মাটিমাখা মহাপ্রাণ/ পর্ব-চার /শুভঙ্কর দাস

মাটিমাখা মহাপ্রাণ
পর্ব-চার

শুভঙ্কর দাস 

"অন্ধকার নাহি যায় বিবাদ করিলে
মানে না বাহুর আক্রমণ।
একটি আলোকশিখা সমুখে ধরিলে
নীরবে করে সে পলায়ন। "


গরুর গাড়িটি মেঠোরাস্তার শেষে যেখানে হাট বসে,সেখানে এসে দাঁড়াল। আজ হাট। গাঁয়ের মানুষজন নিজেদের শ্রমে ও আনন্দে ফলানো শাক-সবজি এবং জিনিসপত্র এনে বেচে-কেনে।এমন কি হলদি নদীর ইলিশ মাছও হাট খুঁজলে খুব সস্তায়  পাওয়া যেতে পারে। ঠাকুরদাস গরুর গাড়ি থেকে নেমে জগমোহন আড়তদারের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
হাটের এক প্রান্তে এই একটি মাত্র ইটের গাঁথনি।সামনে একটি প্রশস্ত গদিতে বসে জগমোহন।যার চক্ষু চরকির মতো ঘোরে।অর্থাৎ হাটে কে এলো,কে কী বিকল,একেবারে নিখুঁত হিসেবটি রাখতে পারে!আড়তখানার সামনের অংশে এখন চলছে বন্ধকী কারবার। একপাশে সারিবদ্ধ কিছু গাঁয়ের চাষাভুষা লোক। পর পর একটা সাদা কাগজে টিপ-সই দিয়ে সভয়ে সরে দাঁড়াচ্ছে। একটু দূরে ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে এবং বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই লেনদেন ঘটনায় সাদাকাগজে টিপসইটি জগমোহন নিজের হাতে করছে। এটি বাসুদেবপুর অঞ্চলে বেশ বড় চালের আড়তখানা।

কী হে ঠাকুর,কত মন চাল এনেছিস? গতবারের শোধবোধ হবে তো?আর কতদিন দাদন চলবে রে? অবশ্য তুই ধারবাকির লোক নস,সে আমি ভালো করে জানি, তোদের মতো খাঁটি লোকজন আছিস বলেই তো আমাদের দাঁড়ানোর মাটি নড়ে যায়নি!

জগমোহন অতি ধূর্ত এবং হিসেবী।সরাসরি কাজের কথায় চলে আসতে পারে,কোনো ভূমিকা ছাড়াই।

আর মাটি! যে মাটির ওপর কোনো জোর নেই, অধিকার নেই, সে মাটি তো বন্দী, সে যতই উর্বর হোক..কোথা থেকে গোরার দলবল এলো... চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পাকে সব জমি হয়ে গেল জমিদারের আর আমরা হয়ে গেলাম মজুর... তা অবশ্যই জমিদারের দোষ নয়, গোরারাই তো আমাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে, সে জমিদারেরও... তুই এসব বুঝবি না জগা!

জগমোহন ও ঠাকুরদাস একসঙ্গে বড় হয়েছে, এক গ্রামে।কিন্তু জগমোহন এক জমিদারের হাতে-পায়ে ধরে কলকাতা গিয়ে নিজের ভাগ্য ফিরিয়ে এনেছে। জমিদার ও গোরা সাহেবের মধ্যস্থকারী নানাবিধ কাজকর্ম কলকাতা থেকে শিখে এখন দু'দুটো জমিদারের মূল সূত্রধর হয়েছে, একদিকে আড়তদার,অন্যদিকে জমির দালালি,এই করে গাঁয়ের বিশিষ্টজন হয়েছে। শুধু ধান-চাল নয়, জমির দালালি করে একেবারে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।

শোধবোধ বলতে! গতবারে তো অনাবৃষ্টির জন্য জমিদার নিজেই তো সব হিসেব অর্ধেকেই খাতা বন্ধ করেছিলেন,সে তো তুইও সাক্ষী ছিলি,এখন আবার গতবারের কথা উঠছে কেন?

একটু এদিক-ওদিক দেখে জগমোহন বলে উঠল,আরে দোর্ দোর্, তুই কি এখনও জমিদারকে দেবতা মানিস,ওদের কথায় কোনো ভরসা আছে, এই বললে,প্রজাদের দুঃখে সব ছাড়,আবার রাতে পেটে মদ পড়লে,চেঁচাবে, সব শালাগুলোর ভেঙে দে ঘাড়!

সেকি রে! তুই জমিদারের নুন খাস,অথচ তাদের বিরুদ্ধেই তোর এতো আগুন!

আরে আস্তে আস্তে,তুই দেখছি,আমাকে ভিটেমাটি ছাড়া করবি,আরে আরে কোম্পানির আলম গিয়ে এখন মহারানীর রাজত্ব, এতে কোনো রাজা-ফাজা বা ঐ জমিন্দার বলে কিছু থাকবে না!

তা জানি না,তবে তোর কিন্তু পোয়াবারো, তা তোর নধর ভুঁড়িটি দেখলে বোঝা যায়! হা হা হা 

জগমোহন নিজের সিল্কের পাঞ্জাবিতে ঢাকা পেটটি একবার হাত বুলিয়ে নিল,হাসল,তারপর বলল,আরে আরে,তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু, তোকে আর কী বলব,এই দ্যাখ না,যে জগমোহন নিজেই টিপসই ছাড়া সবই ক অক্ষর গো মাংস ছিল,সেই এখন কলকাতার বাবুদের মেনটর!

কী টর?

আরে ঐ বলে না,সাহেবগুলো,কী যেন,মেনটর মেনটর!মানে যে পরামর্শ ও বুদ্ধি দেয়...হ্যা হ্যা

ওহ্,বাপরে,ওসব বুঝি না,তবে লোকজন বলে শুনি,জগা নাকি ফরফর করে দু'চারটে ইংজিরি বলে আর গোরা সাহেবকে দেখলে মাথা নত করে স্যালুট দেয়,আবার ক্ষনে ক্ষণে বলে ওঠে,থাঙ্কু থাঙ্কু,হা হা হা, তা আমাকে ছাড়,মোট দশ বস্তা ধান এনেছি,সবগুলো এবারে দুধের সর,আশা করি, ঋণ শোধ হবে..

হেঁ হেঁ করে একটু হেসে,জগমোহন বলে উঠল,তা কী করে হয়? তুই যে জমিটি দান করবি ভেবেছিস,তার তোলা ধান তো এখানে হিসেবে আসবেনি!সে তো তুই নিজেই বলেছিলি...

ঠাকুরদাস নরম সুরে বললেন,হা, তা বলেছিলাম,যে এই বাসুদেবপুর গাঁয়ে কেউ পাঠশালা গড়লে আমি জমি দেবো,কিন্তু তা তো হয়নি!এইসব তোর কথায় সবকিছু ব্যবস্থা তো করলাম, কিন্তু হলতো কচু! আর তুই যে আস্ত গাড়োল,তাও দেখলাম..

আরে আরে অত ক্ষেপছিস কেন?

আর বলিসনি! তুই বললি,তোর নাকি কলকাতায় শিক্ষাদপ্তরে বড় বড় পণ্ডিত ও গোরা অফিসারদের সঙ্গে আলাপ আছে,শুধু জমি পেলেই সব হয়ে যাবে।দলিল পর্যন্ত তোকে দিয়ে রেখেছি.. সে সব বুঝি মিথ্যে.. এই তো এখানে গাঁয়ের বেশকিছু লোকজন আছে,তাদের জিজ্ঞেস কর..

আরে দূর! আমি কি বলছি তুই মিথ্যে বলছিস! জগমোহন সতর্ক হয়ে বলে উঠল,মানে, বুঝলি না! আমি তো সে দলিল, কলকাতার দপ্তরে জমাও দিয়েছি,বলেও এসেছি,ওখানে স্কুল গড়তে কোনো বাধা নেই, এই শীতের শেষে তারা সব এসে পড়ল বলে!
আরে বিদ্যেসাগর হঠাৎ সগ্গে গেলেন,না হলে কবেই হয়ে যেত! এতো ঘাবড়াছিস কেন! আমি কেন,এই গাঁয়ের কে না জানে,পাঠশালা গড়ার তোর কত সাধ,তুই কত বই পড়িস,কৃত্তিবাসী রামায়ণ তো তোর মুখেই শুনে কতকিছু জেনেছি,এসব কি মিথ্যে হতে পারে!

সে যাই হোক,যখন টোল হবে,তখন তার কথা,জানিস তো,মোদের মতো গরীবের জমিই একমাত্র সম্বল,ওটি গেলে সব যাবে! তুই নিজেও গরীবের সন্তান ছিলি,এখন না হয়, দু-চার পয়সার মুখ দেখেছিস! তা বলে গরীব চাষার কাছে জমি কী জিনিস,তুই কি বুঝিস না!

ওরে সব বুঝি,আসলে তোর স্বপ্ন পূরণ করতে চাই,তাই ঐ জমিটি যে চাষাবাদ হয়, এসব কলকাতায় দপ্তরে গোপন করেছিলাম,তাই বলছিলাম!এবছর ছেড়ে দে,পরের বছর যদি না হয়,তুই জমি ফিরিয়ে নিবি!আমাকে বিশ্বাস কর, আমি কি লোক ঠকিয়ে খাই!

সে ভাবব খন,তুই সেই কাজটি করতে পেরেছিস? সেই যে একটা বইয়ের পৃষ্ঠা তোকে দেখালাম,তুই বললি,এ কার লেখা? কোন্ বই শহর গেলেই জেনে এনে দিবি!

জগমোহন একটু বিরক্তি চেপে বলল,'কী বই? কী বলছিস?'  
আসলে জমি-জায়গা, টাকা-পয়সার বাইরে কোনো প্রসঙ্গ গেলেই তার গায়ে কাঁটা বেঁধে। ঠাকুরদাসের সঙ্গে তার যতই ছোটবেলা থেকে পরিচিত থাক,তার জমিটির হস্তান্তরিত হওয়ার আশায় এসব সহ্য করে। না হলে এই কলেরা-ম্যালেরিয়ার দেশে স্কুল! ছোঃ খেয়েদেয়ে কাজ নেই!  স্কুল করে কি টাকা আসবে?যেখানে মানুষজন ভালো করে দুমুঠো খাওয়ার জন্য শরীরের রক্ত নিঃশেষ করে,তারা পড়তে যাবে স্কুলে! আর পড়িয়ে হবে কী? যতসব উদ্ভট পেটগরমি প্রস্তাব! 
এমন কি জগমোহনের সেগুন কাঠের চকচকে সিন্দুকটি খুললে,নিশ্চিতভাবে ঠাকুরদাসের জমির দলিলটি পাওয়া যাবে!
কিন্তু এখনও যেহেতু জমিটি পাওয়া যায়নি,তাই এই আপনভোলা বিদ্যানুরাগী লোকটির অবাস্তব ও অবান্তর সহ্য করছে...

আরে বাবা,এইটি, তোকে সেদিন পড়ে শোনালাম,আর বললাম, এই বই আমাকে পড়তেই হবে। তুই বললি,মহিষাদলের হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক নাকি প্রচুর পড়াশোনা,তিনি বলতে পারবেন,তারপর তুই কলকাতা থেকে এনে দিবি, এর জন্য আগাম তোকে এক বস্তা চালও দিলাম..যাতায়াত ও বইপত্র কেনার জন্য... 

কী বলতো? আরও একবার পড় বলেই জগমোহন নিজের ক্যাসিয়ারকে কী একটা ইশারা করে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে একজন লোক প্রবেশ করল,হাতে লাঠি,পক্ব কেশ, পায়ে বার্নিশ করা জুতো। গদিতে গিয়ে বসল।
আসুন আসুন, গজেন্দ্রবাবু,এইখানে বসুন,এই যে এর কথাই আপনাকে বলেছিলাম,এ হল গিয়ে  ঠাকুরদাস,আমার বাল্যকালের বন্ধু। 
তারপর জগমোহন ঠাকুরদাসের দিকে তাকিয়ে বলল,ওরে ইনি গজেন্দ্রবাবু,প্রচুর পড়াশোনা জানা লোক,বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করবেন।তুই কী জানতে চাইছিস,বল একবার?

গজেন্দ্রবাবু একবার ঠাকুরদাসের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাস্য দিলেন। দেখা গেল,খুবই আগ্রহ নিয়ে শুনতে চান,কী সেই আবিষ্কার করা পুঁথি?
ঠাকুরদাস অতি আনন্দে নিজের চটের ব্যাগ থেকে একটি পুঁথির গোটা দশেক ছেঁড়া পাতা বের করলেন।তারপর এমনভাবে যত্ন করে হাতে তুলে ধরলেন,যেন কোনো সোনার অলংকার। মাটিতে পড়লে বেঁকে যাবে বা ভেঙে যাবে। 
এই পুঁথিটির শুরু নেই, শেষ নেই! শুধু এই কয়েকটি পাতা এক জমিদারের বাড়িতে হিসেবের কাগজপত্রের মধ্যে ছিল। বড়পুত্র দেবেন এনে দেয়,যতটা পড়েছে ঠাকুরদাড,তারপর পড়ার প্রচণ্ড আগ্রহ বেড়ে গেছে তাঁর,বলপ উঠলেন,আচ্ছা একটু শোনাই...

"তখন সেই অসভ্যজাতীয় ব্যক্তি গর্বিত বাক্যে বলিল,মহাশয়, আমরা বহুকালের অসভ্য জাতি।আপনারা সভ্য জাতি বলিয়া অভিমান করিয়া থাকেন।কিন্তু দেখুন,সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার বিষয়ে  অসভ্য জাতি,সভ্যজাতি অপেক্ষা কত অংশে উৎকৃষ্ট। সে যাহা হউক, অবশেষে আপনকার প্রতি আমার বক্তব্য এই,যে অবস্থার লোক হউক না কেন,যখন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হইয়া, আপনকার আলয়ে উপস্থিত হইবে,তাহার যথোপযুক্ত আহারাদির ব্যবস্থা করিয়া দিবেন।তাহা না করিয়া তেমন অবস্থায়, অবমাননা পূর্বক তাড়াইয়া দিবেন না।এই বলিয়া নমস্কার করিয়া সে প্রস্থান করিল।"

এতটা পড়ে ঠাকুরদাস একটু থামলেন।তিনি যে এই রচনার অংশবিশেষ পাঠ করে মুগ্ধ এবং সজীবতায়,পূর্ণ হয়েছেন,তা তাঁর মুখ দেখলে বোঝা যায়!
তারপর বললেন,হ্যাঁ,এই লেখাটির সবটা পড়তে চাই,এটি একটি মনে লাগা লেখনি,এ কার লেখা? জানেন আপনি?কী বই এ?

দেখি,বলে গজেন্দ্র হাত বাড়িয়ে বইটির ছেঁড়া অংশগুলো নিলেন।ভালো করে দেখলেন। এবং একটু সঠিক নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায়,গজেন্দ্রবাবু লোকটি আসলে অক্ষর-পরিচয়হীন ব্যক্তি।সে জগমোহনের মতো টিইসইওয়ালা দূর গ্রামের ব্যবসাদার,ব্যবসার কাজে জগমোহনের কাছে এসেছে এবং তারই বাড়িতে আতিথেয়তা নিয়েছে।এখন ঠাকুরদাসের অতি কৌতূহল ও পড়ার সম্বন্ধে আগ্রহ দেখে,সেই লোকটিকে জগমোহন উপস্থিত করেছে শিক্ষানুরাগী হিসেবে। গজেন্দ্র এসব নিছক গেঁয়ো মজা ভেবেই এসেছে,এখন সে একটি বিষয়ে বিস্মিত হয়েছে,ঠাকুরদাসকে দেখে,এই ধরণের সস্তা খেটো ধুতি পরা কৃষ্ণকায় একটা চাষাভুষা লোক,এতো আগ্রহ পড়াশোনার.. এই কী সব আতিপাতি কঠিন কঠিন লেখা,সেই বই পাওয়ার জন্য বস্তাখানিক চাল দিয়ে দিয়েছে!
এই সব ঘটনা তার কাছে আজব লাগল! 
ঠাকুরদাস সেই ছেঁড়া পাতাটির নিচের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন,দেখুন,এখানে একটা কথা পড়া যাচ্ছে, আখ্যান.. তারপরে ইঁদুরে কেটেছে! বইটির নাম,নিশ্চয় 'আখ্যান' দিয়ে শুরু...

গজেন্দ্রবাবু মুখটা গম্ভীর করে সমর্থন করল। এবং বলল,ঠিক আছে,বুঝতে পেরেছি,এটি আমার পড়া, তবে অনেকদিন আগে পড়েছিলাম তো! তাই মনে করতে পারছি না! আমি জানিয়ে দেবো..
এগুলো কি আমার কাছে দু-একদিন রাখতে পারি?

হা,হা,অবশ্যই রাখুন,ঠাকুরদাস বিগলিত হয়ে বলল।আমি আরও চাল দেবো,এই বইটি এনে দিতে হবে...কিন্তু... 

হা,চেষ্টা করব,এ নিশ্চিত কোনো গোরা সাহেবের লেখা,এখন অনেক গোরারা বাংলায় বই লিখছে,সাহেব জাতির খেয়াল আর কি! দেখছেন না,কীসব সভ্য ও অসভ্য বলছে,মানেটা কী? ওদের চোখে তো আমরা অসভ্য আর ওরা নিজেদের সভ্য মনে করে... তাই ঐ গোরারা ছাড়া এসব কেউ লেখে!আমি এতোদিন কাপড়ের ব্যবসা...
বলেই গজেন্দ্রবাবু জিভ কেড়ে ফেললেন।

আচ্ছা, আচ্ছা, এই তো উনি বললেন,এনে দেবেন,তুই উতলা হোসনি! এখন চালের হিসেব বুঝিয়ে ঘরে যা...অতি দ্রুত কথা চাপা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠল,জগমোহন। 

হা,আমি তিনদিনের মধ্যে খুঁজে এনে দিচ্ছি! এ পাওয়া যাবে...এখনই বলে দিতাম,পুঁথিটির নামটা পেটে আসছে,মুখে আসছে না! হে হে হে করে হেসে বললেন গজেন্দ্রবাবু।
অবশ্যই ভেতরে ভেতরে জানে,ঠাকুরদাস বেরিয়ে গেলেই বইটির খণ্ডাংশ মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দু'জনেই ঠাকুরদাস নামক বোকার কাণ্ডকারখানার জন্য বেশ হাসি হেসে নেবে!
সেইসঙ্গে গজেন্দ্রবাবুর মনে মনে এ-ও এলো,এমন পাগল লোক থাকে!বই পড়ার জন্য চাল বিলিয়ে দেয়! ভাবা যায়!

ঠিক আছে, তুই বুঝে নে দশবস্তা চাল আছে ,তারপর আবার গজেন্দ্রের দিকে একপ্রস্ত অনুরোধ জানালেন।বইটি এনে দেয়।
অর্থাৎ ঠাকুরদাসের ভাবটা এমনই যেন চালের দামের চেয়েও ঐ বইটি বেশি মূল্যবান।
আড়তখানা থেকে বেরিয়ে পড়লেন ঠাকুরদাস।
মনে মনে বেশ উৎফুল্ল। কারণ তিন-চার দিনের মাথায় এই আশ্চর্য বইটি হাতে পাওয়া যাবে।পড়া যাবে।আহা!  কী ভালো হবে!ছোট্ট কুমার এতো গল্প শুনতে ভালোবাসে, আবার কোনো বই ধরে পাঠ করলে চুপটি করে শোনে।তার মুখ দেখলে বোঝা যায়,সে বুঝুক আর না বুঝুক,তার একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে! 
গরুর গাড়িটি মেঠোপথ ধরে চলতে লাগল।

গৃহের সামনে এসে গরুর গাড়িটি থামল। ঠাকুরদাস দরজার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন। ভেতরে দৃশ্যটি তাঁকে অবাক করে দিল।একটি ছোট্ট শিশু কোথা থেকে একটি টালির টুকরো জোগাড় করে আপনমনে লিখছে,মাটির ওপর।অর্থাৎ গোটা উঠোনটাই শ্লেট।তারপর নিজে লিখছে,আর বলছে,অ আ ই ঈ 
 মা, মা,দেখো মাটিতে কেমন লিখেছি... মা...গো

একটু উঁচু এক চিলতে বারান্দায় বসে লক্ষ্মীদেবী রান্না করছিলেন।তিনি নিরক্ষর। ভালো জ্ঞানগম্যি হওয়ার আগেই বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। তাদের মতো মেয়েদের কোনো পড়ার সুযোগ ও স্থান ছিল না! তবুও তিনি বালকের পড়ার পদ্ধতিকে আগলে রেখেছেন।তিনি নিজেই বর্ণমালার কিছুই লিখতে পারবেন না,তবুও বালকের উচ্চারণের পরে নিজেই সেই উচ্চারণকে নকল করে উচ্চারণ করছেন এবং বলছেন,ঠিক আছে, ঠিক আছে,তারপর লেখ.. তো
বলেই তিনি উনুনের ভেতর কাঠ গুঁজে দিচ্ছেন।
বালক আবার একটা বর্ণ লিখে চিৎকার করে মাকে দেখিয়ে নিচ্ছে... 

ঠাকুরদাসের মন আনন্দে ভরে গেল,যেন নিজের ছোটবেলাটা দেখতে পেলেন। নিজের পুত্র কুমার পড়াশুনার জন্য যা হাতের কাছে পেয়েছে, তাই দিয়ে পড়ার কাজটি করে যাচ্ছে... 
খুব আগ্রহ পড়াশোনার...
সত্যি, সেই ফকির আবদুল লোকটি কুমাররের নামকরণের দিন চাল নিয়ে বলেছিল,এই ছেলে বড় হয়ে খুব পড়তে পারবে,খুব মানুষ পড়তে পারবে!মুই জাতফকির,মোর কথা অনথ্যা হবেনি!

মানুষ পড়তে পারবে! কথাটি ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি ঠাকুরদাস।কিন্তু খুব পড়াশোনা হবে,এটি শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন।

ঠাকুরদাস ঘরে ঢুকলেন না।
আবার হাটের দিকে ছুটলেন।একটা শ্লেট-খড়ি আনতেই হবে...

সত্যি একদিন,যিনি মানুষ পড়বেন,তিনি শ্লেটের বদলে মাটি অর্থ গোটা ভুবনকেই শ্লেট করেছেন,পড়ার জন্য...  বোঝার জন্য... 
আর মাটি থেকে আসবে মানুষ....

ক্রমশ.....

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া