ইউরোপ (ডেনমার্ক)--র লোকগল্প /চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—ইউরোপ (ডেনমার্ক)

চিন্ময় দাশ
 
তিল থেকে তাল

--আরে ভাই, সে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। একটা মুরগি কথাটা বলছে তার পাশের সবাইকে। কথা বলছে, চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেছে তার। 
শহরের একেবারে শেষ মাথায় ছোট একটা কুঠুরিতে থাকে কয়েকটা মোরগ আর মুরগি। তাদেরই একজন বলছে কথাগুলো। 
তবে ঘটনাটা সেখানে ঘটেনি। অন্য কোথাও ঘটেছে। বিভিন্ন জনের মুখে ঘুরতে ঘুরতে কানে এসেছে মুরগির। সেটাই সে শোনাচ্ছে অন্যদের—বুঝলে, বড় একটা পোলট্রি খামারে ঘটেছে ব্যাপারটা। এতটা বয়স হোল, এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা জীবনে শুনিনি কখনো। বলব কী ভাই, সারা রাত ঘুমাতেই পারিনি আমি। 
যেমনটা সে শুনেছিল, পুরো ঘটনাটা বলে গেল সকলকে। যারা শুনল, সকলেরই পালক  দাঁড়িয়ে গেছে খাড়া হয়ে। একটা মোরগ ছিল সেই শ্রোতাদের দলে। তার তো ঘাড়ের পালক, মাথার ঝুঁটি সব ঝুলে পড়েছে। সত্যি সত্যি এমন ঘটনা কেউ ঘটাতে পারে, ভেবে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে তার।

একেবারে গোড়া থেকেই বরং বলি আমরা। তাতেই বোঝা যাবে, ঘটনাটা আদৌ ভয়ঙ্কর ছিল, না কি নানাজনের মুখে মুখে সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। নেহাতই ছোট্ট আর সাধারণ একটা ঘটনা, পল্লবিত হতে হতে, কী বিশাল রূপ নিতে পারে, এ গল্প তার উদাহরণ। 
ঘটনাটা ঘটেছিল অনেকটা দূরে। ডেনমার্কের আরহাস শহরের একেবারে ওপাশের মাথায়, উত্তর সাগরের তীরে। সাগরের একেবারে কোল ঘেঁষে একটা পোলট্রি ফার্ম। সেখানেই  ঘটেছিল ব্যাপারটা।
ফার্মটা বেশ বড়ই। অনেক মোরগ আর মুরগির মেলা তাতে। সেদিন তখন সবে সূর্য ডুব মেরেছে। আঁধার নামছে আলো মুছে গিয়ে। বাসা ছেড়ে বেরুবার জোগাড় করছে পেঁচার দল। শিকার ধরবার সময় হয়েছে তাদের।
একটা মুরগির পিঠ চুলকে উঠল। ঘুমোতে যাওয়ার আগে, পেছন দিকে গলা পেঁচিয়ে পিঠ চুলকানো মুরগিটার স্বভাব। মুরগিটা যখন গলা বেঁকিয়ে পিঠ চুলকাচ্ছে, ছোট্ট একটা পালক খসে গেল গা থেকে।
তাতেই হোল যত বিপত্তি। মুরগিটা বলে উঠল—যাঃ, একটা পালক খসে গেল আমার!
আক্ষেপ করবার কারণ আছে মুরগিটার। দেখতে ভারি সুন্দর সে। সাদা ধবধবে গায়ের রঙ। কাঁচা হলুদের বরণ ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা। কিছুদিন হোল, ডিম পাড়া শুরু হয়েছে তার। সব দিক দিয়ে তারিফ করবার মত মুরগি সে।
পালকটা খসে যেতে মন খারাপ তার। কিন্তু করবারই বা কী আছে। নিজের মনেই বলল—যাকগে, খসুকগে। কী আর হবে? বরং যতই পালক খুঁটব, ততই সুন্দর দেখাবে আমাকে। 
বেশ খুশি মনেই কথাটা বলেছে সে। মুরগিটা যে হাসিখুশিই থাকে সবসময়, সবাই জানে কথাটা। দেখতে সুন্দর। সবার মধ্যে বেশ মান্যিগণ্যিও সে। নিজের মনে কথাগুলো বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
চারদিক অন্ধকার। সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে। জেগে আছে কেবল একজন। পালক-খসা মুরগিটার পাশের একটা মোরগ। পালক খসা বা তার কথাগুলো সবই চোখ দিয়ে দেখেছে আর কান দিয়ে শুনেছে সে। 
যারা শান্তিতে থাকতে চায়, তারা এসব ঘটনা দেখে না, কানও দেয় না। কিন্তু এই মোরগটার স্বভাবই আলাদা। সকলের সব ব্যাপারেই তার কৌতুহল। সব কথা সকলের কাছে বলে না বেড়াতে পারলে, পেটের দানা হজম হয় না তার। 
খুব সন্তর্পণে পাশের মুরগিটাকে ডেকে তুলল সে। ফিসফিসিয়ে বলল—এইমাত্র এখানে কী ঘটল, জানো তুমি?
ঘুম ভাঙা চোখ পিটপিট করে সে বলল—না তো। কী ঘটল গো? 
--বলছি তোমাকে। কিন্তু কারও নাম বলব না আমি। আমাদের এখানেই একটা মুরগি আছে , নিজের সবপালক ঝরিয়ে ফেলতে চায় সে। তাতে না কি তাকে বেশী সুন্দরী দেখাবে। সাত জন্মেও এমন মেয়ে আমি দেখিনি বাবা। 
পোল্ট্রির মাথায় চালা ছাউনি। কথাগুলো যেখানে হচ্ছে, সেখানেই চালার এক কোণে প্যাঁচার বাসা। প্যাঁচানি বসে বসে শুনছে সব কথা। বাসায় সে একা নয়। তার বর আছে, বাচ্চারা আছে। প্যাঁচাদের চোখ কান দুইই চিরকাল খর। বিশেষ করে রাতের সময়। পুরো পরিবার শুনেছে মুরগি আর মোরগদের আলোচনা। 
এমনিতেই গোল্লা গোল্লা চোখ প্যাঁচাদের। সেই চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সবাই। মা-প্যাঁচা ডানা ঝাপ্টে বাচ্চাদের বলল—এসব কথা শুনতে নাই। অন্যদের কথা আমরা শুনবই বা কেন? তবে, আমার মনে হয়, শুনেছিস তোরা সবাই। আমিও তো শুনলাম সব নিজের কানে।
বাবা-প্যাঁচা বলল—এসব কথা বাচ্চাদের শোনার নয়। বাবা-মায়েদেরই উচিৎ, ছোটদের আগলে রাখা।
প্যাঁচানি বলল—আরে বাপু, আমি তো সেই কথাই বলছি। বেশি সুন্দরী দেখাবে বলে, একটা মুরগি তার গায়ের সব পালক উপড়ে ফেলে দেবে? তাও আবার কতকগুলো মোরগের সামনেই! কী ঘেন্না, কী ঘেন্না। 
এভাবে কথাটা বাড়তে শুরু করল। 
প্যাঁচানি বলল—আমি একটু ঘুরে আসছি। 
প্যাঁচা জানতে চাইল—সবাইতো বেরুব। তুমি একলা আবার চললে কোথায়? 
--আমাদের এই ফার্মের বাইরেই ঘুঘুনির বাসা। যাই, তাকে বলে আসি। সে যেন তার বাচ্চাদের সামলে রাখে। সহবত শেখাবার কাজটা তো মায়েদেরই করতে হয় কি না। বলেই প্যাঁচানি উড়ে গেল। 
ঘুঘুর বাসাটা কাছেই। সেখানে ঘুঘুনিকে ডেকে প্যাঁচানি বলল—হ্যাঁগো, শুনেছ তো? দিন দিন কী সব ব্যাপার ঘটছে? 
ঘুঘুনি মুখ বাড়িয়ে বলল—কোথায় আবার কী ঘটল গো, দিদি?
--আর বোল না, ভাই। এমন কাণ্ড জন্মেও শুনিনি। এক মুরগি সুন্দরী কী করেছে জানো? এক এক করে নিজের গায়ের সব পালক তুলে ফেলে দিয়েছে। তাও আবার কেন, না, মোরগকে নিজের রূপ দেখাবে বলে। 
--সে কী গো! তার পর? ঘুঘুনির চোখ কপালে উঠে গেছে একেবারে।
--তার আবার পর কী ভাই? যা হবার, ঠিক সেটাই হয়েছে। প্যাঁচানি বলল—মরে গেছে বেকুবটা। ঠাণ্ডার দেশ আমাদের। গায়ে পালক না থাকলে, ঠাণ্ডায় জমে যাবে না? তুমিই বলো।
প্যাঁচানির গলা বলে কথা। শুধু ঘুঘুনি নয়, তাদের পাড়ার বুড়ো-বাচ্চা সবাই শুনছে কথাগুলো।
তারা সবাই চেঁচাতে লাগল—কোথায় গো? কোথায় হয়েছে ব্যাপারটা? 
কোথায় আবার? এই পাশেই, আমাদের পোলট্রি ফার্মেই। আমার নিজের চোখের সামনে। আমার কথার প্রত্যেকটা অক্ষর সত্যি। তাছাড়া, মিথ্যে বলে আমারই বা লাভ কী বলো?
ঘুঘুদের যেন তর সয় না। তাদের পাড়ার পাশটিতেই আর একটা ফার্ম। কয়েকটা ঘুঘু নেমে গেল নীচের দিকে। সেখানে ডেকে ডেকে বলতে লাগল—আরে, ও পাড়ার ফার্মের ঘটনাটা শুনেছ তো? একটা সুন্দরী মুরগি নাকি মোরগদের ভোলাবে বলে, গায়ের সব লোম উপড়ে ফেলেছিল। কেউ কেউ আবার বলছে, একটা নয়, দুটো মুরগি। কে কাকে রূপের টেক্কা দিতে পারে, তা নিয়েই দুজনে মাতোয়ারা। কী ভয়াণক ব্যাপার, ভাবো একবার।
মুরগির দল হইহই করে উঠল—তার পর? 
--তারপর আর কী? ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে, দুজনেই অক্কা। 
একটা মোরগ ছিল ভীড়ের ভিতর। সে ঝটপট করে তক্তার উপর উঠে পড়ল। এখনও তার ঘুমে চোখ ভারি। তবু চেঁচিয়ে বলল—উঠে পড় সবাই। কী বলছি শোন। তিনটে মুরগি ঠাণ্ডায় ছাতি ফেটে মরেছে। তারা নিজেরাই নিজেদের শরীরের সব পালক উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কী ভয়াণক ঘটনা। শুনে তো চুপ করে বসে থাকা যায় না। সবাইকে জানিয়ে দেওয়া দরকার কথাটা। 
এবার হোল কী, সবাই বলতে লাগল—চুপ করে থেকো না কেউ। সবাই সবাইকে জানিয়ে দাও। এমন ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে, কারোরই চুপ করে থাকা ঠিক কাজ নয়। 
কথা ছড়াতে লাগল এভাবে। রাতচরা পাখিরা শুনল। তারা বলল বনমোরগদের। বনমোরগরা বলল ফিঙেদের পাড়ায়। লেজঝোলা, কাঠঠোকরা সবাই বলাবলি করতে লাগল। 
দেখতে দেখতে ভোর হয়ে আসছে। বাদুড়ের দল ফিরে আসছিল গাছের ডেরায়। তারাও শুনে চেঁচামেচি করতে লাগল কত কথা।
এভাবে পোলট্রি ফার্মগুলোতেও পৌঁছাচ্ছে খবরটা। এক ফার্ম থেকে আর এক ফার্ম। সেখান থেকে আর একটায়। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে সেই ফার্মেও এসে পৌঁছালো কথাটা, আদতে শুরু হয়েছিল যেখান থেকে। যে ফার্মে একটা পালক খসে পড়েছিল মুরগিটার। 
সেখানে যখন পৌঁছালো, খবরটা দাঁড়িয়েছে এরকম—পাঁচ-পাঁচটা মুরগি মরেছে! কী অনাসৃষ্টি কাণ্ড বাপু। কালে কালে আরও কত কী যে দেখব আর শুনব, তার নাই ঠিক। সবাই মিলে নিজেদের শরীরের সব পালক উপড়ে ফেললি তোরা? কেন না, নিজেদের ছিপছিপে চেহারা দেখাবি তোরা মোরগদের! তাই নিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে চুলোচুলি। আঁচড়া-আঁচড়ি, কামড়া-কামড়ি! কী রক্তারক্তি কাণ্ড গো মা? কাজের কাজটা কী হোল? শেষে সব কটাই মারা পড়ল। কী ঘেন্না, কী ঘেন্না। আর, বলিহারি যাই তাদের মা-বাপদের। একটু সহবত শেখাতে পারেনি ছোটবেলায়? তাছাড়া, পোলট্রি মালিকদেরও তো কত ক্ষতি হোল, তাই না? 
কথার আর শেষ না। ডালপালা মেলে দ্রুত পল্লবিত হয়ে চলেছে।
হয়েছে কী, সেই মুরগিও শুনল কথাটা, পিঠ চুলকাতে গিয়ে যার ছোট্ট একটা পালক খসেছিল। কিন্তু সে বেচারা জানবে কী করে, তার একটা পালক খসে পড়ার ঘটনা, তারই কাছে ফিরে এসেছে পাঁচটা আস্ত মুরগির মৃত্যু হয়ে।
সেজন্যই বলে—রটনায় কান দিতে নাই। তিলকে তাল করা আমাদের স্বভাব।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া