রাশিয়ার লোকগল্প/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প—রাশিয়া

চিন্ময় দাশ

সোনার পাহাড়ে সিঁড়ি নাই



একমাত্র ছেলে আর অঢেল টাকাকড়ি রেখে মারা গেল এক বণিক। সারা জীবন দূর দূর দেশে বাণিজ্য করে সিন্ধুক ভর্তি টাকা করেছিল মানুষটি। 
একমাত্র ছেলে। আদরে আদরে এক্কেবারে বাঁদর হয়ে উঠেছিল সে। বাপও বলত না কিছু। বাপ মারা যেতে,  সিন্ধুকের পুরো মালিকানা পেয়ে গেল ছেলেটি। তারপর যা হয় আর কী!
দু’হাত খুলে খরচ করতে লাগল। আমোদ-ফূর্তির যেন শেষ নাই তার। টাকা যেন বাতাসে উড়তে লাগল। যত বড়ই হোক, কলসীর জল একদিন ফুরোবেই। একদিন একেবারে ফতুর হয়ে গেল ছেলেটা। 
যেদিন ইয়ার-বন্ধুরা কেটে পড়তে লাগল, টনক নড়ল ছেলের। চোখ কপালে উঠে গেল সিন্ধুকের ডালা তুলে । একটা রূবলও পড়ে নাই তলানি হিসাবে। 
ক’দিন না যেতেই, অবস্থা এমন দাঁড়াল, মুখে তুলবার রুটিও জোটানো গেল না। গলা ভেজাবে, পানীয়ের বোতলও নাই আলমারিতে। 
পেটের খিদে ভয়ানক জিনিষ। অগত্যা কী আর করে? একটা বেলচা হাতে নিয়ে, বাজারে গিয়ে দাঁড়াল। চাকর হিসাবে যদি কেউ কিনে নিয়ে যায় দয়া করে।
বাজারে বেশ ভীড়। অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছে ভীড় করে। এরা সবাই কাজে যেতে চায়। দুপুর গড়িয়ে গেল যখন, দূরে একটা গাড়ি আসতে দখা গেল। বেশ আশা হোল ছেলেটার মনে।
গাড়িটা এসে পড়বার আগেই, একটা হুলুস্থুল কাণ্ড। এতক্ষণ ভীড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর সে কী ছোটাছুটি! যে যেদিকে পারল, হুড়মুড়িয়ে দৌড় লাগিয়ে সরে পড়ল। ছেলেটা আজ নতুন এসেছে এখানে। কারণটা কিছুই মাথায় ঢুকল না তার। 
ততক্ষণে গাড়িটা এসে দাঁড়িয়েছে বাজারে। চার দিক শুনশান। দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র বণিকের ছেলেটাই। গাড়ি থেকে নামল একজন লোক। ঝলমলে গাড়ি, লোকটির চেহারা, পোষাক-আসাক দেখে বোঝা গেল, বেশ কেউকেটা মানুষ লোকটি। 
--কীহে, কাজে যাবে বলে দাঁড়িয়ে আছো নিশ্চয়? লোকটি জানতে চাইল। 
ছেলেটি আশান্বিত হয়ে, বলল—হ্যাঁ, সেজন্যই এসেছি। 
লোকটি বলল—বাহ, বেশ ভাল কথা। তা, মজুরী কত চাও? 
--দিনে একশ’ রুবল হলেই আমার চলবে। 
--বলো কী হে? এত চড়া দর কেন?
কাজের জন্য দাঁড়াতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। কিন্তু তার বাবাও কম বড়লোক ছিল না। ছেলেটা মেজাজের গলায় বলল—দর চড়া হলে, অন্য কাউকে দেখো। কিন্তু তোমার গাড়ি দেখা মাত্রই তো ভেগেছে সকলে।  
লোকটি বলল—তাহলে ঠিক আছে। কাল সকালে জাহাজঘাটায় হাজির হয়ে যেও বেলচা নিয়ে। আমার জাহাজ বাঁধা আছে সেখানে। 
সকাল হতেই জাহাজ ঘাটায় এসে পৌঁছালো ছেলেটা। ধনী লোকটি তার জন্যই অপেক্ষা করছিল ডেকের উপর চেয়ার পেতে বসে।
সব কিছু দেখে, ছেলেটার তো চক্ষু চড়কগাছ! পুরো জাহাজখানা সোনায় মোড়া। চেয়ারে বসে গড়্গড়া টানছিল লোকটি। চেয়ার, গড়্গড়া সবই সোনা দিয়ে বানানো। সকালের রোদ পড়ে, জ্বলজ্বল করছে সব। 
জাহাজ ভেসে চলেছে সমুদ্রের বুকে সাঁতার কেটে কেটে। কত দূর চলবার পর, দুপুরও গড়িয়ে গেল যখন, একটা দ্বীপে এসে থামল জাহাজ। বালিতে পা রেখেই চেঁচিয়ে উঠল ছেলেটা—হায়, হায়! আগুন লেগেছে ওখানে কোথাও।
বাবু একবার চোখ তুলে চাইল শুধু। মুখে হাসি ফুটে উঠল তার। বলল—আগুন কোথায় হে? ওটা আমার প্রাসাদ। সূর্যের আলো পড়েছে তো, তাতেই আগুনের মত জ্বলছে। 
এত বড়লোকও হতে পারে কেউ? খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ছেলাটা। 
ঘোড়ায় টানাএকটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল আগে থেকেই। তাতে চড়ে বাবুর বাড়িতে পৌঁছানো গেল। মুখে যেন কথা  সরে না ছেলেটার। চোখের সামনে যা কিছু, সবই সোনা দিয়ে মোড়া। বিস্ময়ের সীমা নাই তার। 
বাবু কাজের লোক নিয়ে ঘরে ফিরেছে। বাবুর বউ আর মেয়ে এসে পৌঁছাল ভেতর থেকে। দুজনেই ভারী সুন্দরী। মেয়েটির দিক থেকে তো চোখ ফেরানোই যায় না যেন। এত সুন্দরও কেউ হতে পারে, কল্পনাও করা যায় না। 
নিজেরা কুশল বিনিময় শেষ করে ভেতরে চলল এবার। কাজের ছেলেটিও চলল পেছন পেছন। বিশাল আকারের একটা ওক কাঠের টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া শুরু হোল। সে এক এলাহি কাণ্ড। বাপের সিন্ধুকে ছিল অঢেল টাকাকড়ি। বহু ভোজের আয়োজন করেছে ছেলেটা তার নিজের হাতে। কিন্তু এখানে যা দেখছে, তার কোন তুলনাই হয় না। খাদ্য, পানীয়, আদর-যত্ন কোন কিছুরই ঘাটতি নাই। 

বাবু বলল—আজকের দিনটা কারও হিসাবের মধ্যে যাবে না। না তোমার, না আমার। আজ আনন্দ আর খানাপিনা করা যাক। কাজ আর তার হিসাব-নিকাশ শুরু হবে আগামীকাল থেকে।
ছেলেটির বয়স এমন কিছু নয়। দেখতেও ভারি সুন্দর। যেমন লম্বা তেমনই চওড়া। সুঠাম চেহারায় ছেলেটি যে বেশ বলশালী, বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সেই ভেবে, বাবু বেশ খুশি। 
বাবুর বউ আর মেয়ের যে তাকে পছন্দ হয়েছে, বেশ বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তেমন উচ্ছাস নাই দুজনের মুখে। উলটে হোল কী, খাওয়ার পর্ব মিটলে, উঠে যাওয়ার সময়, ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মেয়েটি। একটা চোখের ইঙ্গিত করে গেল ছেলেটিকে, সে যেন তার পিছন পিছন বেরিয়ে আসে। 
ছেলেটিও চালাক-চতুর কম নয়। সে ধীরে সুস্থে বেরিয়ে মেয়েটিকে অনুসরণ করে চলতে লাগল। একটু আড়াল পেয়েই, ছেলেটার হাতে দুটো পাথর গুঁজে দিল মেয়েটি। বলল-- যত্ন করে রেখো। বিপদের সময় কাজ দেবে। আর হ্যাঁ, সাবধানে থেকো। 

বলেই নিঃসাড়ে সরে গেল বাবুর মেয়ে। 
পরদিন সকালে ছেলেটিকে নিয়ে কাজের জায়গায় চলল বাবু। ছেলেটি তার পিছনে। কিন্তু তারা দেখতে পেল না, পিছনে মা আর মেয়ে দুজনে বিষণ্ণ চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আছে। 
কাজের জায়গায় এসে হাজির হোল বাবু। সমুদ্রের একেবারে গায়েই এক পাহাড়। যেন কোথা থেকে ডুবসাঁতার দিয়ে এসে, ভুস করে উঠে পড়েছে কিনারা পেয়ে। ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে পাহাড়টার দিকে। 
সোনার পাহাড়। সকালের রোদ ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে তার গা থেকে। পাহাড়টা যেমন খাড়া, তেমনি পিছল। হেঁটে উঠবে, কি বেয়ে বেয়ে, কোন কিছুরই উপায় নাই। 
বাবু বলল—অবাক হয়ে দেখবার কিছু নাই। এখুনি এটার মাথায় উঠেই সোনা খুঁড়বে তুমি। সব দেখতে, আর সব বুঝতে পারবে তখন। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে তোমার কাছে। 

ছেলেটা তো আকাশ থেকে পড়ল—কিন্তু এটার মাথায় উঠব কী করে?
--সে ভাবনা তোমার নয়, বাপু। কাজ করবে আমার জন্য। তাই তোমাকে ওঠানো বা নামানোর ভারও আমার। যাকগে, ওপরে কিন্তু জল নাই। ভরপেট জল খেয়ে নাও এখনই। 
ছেলেটা তো জানে না, জলের সাথে বাবু কী মিশিয়ে এনেছে। জল খাওয়ার খানিক বাদেই ঘুমে ঢলে পড়ল ছেলেটা। দেখে মুচকি হাসি বাবুর মুখে। 
বাড়ি থেকে আসবার সময় একটা বুড়ো ঘোড়াও এনেছিল বাবু। এটাই তার কাজের রেওয়াজ। ধারাল একটা ছুরি দিয়ে ঘোড়ার পেটটা ফালাফালা করে চিরে, নাড়িভুঁড়িগুলো ফেলে দিল। এবার ঘুমন্ত ছেলেটাকে ঢুকিয়ে দিল ঘোড়ার পেটের ভিতর। সেইসাথে বেলচাটাকেও। এবার শক্ত করে পেটটা সেলাই করে, একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে চুপটি করে বসে রইল। 
বেশি সময় গেল না। আকাশ কালো করে উড়ে এল একঝাঁক দাঁড়কাক। তাদের কা-কা শব্দে কান পাতা দায়। কিন্তু বাবুর মুখের হাসিটি এখন বেশ চওড়া হোল। 
মরা ঘোড়াটাকে ঘিরে ধরেছে কাকগুলো। লোহার মত শক্ত মস্ত মস্ত ঠোঁট কাকেদের। খানিক ঠোকরা-ঠুকরি করে, আস্ত ঘোড়াটাকে নিয়েই উড়ে গেল কাকেরা। সোজা পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে খুবলে খুবলে খেতে শুরু করে দিল। 

খানিক বাদেই, কাকেদের ঠোক্কর খেয়ে, চেতনা ফিরে এল ছেলেটার। ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে উঠে বুঝতে পারল, পাহাড়টার মাথায় পৌঁছে গেছে সে। এদিক ওদিক চেয়ে দেখল। একদিকে দ্বীপটা। বাকি তিন দিক জুড়ে সমুদ্রের থইথই জল। মাঝখানে উঁচু সোনার পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সে একা মানুষটা। 
কোন কিছু ভেবে উঠবার আগেই, বাবু নীচ থেকে হাঁক পাড়লেন, বেলচাটা বের করে কাজে লেগে যাও। দেরী করে কাজ নাই।
ছেলেটা বেলচা নিয়ে সোনার তাল কাটছে, আর বাবু নীচ থেকে হাঁক পাড়ছে—নীচে ফেলে দাও।
ছেলেটা ফেলছে, আর বাবু কুড়োচ্ছে। বাবু কুড়োচ্ছে,  আর ছেলেটা ফেলছে। এইভাবে চলতে চলতে সবে বিকেল হয়েছে, বাবু হাঁক দিলেন – গাড়ি সব ভর্তি হয়ে গেছে। আর নয়। আমাকে সাহায্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। চলি বন্ধু, বিদায়!

ছেলেটা তো হায় হায় করে উঠল। আঁতকে উঠে বলল—আর, আমি? আমি নামবো কী করে? 
--নামার দরকারটা কী তোমার? বাবু বলল—আশপাসে তাকিয়ে দেখ, তোমার মতন অনেককেই পেয়ে যাবে। সবাই উঠেছিল এই কাজে। আমারই জন্য। গুণে দেখে নিও, গোণাগুণতি নিরানব্বই জনের কঙ্কাল পেয়ে যাবে ওখানে। তোমাকে দিয়ে আজ একশ’ পূর্ণ হোল। ভাগ্যবান মনে করো নিজেকে। তুমি হলে শততম  শহীদ, যে অন্যের জন্য প্রাণ বলি দিচ্ছো। বিদায়। 
মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে ছেলেটার। বারোখানা গাড়ি সোনায় ভর্তি করে, সত্যি সত্যি বাড়ি চলে গেল বাবু। ভালোমানুষ সেজে মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়ে গেল মানুষটা। তাও আবার সাধারণ মৃত্যু নয়। দিনের পর দিন এখানে পড়ে থেকে, তিলে তিলে মরতে হবে তাকে। এভাবেই মেরেছে অন্য সবাইকেও! 
তখনই আবার কাকের ডাক। কা-কা করতে করতে একঝাঁক দাঁড়কাক এসে উড়তে লাগল তার মাথার উপর। শততম শিকার জুটে গেছে তাদের। 
একপাল বিশালদেহী কাক, আর তাদের লোহার মত শক্ত একজোড়া করে ঠোঁট। অনাহারে একেবারে মরে যাওয়ার আগেই, যখন নড়াচড়ার শক্তিটুকুও আর থাকবে না শরীরে, তখন কাকগুলো এস ঘিরে ধরবে তাকে। ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাবে জীবন্ত শরীর থেকে। এটাই অভ্যেস হয়ে গেছে পাখিগুলোর। ভাবতেই সারা শরীর শিউরে উঠল ছেলেটার। 

তখনই মাথাটা চিড়িক করে উঠল। বাবুর মেয়ে হাটে দুটো পাথর গুঁজ়ে দিয়ে বলেছিল, বিপদের সময় কাজে লাগবে। তাহলে কি এই বিপদের কথাই বলতে চেয়েছিল? মা-মেয়ে জানতো সবকিছু?  
তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে বার করে আনল পাথর দুটোকে। যেই না ঠুকে দিয়েছে দুটোকে, অমনি তাগড়াই চেহারার দুটো লোক তার সামনে হাজির। যেন আকাশ ফুঁড়ে নেমে এল দুটো প্রাণী। 
--হুকুম দাও, মালিক। কী করতে হবে তোমার জন্য। আগু-পিছু ভাববার সময় নাই এখন। ছেলেটা তাড়াতাড়ি বলল—এখান থেকে নীচে নামিয়ে নিয়ে চলো আমাকে। 
কথা শেষ হতে না হতে, দুজনে বগলদাবা করে ফেলল ছেলেটাকে। চোখের পলকে জলের একেবারে কিনারায় নামিয়ে দিল তাকে। 
জল ছুঁয়ে যাচ্ছে পায়ের পাতা। মাথাও ঠাণ্ডা হচ্ছে একটু একটু করে। বেঘোরে মারা পড়বার ভয়টা গিয়েছে। এবার কোন রকমে সরে পড়তে হবে এই ভয়ানক দ্বীপ থেকে।

খানিক বাদে একটা জাহাজ যেতে দেখল ছেলেটা। অমনি ডাক পেড়ে বলল—হ্যঁগো, ভালোমানুষেরা। আমাকে তোমাদের সঙ্গে নেবে? ভারি বিপদ আমার। 
কানে গেল বটে, মাঝি-মাল্লারা সাড়া দিল না তার কথায়। মালিক ছিল ভেতরে। একজন মানুষের আকুল ডাক তারও কানে গিয়েছে। ধমক দিয়ে বলল—জাহাজ ভেড়াও। কাউকে বিপদের মধ্যে দেখেও, ফেলে যেতে নাই। তার উপর প্রায় জনহীন এমন একটা দ্বীপে!  
যত্ন করে ছেলেটাকে তুলে নেওয়া হোল। দূর দেশে বাণিজ্যে যাচ্ছে বণিক। ছেলেটাকে তার দেশেই নামিয়ে দিয়ে গেল লোকটি। 

বেশ কিছুদিন কেটে গেল তারপর। কোন রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছে গ্রামে। দিন যায়, কিন্তু ধুর্ত বাবুটির কথা মন থেকে মুছে ফেলা যাচ্ছে না কিছুতেই।
শেষমেশ একটা ফন্দি এল মাথায়। সেটা নিয়েই দিনের পর দিন অপেক্ষা করে থাকতে লাগল। 
প্রায় দিনই জাহাজঘাটায় যায়। লক্ষ্য রাখে, সোনায় মোড়া জাহাজটা এসেছে কি না। সবাই দ্যাখে আর হাসাহাসি করে ছেলেটাকে নিয়ে। 
একদিন সত্যি সত্যি জাহাজটা এসে ভিড়েছে। বেলচা ঘাড়ে করে, বাজারে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটা। যার জন্য অপেক্ষা করে আছে, সেই ধনী বাবুলোকটির গাড়ি আসতে দেখা গেল। অমনি গেল বারের মতোই, বাজারের সবাই পালালো তড়িঘড়ি করে। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল ছেলেটা। পোষাক ময়লা, মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। চেনার কোন উপায় নাই। 
বাবু বলল—কাজে যাবে নাকি হে?
--যাবো। বেতন লাগবে দিনে দু’শ রুবল।
--দর এত চড়া কেন হে?
 --তাহলে সস্তায় কাউকে পেলে নিয়ে যাও। আমার দর পাল্টাবে না। 
বাবু বলল—ঠিক আছে, তাই দেব। দিনে দু’শ। কাল সকালে চলে এসো জাহাজঘাটে। 
পরদিন বাবুর সাথে জাহাজে চড়ে দ্বীপে এসে নামল ছেলেটা। খাওয়া-দাওয়ার সেই রকম এলাহি ব্যাপার। টেবিলের উলটো দিকে বসেছে মা আর মেয়ে। ছেলেটার দিকে তাকিয়েই আছে মেয়েটি। মনে কেমন খটকা তার। এই ছেলে সেই লোক নয়তো? জেনে শুনে আবার এসেছে এই কাজে। 

ছেলেটার মুখে হালকা হাসি। এবার সে চোখের ঈশারা করল মেয়েটিকে। চুপ করে থাকতে বলল। 
পরদিন সকালে সোনার পাহাড়ের তলায় এসে হাজির হয়েছে দুজনে। মালিক বলল—কাজে যাওয়ার আগে, জল খেয়ে নাও বেশি করে। ওপরে জল পাবে না তুমি।
--তা কী করে হয় , মালিক? আপনি মালিক, আপনি আগে খাবেন। তার পরে তো চাকরের পালা। দাঁড়ান, আগে আপনার পানীয় নিয়ে আসি গাড়ি থেকে। আপনি খেলে, তার পর আমি খেয়ে কাজে চলে যাবো। 
মালিককে কিছু বলতে না দিয়ে, বাবুর গাড়ি থেকে এক গ্লাশ পানীয় এনে এগিয়ে দিল মালিককে। ছেলেটির এই বিনয় আর সহবত ভারি ভালো লাগল বাবুর। 
বাবুর তো জানা নাই, বাড়ি থেকেই ঘুমপাড়ানি দানা এনেছে ছেলেটি। মিশিয়েও দিয়েছে বাবুর গ্লাশে। বাবু হাসিমুখে ঢক ঢক করে খেয়ে ফেলল গ্লাশ ভর্তি পানীয়। আর, যা হবার হয়ে গেল। সেখানেই বালির উপর গড়িয়ে পড়ে গেল বাবু। 
ধারালো ছুরি বের করে বুড়ো ঘোড়ার পেট কাটল ছেলে। নাড়িভুঁড়ি বের করল পেট থেকে। তার পর, মালিক আর বেলচাটা ঘোড়ার পেটের মধ্যে ভরে, সেলাই। 
সব কাজ সুন্দর করে সেরে, একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল ছেলেটা। 
খানিক বাদেই এসে গেল কাকের দল। বড় বড় চেহারার একদল দাঁড়কাক। লোহার মত শক্ত দুটো করে ঠোঁট তাদের। কা-কা করতে করতে নেমে, ঘোড়াটাকে তুলে নিয়ে উঠে গেল পাহাড়ের মাথায়। ঠুকরে ঠুকরে ঘোড়ার মাংস খেতে লাগল কাকেরা। 

কিছু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। উপর থেকে একটা আতঙ্কের গলা ভেসে এল—এ আমি কোথায়?
--কেন, মালিক? সোনার পাহাড়ের মাথায়। সময় নষ্ট করে লাভ নাই। কাজে লেগে যান। সোনা খোঁড়া শুরু করে দিন। কাজ শেষ হয়ে গেলে, আমি বুঝিয়ে দেব, কী করে নামতে হয়। 
কী আর করে? অগত্যা মালিক সোনা খুঁড়ছে বেলচা দিয়ে। নীচে কুড়িয়ে কুড়িয়ে গাড়ি বোঝাই করছে ছেলেটা। গুণে গুণে বারোখানা গাড়ি বোঝাই হয়ে যেতে, ছেলেটা বলল—ঠিক আছে, আর দরকার নাই। এতেই সাত পুরুষ চলে যাবে আমার। বেশি লোভ করে লাভ নাই। ধন্যবাদ, বন্ধু। বিদায়।
--আরে আরে, আমার কী হবে? চিতকার করে উঠল বাবু। 
ছেলেটা গাড়ি গোছগাছ করছিল। উত্তর দিল—কেন গো, কী আবার হবে?  আগের নিরানব্বই জনের যা হয়েছে, ঠিক তাই হবে। চিন্তা করবেন না।
--হায়, হায়! আমি নামবো কী করে? ককিয়ে উঠেছে মানুষটা। 
বেদম হাসি পেল ছেলেটার। হাসতে হাসতেই বলল—মালিক, আপনি নিজেও ভালো করেই জানেন, সোনার পাহাড়ে কোন সিঁড়ি নাই, যা দিয়ে ওঠা নামা করা যায়। 
বারো গাড়ি ভর্তি সোনার তাল। বাবার কথা মনে পড়ে, চোখে জল এসে গেল ছেলেটার। গাড়ি নিয়ে রওণা দেবে, দেখে বাবুর বউ আর মেয়ে কখন এসে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজঘাটে। মা বলল—আমাদের এখানে ফেলে তুমি চলে যাবে, বাছা? আমরা থাকব কী নিয়ে? কেমন করেই বা থাকব? তাছাড়া আমার মেয়েরও ভারি পছন্দ তোমাকে। 

ছেলেটা দেখল, ঠিকই তো। এই মেয়েই প্রাণ বাঁচিয়েছে তার। তাকে দুঃখ দেওয়াটা ঠিক কাজ নয়। 
বাবুর মেয়েকে বিয়ে করে সমস্ত কিছুর মালিকই হয়ে গেল ছেলেটি। তারপর একদিন বারোখানা জাহাজে সব কিছু চাপিয়ে,রওণা দিল তিনজনে। এঅভিশপ্ত দ্বীপে থাকতে মন চাইল না তাদের। 
আর মালিক বাবুর কী হোল? সেটা আর খোঁজ নেওয়া হয়নি আমাদের। তবে, কী আর হবে? যা হয়েছিল আগের নিরানব্বই জনের, তাই। খাবার নাই, জল নাই সোনার পাহাড়ের মাথায়। সিঁড়িও নাই নেমে আসবার। খিদেয়, তেষ্টায় ধুঁকে ধুঁকে মরছিল লোকটা। মাথার উপরে পাক খাচ্ছিল একটা কালো রঙের মেঘ। একদিন সেটা নেমেও এসেছিল পাহাড়ে। তখনও মরণের কোলে ঢলে পড়তে বাকি আছে মানুষটার। কাকগুলো ঘিরে ধরেছিল তাকে। খুবলে খুবলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছিল গায়ের মাংস। বুকের ধুকপুকানি না থামা পর্যন্ত, অসহায়ের মত তাকে সইতে হয়েছে সব। 
লোকটার এমন অবস্থার কথা শুনে , আহা বা উহু করার দরকার নাই কোন। লোভ আর নিষ্ঠুরতার পরিণাম এমনটাই তো হয়। তাই না?

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া