দূর দেশের লোক গল্প—অস্ট্রেলিয়া /দুর্দশা দুজনেরই /চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোক গল্প—অস্ট্রেলিয়া

দুর্দশা দুজনেরই

চিন্ময় দাশ

চার দিকে নীল জলের সমুদ্র দিয়ে ঘেরা দেশ অস্ট্রেলিয়া। আসলে দেশটা হোল বড়সড় একটা দ্বীপ। বহু জীবজন্তুর বাস সেখানে। কত রকমের যে পাখি আছে দেশটায়, তার নাই ঠিক। এমু, বুবুক, ম্যাগপাই, কাকাতুয়া, সারস, লালরঙের বনমোরগ, মাণিকজোড়—হাজারো পাখি।
এমু পাখিকে তাদের রাজা হিসাবে মেনে নিয়েছে অন্য সব পাখিরা। আর, নেবে নাই বা কেন? যেমন তারা চেহারায় বড়, গায়ের জোরও তেমনি। উড়তেও পারে তেমনি জোরে। উড়বে না কেন? যা বড় বড় সব ডানা তাদের! (পূর্বকালে না কি, এমু পাখিও ওড়াউড়ি করতে পারত অন্য পাখিদের মত। পরে কেন আর উড়তে পারল না, তাই নিয়েই এই গল্প। ফলে, এমু পাখি আকাশে ওড়ে, এটা পড়ে, এখুনি ভুরু কোঁচকানোর দরকার নেই আমাদের।) 
আসলে এমুরা হোল আফ্রিকার উট পাখির মত। উট পাখি হোল বিশ্বের বৃহত্তম পাখি। চেহারায় তারা দুনিয়ার সব পাখির চেয়ে বড়। ডানা আছে বটে, কিন্তু উড়তে পারে না। তবে, দৌড়ে উট পাখির সাথে এঁটে ওঠা দায় অন্যদের। আয়ু? অনেক বছর বাঁচে উট পাখিরা। তা ধরো, ৮০-৯০ বছর তো হবেই। 
উটপাখির সাথে তুলনা করে দেখতে গেলে, এমুরা আছে ঠিক তাদের পেছনে। এমু হোল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখি। এক সময় উড়তে পারত পাখিগুলো। অনেক কাল হোল, উড়তে পারে না আর।
কেন পারে না, তাই নিয়েই একটা গল্প আছে খোদ অস্ট্রেলিয়াতেই। 
বুস্টার্ড নামের একটি পাখিও আছে সে দেশটায়। বড়সড় চেহারা, পালকহীন সরু লম্বা পা। ধবধবে সাদা গলাটাও বেশ লম্বা। বড় বড় দুটো ডানা। বলা হয়, আকাশে ওড়ে এমন পাখিদের মধ্যে বুস্টার্ড হোল সবচেয়ে ওজনদার পাখি। 
এমু আর বুস্টার্ড—দুজনেরই চেহারা ভালো। দুজনেরই লম্বা ডানা। উড়তে পারে দুজনেই। একই দেশের পাখি। তাই, ভাব-সাবও আছে দু-দলের মধ্যে। দেখা-সাক্ষাৎ, টুক-টাক কথাবার্তা তাদের মধ্যে হয়েই থাকে। 
এর মধ্যে ঝামেলা তৈরি হোল এক মা-বুস্টার্ডের। কিছুদিন যাবৎ তার কেবলই মনে হতে থাকল, কী পার্থক্য আছে আমাদের মধ্যে। সবেতেই সমান সমান। তাহলে, এমুকেই কেন রাজা বলা হবে। ওদেরই কেন রাজা বলে মেনে নেব আমরা?
যত দিন যায়, ততই মনে মনে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল পাখিটা। এমুদের রাজা বলা হয় বলেই কেবল হিংসা নয়। হিংসা হতে থাকল-- এমুরা অনেক উঁচুতে উড়তে পারে, তাই নিয়ে। জোর পায়ে দৌড়তে পারে তারা, তা নিয়েও। মা-এমু উঁচু আকাশে দূরন্ত গতিতে ওড়া শেষ করে, ডানা দুটো হেলিয়ে দুলিয়ে যখন এসে নামে মাটিতে, চোখে মুখে সে কী দেমাকি ভাব তার! যেন তাদের মত অমন উঁচুতে, অমন জোরে উড়তে পারে, সারা দেশে আর কেউ নাই। 
দেখে গা-পিত্তির জ্বলে যায় মা-বুস্টার্ডের। তা থেকেই মনে হিংসা জেগেছে পাখিটার। 
আর, হিংসা থেকেই প্রতিশোধ নেবার একটা ইচ্ছা কুরে কুরে খেতে লাগল তাকে। 
কিন্তু নেব বললেই তো আর প্রতিশোধ নেওয়া যায় না। অত বড় পাখি। এত ক্ষমতা গায়ে। সবাই তাদের মানে রাজা বলে। প্রতিশোধ নেওয়া কি আর সোজা কাজ না কি?
কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া তো আর যায় না। কিছু একটা উপায় বের করতেই হবে। মনে মনে ফন্দি আঁটতে লাগল বুস্টার্ড-মা। 
মা-এমুর সাথে লড়াই করে পারা যাবে না, সেটা ভালোই জানা আছে। কেন না লড়াই লাগালে, একজন বুস্টার্ডকেও পাশে পাওয়া যাবে না। অন্য পাখিরা নয়ই। কেউ যাবে না এমুর বিরুদ্ধে। যা করবার একাই করতে হবে। সুকৌশলেই করতে হবে কাজটা। 
মনে ভাবল, যত দেমাক তো ডানা দুটোর জন্যই। ডানা দুটো ছেঁটে দিতে পারলে, একেবারে দফারফা হয়ে যাবে বাছাধনদের। তখন দেখা যাবে কোথায় থাকে তোমাদের দেমাক। 
একদিন একটা ফন্দি এঁটে নিয়ে, বাইরে বেরুল মা-বুস্টার্ড। মাঠে চরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু চোখ আছে দূরের দিকে। যখন দেখল মা-এমু এদিকে আসছে, অমনি ঝটপট উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। নিজের লম্বা ডানা দুটোকে মুড়ে, একেবারে পেটের নীচে চালান করে দিল। যেন ডানাই নাই পাখিটার।
একটু বাদেই মা-এমু এসে গেল সেখানে। একথা সেকথার পর, মা-বুস্টার্ড বলল—তোমরা আবার আমাদের মতো ডানা ছেঁটে ফেলবে না কি, দিদি? 
প্রথমে মা-এমু ধরতেই পারল না, এ কথার মানেটা কী? মা-বুস্টার্ড তাকে বুঝিয়ে বলতে লাগল—সব পাখি আকাশে উড়তে পারে, ডানা আছে বলে। সবাই বলাবলি করছে, তাহলে তারা এমুকেই বা রাজা বলে মানবে কেন? ডানা ছাড়া যদি কেউ সবাইকে দেখভাল করতে পারে, তাহলেই তাকে রাজা বলে মানবে তারা। 
মা-এমু বলল—বলছ কী তুমি? এমন চিন্তা-ভাবনা চলছে না কি? 
মা-বুস্টার্ড বলল—দিদি, বলছি কী তাহলে? তাই তো আমরা সবাই ডানা ছেঁটে ফেলেছি। সবাই বলেছে, তাহলে তারা বুঝতে পারবে, আমরাই সেরা। আমাদেরই রাজা বলে মেনে নেবে সব পাখি।
--কিন্তু তোমাদের তো ডানা আছে!
--ডানা ছিল, দিদি। গতকাল পর্যন্ত ছিল। কী সুন্দর লম্বা আর শক্তিশালী দুটো করে ডানা ছিল আমাদের। কিন্তু ডানা ছেঁটে যদি রাজা হওয়া যায়, সে তো আরও অনেক বড় কথা। তাই না, বলো? তাই, আমরা সবাই ডানা ছেঁটে ফেলেছি। খুব গোপনে করা হয়েছে কাজটা। তুমি যেন বলে বসো না কাউকে। 
আর কোন কথা নয়। মা-এমু দৌড় লাগালো বাসার দিকে। বাসায় ঢুকেই বিশদ করে খুলে বলল সব কথা। শুনে তো বাবা-এমু পাখিটার মুখ গম্ভীর। কথা সরছে না মুখ থেকে। 
তার বউ উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে তার দিকে। অধৈর্য হয়ে বলল—কী গো, চুপ করে থাকলে চলবে?
বাবা-এমু বলল—বুঝলে গিন্নী, ভেবে দেখলাম, ডানা ছেঁটে ফেলতে হয়, সেও আচ্ছা। কিন্তু ডানা বাঁচাতে গিয়ে রাজার আসন ছাড়া যাবে না। 
বউ শুনে যার পর নাই খুশি। কেউ যদি রাজা বলেই তাদের না মানল, ডানা দুটো নিয়ে হবেটা কী? পায়ে কি জোর কম আছে না কি? তাতেই বেশ চলা ফেরা করা যাবে। 
আনন্দে ডগমগো হয়ে বউ বলল—তাহলে আর দেরী নয়। হতভাগা বুস্টার্ডগুলোকে রাজা মেনে নেবার আগে, যা করবার করে ফেলতে হবে। তুমি আর দেরি কোর না। 
না, আর দেরী সইল না রাজা এমুরও। ধারালো পাথর জোগাড় করা হোল। সব এমু জড়ো হোল এক জায়গায়। এক এক করে ডানা ছেঁটে ফেলা হোল সকলের। 
মা-এমুর তর সইছে না। সে দৌড় লাগালো মা-বুস্টার্ডকে খবরটা জানাতে। এত সহজে তাদের রাজত্ব হাতিয়ে নেওয়া যায় না। বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হবে তাকে।
দৌড়তে দৌড়তে সে হাজির হোল সেই জায়গায়, যেখানে মা-বুস্টার্ডের সাথে কথা হয়েছিল তার। পাখিটা তখনও সেখানেই শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। 
মা-এমু গদগদ হয়ে বলতে লাগল—দ্যাখো, যেমনটি বলেছিলে, আমরা সবাই তাই করে নিয়েছি। কারুরই আর ডানা নাই আমাদের সব ছেঁটে ফেলে দিয়েছি।
হা-হা করে হেসে উঠল মা-বুস্টার্ড। তার ফন্দী খেটে গেছে। সব দেমাক শেষ এমুদের। আনন্দে লাফিয়ে উঠল পাখিটা। বড় বড় দুখানা ডানা ছড়িয়ে দিল দু’দিকে। বলতে লাগল—এবার হোল তো? ডানাও গেল। রাজত্বও গেল তার সাথে। বোকা বুড়ি! পাখির যদি ডানাই না থাকল, সে আবার রাজা কিসের? বড্ড দেমাক হয়েছিল, তাই না? জীবনে আর ডানা মেলে উড়তে হবে না কোন দিন। 
চোখের সামনে পুরোটা দেখে, মা-এমু বুঝতে পারল, কী ভীষণ শঠতা করেছে তার সাথে। রাগে অন্ধ হয়ে তেড়ে গেল তার দিকে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এখন আর ডানা নাই। দৌড়ে গেল বটে, তার আগেই ডানা মেলে আকাশে উঠে পড়েছে মা-বুস্টার্ড। ডানাহীন এমুর সাধ্য কি তাকে ধরবার।
মা বাবা দুই এমু পাখিই বুঝল, ভুলটা হয়েছে তাদেরই। অন্যের কথায় নেচে, নিজেদের ডানা ছেঁটে ফেলাটা একেবারে আহাম্মকের কাজ হয়েছে। মনমরা হয়ে বসে রইল দুজনে। 
কিন্তু মা-এমুর মন ভারি অশান্ত। যা করে ফেলেছে, তার কোন বিহিত নাই। মেনেই নিতে হবে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে না পারলে, মনে শান্তি আসবে না। কিছু একটা করতেই হবে। কী করা যায়, কী করা যায়? ভাবতে ভাবতে দিন কয়েক গেল। একদিন একটা ফন্দি এল মাথায়।  ভয়াণক ফন্দি। 
অনেকগুলো ছানা এমুদের। হৃষ্টপুষ্ট দুটো ছানাকে বেছে নিল মা-এমু। একটা ঝোপের আড়ালে ঢুকিয়ে রেখে দিল বাকিগুলোকে। 
একটা পাহাড়ের খাঁজে এমুদের বাসা। বাসা থেকে বেরিয়ে, ছানাদুটোকে নিয়ে এগিয়ে চলল হেঁটেহেঁটে। মাঠে পৌঁছে, দেখা হয়ে গেল মা-বুস্টার্ডের সাথে। সাথে গোটা বারো ছানা। চোখ টেরিয়ে বাচ্চাগুলোকে একবার দেখে নিল মা-এমু। তার পর বলল—কীগো, কেমন আছো? 
গলা একেবারে স্বাভাবিক। রাগের সামান্য লক্ষ্মণটুকুও ফুটল না গলায়। তা দেখে মা-বুস্টার্ড বেশ নিশ্চিন্ত হোল। সেও গল্প জুড়ে দিল। একথা সেকথার পর, মা এমু বলল—তোমার বাচ্চাগুলো এমন রোগা-পটকা কেন ভাই? কেমন লিকলিকে হাড়গিলের মত চেহারা। আর, তাছাড়া হবে না-ই বা কেন। অতগুলো বাচ্চা হলে শরীর স্বাস্থ্য আর হবে কী করে? 
তা তুমি ঠিকই বলেছ, দিদি। বাচ্চাগুলো সত্যিই রোগা। কিন্তু করবোটা কী? 
--কেন গো? আমাকে দেখে শিখতে পারো না? দ্যাখো, মাত্র দুটি বাচ্চা আমার। কেমন সুন্দর নাদুস নুদুস চেহারা। চেহারা ভালো, তো সারা জীবন হেসে খেলে সুখেই কেটে যাবে। এদিক ওদিক হবে না কোন দিন।
--তাই না কি? 
মা-বুস্টার্ডকে আর কিছু বলতে না দিয়ে মা-এমু বলল—এতে আবার নাকি-র কী আছে? দুজনের খাবার জোটাতে কী এমন মেহনত? নিজের চোখেই দ্যাখো তুমি। দুজনের সেই খাবার যদি বারো জনে ভাগ করে খায়, শরীর স্বাস্থ্য বাড়ে না কি তাতে? সারাটা জীবন রুগ্ন শরীর নিয়েই কাটাতে হয়। মা-বাবাদেরও কি সেটা দেখতে ভালো লাগে? 
মা-বুস্টার্ড কোন উত্তর দিচ্ছে না। মা-এমু দেখল টোপ ধরেছে। সে বলল—আমরা বাপু, যা করি, ভেবেচিন্তেই করি। জন্মায় তো অনেকগুলো। ছোটবেলাতেই দুটো রেখে, বাকিগুলোকে মেরে ফেলি আমি। সারা জীবন পেট ভরে দানা দিতে না পারলে, বাচ্চা থেকেই বা লাভ কী? 
একটু থেমে, বলল—যাইগো, ভাই। এদের খাওয়াতে হবে পেট ভরে, চললাম।
মা-এমু চলে গেল ছানা দুটোকে নিয়ে। চিন্তায় পড়ে গেল মা-বুস্টার্ড। কথাটা নেহাত ভুল বা মিথ্যে বলেনি তো! বাচ্চা এমু দুটো যে তার নিজের বাচ্চাদের চেয়ে, অনেক হৃষ্টপুষ্ট এ কথা তো অস্বীকার করা যায় না। তাহলে, সংখ্যায় বেশি বলেই কি আমার বাচ্চাদের চেহারা তেমন পুষ্ট নয়?
তখুনি আবার মনে হোল, আমি ওকে ঠকিয়েছিলাম। এবার উলটে ও আমাকে ঠকাচ্ছে না তো? মনে একটু ধন্দ দেখা দিল মা-বুস্টার্ডের।
মা-এমুর পথের দিকে চাইতেই তার বাচ্চা দুটোকে আবার চোখে পড়ল তার। আহা, কী সুন্দর নাদুস-নুদুস দুটো বাচ্চা। তাদের নধর চেহারা দেখেই, চিড়িক করে উঠল মাথার মধ্যে। নাই বা থাকল ডানা। চেহারার যা চেকনাই! নিশ্চয় এর জোরেই রাজা হয়ে যাবে এমুরা! 
এটা তো কোন মতেই মেনে নেওয়া যায় না। যতই ডানা থাকুক, যতই উড়তে পারুক আকাশে, রোগা পাতলা চেহারা নিয়ে তার ছেলেদের যে রাজা বলে মানবে না কেউ, সেটা বেশ বুঝতে পারল মা-বুস্টার্ড। 
সাথে সাথেই মনস্থির করে ফেলল পাখিটা। নাঃ, এতগুলো বাচ্চা একেবারেই ভালো কথা নয়। এক গাদা রোগা বাচ্চার চেয়ে, দুটো সুস্থ্য সবল বাচ্চা থাকাই ঠিক কথা। 
এমুদের কোন মতেই আর রাজা থাকতে দেওয়া যাবে না। সুস্থ্য সবল বুস্টার্ডরাই রাজা হবে এবার থেকে। চেহারায়ও বড় হবে, উপরি কথা, ডানা মেলে উড়তেও পারবে। রাজা হওয়া তখন কে ঠেকাবে?
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। দুটো বাচ্চা রেখে, বাকিগুলোকে মেরে ফেলল নিজের হাতে। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে মা-এমুর সাথে দেখা করতে রওণা হয়ে গেল। 
দুটি বাচ্চা নিয়ে চরে বেড়াচ্ছিল মা-এমু। মা-বুস্টার্ড এসে হাজির হোল সেখানে। মা-এমু চোখ টেরিয়ে দেখে নিল তাদের। সাথে মাত্র দুটো বাচ্চা। আগ বাড়িয়ে নিজেই বলল—কী গো, বাকি বাচ্চাগুলো কোথায় তোমার? তাদের কোথায় রেখে এলে?
--দিদি, ভেবে দেখলাম, তোমার কথাই ঠিক। দুটো বাচ্চা থাকাই ভালো। তাই বাকিগুলোকে মেরে ফেলেছি। এবার তাহলে আমার বাচ্চা দুটোও তোমার বাচ্চাদের মত হৃষ্ট-পুষ্ট আর শক্ত-সবল হবে। রাজাও হবে তারা। 
মা-এমুর মনে তো আনন্দ ধরে না। যেমন শিক্ষাটা দেবে ভেবেছিল, সেটাই হয়েছে। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করা চলবে না। শোনামাত্র মুখ ঝামটে বলে উঠল—হায়, হায়! এ কী করেছিস তুই? তুই মা, না কি একটা ডাইনি? নিজের হাতে নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে পারলি? রাজা করবার এমন লোভ তোর?
মা-বুস্টার্ডের তো মুখে কথা সরছে না এসব শুনে। তাহলে কি এবার সে নিজেই ঠকে গেল? 
তাকে চুপ করে থাকতে দেখে, মা-এমু বলল—ছেলেপুলে যে কটাই হোক, তাদের মুখে আহার যোগাবার দায় তাদের বাবা-মায়ের। আমার ঘরে দেখবে চলো। ঘর ভর্তি করে বেরি ফল জমিয়ে রেখেছি। বাইরে ভীড় করে থাকে উচ্চিংড়ের দলও। খাবারের অভাব আমার ছেলেদের হয় না কখনো।
--কিন্তু তুমি যে বললে, তোমার এখন দুটি মাত্র ছেলে!
--দুটি? মা-এমু যেন আকাশ পড়ল। গুণে গুণে বারোটা ছেলে আমার। দেখবে চলো আমার বাড়িতে। 
বলেই মাথা উঁচিয়ে, জোর এক শিষ! মিষ্টি সুরের সাড়া পেয়ে, এমুর লুকিয়ে রাখা দশটি বাচ্চা বেরিয়ে এল পিল পিল করে।
মা-বুস্টার্ডের চোখ ছানাবড়া। মুখে কথা নাই। মা-এমু বলল—তাকিয়ে দেখে নাও, আমার বাচ্চারা সবাই আছে কিনা। তোমার মৃত ছেলেদের কথা ভেবে দ্যাখো। আসলে কী জানো, এমন নিষ্ঠুর কাজে ফল তুমি জানো না। তবে  এটা নিশ্চয় জানো, বিধাতা সব দেখছে। তিনিই তোমাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেবেন। দুটির বেশি বাচ্চা দেবেন না তোমাকে। 
মরমে মরে যাচ্ছে মা-বুস্টার্ড। মুখে কথা নাই একটিও। মা-এমু গর্বের সাথে ঘরে ফিরে চলল বাচ্চাদের নিয়ে। মুখ ফিরিয়ে বলে গেল—তাহলে এটাই দাঁড়াল—উড়বার মত ডানা রইল তোমাদের। আর, আমাদের রইল দশ-বারোটা করে বাচ্চা।
সেদিন থেকেই দেখা যায়, অত বড় চেহারা থাকলেও, এমু পাখি উড়তে পারে না। আর, যতই না কেন বড়সড় দুটো ডানা থাকুক, মা-বুস্টার্ড এক ঋতুতে মাত্র দুটো ডিমই পেড়ে থাকে। তার বেশি কখনও নয়।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি