প্রয়াত কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। শ্রদ্ধায় স্মৃতিচারণ করলেন স্বনামধন্য বিশিষ্ট লেখক ও শুভানুধ্যায়ীরা।


প্রয়াত কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। শ্রদ্ধায় স্মৃতিচারণ করলেন স্বনামধন্য বিশিষ্ট লেখক ও শুভানুধ্যায়ীরা

চলে গেলেন আমাদের আপনজন। বুদ্ধদেব গুহ(২৯ জুন ১৯৩৬-২৯ আগস্ট ২০২১) লেখার জন্য ছাড়াও নানা কারণে জ্বলদর্চির চিঠি পৌঁছতো তাঁর কাছে। তিনিও লিখতেন চিঠি। প্রায় সব চিঠির উত্তর দিতেন। তাঁরই আঁকা রঙিন লেটার প্যাডে। জ্বলদর্চিতে নিয়মিত লিখতেন। হাজারো কাজ ও লেখার চাপের মধ্যে থেকেও লেখার আমন্ত্রণ ফেরাতেন না। ভালো বাসতেন আমাদের, জ্বলদর্চিকে। সামান্য কিছুদিন আগে, জ্বলদর্চি ১৪২৮ উৎসব সংখ্যার জন্য দিয়েছেন দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সম্ভবত এটিই তাঁর দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি প্রতাপ সিংহ। এটি প্রকাশ পাবে ১ সেপ্টেম্বর। জ্বলদর্চি ওয়েবসাইটে। আজ এখানে প্রকাশিত হল তাঁর হাতে লেখা কিছু চিঠি। জ্বলদর্চি পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই।

তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করলেন বিশিষ্ট কবি লেখক শুভানুধ্যায়ীরা। 

তোমরা অমর
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য 
(বিশিষ্ট লেখক, রবীন্দ্র গবেষক) 

তাঁর জীবনটা ছিল গল্পে ভরা উপন্যাসে ভরা প্রেমে ভরা প্রকৃতিতে ভরা প্রসন্নতায় ভরা। কোনো গুণ নেই  এমন কোনো কোনো মানুষকে উনি নিজ গুণে ভালোবাসতেন। তেমনই আমাকে। তাঁর মন ও মেজাজ বসন্তের বাতাসে উড়তো। বীরভূমের লাল মাটি তাঁকে টানতো। শান্তিনিকেতনে উনি বাড়ি করেছিলেন। দীনবন্ধুকে বন্ধু বানিয়েছিলেন।  সুপারমার্কেটে তাঁর দোকানে বসতেন। চা আসতো। বড় সাহিত্যিক হতে গেলে যে ভি-আই-পি ছাড়া মেশা যাবে না, এটা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাই শান্তিনিকেতনে এসে দুজন একজন সাধারণ মানুষের বন্ধুত্বে মজে থাকতেন। খুব গল্প জমতো। নিজেকে তিনি সামান্য লেখক মনে করতেন। এই ছিল  তাঁর অসামান্যতা। আর সামান্যকে অসামান্য মনে করতেন। তাঁর  আকাশের মতো বিশাল উদার হৃদয়ের কারণে। তাঁর সান্নিধ্যগুণে সামান্যরা কিছু সময়ের জন্যে হলেও নিজেদের সামান্য ভাবতে ভুলে যেত। তাঁর বনবিহারীর পদাবলী বইটা উনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেটি আমি আজকালে রিভিউ করেছিলাম। তিনি পড়ে খুশি হয়েছিলেন। এখন তিনি শুধুই  বুঝি রবি ঠাকুরের গান শুনবেন। 'তোমরা অমর'। 


চির-পরিব্রাজক বুদ্ধদেব গুহ
অনিতা অগ্নিহোত্রী 
(কবি ও কথাসাহিত্যিক)

পঁচিশ বছর আগে। আমার 'চিরসখা' গল্পটি পড়ে নম্বর নিয়ে  নিজেই ফোন করেছিলেন। তুমি শান্তিনিকেতন-এ পড়াশোনা করেছিলে? কখনো যাইনি শুনে কল্পনা শক্তির প্রশংসা করলেন। বললেন, যদি প্রকাশক দরকার হয়, আমাকে বোলো। দরকার হয়নি। কিন্তু  এমন উদার, স্নেহময়, জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেও, এটা বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। সারা জীবন ছিলেন সৃজনশীল। প্রকৃতি ও মানুষের জন্য ভালোবাসায় রাঙানো অজস্র বই রেখে গেলেন। আর ছবি, গান। চির-পরিব্রাজক বুদ্ধদেব গুহ চলে গেলেন সূর্যাস্তের আলোয় করুণ কোনো অলীক বনবীথিতে।


ঈর্ষণীয় পাঠক ছিল তাঁর 
অমর মিত্র
(কথাসাহিত্যিক) 

গত ৪০ বছর আগে আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসেই তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। প্রাণখোলা, প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। পূর্ব ভারতের জঙ্গলকে নিয়ে তিনি অনেক লেখা লিখেছেন। এ সব লেখার একটা আলাদা স্বাদ আছে। উনার তাই ঈর্ষণীয় পাঠক সংখ্যা। বহু মানুষ তাঁর গুণমুগ্ধ। আমি তাঁর লেখার মধ্যে প্রাণের স্পর্শ পাই। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা লিখতেন। কোজাগর, মাধুকরী, হলুদ বসন্ত ইত্যাদি পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। 'বাতিঘর' আমার পড়া তাঁর প্রথম উপন্যাস। অসম্ভব ভালো লেখা। উনাকে নিয়ে আমি একটা উপন্যাস লিখেছি। 'ভিন্দেশি পুরুষ দেখি', যা কারিগর প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছিল।


তাঁর স্মৃতি আমাদের অন্ধকারে আলো দেখাবে
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য 
(আইনজীবী) 

আর এক ইন্দ্রপতন। বাংলা সাহিত্যের আর এক দিকপাল দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মারা গেলেন| সদা হাস্যময় এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব গুহ,  সবার প্রিয় লালাদা জীবন সঙ্গীতের মঞ্চ থেকে চির বিদায় নিলেন| জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত নিয়ে রসিকতার অমন দক্ষতা খুব কম মানুষের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়| তাঁর সঙ্গে আলাপ ও ঘনিষ্ঠতা লড়াইয়ের মঞ্চে| ময়দানের বুকে বইমেলা বন্ধের আবেদন শুনানীর সময় উনি রোজ আদালতে হাজির থাকতেন| আমরা যারা ময়দানেই বইমেলা করার পক্ষে সওয়াল করছি আদালতে উনিও তাদেরই দলে| যদিও ওঁর সওয়াল কলমের ডগায়| তখন থেকেই সঙ্গ লাভে ঋদ্ধ হয়েছি| বিভিন্ন সভায় ওঁর সঙ্গে থেকেছি| বেশী কথা বলতেন না বরং মজা করতেন। শ্রোতারা কেউকেউ বলতেন, 'গান হোক।' খুব ভাল টপ্পা গাইতেন | প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী ঋতু গুহ ছিলেন জীবন সঙ্গী | নিজেও ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন| তবে উনি টপ্পা গাইতেই পছন্দ করতেন| গাইবার আগেই রসিকতা, বিনা পয়সায় গান গাইব না, ইত্যাদি আরও হরেকরকম মজার কথা| কিন্তু গান গাইতেন|  ঋতু গুহের সঙ্গে প্রেমপর্বে গানের যোগাযোগ নিয়েও খুব মজা করতেন| প্রেমিক মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর জঙ্গলজীবন নিয়ে লেখা বহু মানুষকেই জঙ্গলপ্রেমী করে তুলেছিল| 
বহু ব্যক্তিগত স্মৃতি ভেসে আসছে| সে কথাই বলি| আদ্যোপান্ত বামপন্হী ছিলেন বলেই হয়ত একটু বেশী সান্নিধ্য পেয়েছিলাম| একদিন এক অনুষ্ঠানে ইভাকে দেখে একটু টিজ  করে বললেন, এত সুন্দর সুন্দর পাঞ্জাবী কে দেয় বলতো? ইভা পরে ওঁকে দুটি পাঞ্জাবী কিনে উপহার দেওয়াতে খুব খুশী হয়েছিলেন| এই তো কিছুদিন আগে ফোনে কথা। বললেন, খুব ইচ্ছে একদিন উনি আমাদের খাওয়াবেন| প্রবাল মল্লিকের উদ্যোগে আমরা কয়েকবার ওঁর জন্মদিনও পালন করেছি| কিছুতেই ভুলতে পারি না তমালিকা পন্ডা ও লক্ষ্মণ শেঠের উদ্যোগে হলদিয়ায় কবিতা উৎসবের দিনগুলির কথা| একবার একটিরাত একসঙ্গে বেশ কয়েকজন হলদিয়ায়। নরক গুলজারের স্মৃতি উনি স্মরণ করাতেন বারবার।

  লালাদার প্রয়াণ যে শূন্যতার সৃষ্টি করল তা পূরণ করতে অনেক কাল ক্ষয় করতে হবে| সফল চার্টার্ড একাউন্টেন্ট| সফল কথাসাহিত্যিক। সফল গাইয়ে|রসিক আড্ডাবাজ| সর্বোপরি সমাজসচেতন আপোষহীন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষকে আমরা হারালাম| হারালাম এক অভিভাবক| তাঁর স্মৃতি আমাদের অন্ধকারে আলো দেখাবে|


প্রকৃতি ও ভালোবাসার স্রষ্টা
সাধন চট্টোপাধ্যায় 
(কথাসাহিত্যিক) 

ইদানীং মুঠিফোনের স্ক্রিন খুললেই চমকে উঠি। কালের যাত্রার ধ্বনি কানে বেজে ওঠে। এই তো সেদিন 'উনি' চলে গেলেন, গতকাল 'অমুক'। আজ! দেখলাম বুদ্ধদেব গুহ চিরবিদায় নিলেন।

অমন দশাসই দেহ, রসের অফুরন্ত ব্যক্তিত্ব এবং যাঁর কলমে মস্তিষ্কের থেকে হৃদয়ের আহ্বান অনেক বেশি-- চোখের সামনে ভেসে উঠলেন।

এমন সুভদ্র, প্রাণখোলা উত্তাপে কম লেখককেই পাঠকপাঠিকাদের আপন করে নিতে দেখেছি।

সাহিত্য আসরে, কখনই গানের অনুরোধ এড়াতে পারেননি। টপ্পা যেন লতার  মতো শ্রোতার হৃদয় জড়িয়ে ধরে! আর তাঁর সৃষ্টিতে প্রকৃতি ও ভালোবাসার কি সুন্দর বিনুনি! সব থেমে গেল!



পাঠকের পুরস্কার পেয়েছেন
তপন বন্দ্যোপাধ্যায় 
(কথাসাহিত্যিক) 

গত শতকের সত্তরের দশকে দেশ পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যখন অমৃত সাপ্তাহিক প্রকাশিত হতে শুরু করল, আমি প্রথম সংখ্যা থেকেই গ্রাহক। সেসময় অমৃতএ একটি নতুন ধারাবাহিক শুরু হল 'কোয়েলের কাছে'। প্রথম উপন্যাসেই বুদ্ধদেব গুহ জয় করে নিয়েছিলেন পাঠকের মন্তব্য। জঙ্গল নিয়ে এরকম নিবিড় উপন্যাস বাঙালি পাঠক পড়েননি। 

  তারপর একের পর এক নতুন স্বাদের উপন্যাস লিখে পাঠকমহলে স্থায়ী জায়গা দখল করে নিয়েছেন বুদ্ধদেব গুহ।

  আমার প্রথম কিশোর উপন্যাস 'ভুতুড়ে দুপুর' তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম ১৯৮৪ তে। তখন আমার বেশ কিছু গল্প প্রকাশিত হয়েছে রবিবাসরীয় ও দেশ পত্রিকায়। বই পেয়ে বলেছিলেন, তোমার গল্প পড়েছি, দেখি কেমন লিখেছ এই বই। 

  আমাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ একটা খাম এল আমার ঠিকানায়। খুলে দেখি বুদ্ধদেবদা এক লম্বা চিঠি লিখে প্রশংসা করেছেন আমার লেখা। এভাবেই আমি ক্রমশ তাঁর স্নেহ পেয়ে এসেছি এই দীর্ঘকাল।
 
আমিও পড়ে চলেছি তাঁর কোজাগরী, মাধুকরী, একটু উষ্ণতার জন্য--আরও অসংখ্য উপন্যাস ও গল্প। প্রেমের উপন্যাস লেখায় তিনি সিদ্ধহস্ত। শুধু চিঠির উত্তরে চিঠি দিয়ে লিখেছেন একাধিক উপন্যাস। প্রতিটি উপন্যাস বেস্ট-সেলার। 

  তাঁর অবশ্য আক্ষেপ ছিল সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার না পাওয়ায়। কিন্তু তিনি পাঠকের পুরস্কার যা পেয়েছেন তা খুব কম লেখকের ভাগ্যে জুটেছে। 

তাঁর প্রয়াণে পাঠকসমাজ শোকস্তব্ধ।



লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির জন্য ভেবেছিলেন
সন্দীপ দত্ত 
(প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র)

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ১০ম প্রতিষ্ঠাদিবস উপলক্ষে ১৯৯৬ সালের ২০ মে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে সারাদিন আলোচনা চলেছিল এবং সাতদিন ব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন বিক্রির একটি অস্হায়ী স্টল উদ্বোধন হয়। এর নেপথ্যে ভাবনাটি ছিল তৎকালীন সভাপতি অন্নদাশংকর রায়ের। তিনি বর্ষপূর্তির দিনটির সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনকে জুড়তে চেয়েছিলেন। বাংলা আকাদেমির মূল সভাগৃহে লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে আলোচনাচক্রের প্রারম্ভিক ভাষণটি আমি দিই। বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে যখন নেমে এসে পেছনের দিকে যাচ্ছি, হলের মাঝখানে ডানদিকের সাইডের চেয়ারে বসে থাকা এক ভদ্রলোক উঠে  দাঁড়ালেন এবং আমার হাত করমর্দন করে বললেন 'আমি বুদ্ধদেব গুহ। তোমার মধ্যে আগুন দেখেছি'। আমার ঠিকানা ফোন নাম্বার চাইলেন। অনেকেই তো এরকম নাম ঠিকানা চায়, কিন্তু রেসপন্স করেন না। কিছুদিন বাদেই পেলাম ওঁর দীর্ঘ চিঠি। লিখেছেন তিনি লাইব্রেরিকে সাহায্য করতে চান।আমি অভিভূত। বুদ্ধদেব গুহ একজন নামী প্রতিষ্ঠিত ব্যস্ত লেখক। তিনি তো লিটল ম্যাগাজিনের কেউ  নন। তবে? অবাকই হই। উনি ওনাকে ফোন করে জানাতে বলেছিলেন। আমি ফোন করি। এবং বলি একটা জেরক্স মেসিন যদি পাওয়া যায় ! উনি দরপত্র করতে বলায় খোঁজ নিয়ে জানলাম মোদি আর কেনন অটো জেরক্স মেসিন পাওয়া যাচ্ছে। ন্যূনতম এক--চারলাখ।উনি বলেছিলেন এত দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। বরং রবীন্দ্রসদনে যদি একটি সংগীতানুষ্ঠান করা যায়, যেখানে উনি আর ওনার স্ত্রী ঋতু গুহ গাইবেন।বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে লাইব্রেরির ফান্ডিং করা। এ ছিল ওনার প্রস্তাব। হল ভাড়া করে টিকিট সেল করে করা রীতিমতো পরিশ্রমী ও ব্যয়বহুল কাজ। এরপর টিকিট বিক্রির ওপর নির্ভরতা। ঝাঁঝিয়ে বলি, আপনি ই বলেছিলেন পাশে দাঁড়াতে চান। আমরা ভিখারি নই।আপনার যদি ইচ্ছে হয় করবেন নচেৎ এভাবে আমাদের বিরক্ত করবেন না। ফোন নামিয়ে রাখি।

  এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। লখনউ-এর মুখপত্র পত্রিকার সতীনাথ ভাদুড়ীর জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে যাই।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উনি এসেছেন। সঞ্চালকের  ঘোষণায় যখন শুনলেন আমার নাম, তখনই আমায় তিনি সাদরে মঞ্চে ডেকে নিলেন। তাঁকে যে আমি একসময় যা ইচ্ছে তা বলেছি, তা তিনি গ্রাহ্যেই আনেননি। আজ তিনি আমাকে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর পাশে বসাচ্ছেন। এত সব কথা বলা ব্যক্তিগত পিঠচাপড়ানির জন্যে নয়, মানুষটির মহত্ত্ব ও ঔদার্যর কথা সবাইকে বলার জন্যে।

  আজ উপলব্ধি করি উনি তো লাইব্রেরির জন্যে ভেবেছিলেন। কেউ তো ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবেনও না। লাইব্রেরিতে তাঁর আসার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন।আসতে পারেননি। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই।

  তাঁর চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অন্য ঘরণার ব্যতিক্রমী লেখক ছিলেন। স্পষ্ট ভাষায় দ্রোহী হয়ে তাঁকে বিগ হাউস জার্নালের নোংরাতন্ত্রের প্রতিবাদ করতেও দেখেছি। সারস্বত গ্রন্থটিতে এসব কথা অকপটে বলে গেছেন। আমি ওঁর স্নেহ পেয়েছি। আজ ঋজু, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব গুহর মৃত্যুতে গভীর মর্মাহত।



লালাদা অতিজীবিত হয়েই থাকবেন
দীপ মুখোপাধ্যায়
(ছড়াকার) 

লালাদা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর। উনত্রিশ অগস্ট রাত সাড়ে এগারোটায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অবশ্য চলতি এপ্রিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে তেত্রিশদিন লড়াই করে বাড়ি ফেরেন। এ যাত্রায় আর হাসপাতাল থেকে ফেরা হলো না। দৃষ্টিশক্তি ও নানা বয়সজনিত সমস্যাতে ভুগলেও নিয়মিত সাহিত্যচর্চার মধ্যে ছিলেন। এবারের একটি পুজোসংখ্যায় অবধি তাঁর উপন্যাস প্রকাশিত হতে চলেছে।

  সমকালীন বাংলা সাহিত্যে নিজের জায়গা গড়ে নিয়েছিলেন লালাদা। 'জঙ্গলমহল', 'মাধুকরী', 'কোজাগর' বা 'অববাহিকা'-র মতো একের পর এক উপন্যাস উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। তাঁর  সৃষ্ট ঋজুদা কিংবা ঋভুর মত চরিত্র কিশোর সাহিত্যে সম্পদ। একসময় নিয়মিত ছড়া লিখতেন তাঁর কাব্য লালামিয়ার শায়েরি আমাদের মুগ্ধ করে। শিকার কাহিনি কিংবা অরণ্যপ্রেমিক লেখক হলেও তাঁর প্রেমিক সত্তা প্রকৃতির পাশাপাশি ধাবিত ছিল নারীর প্রতি। যুবক হবার প্রথম পাঠ নিয়েছিলাম 'একটু উষ্ণতার জন্য' উপন্যাস থেকেই। টের পেয়েছিলাম যৌবনের আলোড়ন।

  লালাদা ছবি এঁকেছেন আর রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন নিষ্ঠা ভরে। তিনি সত্যিই ছিলেন এক বিরল মানুষ। দক্ষিণ কলকাতায় সানি টাওয়ার্স-এর ফ্ল্যাটে সপ্রাণ আড্ডা দিয়েছি দিলদরিয়া মানুষটির সঙ্গে। লালাদাকে নিয়ে যেমন ছড়া লিখেছি তেমনি একটি উপন্যাসও উৎসর্গ করেছি। আমার পেসমেকার সংস্থাপনের সময় দেখতে আসতে চেয়েছিলেন হাসপাতালে। আমার যৌবনকালের অজস্র দুষ্টুমির স্পনসর ছিলেন লালাদা।তিনি নেই, ভাবতেই মনের ভেতর কুঝোপাখি ডেকে ওঠে। বিষণ্ণতার বোঝা বুকে ধাক্কা মারে। আদ্র হয়ে আসে চোখদুটো। লালাদা আমার কাছে বেঁচে থাকবেন অতিজীবিত হয়েই।


তাঁর ছিল অনন্য জাদুকলম
প্রতাপ সিংহ 
(কবি)

কথাশিল্পী বুদ্ধদেব গুহ, আমাদের প্রিয় লালাদার সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ হবে না। আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তাঁর হৃদয়স্পর্শী লেখনী অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছে। পাশাপাশি সারস্বত সমাজের অনেক অভিমান, যন্ত্রণাতে বিদ্ধ হয়েও শিল্পীর তুলিতে তিনি ফুটিয়েছেন রঙিন জীবনের আশ্চর্য এবং বিচিত্র ছবিগুলো। নিশানায় অভ্রান্ত শিকারির মতো এই অরণ্যপথিক আর পাড়ি দেবেন না জঙ্গলমহলে। 'মাধুকরী', 'হলুদ বসন্ত', 'খেলা যখন', 'কোজাগর', 'কোয়েলের কাছে', 'সবিনয় নিবেদন', 'সম', 'একটু উষ্ণতার জন্য', 'চানঘরে গান' বা ঋজুদার স্রষ্টা চিরদিনের জন্য তুলে রাখলেন তাঁর অনন্য জাদুকলম। পাঠকের ভালোবাসাকে পাথেয় করেই সংগীতরসিক এই মানুষটি প্রাণখুুলে অকপটে অনেক কথা বলেছেন দীর্ঘ ও অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়। সম্ভবত শেষ সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম 'জ্বলদর্চি'-র সৌজন্যে। আরও অনেক কথা বলতে চেয়েছিলেন, তা আর শোনা হলো না। কথা বলতে বলতে বিভূতিভূষণ থেকে বিমল কর কিংবা হুইটম্যান থেকে মেন্ডেলসন -- যে অপূর্ব মুনশিয়ানায় তিনি বিচরণ করছিলেন যেন মনে হচ্ছিল সারা মাঠ জুড়েই তিনি প্রিয় ফুটবলারের মতো ড্রিবল করতে পারেন অথবা সেরা ব্যাটসম্যানের মতো ফ্লিক বা কভার ড্রাইভও মারতে পারেন অতি অনায়াসে। সামনে বসে সম্মোহিত হয়ে গেছি। মাত্র ক'দিন আগে টেলিফোনে শোনা তাঁর অন্তিম উচ্চারণ -- 'আজ আর বেশি কথা বলতে পারছি না' এখনো আমার বুকের মধ্যে বেজে চলছে।



বুদ্ধদেব গুহকে
যশোধরা রায় চৌধুরী 
(কবি)

ঋজুদার সংগে জংগলে আমি যাইনি কখনো
যদিও আমাদের ক্লাস নাইনে আর টেনে
সব মেয়ে তোমার প্রেমে মশগুল ছিল আমার ক্লাসের
পাগলের মত কাড়াকাড়ি করে পড়া মাধুকরী
হলুদ বসন্ত আর কোয়েলের কাছে

মিষ্টি খাবারে মতি ছিল না বলে
তোমাকে উপেক্ষা করতাম, আড়চোখে পড়ে নিতাম
শুধু খেলা যখন আমাকে ভাসাল

তুমি অংক কষ, তুমি ডেবিট ক্রেডিট বোঝ
তুমি বাঘ শিকারে যাও
তুমি টপ্পা গাও
ঋতু গুহর গানের পেছনেও রিন রিন বাজে তোমার অস্তিত্ব 

বাংলাভাষার বাতায়নে কত রূপ রস তুমিই এনেছ
এভাবে তোমার চলে যাওয়া
আমাদের বুকের ভেতর একটা আরো তাক খালি করে গেল

রাজকীয় বাঙালিপনার শেষ  প্রতিভূর মত
তুমি চলে যাচ্ছ বুদ্ধদেব গুহ

খলিফার মত



তিনি ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন ও  
তরুণ লেখকদের অন্যতম প্রেরণা 
আশিস মিশ্র 
(কবি সম্পাদক) 

সমাজ - সংসারে বড়ো দুঃসময় এখন। একের পর এক প্রিয় মানুষের মৃত্যু বিষণ্ণ করে দিচ্ছে। আজ কথাসাহিত্যিক ও শিল্পী বুদ্ধদেব গুহর চলে যাওয়া গোটা সাহিত্য জগতকে গভীর শূন্যতায় ফেলে দিয়েছে। শারদোৎসবের সময় চলে গেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আর একটি শারদ-উৎসবের কয়েকদিন আগে বুদ্ধদেব গুহর প্রয়াণ! মেনে নিতে কষ্ট! 

  তাঁর সঙ্গে এক দশকের বেশি স্মৃতি আমার। অনেকবারই  অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটিয়েছি। ওয়াটারলু স্ট্রিটে তাঁর অফিসে, বালিগঞ্জে সানিটাওয়ারের ফ্ল্যাটে, শান্তিনিকেতনে তাঁর বাড়িতে, হলদিয়ার বইমেলা, বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসবে, হোটেলের রুমে আড্ডা হয়েছে। নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। রসিকতা করে কত কথা বলেছেন তিনি। নিজের বই নিয়ে সই করে উপহার দিয়েছেন। তাঁর বাড়ির আতিথেয়তা কখনো ভোলার নয়। 
  কয়েক বার তাঁর কলকাতার ফ্ল্যাটে তমালিকাদি, আমি ও কমল যাই। একদিন কথা প্রসঙ্গে তাঁর বইয়ের টেবিলে একটি পোস্টকার্ড দেখে বললাম, 'এ তো আমাদের ঋত্বিক ত্রিপাঠীর চিঠি। ' তিনি বললেন, ' হ্যাঁ, ওর এমন চিঠি আসে। ঠিক মতো চোখে দেখতে পাই না বলে ওর উত্তর দিতে পারি না সময়ে। ও তো কবি। লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। 'বললাম,  হ্যাঁ।' 

  ২০১৫ সালে সংবাদ সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকার উদ্যোগে হলদিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির সত্যেন্দ্রনাথ বসু অডিটোরিয়ামে লিটল ম্যাগাজিন মেলা ও সাহিত্য সম্মেলনে তিনি উদ্বোধক হয়ে আসেন। মঞ্চে বসে বক্তব্য রাখতে রাখতে হঠাৎ বলেন,  'আচ্ছা এখানে কি ঋত্বিক এসেছে? ' ঋত্বিক মঞ্চে উঠে আসে। মুখোমুখি কথা হয়। 

  বুদ্ধদাই বলতাম। মঞ্চে  সঞ্চালনার সময় তাঁকে লালাদা বলেও সম্বোধন করেছি। আজ গোটা সারস্বত সমাজে শূন্যতা! তাঁর অনেক বইয়ের মধ্যে ' সারস্বত' মাঝে মাঝে খুলে পড়ি। বাংলা সাহিত্যের অনেক ঘটনা অকপটে তিনি লিখে গেছেন। যে কোনো তরুণ লেখক ও সম্পাদকের কাছে বইটি অমূল্য সম্পদ।



জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
আরও পড়ুন 









Comments

  1. সংরক্ষণে রাখার মতো।

    ReplyDelete
  2. সংগ্রহে রাখলাম এই অপূর্ব স্মৃতিচারণা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি 🙏🏻
    প্রয়াত কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা 🙏🏻

    ReplyDelete
  3. খুব ভালো স্মৃতি সংকলন।

    ReplyDelete
  4. খুব সুন্দর স্মৃতি উচ্চারণ

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি