গরিব। সবকিছু তাকে ফিরিয়ে দিতে চাই আমি। মালা যাতে তার বাবাকে খুঁজে পেতে পারে, সে সাহায্যও তাকে করতে চাই আমি। যা নিয়েছিলাম, সবই দিয়ে দিতে চাই।
দৈত্য পুতুল বলে উঠল-- ভয়ানক ভাবনা তো তোমার! সাধ করে গরিব হতে চাইছ?
যাদুকর মুচকি হেসে বলল-- তাছাড়া, দেরি করে ফেলেছ  তুমি। কাল রাতে মালা পালিয়ে গিয়েছে।
-- বলছো কী তুমি? চিৎকার করতে করতে ছুটে বেরিয়ে গেল ছেলেটা। আঁতি-পাঁতি তন্ন তন্ন করে খুঁজল গোটা অট্টালিকা। কিন্তু কোথায় মালা? চিহ্নটুকুও নাই সে মেয়ের।

আবার পুতুলের ঘরে ফিরে এল ছেলেটা-- কী হবে আমার এতো সম্পদে? যা চাই তা-ই যদি না পেলাম!
এই প্রথম বার দৈত্য আর যাদুকর একটা কথাও বলল না। এই প্রথম বার ছেলেটার মনে পড়ল, আরও একটা পুতুল আছে তার কাছে, সেই সন্ন্যাসী! যার কথা একবারও মনে পড়েনি তার।

ছেলেটা করুণ চোখে তাকিয়ে, সন্ন্যাসী-পুতুলকে বলল-- তুমি বলো আমাকে, সব কিছু বেঠিক পথে চলেছে কেন? 
এই প্রথম বার জীবন্ত হয়ে উঠল সেই পুতুল। বলল-- শোন, বাছা! তুমি ভেবেছিলে, সম্পদ সুখ নিয়ে আসবে জীবনে। কিন্তু প্রকৃত সুখ আসে মহত্ব থেকে। তোমার কী আছে, সেটা আদৌ বড় কথা নয়। বড় কথা হল, তুমি তা দিয়ে কী করেছ। 

সেসময় দেবরাজ পুতুল বেরিয়ে এল জীবন্ত হয়ে। ছেলেটাকে বলল-- বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় তোমার বাবা কী বলেছিল, ভুলে গিয়েছি তুমি। বলেছিল-- জীবনে অভিজ্ঞতা আর শক্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু তারা কখনোই জ্ঞান আর সাধুতার চেয়ে বড় নয়। জীবনে কেবল জ্ঞান আর সাধুতার নির্দেশেই চলতে হয়।
বোধ ফিরে এল ছেলেটার মনে। দৈত্য আর যাদুকর অনেক উপকার করেছে তার। কিন্তু তাদের সব পরামর্শ মেনে নেওয়া ঠিক কাজ  হয়নি। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে, সে বলল-- আর ভুল হবে না আমার। বাবার কথা মতোই চলব এবার থেকে।

সেদিন থেকে শুরু হল, ছেলেটার নতুন জীবন। নতুন ভাবনায় পথ চলা।  দান-ধ্যান করে। অভাবী মানুষদের সাহায্য করে। টাকা-পয়সা খরচ করে ভালো ভালো কাজে।
বিশাল একটা প্যাগোডা বানালো সুন্দর করে। এমন সুন্দর একটা উপাসনার জায়গা পেয়ে, শহরসুদ্ধ লোক আনন্দে যারপরনাই খুশি। শুধু উপাসনা নয়, দু'বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হল সকলের। দূরের মানুষজনের থাকবার ব্যবস্থাও।

একদিন ভিড়ের ভিতর এক সুন্দরী মেয়েকে দেখা গেল প্যাগোডায়। পাশে একজন বয়স্ক মানুষ। এই মুখ জীবন থাকতে ভুলতে পারে না ছেলেটা। হিতাহিত বোধ হারিয়ে ফেলল সে। মালা-- বলে চিৎকার করে, দৌড়ে গেল তাদের কাছে।
বয়স্ক মানুষটির সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। বলল-- মহা অন্যায় করেছি আমি আপনার সাথে। আপনি কেবল আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর কিছু চাই না আমি। আজ যা কিছু আমার আছে, হাসি মুখে সব তুলে দিচ্ছি আপনার হাতে। স-অ-ব। 

চোখের জল মুছে, আবার বলল-- আমার সেই নদীতীরের কুটিরে ফিরে যাবো আমি। কাঠ খোদাই করে পুতুল বানাবো বাবার সাথে। আপনি শুধু ক্ষমা করে দিন আমাকে। সেই ক্ষমাটুকু নিয়েই ঘরে ফিরে যাবো আমি।
মালা ফিসফিস করে তার বাবাকে বলল-- এই সেই ছেলে। তবে, এখন দেখছি, বদলে গেছে মানুষটা।
বাবা বলল-- দেখা যাক, কতটা বদলেছে। যদি সত্যিই বদলে থাকে, তাহলে এমন একজন গুণী ছেলেকে চলে যেতে দেওয়াটা, লজ্জার ব্যাপার হবে। হয়তো আমার সাথে থেকে কাজ করতে অরাজী না-ও হতে পারে সে। হয়তো আমাদের এক প্রাসাদেও থেকে যেতে পারে। দেখা যাক।

অরাজী হয়নি ছেলেটা। এখন মালার বাবার সাথে একসঙ্গে কাজ করে সে। থাকেও একসাথে, তাদের প্রাসাদেই।
এইভাবে মালার মন বদল হল যেদিন, মালার সাথে বিয়ে হল কাঠুরিয়ার ছেলের। সহকারী থেকে জামাই হয়ে উঠল সে। 

আর পুতুলগুলো? বিশাল প্রাসাদ মালার বাবার। তারই একটা ঘরে যত্ন করে তাদের রাখা হয়েছে চারটে  আলমারিতে। দরকার পড়লেই সেই ঘরে যায় ছেলে। পরামর্শ করে। সাহায্য নেয় দৈত্য-পুতুলের শক্তির আর যাদুকরের জ্ঞানের। কিন্তু তার ভরসা কেবল দেবরাজের অভিজ্ঞতা আর সন্ন্যাসীর সাধুতার উপর। তাদের উপদেশ মতোই কাজ করে ছেলেটা। 

চার পুতুলকে নিয়ে, বেশ সুখে-শান্তিতেই জীবন কাটে তিনজনের।

আরও পড়ুন 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি