অ্যাপের নাম বাবাজী-২ / বাসুদেব গুপ্ত

অ্যাপের নাম বাবাজী  

লেখক বাসুদেব গুপ্ত

২য় পর্ব 

লোড শেডিং আর হয়না এ শহরে। কারেন্ট যাবে কারেন্ট যাবে এই ভয়টা আর নেই। দিব্যি চলছে টিভি, ফ্রিজ, ল্যাপটপ, আর অসংখ্য ফোন একবার করে চারজ নিতে আসছে, চুমুক দিয়ে কারেন্ট খাচ্ছে। তারপর খুশি খুশি মানুষগুলোর আঙ্গুলের চাপে খিলখিল করে স্ক্রোল করছে, নাচছে, গাইছে আর চিনিয়ে দিচ্ছে কোন লোকটি মহান দেশভক্ত, আর কোন লোকটি ডেনজারাস, দেশ ভাঙ্গবার প্ল্যান কষছে। ফোন নয়ত পাঠশালা।
-শা- ভালো যন্তর। 
ম্যারাথনদার বাড়ীর সামনে একটু বাগান, একটা দেবদারু সোজা টঙে উঠে এদিক ওদিক দেখছে। নীচে চেয়ার পেতে রূপম বসে আর রতু বসে। দুটো কেবলম্যান দাঁড়িয়ে। অর্ণব আর লোকি। কথা শুনছে।একজনের হাতে গলা থেকে নেমে এসেছে ট্যাটু। জয় বাবা তারকনাথ। আর একটি চুল নিয়ে ব্যস্ত। যেমন যেমন হাদ্দিক পান্ডের কাট বদলায় তেমনি ওর মাথায় বনসাই ইকেবানার কাজ চলতে থাকে। দুজনেই দুটো ফোন নিয়ে ঝুঁকে স্ক্রোল করে যাচ্ছে একমনে, পিছনে বাঘ ডাকলেও শুনতে পাবে না মনে  হয়।
রতুর ফোন নেই। পকেট মারা যাবার পরে আর পয়সা হয়নি। কিন্তু ওরই দায়িত্ব বেদান্তবাবুকে অ্যাপ্রোচ করার। 

দুদিন ধরে প্ল্যান চলছে। প্রথমে কথা হল কল করার। কিন্তু অজানা কল যদি না ধরেন। 
-হোয়াটসাপ করলে শালা ধরবেই। 
লোকি বলে একবার চুলটা সেট করে নেয়।
-তুই চুপ করবি। আমরা কি স্ক্যাম করছি না কি? জেনুইন বিসনেস। 
অর্ণবের জ্ঞান প্রচুর। দু বছর বিটেক পড়েছিল। বাবার চাকরি যেতে ইন্টারনেটের কাজকর্ম করে। 
-স্ক্যামও নয় স্প্যামও নয়। কনট্যাক্ট চাই। সেইজন্যই তো রতুকে ডাকা। রতু তুই কারা মেসো দাদা দিদি পাশের বাড়ী যেভাবে পারিস কন্ট্যাক্ট চেন তৈরী কর।
-বুঝলাম না। চেন মানে?
-শোন আজকের দুনিয়ায় যে কোন লোকের সংগে আরেকজনের দূরত্ব কত জানিস? এই ধর আমার কন্ট্যাক্ট লিস্টে আছে ১০০ জন। এবার এদের প্রত্যেকের আবার কন্ট্যাক্ট লিস্ট ধর ১০০ জন। কত হল?
-১০০০০। কিন্তু কিছু তো কমন থাকবে? 
অর্ণব সন্দেহ প্রকাশ করে।
-ঠিক। কিছু কমন হবে। ধরলাম সেটা ২০%। তাহলে হল ৮০০০। এবার এরকম পাঁচটা চেন যদি তুই কাউন্ট করিস কত হবে?
-8000x80x80x80x80 . মানে প্রায় ৪২০ কোটি। 
 -আরিব্বাস। তার মানে পৃথিবীর আদ্ধেক লোক চলে এল লিস্টে?
-হ্যাঁ। তার মানে রতু চেনে এমন একজনকে ধরে তিন চারটে চেন ধরে এগোলেই ব্যাস। একেবারে বেদান্ত স্যারের অন্দরমহলে।
-ঠিক আছে রতু?  বুঝে গেছিস? বুঝতে হবে। বিট কয়েনের ব্যবসায় কাজে লাগবে। এমনি তো আর একটা কয়েনের দাম ৫০ লাখ হয় না। আর সব বড় বড় বিলিওনেয়াররা বোকার মত কিছু করবে না।  ঐ টাইমিং। যেমন শেয়ারে তেমনি কয়েনে। আমাদের টাইম আসছে রে পাগলা। সব কুছ বদলেগা। 
এত হিসেব নিকেশ অবশ্য কিছু কাজে দিল না। বেদান্ত বাবুর বাড়ীর রান্নার লোক পর্যন্ত চেন রতু করে ফেলেছিল। কিন্তু বেদান্ত বাবু হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। এক সপ্তাহ পরে তাঁর মৃতদেহ ঝুলতে দেখা গেল কলকাতার এক ষাট তলা স্কাই স্ক্রেপারের সবচেয়ে ওপরের তলায়। রূপমের যাবতীয় প্ল্যান ভেস্তে গেল। 

সব মৃত্যুই দুঃখের। এই বাক্যতে কখনও দ্বিমত হয় না। কিন্তু কিছু মৃত্যুতে পয়সা হয়। রহস্যের ওপরে রহস্য। চ্যানেলে চ্যানেলে রুদ্ধশ্বাস গোয়েন্দা উপন্যাস। টি আর পি খইএর মত ফুটছে। সন্ধেবেলা রোল অর্ডার করে চোখ গোল করে শুনতে বসে যান সম্ভ্রান্ত নাগরিক নাগরিকারা। কিন্তু এঁর মৃত্যুটা কেমন টুপ করে ডুবে গিয়ে সবাই একেবারে চুপ। কয়েক জায়গায় প্রশ্ন উঠেছিল, এটা আত্মহত্যা হতেই পারে না। তাহলে অত বুদ্ধিমান ব্যক্তি ষাটতলা থেকে লাফ না দিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলতে গেলেন কেন? এই রহস্যটা পাত্তা না পেয়ে হারিয়ে গেল ইথারে। 

আলোচনা অবশ্য হলো উনি সুইসাইড করলেন কেন? এখন অর্থনীতির যুগ। যত না জিনিষ বেঁচে পয়সা তার থেকে টাকা বেচে বেশি পয়সা। উনি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। অবশ্য ক্রিপ্টোর উনি একটু বিরোধী ছিলেন। উচ্চতম ন্যায়ালয় কৈফিয়ৎ চেয়েছিলেন সরকারের কাছে। সেই ব্যাপারে উনি সরকারকে পরামর্শ দিতেন বলেও শোনা যায়।

-এ কিসমত কা খেল। কিচাইন একটা কিছু করেছিল। আর সামলাতে পারে নি। লোকির পরিষ্কার মতামত।
সুইসাইডে ম্যারাথনদার অনেক অভিজ্ঞতা। বনেদী বাড়ী। একটা দুটো বৌ বিষ খাবেনা তা হয়? কিন্তু ওর ঠাকুমা কেন গলায় দড়ি দিয়েছিল সে রহস্য আজও প্রকাশ হয় নি।
হয়ত সে কথা মনে পড়ছিল। রূপম মুখটা কালো করে বসেছিল। তার ওপর একটা কালো মাস্ক।
-এটা একটা সেটব্যাক। কিন্তু আমি ছাড়ছি না। এই হয়ত শেষ সুযোগ। বুধের রেখা কবে আবার ঘুরে যাবে কে জানে। 
রূপম হাতটা একবার মুঠো করে আর খোলে। 
লোকি চুল সেট করতে গিয়ে ফোন চেক করতে ভুলে গেছে। ঐ হাতের দিকে সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। হাতমুঠো করলেই টংকা। খুললেই ফক্কা। টঙ্কা। ফক্কা। ঝপ করে ধরতে হবে। সবাই টাকা করে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওদের হবে না?
 
আজ সকাল থেকেই গোলমাল চারদিকে। সারা পৃথিবীটা একেই জ্বরও রুগীর মত ধুঁকছে। সযত্নে গড়ে তোলা একটা চকচকে সভ্যতার মুখ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, জনগণের সেবায় ব্যস্ত দেশে দেশে মন্ত্রীসান্ত্রীরা। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। গোল টাকমাথা গ্রহের মুখেই এক অকালপক্ক ভাইরাস মুখোস পরিয়ে দুয়ো দুয়ো করে নেচে যাচ্ছে।

এর মধ্যে চারদিকে খাবার নেই, চাকরি নেই, অক্সিজেন নেই, রেমডিসিভির ১০০০০ টাকায় বিকোচ্ছ। আমোরিকায় ক্যাপিটলের মাথায় উঠে শিং লাগিয়ে, সং সেজে নাচছে হাজারো স্বাধীনচেতা মানুষ, উপরাষ্ট্রপতি লুকোচ্ছেন বিরোধীপক্ষের আঁচলের তলায় আর লাঠি সোঁটা হাতে মাথায় তার পেছনে দৌড়চ্ছে জনতা, ঝুলিয়ে দে ঝুলিয়ে দে বলতে বলতে।
হাঁ করে খবর শুনছিল রতু লোকি আর অর্ণব। রতুর ব্যায়াম করা আর জিমে দুঘণ্টা ট্রেনারের চাকরির পর সারাদিন ফ্রি। ও জুটে গেছে এই টিমে। রূপম (লোকি  শিখার সামনে ম্যারাথনদা বলে ডেকে ফেলার পর থেকে স্ট্রিক্ট অর্ডারহয়েছে ভালো নাম ধরে ডাকার) হেলান দিয়ে সোফায় শুয়ে কানে দুটি এয়ারপড লাগিয়ে চোখ বুজে কি শুনছে কে জানে। টিম বসে বসে ইউটিউবে খবর দেখে যাচ্ছিল স্মার্ট টিভিতে। 

 শিখার যখন এন্ট্রি হয়েই গেল তার সম্বন্ধে কিছু বলতেই হয়। সে মাঝে মাঝেই আসবে এবং নামকরণের সার্থকতাপ্র মাণ করার জন্য রূপমকে  শিখায় প্রজ্জ্বলিত করে হঠাৎ স্টেজ ছেড়ে প্রস্থান করবে। যেমনটি রাগী নেতা নেত্রীরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে এন্করের ওপর ভীষণ চটে  ফটফট করে চলে যান।

শিখা রূপমের অনুরাগিণী। সফটওয়ার ইঞ্জিনীয়ার। কিন্তু কুলীন নয়। কুলীনরা সব ঐ কয়েকটি বড় বড় বিগ বুল কম্পানির জন্য জন্ম থেকে তপস্যা করে একদিন প্রবেশাধিকার পান। আর অকুলীনরা এখানে ওখানে অমুক টেক প্রাইভেট লিমিটেড, অমুক কনসালটেন্টস এসব বিভিন্ন টেক পার্কের কোণায় কোথায় গজিয়ে ওঠা অফিসে মাউস পেষেন। 

রূপম এই ঘাটে অনেকদিন ঘটি হাতে ঘুরেছে। ঘুরতে ঘুরতে এক্রিমনি টেক সার্ভিসেসে ওয়েব সাইট ডিজাইন করাতে আসে কোন এক বর্ষা মুখর বিকেলে। আলোচনা হয়। বৃষ্টি থামে না। ডিকিতে পুলকারের অসহিষ্ণু ধাক্কায় একটু তুবড়ে যাওয়া অটোর ওপর দায় এসে পড়ে ঘটকালি করার। পঞ্চশরের বদলে শিক খুলে আসা ছাতার খোঁচা অম্লানবদনে রূপম হজম করে নেয় কারণ ওর চোখ তখন চাঁদ দেখতে গিয়ে  শিখাকে দেখে ফেলেছে। একজন মেয়ে এত বুদ্ধি ধরে এটা তার অভিজ্ঞতায় ছিল না। বুদ্ধির সংগে একটা ঘাড় বাঁকানো কমনীয় ঔদ্ধত্য ঠিক সুচিত্রা সেনের মত। একদিনেই রূপম কাত। 

 শিখা ফোন করেছিল এবং রূপম শুনছিল। ওনারা যখন বলতে শুরু করে তখন কালের চির চঞ্চল গতি স্তব্ধ হয়ে পড়ে সেটা পুরুষমাত্রেই জানে। 
-আর কতদিন চলবে এমনি করে ফ্যামিলির পয়সা ভাঙিয়ে। কোন ব্যবসাই তো দাঁড় করাতে পারলে না। একবার নেট সার্ভিস। একবার কেক ডেলিভারী একবার ইন্টারনেট ফিস শপ। আরে বোঝা না কেন ঐ ক্যাপিটাল দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তুমি মারোয়াড়ী নও, গুজরাতি নও। ব্যবসা করতে কোটি কোটি টাকা চাই। তার চেয়ে আমার মত কোথাও ঢুকে পড়। তোমার উৎসাহ আছে ঠিক উন্নতি হবে। আর আমরা বিয়ে করবো তো? করব কি করব না? বলো করব কি করবো না?
মিনমিন করে রূপম বলে 
-তুমি তো নির্বাচনী সভায় বক্তৃতা দিচ্ছ মনে হচ্ছে।
অবধারিত যা হয়। স্ফুলিংগ থেকে বহ্নিমান শিখা। কট। নিস্তব্ধতা এত সরব হতে পারে…
-বৌদিকে বলুন না আমাদের টিমে এডভাইসার হিসেবে আসতে।
লোকির আলটপকা মন্তব্য করা অভ্যেস। কিন্তু এতেই কাজ হল। 
 রূপম ছিটকে উঠে বসে ঘোষণা করল
-কোন দরকার নেই। আজই আমি একটা স্কীম তৈরী করে এখান থেকে উঠবো। যা চটপট চায় বোলাও। বহুত কুছ করনা হ্যায়।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া