তুর্কী নাচন পর্ব-৩ /মলয় সরকার

তুর্কী নাচন 

পর্ব-৩

মলয় সরকার


কাপাদোসিয়া পর্ব-৩ (কিজিলিরমাক ও গোরেম ওপেন মিউজিয়াম)

পাশাবাগ ছেড়ে যেখানে এলাম সেখানেও বেশ কিছু এরকম পাহাড় রয়েছে, তবে সেগুলো একটু বড় বড়। তবে এখানে এক অদ্ভুত জিনিস দেখলাম।অনেক পাহাড়ই রয়েছে, যেখানে একসময় মনুষ্য বসতি ছিল বোঝা যায়।আপাততঃ পরিত্যক্ত। পাহাড়গুলি কেটে তার মধ্যে সিঁড়ি, ঘর, জানালা সব করা আছে। পাশাপাশি এই রকম অনেকগুলি লাগোয়া পাহাড়ে পাশাপাশি ঘর দেখে বোঝা যায়, একসময় বহু মানুষই একত্রে এখানে থাকত।তবে জায়গা তো বেশ রুক্ষ, চাষ কি করে করত, বা খেতো কি,কে জানে।আমরা বেশ কিছু এই রকম পাহাড় কাটা ঘরে ঢুকে দেখলাম, অনেকটা আমাদের দেশের অজন্তার মত মনে হল, যদিও অজন্তা ছিল শিল্পীদের হাতে কাটা আর এগুলো অপটু হাতে প্রয়োজনে কাটা।সামনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা চত্বরের মত।তাতে বিচ্ছিন্ন ভাবে দু একটা বেশ উঁচু ছুঁচালো পাথরের পাহাড় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমরা অনেক ঘরে ঢুকলাম, স্বচক্ষে দেখলাম তাদের ঘর-গেরস্থালীর পরিত্যক্ত স্থান। এরা যেন সেই বেদুইনদের মত, যেখানে পেরেছে সেখানেই যেভাবে হোক থেকেছে। আশে পাশে ছবি তোলার জন্য ফোটোগ্রাফারের দল এবং উট সঙ্গে নিয়ে উট চাপানোর জন্য লোকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
                                              

এখান থেকে আমরা গেলাম সম্পূর্ণ এক অন্য পরিবেশে। আমাদের বাস চলল, একের পর এক তুর্কী গ্রামের মধ্য দিয়ে। বাড়িগুলোর সামনে, প্রায় প্রত্যেকের দরজার মাথায়, কয়েকটি করে আঙ্গুর গাছ লতিয়ে আছে আর তার থেকে ঝুলছে আমাদের গ্রামের বাড়ীর লাউ কুমড়োর মত আঙ্গুরের থোকা। এ ছাড়াও যত্রতত্র আঙ্গুর গাছ ফলসহ শোভা পাচ্ছে। গ্রামের অবস্থা গুলো মোটেই বড়লোকী নয়, বেশ গরীব ও মধ্যবিত্ত ধরণেরই মনে হল।যে রাস্তায় গাড়ী যাচ্ছে, তাও পাথুরে এবং  গ্রাম্য রাস্তা।যেতে যেতে আমরা এসে পড়লাম একটি নদীর কাছে। তার জল লাল এবং পাশের কাদা মাটি যা দেখছি, টকটকে লাল, ঠিক পোড়া মাটির মত। দেখে একটি কথা মনে পড়ে গেল, মনে করে হাসিও পেল। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম, বন্ধুদের কেউ কেউ আস্ফালন করে বলত, ‘মেরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব’। তা এটাই সেই 'রক্তগঙ্গা' নাকি কে জানে!                

মোটামুটি চওড়া নদী, তবে খুব যে জল আছে এমন মনে হল না। জানলাম নদীর নাম কিজিলিরমাক (Kizilirmak ) বা লাল নদী। এটি নাকি তুরস্কের দীর্ঘতম নদী।এটি জল-বিদ্যুতের উৎস এবং এখানে নাকি নৌকা চলে না।গাইড মেয়েটি জানাল, এই নদীটা দেখে রাখুন। এটি এখানকার মানুষদের অতি প্রিয় নদী এবং এর উপর এক বিরাট শিল্প নির্ভর করছে, যা আপনাদের আমরা দেখাব।


কিছু পরেই আমরা পৌছালাম একটি অতি সাধারণ গ্রামে, যেখানে প্রায় অনেক বাড়ীতেই বড় বড় সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে ‘অমুক পটারী, তমুক পটারী’ বলে। লেখা আছে ইংরাজীতেই, ওদের ভাষাতেও রয়েছে। বুঝলাম, এখানে নিয়মিত বিদেশী পর্যটকরা আসেন, যাঁদের সুবিধার জন্যই হয়ত এই ব্যবস্থা। এরকমই একটা ‘পটারী’তে ঢুকলাম সদলবলে।
                       

ভিতরে ঢুকে তো চক্ষু ছানাবড়া। বিশাল বড় জায়গায় কত ছেলে মেয়ে যে কাজ করছে কে জানে, গোটা পঞ্চাশ তো হবেই- একটা বিরাট ইণ্ডাস্ট্রী। কোথাও সাদা পোর্সেলিনের প্লেট তৈরী হচ্ছে। কোথাও তাতে শিল্পীরা ছবির প্রাথমিক স্কেচ করছে, কোথাই শেষের ফিনিশিং টাচ দেওয়া হচ্ছে। প্লেট, ফুলের ভাস, ঘর সাজাবার জিনিসপত্র, কি সুক্ষ্ম কারুকাজ, কত বিচিত্র রঙের কারিকুরি, দেখে চোখ একেবারে মোহিত হয়ে যায়। কোথাও সাদা প্লেট, কোথাও হলুদ, কোথাও বা অন্য রং।যিনি মালিক(বা ম্যানেজারও ,হতে পারেন), আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিলেন, আর বোঝাচ্ছিলেন, কি করে কি হয়, কার কত দাম এই সব। বিক্রীর কাউন্টারে সুবেশা তরুণীরা রয়েছে, তারা হাসিমুখে সব দেখাচ্ছে। বুঝলাম, এর যা দাম ,তা আমার দেওয়ার সাধ্য নেই। তার থেকেও বড় কথা, এ নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয় বা আমার ঘরে রাখার মত জায়গাও নেই। এ সব জিনিস রাখতে হলে তেমন ঘরও প্রয়োজন। আমি সাধারণ মানুষ, কোথায় স্থান দেব এত সুন্দর কারুকাজকে!


 শেষে উনি বললেন, চলুন আর এক জায়গায় নিয়ে যাই। বলে আর এক পাশে নিয়ে গেলেন। সেখানে সমস্ত মাটির কাজ হচ্ছে। তবে মাটি একেবারে টকটকে লাল।জানলাম এগুলো সেই নদীর পাশে জমে থাকা পলিমাটি। ওখান থেকে গাড়ী করে আনা হয়  এখানে তার পর এর থেকে জিনিস তৈরী হয়। আমার মনে পড়ল, আমাদের দেশে মাটি দিয়ে যেমন কুমোরের চাকে জিনিস তৈরী হয় তেমনই আর কি। মোটরে ঘুরছে কুমোরের চাক।এখন আমাদের দেশেও মোটরেই ঘোরায় এই ভাবেই। আলাপ হল ওখানকার সবচেয়ে যিনি বড় কারিগর তাঁর সঙ্গে। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ঊনি পাঁচ মিনিটের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস করে দেখিয়ে দিলেন, কেমন করে কি করেন। বুঝলাম, শিল্পীর হাতের অদ্ভূত জাদু আছে। আশেপাশে তৈরি করা রয়েছে লাল মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র।এখানে বিখ্যাত, দেখলাম, একটি অদ্ভূত ধরণের জাগ। তার নাম বলল, “হিতাইত সান জাগ”। প্রাচীন হিতাইতরা এই ধরণের জাগ সূর্যদেবতার পূজায় ব্যবহার করত। তাদের প্রথম দেবতা সূর্যের উদ্দেশ্যে এটি বানানো। এটি আসলে গোল মত, মাঝখানটা ফাঁকা। ঠিকমত বলতে গেলে, একটা পাইপকে গোল করে ঘুরিয়ে একটা রিঙ্গের মত বানালে যা হয় তাই। মাঝের ফাঁকা অংশটা সূর্যের দ্যোতক।এর একদিকে একটি হ্যাণ্ডেল এবং বিপরীতে একটি জল ঢালার মুখ আছে। নানা রঙের, নানা কারুকাজ করা বিচিত্র এক জাগের বিশাল সম্ভার রয়েছে দোকানে। মনে পড়ল শান্তিনিকেতনে গিয়ে বেশ কিছু শাড়ী শিল্পী, মাটির কাজের শিল্পীদের কাজ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।সে-ও ভীষণ সুন্দর। তবে ঐ আর কি, শিল্পীরা কি আর তার শিল্পের দাম পায়! এরা গরীবই থাকে। 


এই মাটির টেরাকোটার কাজের ইতিহাস মোটেই আধুনিক নয়, বরং বলা যায় হাজার হাজার বছর চলছে কাপাদোসিয়ায় এই আভানস অঞ্চলের বংশানুক্রমিক শিল্প। শোনা যায় ১৮০০ -২০০০ খ্রীঃপূঃ তেও এই শিল্প এখানে ছিল।এখানকার মৃৎশিল্প পৃথিবী বিখ্যাত।এখানে একটা তফাত লক্ষ্য করলাম, ঘুরন্ত চাকে। আমাদের দেশে শিল্পী বসে নীচুতে আর চাকটাও ঘোরে নীচুতে। এখানে কিন্তু চাকটা যদিও নীচুতে ঘুরছে, তার মাঝখানে একটি মাটির স্তম্ভ মত করা আছে। সেটি শিল্পীর বসার উচ্চতায়। শিল্পী দুপাশে পা ছড়িয়ে চেয়ারের মত উঁচুতে বসে  ওই স্তম্ভটির উপরেই সব কাজ করছেন। অর্থাৎ চাকার অরটিকে উঁচু করে নেওয়া হয়েছে সুবিধামত।
                                            

যাক, এখান থেকে বেরিয়ে আমরা এগোলাম।পৌঁছালাম আর এক বিচিত্র জায়গায়। এখানে নাকি একসময় খ্রীষ্টান মিশনারীরা থাকতেন । পাশাপাশি পাহাড় কেটে বিভিন্ন ঘর ও চার্চ সমেত একটা আস্ত গ্রামের মত বানিয়ে ছিলেন।এখানে অনেকগুলি চার্চ আছে। এবং এইখানে নাকি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত মনুষ্য বসতি ছিল। যখন গ্রীসের সঙ্গে তুরস্কের নাগরিক বিনিময় হয়, তখন খ্রীষ্টানরা এখান থেকে চলে যান। তবে মুসলিমরা প্রায় পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ছিলেন। কিন্তু পাথরের ক্রমশঃ ক্ষয় জায়গাটিকে বাসের অযোগ্য করে তোলার আশঙ্কায় এটি পরিত্যক্ত হয়। তবে এটি ইউনেস্কো হেরিটেজ এর স্বীকৃতি লাভ করে। এখানে চার্চের ভিতর ফ্রেস্কোগুলি ও অন্যান্য চিত্রগুলো ভীষণ সুন্দর। আমার ধারণাতেই আসছে না, এই রুক্ষ এক পাহাড়ী জায়গা, যেখানে তো কাছাকাছি চাষবাসের জমি বা জলের কোন ব্যবস্থাই দেখছি না, সেখানে এই মানুষগুলো থাকত কি ভাবে। জায়গাটার নাম ‘গোরেম ওপেন এয়ার মিউজিয়াম’। আমার মনে হল এখানকার অধিবাসীদের কাছে, এই রকম পাহাড়ের ভিতরে গর্ত করে থাকাটাই বোধ হয় অনেক সহজ ছিল, অন্য ভাবে ঘর বানানোর চেয়ে। 


তবে ঘর গুলোর খুব যে শ্রীছাঁদ ছিল বা কারিগরীতে বিরাট কিছু উন্নত এমন নয়।ওই পাহাড় কেটেই তৈরী হয়েছে দোতলা বা তিনতলা। তবে সব জায়গায় সিঁড়ি দেখলাম না, যদিও বর্তমানে লোহার সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে, দর্শকদের জন্য।এগুলির দেওয়াল বা পাথর কাটাও যে খুব মসৃণ, সমান এমন নয়।তবে পাহাড়ের সারি কে কেটে এত বড় একটা গ্রামের মত জায়গা তৈরী যে খুব সহজ সাধ্য ছিল, তা নয়। আমাদের সুন্দরী গাইড রুইয়া আমাদের সাথেই রয়েছে, আর বুঝিয়ে চলেছে জায়গাটার ইতিহাস ভূগোল। আমি ওকে দেখছি, কি স্বাচ্ছন্দ্যে ও চঞ্চলা প্রজাপতির মতো ঘুরে ঘুরে সব বুঝিয়ে চলেছে। রোদে ওর লালচে সাদা মুখ দেখলাম আরো লাল হয়ে উঠেছে।
এর পর যাব পরের পর্বে–
(ক্রমশঃ)

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


Comments

Trending Posts

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি

পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া