মাটিমাখা মহাপ্রাণ- ত্রিশ /শুভঙ্কর দাস

মাটিমাখা মহাপ্রাণ। ত্রিশ

শুভঙ্কর দাস 

"সে গান আজ-ও নানা রাগরাগিণীতে
শুনাইও তাহারে আগমনীসঙ্গীতে
যে জাগায় চোখে নূতন-দেখার দেখা।
সে এসে দাঁড়ায় ব্যাকুলিত ধরণীতে
বননীলিমার পেলব সীমানাটিতে
বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা।"

ইংরেজ রাজসরকারের গুপ্তচরেরা শুধু ইংরেজ ছিলেন না,এই দেশের মানুষই সেই গুপ্তচরবৃত্তিতে বেশি ছিলেন। তারাই সরকার চালানোর অন্যতম স্তম্ভ। অর্থাৎ এই দেশের পরাধীনতার জন্য শুধু ইংরেজ সরকার দায়ী নয়, তার সঙ্গে এই দেশের মানুষজনও সমানভাবে দায়ী। যাঁরা স্বাধীনতার জন্য, দেশ গঠনের জন্য লড়াই করছেন,আত্মত্যাগ করছেন,প্রাণদান করছেন,তাঁদের একইসঙ্গে ইংরেজ ও নিজের দেশের লোকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ঘরে ও বাইরে এই দ্বিমুখী লড়াই জারি ছিল।
অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা স্তব্ধ হলেও একটা জিনিস ইংরেজ রাজসরকার বুঝতে পেরেছিল,সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে অর্জন করছে। কোনো আন্দোলন দশ জন বিশ জন করলে কোনো অসুবিধা নেই, আবার তা যদি শহুরে লোকজন করে,তা সবই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু সেই আন্দোলন যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে,তখন তা শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। তারপর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার,এই দেশের চাষাভুষা, শ্রমজীবী মানুষের দল যেভাবে দিনের পর জেগে উঠছে,তাতে শাসনভার সামলানো কঠিন শুধু নয়, হয়তো এই দেশকে পরাধীন করে রাখার ঔপনিবেশিকতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাবে।ধোঁয়া দেখলেই আগুনের উৎসে পৌঁছানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই ইংরেজ রাজসরকার প্রথমে একটা কাজ করল,গুপ্তচরের বেতন ও সংখ্যা বৃদ্ধি করল। তারপর প্রথম শ্রেণির নেতাদের কারাগারে বন্দী করে যেকোনো আন্দোলনের মুখ আঁতুড়ঘরে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে ফেলল। এর একটা সুফলও আসছিল। একের পর এক নেতাকে রাষ্ট্রবিরোধী আইনে ফেলে বন্দী করা হচ্ছিল, অন্যদিকে বিপ্লবীদের দোষী সাবস্ত করে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোও চলছিল। সবই ঠাণ্ডা মাথায় সম্পন্ন হচ্ছিল। কিন্তু বিপ্লবীরা যেমন বসে ছিল না,তেমনি অহিংস স্বদেশীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল ।বিপ্লবীরা একদিকে অত্যাচারী ইংরেজ পুলিশ কর্তা বা ম্যাজিসট্রেটকে যেমন হত্যা করতে লাগল,তেমনি দেশীয় গুপ্তচরের ভবলীলা সাঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিল।অন্যদিকে যাঁরা হিংসাত্মক কাজকে সমর্থন করে না,পড়াশোনার মাধ্যমে, আইন-আদালতের মাধ্যমে এগিয়ে চাও, সেইসব লোকজন,তাঁরা এমনভাবে ইংরেজ রাজসরকার বিরুদ্ধতার আন্দোলনকে সাজালেন,তাতে ইংরেজ সরকার কোন্ চার্জে গ্রেপ্তারের করবে,তাই ভেবে পাচ্ছিল না! ফলে সর্বদা একটা ইস্যু সন্ধান করে চলত শাসকদল।
চৌরিচৌরার এক স্থানীয় স্বদেশী স্বেচ্ছাসেবক হলেন ভাবন আহির।তাঁকে ইংরেজ পুলিশ অন্যায়ভাবে প্রকাশ্যে অপমান করে। এর ফলে চৌরিচৌরার দেশপ্রেমিক কৃষকরা প্রতিবাদ করেন। তখন পুলিশ নির্বিচারে গুলি মেরে হত্যা করে বহু কৃষককে। অসহযোগ আন্দোলন যোগদান এবং তা অমান্য করে হিংসাত্মক কাজকর্ম করার অজুহাতে  ১৭২ জনকে বৃটিশ আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার মধ্যে ১৯ জনকে রাতারাতি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়। বাদবাকিদের আন্দামানে যাবজ্জীবন নির্বাচিত করে।
এর প্রতিবাদে চৌরিচৌরার তিনশতাধিক সত্যাগ্রহী থানা আক্রমণ করে এবং ২২ জন পুলিশকে হত্যা করে। এ-র মধ্যে সহসা গান্ধিজি একাই সিদ্ধান্ত নিলেন অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার।
গান্ধিজির এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সারাদেশে রীতিমতো গভীর হতাশা এবং শোকের ছায়া নেমে আসে।জেল থেকে চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহেরু,লালা লাজপৎ রায়,সুভাষচন্দ্র বসু,জওহরলাল নেহেরু প্রমুখ এর তীব্র প্রতিবাদ করেন গান্ধিজির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে । 
এইসময় হুগলির ছেলে গোপীনাথ সাহা কলকাতার কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যার করতে গিয়ে অন্য নিরীহ ইংরেজ আর্নস্ট ডে-কে হত্যা করে বসে। বিচারের সময় এক নিরপরাধ ইংরেজকে হত্যা করার জন্য গোপীনাথ দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর অতি দ্রুত বিচার  হয়। এবং তাঁকে ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়। তখন তিনি ফাঁসি যাওয়ার পূর্বে বলে ওঠেন,"তাঁর দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু ঘরে-ঘরে বিপ্লবের বীজ রোপণ করবে।"
এর ফলে ইংরেজ রাজসরকার যেকোনো আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীকে অতি দ্রুত শাস্তিবিধানের মাধ্যমে সারা দেশে এক ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইল। তাঁরা গান্ধিজিকে গ্রেফতার করল অশান্তিতে ইন্ধন যোগানোর অভিযোগে।
এতেও যখন স্বাধীনতার আন্দোলনকে একেবারে স্তব্ধ করে দেওয়া সম্ভব হল না। তখন ইংরেজ সরকার দুটো মারাত্মক কায়দার জাল ফেলল। একদিকে প্ররোচিত করে জনসমাজে  হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধিয়ে দিল।অন্যদিকে কংগ্রেস দলকে নিষিদ্ধ করে প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে সাহস ও বিশ্বাসের ভিত ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
এরপর ইংরেজ রাজসরকার ভাবল, এইসব নেতাদের জেলে বন্দী রেখে লাভ নেই, তাই তাঁদেরকে নানা শর্তে মুক্ত করে কংগ্রেসীদের মধ্যে একে-অপরের মধ্যে বিরোধের চাপা আগুনে ফুঁ দিতে লাগল।
তাই প্রথম সারির নেতাদের মুক্ত করে সরকার প্রস্তাব দিল,রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ লোভনীয় পদক্ষেপ। ইংরেজ প্রতিনিধি এবং ভারতীয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি দেশের আইন কানুন সামলাবে।
একদিকে গান্ধিজি হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য অনশন শুরু করেন,অন্যদিকে কংগ্রেসের অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন দাশসহ মতিলাল নেহেরুরা দাবি করলেন,দেশের মানুষের জন্য  শতকরা ৯৮ শতাংশ স্বরাজ।
একদিকে গান্ধিজি ও লালা লাজপত রায়ের মতো নেতারা ইংরেজ রাজসরকারের আইনসভার সংস্কারকে মেনে নিলেন না। তাঁদের যুক্তি, কোনোভাবেই ইংরেজ রাজসরকারকে সহযোগিতা করা চলবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে বুঝিয়ে দিতে হবে,এই দেশ পরিচালনার জন্য ইংরেজ শাসনের কোনো দরকার নেই। 
কিন্তু অন্যদিকে চিত্তরঞ্জন দাশের যুক্তি, যদি আইন সংস্কার মেনে সরকারে প্রবেশ করা যায়,তাহলে ভেতরে ও বাইরে দু'দিকেই আন্দোলন চালানো সম্ভব হবে। এবং অধিকারগুলো অতি সহজে উপস্থাপন করা যাবে। তারপর ইংরেজ রাজসরকার কারাগারে বন্দী স্বদেশীদের সঠিক বিচারপর্ব পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে,জেল থেকে মুক্ত যাবে এবং পরবর্তী সময়ে যেকোনো অজুহাতে স্বদেশীদের জেলে ভরার অজুহাত খণ্ডিত করা সম্ভব হবে। এইভাবে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এলো।
১৯২৩ সালে কংগ্রেস ছেড়ে চিত্তরঞ্জন দাশ গঠন করলেন স্বরাজ্য দল। যার সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশ এবং সম্পাদক হন মতিলাল নেহেরু। 
এই অবস্থা দেখে ধুরন্ধর ইংরেজ রাজসরকার গোঁফের আড়ালে হেসে উঠলেন। তাঁরা আলোচনা করে দেখাতে লাগলেন,পত্র-পত্রিকায় ছাপতে লাগলেন, এই তো ভারতীয়দের ঐক্যহীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অক্ষমতা। এঁরা শুধু মঞ্চে বড় বড় নীতি ও আদর্শের কথা আউড়ায়, আসলে তা নিজেরা মানে না। কংগ্রেসী নেতাদের বাদবিতণ্ডা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করে দেশের জনগণকে বোঝাতে লাগল, দেশ শাসন করার মতো যোগ্যতা ও দৃঢ়তা এখনও জন্মায়নি ভারতীয়দের,তাই তাদের জন্য ইংরেজ শাসন সবচেয়ে সুবিধাজনক ও গঠনমূলক। 
তাই কংগ্রেসকে সময়ে সময়ে  নিষিদ্ধ করা যায়!
গান্ধিজিকে যখন-তখন বন্দী করে আন্দোলন স্তিমিত করা যায়।
চিত্তরঞ্জন দাশ নিজের দলের উদ্দেশ্য বোঝাতে দিশেহারা হবেন,বিরোধিতার মুখে পড়বেন,তখন সরকারকে নতুন করে চালাকি করতে হবে না,সাফাই দিতে হবে না।এমনি অতি সহজে সকল প্রস্তাব ও পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তারপর হিন্দু-মুসলমান ইস্যু তো হাতে রইল,যাকে বলে Devide and Rule। সে যতই চিত্তরঞ্জন দাশ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য বেঙ্গল প্যাক্ট গঠন করুক,যতই বলুক,শতকরা ৫৫ জন মুসলমান সরকারি চাকরি পাবে,এসবই সার্থক হতে সুদীর্ঘ সময় চলে যাবে।
তারপর যদি কোনো প্রথম শ্রেণির নেতা একটু বেশি বেগড়বাই করে, বাহাদুরি করে,তখন গোলবৈঠকের মতো সম্মানজনক আলোচনাসভা ডেকে সকল প্রতিবাদ,উত্তেজনা এবং প্রস্তাব গ্রহণের নাটক করে মোটামুটি সেই নেতা এবং নেতার অনুগামীদের শান্ত করা যাবে।
তাই ইংরেজ রাজসরকার মনে মনে উল্লসিত এই কথা ভেবে, কোনোরকম মাথাব্যথা ছাড়াই নিশ্চিতে বুলডোজার-শোষণ-নীতি চালিয়ে এই দেশটাকে ছিবড়ে করে করা যাবে আরও সুদীর্ঘকাল।
এইভাবে সকল ভাবনা ও শাসনপ্রণালি পরিকল্পনা সুচারুভাবে চলতে লাগল।
কিন্তু মুসকিল হল যখন সেই সময়কালের মধ্যে এমন একজন মানুষজনের উদ্ভব হল। তাঁরা অদ্ভুত রকমের চরিত্র। অসহযোগ আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও তাঁদের কাজ শেষ হয় না! নেতৃত্ব-সিংহাসনকে ধুলো মনে করেন! গোলবৈঠক-রাজসম্মান তাঁদের কাছে মূল্যহীন! সরকারী চাকরি অথবা মোটা টাকা দেওয়ার প্রস্তাবকে হেলায় উড়িয়ে দেয়। তারপর সবচেয়ে ভয়ংকর সেই সব মানুষগুলোকে জেলের ভয় দেখালেও পিছপা হয় না!
অথচ এঁরা কংগ্রেসের শুভ্র-নরম বালিশ,তোষক পরিবৃত মাইকঝোলানো মঞ্চে বসেন না, এঁরা দিল্লিজয়ের জন্য মরিয়া নন! এঁরা হাতে বন্দুক তুলে নিয়ে কোনো থানার ইনচার্জ অথবা ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যার চেষ্টা করেন না! 
কিন্তু এঁরা অজপাড়াগাঁয়ে হেঁটে হেঁটে সেবা,শিক্ষা এবং পরোপকারের মাধ্যমে এমন জনসংযোগ করে চলেছে,তাতে একদিন গোটা ভারতবর্ষের জনতা সহসা,একদিন সকালে রাস্তায় নেমে এসে গোটা দেশটার গায়ে জড়ানো শৃঙ্খল খালি হাতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে!
ঠিক তেমনই একজন কুমারচন্দ্র জানা।
বাইরে থেকে মনে হতে পারে সামান্য গেঁও চাষা,মুখের ভাষাও গ্রামের হেটো-লোকজনদের মতো।অল্পদামের ধুতি-ফতুয়া পরিহিত।আবার তাঁর দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই কেমন? না,ঘরে ঘরে চরকা চালানো শেখাচ্ছেন মন দিয়ে। যেখানে হিন্দু মুসলমান বাস,তাদের গিয়ে বোঝাচ্ছেন,ধর্ম নিয়ে লড়াই নয়, ধর্ম লালন করে দুই জাতি দুই ভাইয়ের মতো বাস করতে হবে।গাঁয়ের ভেতরে যেখানে পুলিশ, আদালত, আইন পৌঁছাতে হিমসিম খায়,সেখানে গিয়ে ছোটো ছোটো সালিশি সভা করে গ্রাম্যবিবাদ মিটিয়ে একটা ভরসার জায়গা তৈরি করেছেন।যেখানে রাস্তাঘাট বেহদ্দ, সেখানে গাঁয়ের মানুষজন নিয়ে রাস্তা সারানো ও নতুন রাস্তা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। যেখানে গরীব শ্রমজীবী মানুষজন অসুস্থ, তাদের সরকারী ডাক্তার দেখতে চায় না অথবা শহুরে হাসপাতাল নিতে চায় না,তাদের কাছে গিয়ে সেবাশুশ্রূষার মাধ্যমে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন,তার জন্য তাঁরই ডাক্তারি পড়ুয়া ছাত্ররা সহযোগিতা করছে। মেয়েরা যাতে পড়াশোনা করতে পারে,তার জন্য মেয়ের পিতামাতাকে ঘরে গিয়ে বোঝাচ্ছেন। তারপর ছাত্রদের নিয়ে ছোটো ছোটো সভা করে তাদের মধ্যে দেশাত্মবোধের বীজ বপন করে দিচ্ছেন।
তারপরও স্থির থাকতেন না,গ্রামে গ্রামে ঘুরে জাতীয়তাবোধে উদীপ্ত করতেন এবং গ্রামের মানুষজনের মধ্যে এমনভাবে দেশচেতনার বীজ রোপন করতেন,যাতে আন্দোলনের সময় সকলেই একবাক্যে একপ্রাণতায় এক বিশ্বাসে বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রথমের দিকে ইংরেজ রাজসরকার কুমারচন্দ্রের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাত্তা দিতেন না। তাঁরা এঁদেরকে শাসনপ্রণালীতে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চিহ্নিত করতেন। তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা ছিল প্রথম শ্রেণির নেতা ও তাঁদের বৈঠক।কিন্তু পরে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে জানতে পারলেন,এই যে গান্ধির ডাকে আলোড়ন ওঠা বা চিত্তরঞ্জন দাশের সভায় অগুনতি লোকসমাবেশ, সুভাসচন্দ্র বসুকে গ্রেফতার করলে সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা শহর জুড়ে হরতাল বসে যাওয়া অথবা এই যে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত প্রাণবলিদানকারী মারাত্মক বিপ্লবীরা শুধু নয়, তাদের পাশাপাশি  অতি সাধারণ চাষাভুষা লোকজন এক আশ্চর্য শক্তিবলে পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছে এবং চাবুকপেটা করলেও মুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, এদের কে নেপথ্যে চালিত ও প্রাণিত করছে। এঁরাই তো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। তখন চোখ পড়ল,এই লক্ষ লক্ষ অতি সাধারণ সরল মানুষজন, তাদেরকে শক্তি ও সাহস যোগাচ্ছেন কুমারচন্দ্রের মতো সংগ্রামীরা। পরাধীন দেশের মানুষজনের মুখেচোখে সেই পদ্মিনী উপাখ্যানের ভীমসিংহের কথাগুলো জাগ্রত হয়ে উঠছে,
"স্বাধীনতা হীনতায়  কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব-শৃঙ্খল  বল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়?"
তারপর একটি ঘটনায় ইংরেজ রাজসরকারের টনক নড়ে গেল!

বীরেন্দ্রনাথ শাসমল তাঁর কলকাতার বাড়িতে স্বরাজ্য দলের মুখপত্র 'ফরোয়ার্ড' পত্রিকার অফিস করেছিলেন।সেই অফিসে ডেকে পাঠালেন কুমারচন্দ্র জানাকে।

কী কুমার, তোমার ব্যবসার খবর কতদূর?

আজ্ঞে, বাসুদেবপুরে গিয়েছিলাম,সেখানে একটি জনকল্যাণ কমিটি গঠন করেছি,গ্রামের যাবতীয় উন্নয়নের জন্য, তারপর অনন্তপুরে কিছুদিন ছিলাম। নিজের হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়,বাচ্চারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে থাকে,তাদের জন্য চাল সংগ্রহ আর জামাকাপড় তৈরিতে সময় কাটত। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে কলকাতায় কয়লার ব্যবসাটা দেখার জন্য আসি,এসেই শুনি...

এসে শোনো,কয়লার সরবরাহ সঠিক সময়ে হয়নি বলে কর্পোরেশনের অর্ডার হাতছাড়া? 

হ্যাঁ,তাই তো হল

চিত্তরঞ্জন দাশ তা শুনে কী বললেন?

বললেন,একটা সেতু হলে দৌড়ে দৌড়ে দুদিক রাখা যেত!

সেতু!

আজ্ঞে,এই যে মেদিনীপুর থেকে নদী পেরিয়ে আসি, তা শুনে তিনি এই সেতুর কথা বললেন,হেসে বললেন,একটা সেতু হলে কোনো চিন্তা নেই, দৌড়ে সবজায়গা কাজ করতে পারবেন,কি কলেজে তো হেঁটে হেঁটে পড়াশোনা করতেন,ঠিক নয় কী?
আমি তো অবাক আমার কথা উনি জানলেন কী করে?

বীরেন্দ্রনাথ মৃদু হেসে বললেন,আমি বলেছিলাম,তোমার কথা,তোমার পড়াশোনার জন্য লড়াই, তোমার ব্যবসার জন্য লড়াই,যাতে তোমার কিছু উপকার হয়, সেসব শুনে চিত্তরঞ্জন কী বললেন জানো?

কুমারচন্দ্র নীরবে তাকিয়ে থাকলেন বীরেন্দ্রনাথের দিকে।

বললেন,এ তো রামায়ণ যুগের লোক,এখন এই কলিযুগে কী করছে! তারপর হেসে ফেলে জানালেন, আচ্ছা,এই কুমারচন্দ্রকে একটি বার পাঠাবেন,কথা বলব।

আচ্ছা, তাই বলুন, আমার মতো তুচ্ছ লোককে চিত্তরঞ্জন দাশের মতো নেতা চেনে,আমি তো অবাক! তাঁর ডাকে আমি গেছিলাম। তাঁকে ব্যবসার কথা সব জানাই। কে সি জানা অ্যাণ্ড কোং নামে একটি কোম্পানিও খোলার কথাও বললাম। সঙ্গে ছিলেন সাতকড়িবাবু ও নিকুঞ্জবাবু।এক লক্ষ টাকার টেণ্ডার পাই কিন্তু আপনি তো বলছিলেন,আগে দেশসেবা এবং দেশগঠন, তারপর দেশ স্বাধীন। সেইজন্য গোটা সুতাহাটা-মহিষাদল-খেজুরি অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে জনসংযোগ করতে থাকি।আসলে ব্যবসা করব বলে তো কলেজ ছেড়ে আসিনি!

তা বেশ! আর ব্যবসা? 

সে লাটে উঠল,ললাটে নেইকো ঘি,ঠকঠকালে করব কী?

অথচ কুমার জানো,এই রকম সুযোগ পাওয়ার জন্য কত শকুন-শেয়াল অপেক্ষা করছে,তাদের একমাত্র চেষ্টা, যেন-তেন-প্রকারেণ দেশের টালমাটাল সময়ে ব্যবসা আখের গুছিয়ে নেওয়া। এমনি এমনি ব্যবসার চেয়ে যদি স্বদেশীর নাম ব্যবহার করা যায়,তাতে লাভ বেশি। এরকমও লোকজনও আছে,সেখানে তুমি বোকার মতো ঘুরছ গাঁয়ের পর গাঁয়ে,অসহায়, দরিদ্র, শিবভিখিরির মতো! এই জন্য চিত্তরঞ্জন দাশ সঠিক বলেছেন,রামায়ণ যুগের লোক, হাঃ হাঃ হাঃ 

কী করব? আমার যে এইসব কাজ করতে মন আনন্দে ভরে ওঠে,মনে হয়, এ যেন আমারই জীবন সার্থক হয়ে যাচ্ছে। যত ঘুরছি,ততোবেশি চোখ খুলে যাচ্ছে। 

তাহলে এই সব অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে কী বুঝলে? যদি আমরা আইনসভার নতুন আইন অনুযায়ী ভোটে দাঁড়িয়ে জেলা বোর্ড দখলের চেষ্টা করি,জিততে পারব?

অবশ্যই পারবেন।আমি আপনার জন্য প্রাণ লড়িয়ে দেবো।

ঠিক আছে, কিন্তু এই লড়াই ওপর ওপর নয়,ভেতর থেকে লড়তে হবে,এখানে শহুরে বাবুদের পাবে না,কোনো পেপার-টেপার ছাপা হবে না,কোনো লিফলেট বা ফেস্টুন নয়, এ হল সরাসরি পাড়াগাঁয়ের অতি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে হবে।সঙ্গে চিত্তরঞ্জন দাশ বা গান্ধিজিকে পাবে না,তাঁদের ছাড়াই বোঝাতে হবে,এই ভোট নতুন দেশ গঠনের জন্য, নতুন ভোর আনার জন্য, পারবে তো কুমার?

এটাই তো আমার কাজ বীরেনদা 

ঠিক আছে, শোনো,সুতাহাটা থানার অঞ্চলে তোমাকে আর জীবেশ পট্টনায়ককে কংগ্রেস দলের কমিটিতে নির্বাচিত করা হয়েছে। 
সামনে নির্বাচন, তাহলে কাজে নেমে পড়ো।কারণ এই প্রথম লড়াই দেশগঠনের জন্য ভোটাধিকার। কাজটা করতেই হবে,কুমার এবার সত্যিকারের কাজ করা শুরু

কুমারচন্দ্র শুধু উচ্চারণ করলেন,

"করিষ্যামি করিষ্যামি করিষ্যামীতি চিন্তয়া।
মরিষ্যামি মরিষ্যামি মরিষ্যামীতি বিস্তৃতম্।। 

চেয়ার থেকে উঠে কুমারচন্দ্র বেরিয়ে যাচ্ছিলেন,তারপরে হঠাৎ ঘুরে এসে বীরেন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গিয়ে নিচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললেন,আপনি আমার পথপ্রদর্শক, একই সঙ্গে আমাকে আমাকে এবং আমার বাচ্চাগুলোকে আগলে রাখছেন।আপনার সক্রিয় ভূমিকার জন্য আমি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি,আবার অনন্তপুর জাতীয় বিদ্যালয়ের জন্য চাল-আনাজের রেশন পাঠিয়ে তাদের রক্ষা করছেন। এসব কি কোনোকিছুর বিনিময় শোধ করা যায়!

আশেপাশে যেসব কংগ্রেসকর্মীরা বসে ছিলেন,তাঁরা দুই মেদিনীপুরের নেতার সৌজন্য ও সৌহার্দ্য দেখে পুলকিত। 

আচ্ছা, কুমার,একটা প্রশ্ন করব?

বলুন?

তুমি কার হয়ে কাজ করবে? কংগ্রেস না স্বরাজ্য দল? গান্ধিজি না চিত্তরঞ্জন?  

কুমারচন্দ্র এক মুহূর্ত নীরব।
তারপর দৃঢ়কণ্ঠে জানালেন,আমি মানুষের জন্য কাজ করতে চাই,এই দেশের জন্য কাজ করতে চাই.. আর কিছুই জানি না!

বলেই চলে যাচ্ছিলেন। 

বীরেন্দ্রনাথ তাকিয়ে ছিলেন কুমারচন্দ্রের চলে যাওয়ার দিকে।তারপর মৃদুকণ্ঠে বললেন,জেনে রেখো,যদি কোনোদিন দেশ স্বাধীন হয়, তাহলে এই কুমারচন্দ্রের মতো মানুষের কাঁধে ভর করে সেই স্বাধীনদেশ হাঁটতে শিখবে... এঁরা সাচ্চা দেশপ্রেমিক। 

বসে থাকা কংগ্রেসকর্মীরা অবাক হয়ে কুমারচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

জেলা বোর্ডের প্রতিনিধি নির্বাচন দাদামা বেজে উঠল। কুমারচন্দ্র সুতাহাটা থেকে দ্বারিবেড়্যা,মহিষাদল থেকে নন্দীগ্রাম, খেজুরি থেকে কাঁথি ছুটে বেড়ালেন।
সঙ্গে সূর্যকান্ত, জীবেশ পট্টনায়েক,জনার্দন হাজরা, গুণধর হাজরা প্রমুখ।
সুতাহাটা অঞ্চলের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম।
সেখানে একটি চণ্ডীমণ্ডপে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের স্বপক্ষে নির্বাচনী মিটিং ডাকা হয়েছে। শুরু হবে ঠিক বিকেল চারটায়।
দুটোর পর থেকে লোকজন আসা শুরু হয়েছে। 
চারটের কিছু পরে মিটিং শুরু হল।
সকলে উপস্থিত। বক্তব্য পরিবেশন শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কুমারচন্দ্রের দেখা নেই। অথচ এই মিটিং এ-র মূল পরিকল্পনা তিনিই করেছেন।
প্রায় মিটিং শেষের পথে,ঠিক সেই সময় কুমারচন্দ্র প্রবেশ করলেন। ধুতিতে কাদা লেগে। ফতুয়ার কাঁধে কচুরিপানা অংশ আটকে আছে।মুখেচোখ ঘামে সিক্ত। পায়ের হাঁটু পর্যন্ত কাদা জড়িয়ে। বোঝা যাচ্ছে, তিনি হেঁটে আসছেন এবং মিটিং এ-র পূর্বে কোনো পুকুর পরিষ্কার সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
মঞ্চে ওঠা মাত্র একটা শিহরণ খেলে গেল সভায়। যেন যে মানুষের অপেক্ষায় ছিল এই জনসভা,সেই মানুষটি এসে উপস্থিত হয়েছে। 
কংগ্রেসের অন্যান্য বক্তারা নির্বাচনের পদ্ধতি, কাকে ভোট দেবেন অথবা ভোটে যিনি দাঁড়িয়েছেন,তাঁর কথা এতক্ষণ ধরে বলছিলেন।
কুমারচন্দ্র এঁদের মধ্যে আলাদা।তিনি মঞ্চে উঠে বললেন,গ্রামে পুকুরে এতো কচুরিপানা,এতো নোংরা,এতো পাড় ভেঙে আছে,তা ই সারাতে একটু দেরি হল আসতে,কিছু মনে করোনি তোমরা, আরে কথায় বলে না,খালি পেটে জল,ভরাপেটে ফল।তাই করলাম।যে পুকুরের জলে শীতলা মায়ের ভোগ হয়,গাঁয়ের মানুষজন পেটপুরে খায়,যে পুকুরে এতো লোকজন পান করে,চান করে এবং  যে জল ঠাকুর-দেবতার পুজো হয়,তাকে কি ময়লা রাখা উচিত? তোমারাই বলো? বলো? এতে ফল কী ভালো হয়?  হয় না! কলেরা ম্যালেরিয়া শেষ করতে হলে আগে পুকুর পরিষ্কার রাখতে হবে।
কুমারচন্দ্রের সঙ্গে যে কয়েকজন এসেছিল,তাদের মধ্যে একজন কুমারচন্দ্রকে দেখিয়ে বলে উঠল,এই মানুষটিকে দেখো,সেই সাতসকালে মোদের গাঁয়ে এসে মোদের বড়পুকুর দেখে বলেন,ওরে এটি তো দিনপিতিদিন বাঁচিয়ে রাখে,এটাই এতো অপরিষ্কার হলে হবে! আয় কাজ করি। তাই মোদের সঙ্গে পুকুরে নেমে কাজ করেছে।পুকুর পরিষ্কার, পাড় বাঁধানো,জলাজঙ্গল কাটা এইসব করে এখন এখানে মোদের নিয়ে এসেছে, যাতে তোরা সক্কলে বুঝতে পারিস,কীভাবে গ্রাম গড়তে হয়!  ভাইসব,কুমারদার কাজ ঠিক তো?

এইবার জনগণ সমস্বরে চেঁচাল,ঠিক।ঠিক।

কুমারচন্দ্র বলে উঠলেন, 
ওরে ভাইসকল,শুধু মুখে ঠিক ঠিক বললে হবে না,পুকুরের জল খাওয়া ভালো,তবে তার যদি পরিষ্কার হয়,ওরে বাপরে, যদি জল হয়, নোংরা,অশুদ্ধ, তাহলে তো পেটে খেলে পিঠে সইবে না,কলেরা বাবাজি ছুটে এসে পিঠে দমাদম চাবুক কষাবে, বলেই কুমারচন্দ্র পেটে নিজের হাত রেখে উঃ আঃ করে অসুখের অভিনয় করে দেখালেন, তাতে উপস্থিত লোকজন হেসে গড়িয়ে গেল।
তারপর মঞ্চের একপাশে গিয়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠে বললেন,কী রে হানিফ, তোর ব্যাটা কেমন আছে? ম্যালেরিয়া সেরেছে?

ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন নিরীহ মুসলমান বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বললে,এখন ভালো আছে কর্তা,তুমি যেভাবে ডাক্তার ডাকলে,সেবা করলে,মুই তো বাপটা হয়ে তা পারিনি!  

তা বাপ হয়ে একটা কাজ করো সবাই,নিজের ঘরের কাছে মজাপুকুর, ঝোপঝাড় কাটা,যেখানে সেখানে নোংরা জল জমতে না, এইসব কাজ কর দিকি, কী রে পারবি তো?

হানিফ একটু কেশে নিয়ে বলে উঠল,বেশ পারব,কী রে সবাই, কুমারবাবু,যা বলেরে, বল,মোরা কি পারবনি?

আবার সমস্বরে চিৎকার, হ পারবই।

তারপর মঞ্চের অপর প্রান্তে গিয়ে যেখানে কিছু সংখ্যক গ্রামের মহিলা উপস্থিত ছিল,তাদের সামনে গিয়ে কুমারচন্দ্র বলে উঠলেব,কী গো, পুতুলের মা,পুতুলের বিয়েটা ঠিকঠাক মিটেছে তো?

একজন মহিলা মাথার ঘোমটাসুদ্ধ মাথা নেড়ে জবাব দিল।অর্থাৎ তার মেয়ের বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছে। 
সেই সময় সেখানের একজন যুবক উঠে দাঁড়াল।বলে উঠল,কুমারদা,এক বিধাবা মায়ের বিবাহযোগ্যা মেয়ের জন্য তুমি যা পরিশ্রম করলে, তা আর দেখতে পাইনি গো,এ যেন নিজের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন।
মুই সেই মেয়ের ভাই হয়ে যা পারিনি,তুমি করেছো,তোমার জন্য সবকিছু করতে পারি,একবার শুধু হুকুম করো কুমারদা

সঙ্গে সঙ্গে সমস্বর, হুকুম হুকুম! 

ওরে আমি হুকুম করার কে? এই দেশগাঁটা মোদের,মোরা সকলে মিলে মোদের মনের হুকুম মেনে কাজ করব।
শোনো, ভাই সকল, গ্রামের উন্নতির নামে যে টাকা সরকার দিত,তার সিংহভাগ বৃটিশ সরকারের শাসকেরা চালাকি করে কাজ না করে ফেরত পাঠায়।যতটুকু টাকা থাকত,তাতে শুধু সরকারী কর্মচারীদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটি বেশি দেখা হত। অর্থাৎ কী বলতো,মোদের গায়েগতরেই খাটা টাকা,তার ট্যাক্সের জোরে বাঁদরবেল্লিকরা ফুর্তি করে চলেছে। এসব আর চলবে না,নতুন আইন, নতুন নিয়ম হবে। মোদের অধিকার মোরা নিজেরা বুঝে নেব।

কিন্তু মোদের কথা কি শুনবে? একজন বয়স্ক লোক মৃদুস্বরে বলে উঠল।

ইংরেজ সরকার শুনবে না,কিন্তু যদি মোদের লোক সরকারের লোক হয়, তখন তো শুনবে, কী বলিস ভাইসব? 

ঠিক ঠিক। কিন্তু মোদের লোক ওদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে?এতো ইংরেজ পুলিশ,এতো চর, এতো জমিদার, এতো ম্যাজিস্ট্রেট, মোদের লোক কি পারব লড়াই করতে?

পারবে রে পারবে, মোদের লোক যে সে নয়,বীরেন শাসমল তাঁর নাম,মেদিনীপুরের মুকুটহীন রাজারে, তাঁকে যদি মোরা জেতাতে পারি,আমাদের ভোল বদলে যাবে..

বীরেন শাসমল একা কি লড়াই করতে পারবে? মোদের বাঁচাতে পারবে? 

আরে স্বয়ং রামচন্দ্র একা লড়েননি, সুগ্রীব-জাম্বুবান, হনুমানদল নিয়ে লড়াই করেছিলেন,ঠিক সেই রকম মোরা সবাই বীরেন শাসমলের হয়ে লড়াই করব।পারবি সব ভাই সকল এবার সত্যিকারে লড়াই দিতে?

আবার সমস্বরে চিৎকার, হ্যাঁ,পারব 

কুমারচন্দ্র আরো জোরে চিৎকার করে বললেন,পারতেই হবে,মনে রাখিস ভাইসব, ইংরেজ সরকার, মোদের নেই দরকার 

আবার চিৎকারে সেই কথাটির  প্রতিধ্বনিতে যে সভা ফেটে পড়ল।জনগণের সেই জোর গলায় সমর্থন এবং কাজ করার জন্য মরিয়া ভাব দেখে সূর্যকান্ত এগিয়ে এসে কুমারচন্দ্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন,বন্ধু, যে সভায় কুমারচন্দ্র থাকবে,সেখানে আর কাউকে লাগে না! সভার মানুষের মধ্যে থেকে তাদের ঝড়ে পরিণত করতে পারিস,এ এক আশ্চর্য ক্ষমতা! 

কুমারচন্দ্র এসব শুনে শুধু একটি কথা চিৎকার করে বলে উঠলেন,জয় বীরেন শাসমলের জয়। 

মাস দুয়েক পরে। নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে। যেদিন রেজাল্ট, সেদিন প্রায় সকলকেই ফলাফল কেন্দ্রে ভীড় জমিয়েছে। এই ফলাফলের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
সেই সময় কুমারচন্দ্র হোড়খালি নামক একটি গ্রামে আছেন,সেখানে ম্যালেরিয়া একেবারে মহামারির আকার নিয়েছে। তিনি দুজন ডাক্তার নিয়ে সেখানে পৌঁছে গেছেন।
একটি গৃহে দশ-বারো বছরের ছেলে জ্বরে কাবু,তাকে দেখার কেউ নেই। কারণ এক মাসের মধ্যে ছেলেটি অনাথ হয়ে যায়,তার বাবা-মা দু'জনেই ম্যালেরিয়ায় গতি হয়েছে। 
কুমারচন্দ্র ছেলেটিকে আনতে গেছেন, তিনি তাকে জাতীয় বিদ্যালয়ে রাখবেন।
যখন কোলে করে তিনি সুদীর্ঘ পথ হেঁটে অনন্তপুর পৌঁছালেন,তখন চারিদিকে একটা দারুণ আনন্দের সংবাদ ভেসে বেড়াচ্ছিল। বীরেন শাসমল জেলা বোর্ডে জয়ী হয়েছেন।আবার একটা কেন্দ্রে নয়, তমলুক-কাঁথি এবং ডায়মন্ড হারাবার এই দুটি কেন্দ্রে জয়লাভ করেছেন।পরে অবশ্য মেদিনীপুর কেন্দ্রটি চিত্তরঞ্জন দাশকে ছেড়ে দেন।ঐ কেন্দ্রে চিত্তরঞ্জন দাঁড় করান ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়কে। তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। জেলা বোর্ড চেয়ারম্যান হন বীরেন্দ্রনাথ শাসমল। ভাইস চেয়ারম্যান হন কিশোরীপতি রায়।
তারপর বীরেন শাসমল চেয়ারে বসেই কাজ শুরু করে দেন।
কিন্তু এই পর পর জয়ের নেপথ্যে যিনি সেই কর্মীর সন্ধানে বীরেন্দ্র শাসমল সুতাহাটায় পৌঁছালেন। সেখানে গিয়ে দেখা হল কুমারচন্দ্রের সঙ্গে।বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। 
তারপর সকলের সামনে জিজ্ঞেস করলেন,কুমার, এই জয় আমার একার নয়, এ জয় তোমারও, এই জয় মেদিনীপুরের,বলো তোমার জন্য কী পারি?

কুমারচন্দ্র হাত জোড় করে বলে উঠলেন,একটা অনুরোধ, সুচিকিৎসার অভাবে গাঁয়ের লোকজন মরে যাচ্ছে, তাদের জন্য একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র করে দিন।লোকগুলো একটু চিকিৎসা পাক।

বীরেন শাসমল এগিয়ে এসে বলে উঠলেন,কুমার, তোমাকে যত দেখছি,অবাক হয়ে যাচ্ছি, একটিবারও বোর্ডের সদস্য হওয়া বা কোনো সরকারী পদ চাইলে না,তোমার মতে মানুষের জন্য মেদিনীপুরের মাথাটা সর্বদা উঁচু থাকবে।
তারপর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সচিবকে ডাকলেন।
সচিব কুমারচন্দ্রের সামনে এসে বলে উঠলেন, চেয়ারম্যান পদে শপথ নিয়ে বীরেন শাসমল তথা জেলা বোর্ড যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে,তা শোনালেন।

পানীয় জলের জন্য খরচের পরিমান ২ হাজার টাকা  থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। 
রাস্তাঘাট উন্নয়নের জন্য খরচ ৭ হাজার টাকা থেকে ১১ হাজার টাকা করা হয়েছে। 
আগে মাত্র ৭টি দাতব্য চিকিৎসালয় ছিল,এখন তার সংখ্যা হবে ৩১ টি।

কুমারচন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন,কিন্তু ম্যালেরিয়ার কী হবে বীরেনদা? 

বীরেনচন্দ্র মৃদু হেসে বললেন,তাও ব্যবস্থা করেছি,কুমার,কেরোসিন ছড়িয়ে মশামাছি মারার জন্য বোর্ডের সুইপার নিয়োগ করেছি।এছাড়াও ম্যালেরিয়া নিবারণী সমিতি গঠন করেছি। তাতে ৫ জন ডাক্তার, ৫ জন হেলথ ইন্সপেক্টর, ১০ জন স্যানাটারি অ্যাসিস্টান্ট থাকবে।সেই সঙ্গে ২৫-৩০ জন জুনিয়ার ডাক্তার অস্থায়ী ভাবে কাজ করবে।আচ্ছা, সেই হোড়খালির ছেলেটি কেমন আছে? 

আজ্ঞে, এখনও শরীর দুর্বল, চিকিৎসা করাচ্ছি,জ্বর থামল তো পেট খারাপে পড়ে আছে।

আচ্ছা, আমি ডাক্তার পাঠিয়ে দেবো,কলেরার ভ্যাক্সিন দেওয়ার দরকার হলে দিয়ে দেবে।

আপনার অশেষ করুণা বীরেনদা 

সে হল, এবার কী করবে? এখন তো নির্বাচন শেষ,তাহলে আমার সঙ্গে জেলা বোর্ডে চলে এসো, কোনো একটা চাকরির চেষ্টা করব তোমার জন্য, 

না,বীরেনদা, আমার জন্য কোথায় আপনি অনুরোধের জায়গায় যাবেন না! বরং এই গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করে চলুন,আমি একটা ব্যবসার কথা ভাবছি

আবার? 


হ্যাঁ,একটা মিষ্টির দোকান করব,ভাবছি কলকাতায় 

আচ্ছা, তাহলে স্বাধীন দেশ এখনও না হোক,স্বাধীন ব্যবসার কথা ভেবেছো,এটাই দারুণ। বলেই কুমারচন্দ্রের পিঠ চাপড়ে দিলেন।

ইংরেজ রাজসরকার এই সব নির্বাচনের ফলাফল দেখে বুঝল,যাঁকে তাঁরা গান্ধি বলে জানে,যাঁকে তাঁরা লালা লাজপত বলে জানে,যাঁকে তাঁরা চিত্তরঞ্জন দাশ বলে জানে অথবা বীরেন্দ্রনাথ শাসমল বলে জানে, আসলে তাঁদের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে এই সংগ্রামীরা,শত শত, হাজার হাজার,কোটি কোটি যাঁদেরকে লোকে কুমারচন্দ্র বলে।
টনক নড়ল!
তখন প্রথম শ্রেণির নেতাদের পাশাপাশি কুমারচন্দ্রদের ভয় পেতে শুরু করল বৃটিশ রাজশক্তি। এই ভয় মারাত্মক রকমের ভয়! এই ভয় সত্যিকারের ভয়! 
সকলে চলে গেলেন,জীবেশ পট্টনায়েক কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বলে উঠলেন,কী কুমার,বীরেন শাসমলের ডাক নিলেন না! বোর্ডের কোনো পদ পেলে, কোনো চেয়ার পেলে কত লাভ হত আপনার?  আপনি তো এই নির্বাচনে মনপ্রাণ দিয়ে লড়লেন? কোনো দাবি নেই আপনার? 

আছে তো,গ্রামের মানুষগুলো কত উপকার হচ্ছে, এই যা বীরেনদা বললেন,এর সবই হবেই, হবে।

তা হলেও একটা চেয়ার পেলে আপনার কত ক্ষমতা বাড়ত!

কুমারচন্দ্র তখন নিচু হয়ে একমুঠো ধুলো তুলে বললেন,জীবেশ, এই মাটিই কিন্তু সবকিছু, অথচ কোনোদিন মাটিকে সিংহাসনে বসতে দেখেছো! আমি মাটির মানুষ,মাটি দিয়ে গড়া,মাটি তো মা, মাটি তো দেশ, মাটির মানুষের কাছে থাকতে চাই শুধু সেই মাটির সেবা করে যেতে চাই,আর কিছুই চাই না!

বলেই কুমারচন্দ্র মাঠের পথ ধরে চলতে লাগলেন। জীবেশসহ আরও কংগ্রেসী তরুণ নেতারা বিস্ময়ে সেই মানুষটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
সহসা দূর থেকে বয়ষ্ক আবদুল ফকিরের গান শোনা গেল... 

" পেয়েছি যা কিছু কুড়ায়ে তাহাই
তোমার কাছে মা এসেছি ছুটি, 
বাসনা,তাহাই গুছায়ে যতনে
সাজাব তোমার চরণ দুটি। 
চাহি নাকো কিছু,তুমি মা আমার
এই জানি শুধু নাহি জানি আর
তুমি গো জননী হৃদয় আমার
তুমি গো জননী আমার প্রাণ!

চাহি না অর্থ, চাহি না মান
যদি তুমি দাও তোমার ও-দুটি 
অমল-কলম চরণে স্থান। "

ক্রমশ...

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি