ভারতীয় সংগীতের ক্রমবিকাশ- ৪ /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

ভারতীয় সংগীতের ক্রমবিকাশ

দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

পর্ব – ৪

ধ্রুপদ ও ধামারের পরে ভারতীয় সংগীত রঙ্গমঞ্চে খেয়াল গানের আবির্ভাব হয়েছে। খেয়াল শব্দটির অর্থ কল্পনা এবং এই শব্দটি পারস্য দেশ থেকে এসেছে। খেয়াল গানের সৃষ্টি হয়েছে চতুর্দশ শতকের প্রথম পাদে কবি আমীর খসরুর মাধ্যমে। আমীর খসরু 'কওয়ালি' গানকে সম্ভ্রান্ত রূপ দিয়ে খেয়াল গানে রূপান্তরিত করেন এবং সম্ভ্রান্ত সমাজে প্রচারে সচেষ্ট হন। খেয়াল গানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হল বিলম্বিত লয়ের বড় খেয়াল যার স্রষ্টা পঞ্চদশ শতাব্দীর সুলতান হুসেন শাহ শর্কি যার কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো মধ্য বা দ্রুতলয়ের ছোট খেয়াল যার স্রষ্টা স্বয়ং আমীর খসরু। ছোট খেয়ালের দুটি ভাগ থাকে - স্থায়ী ও অন্তরা। বড় খেয়ালের সাথে ছোট খেয়ালের তফাৎ হল লয়ের। পূর্বেই উল্লেখ করেছি বড় খেয়াল বিলম্বিত লয়ের কিন্তু ছোট খেয়ালে বিস্তার করার সুযোগ কম। ধ্রুপদ গানের রচনাগুলি ছিল ধীর, শান্ত ও শৃঙ্গার রস প্রধান পক্ষান্তরে খেয়াল গান বেশীর ভাগই শৃঙ্গার রসাত্মক। ধ্রুপদের প্রভাব সেসময় এত প্রবল ছিল যে খেয়াল রীতির গান কিছু সংখ্যক মানুষের ভালো লাগলেও উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে ছিল ব্রাত্য। কিন্তু শত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য অবহেলাকে উপেক্ষা করেও খেয়াল গানের অগ্রগতিকে রোধ করা যায়নি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রখ্যাত বীণকার ন্যায়ামত খাঁয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খেয়াল গান ক্রমশ বিস্তার লাভ করে।
  
  টপ্পা - লোকরুচির সাথে সাথে সঙ্গীত শৈলীরও পরিবর্তন ও বিভিন্ন উদ্ভাবনীর মাধ্যমে লোকরঞ্জন করা হতো। প্রবন্ধ, গীত, ধ্রুপদ, ধামার খেয়াল পরম্পরার পরে টপ্পা গানের শুরু। টপ্পা শব্দটি হিন্দী শব্দ। সঙ্গীত বোদ্ধাদের অভিমত মধ্য এশিয়া থেকে আগত গায়কেরা পাঞ্জাব ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে বসবাস করার সময়ে আমাদের দেশের সংগীত বৈশিষ্ট্যের মিশ্রনে যে বিচিত্র শৈলীর গান গাইতেন সেই গানকেই বলা হতো টপ্পা। তবে একথা স্বীকার্য যে অষ্টাদশ শতাব্দীতে লক্ষ্ণৌ, রেওয়া প্রভৃতি স্থানে টপ্পা গান বিশেষ প্রচলিত ছিল। যেহেতু এই গানের ভাষা চটুল ও আদিরসাত্মক সেজন্য সম্ভ্রান্ত মহলে এই গান ছিল অপাংক্তেয়। বেশীরভাগ টপ্পা পাঞ্জাবী ভাষায় রচিত। টপ্পা গান গাওয়া কিন্তু সহজসাধ্য নয়। লক্ষ্ণৌয়ে যেমন শোরী মিঞা টপ্পাকে জনপ্রিয় করেছিলেন বাংলাতে অনুরূপভাবে রামনিধি গুপ্ত বা নিধুবাবু টপ্পাকে জনপ্রিয় করেছিলেন। সাধক রামপ্রসাদ সেনও টপ্পা গান গাইতেন। 
  
  ভারতীয় সংগীতের এই দুই ধারার মধ্যে মধ্যস্থ সেতু হিসেবে চিহ্নিত ঠুমরি গান, বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোক সঙ্গীতের এক মেলবন্ধন। হালকা বা লঘু চালের গান হিসেবে ঠুমরিকে ব্রাত্য করে রাখা হলেও সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মতে ঠুমরি গানেরও এক সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ঠাকুর জয়দেব সিংহের মতে দ্বিতীয় শতকে রচিত 'হরিবংশ পুরাণে' ঠুমরিকে 'চলিতম্ নৃত্যসাহিতম্' বলা হয়েছে। এটি সাধারণত নৃত্যের সঙ্গে গাওয়া হত এবং মনে করা হতো স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এই সঙ্গীত শিখেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্রের সভা থেকে। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ডঃ রিতা গাঙ্গুলী তাঁর 'বেনারস ও বিসমিল্লা খান' গ্রন্থেও এই মত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে ধ্রুপদ ও খেয়ালের থেকেও ঠুমরি অনেক বেশি প্রাচীন, কারণ খেয়াল ও ধ্রুপদের উদ্ভবের সময়কাল জানা যায় কিন্তু ঠুংরি গানের সূত্রপাতের সময়কাল নিরূপণ করা যায়নি।    
 
  এরপরে এলো ঠুমরী গান। খেয়াল টপ্পার মত ঠুমরী গানও প্রথমে সভ্য সমাজে অনাদৃত ছিল। বিখ্যাত বা কুলীন গায়কেরা সেই সময়ে কোন আসরে ঠুমরী গান গাইতেন না। এই গানের প্রচলন ছিল শুধুমাত্র বাঈজীদের মধ্যে। ঠুমরী গান প্রধানত শৃঙ্গার রসের। কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের রুচিরও পরিবর্তন ঘটে, ফলে ঠুমরীও বিভিন্ন রাজদরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়। ঠুমরী গানে রাগের বিশুদ্ধতার থেকে ভাবের বিশুদ্ধতার প্রতি বেশী লক্ষ্য রাখা হয়। টপ্পার ন্যায় ঠুমরীও যে কোন রাগে বা তালে গাওয়া যায় না। বাংলাদেশের কীর্তন গানে যেমন নানারকম আখর যোগ করে ভাব ব্যক্ত করা হয়, ঠুমরীতেও তেমনি বোল বানিয়ে নানারকম বিন্যাস করে ভাব ব্যক্ত করা হয়। ঠুমরীর আর এক প্রকার হল দাদরা। বেনারস ও লক্ষ্ণৌতে যে ঠুমরী গান গাওয়া হয় তাকে বলে পূর্বী অঙ্গের ঠুমরী। পাঞ্জাবী অঙ্গের ঠুমরীতে টপ্পার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় এবং তাতে কথার চাইতে তানের কাজ বেশী থাকে।                            
  
  শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে অনেক শব্দের পরিবর্তন ঘটে গেছে। 'ধ্রুবপদ'কে এখন যেমন বলা হয় ধ্রুপদ, অনুরূপভাবে ঠুমরি শব্দটি ঠিক কোথা থেকে এসেছে বলা দুরূহ। কথিত আছে যে স্বর্গে নৃত্যের শিক্ষককে বলা হতো 'তামবুরু' যাকে সামবেদের কৌটুম শাখার গায়ক বলে মনে করা হয়। তাঁর প্রশিক্ষিত নাচের সঙ্গে অঙ্গ সঞ্চালন ও মৌখিক অভিব্যক্তিযুক্ত গায়কি রীতিকে বলা হত 'কৌটুমরী পদ'। আচার্য সারঙ্গদেবের সংগীত রত্নাকর পুস্তকে স্বর্গের গন্ধর্ব বা স্বর্গলোকের গায়কদের কথার উল্লেখ আছে। সুতরাং মনে করা যেতে পারে 'তামবুরু'র 'কৌটুমরী পদ' থেকে ঠুমরি শব্দটি এসেছে।    
  
  আবার ঐতিহাসিকদের মতে ঠুমরি গানের আসল উৎস পঞ্চদশ শতাব্দীতে গোয়ালিয়রের রাজা মানসিং তোমরের রাজসভা থেকে। মানসিং সংগীতের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর রাজসভায় তানসেন ও বৈজু বাওরার মতো সংগীত সাধকেরা আলোকিত করে থাকতেন। তিনি নিজেই অনেক ঠুমরি গান রচনা করেছিলেন ও রাগ তৈরী করেছিলেন তাঁর গুর্জরী স্ত্রী মৃগনয়নীর জন্য। তাঁর সৃষ্ট সংগীত বিষয়ক রচনা 'মান কুতুহলের' পার্সি অনুবাদে বলা হয়েছে সংগীতের তিনটি দিক - গায়ন, বাদন ও নৃত্য (গীতম, বাদ্যম, নৃত্যম ত্রয়ম সংগীত মুচায়েৎ)।           
                                                                                                 ক্রমশঃ

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া