বিপত্তারিণী /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ২৮

বিপত্তারিণী

ভাস্করব্রত পতি

কোনো এক সময় এক রাজা ছিলেন। সেই রাজার এক সুন্দরী রাণী ছিল। একদিন রাণীর ইচ্ছে হল গোমাংস খাবেন। সেই মোতাবেক রাজার চোখ এড়িয়ে বিশ্বাসী পরিচারিকাকে দিয়ে গোপনে রাজবাড়ীর অন্দরমহলে নিয়ে আসা হল গোমাংস। সেটিকে বিছানার খাটের তলায় লুকিয়ে রাখলেন রাণী। কিন্তু যে কোনো ভাবেই হোক রাজামশাই জানতে পারলেন রাণীর অভিপ্রায়। রেগে অগ্নিশর্মা রাজা। রাণীর এতো বড় দুঃসাহস! হিন্দু হয়ে গোমাংস খেতে চায়! সঙ্গে সঙ্গে রাজা পেয়াদা ডাকলেন। আজ রাণীকে যথাযোগ্য শাস্তি দেবেন। রাজামশাই নিজেই চললেন অন্তঃপুরে। ইতিমধ্যে রাজামশাইয়ের আসার খবর জেনে গিয়েছেন রাণী। ভয়ে থরহরি কম্পমান। আজ নির্ঘাত মৃত্যু। মুণ্ডুচ্ছেদন হবেই হবে! ঘোর বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রাণী করজোড়ে ডেকেই চলছেন ঈশ্বরকে। চোখ বেয়ে জলের ধারা। যে কোনো মূল্যে এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধারের প্রার্থনা তখন রাণীর চোখে মুখে আর মননে। যথারীতি রাজামশাই অন্তঃপুরে এলেন সঙ্গীসাথী সহ। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলেন গোমাংস কোথায় রেখেছেন রাণী। এতো বড় দুঃসাহস! বিধর্মীর মতো কাজকে কখনোই রেয়াত নয়। খুঁজতে খুঁজতে রাজার পেয়াদারা দেখতে পেলো খাটের তলায় একটা ঝুড়িতে কিছু একটা রাখা আছে! এদিকে রাণী তো ভয়ে তটস্থ। এবার বুঝি জেনে গেলেন রাজামশাই। মনপ্রাণ দিয়ে দেবী দুর্গাকে ডেকেই চলেছেন করজোড়ে। পেয়াদারা ঝুড়ি খুলে দেখতে পেলো তাতে রয়েছে পূজার ফুল ১৩ প্রকারের এবং পূজার ফুল ১৩ রকমের! রাজা চমকে উঠলেন। তাহলে তাঁকে মিথ্যে খবর দেওয়া হয়েছিল রাণীমার গোমাংস ভক্ষনের নামে। রাজা নিজের ভুল বুঝতে পেরে এবং রাণীমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলেন। এদিকে রাণী তো হতবাক! এই বিপদ থেকে কিভাবে উদ্ধার হলেন তিনি? আসলে দেবী দুর্গা মা রাণীর ডাকে সাড়া দিয়ে এই ঘোরতর বিপদ থেকে তাঁকে রাজার রোষানল থেকে বাঁচিয়েছেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন "বিপত্তারিণী"। ভক্ত মনপ্রাণ দিয়ে ডাকায় যিনি ভক্তকে উদ্ধার করেন, তিনিই তো 'বিপত্তারিণী'। এই ব্রতকাহিনী ব্রাম্ভণ ঠাকুর প্রতিটি ব্রতীনীদের বিপত্তারিণী পূজার সময় শোনান। এই কাহিনী শোনার পরেই বিপত্তারিণী পূজার ফললাভ সম্পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস। প্রতি বছর আষাঢ়ের রথযাত্রার পর প্রথম যে মঙ্গলবার বা শনিবার পড়ে সেই দিনেই হয় এই লৌকিক উৎসব। গ্রামবাংলার সধবা মহিলাদের একান্ত নিজস্ব উৎসব।

দৈনন্দিন সকল বিপদ আপদ থেকে ভক্তদের রক্ষা করেন বিপত্তারিণী। কিভাবে 'বিপত্তারিণী' নামের সৃষ্টি হল, তা নিয়ে আরও নানা পৌরাণিক কাহিনীর সন্ধান মেলে। একসময় মহর্ষী নারদ ঢেঁকিতে চেপে পৃথিবী ভ্রমণ করতে করতে করতোয়া নদীর তীরে এলেন। সেখানে দেখলেন যে কয়েকজন মহিলা জড়ো হয়ে দেবী দুর্গার পূজা করছেন। কেউ কেউ দেবী দুর্গার অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করছেন। সেসময় ঐ মহিলারা নারদকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে, মা দুর্গা কিভাবে 'বিপত্তারিণী' নামে পরিচিত হলেন। তখন নারদ তাঁদের তা জানাতে এবং শোনাতে উদ্যত হলেন। তিনি জানান, দেব এবং অসুরগন যখন সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, তখন সমুদ্র থেকে 'কালকূট' বিষ উত্থিত হয়েছিল। সেই বিষ দেবাদিদেব মহাদেব শ্রীদুর্গার নাম স্মরণ করে কন্ঠে ধারণ করেন। ফলে ধরাধাম বিপন্মুক্ত হয়। কিন্তু শিবের গলা নীল বর্ণের হয়ে যায়। তাই তাঁর নাম হয় 'নীলকন্ঠ'! আর বিষের জ্বালার বিপদ থেকে দুর্গাই শিবকে রক্ষা করেছিলেন বলে দুর্গার অপর নাম হয়ে যায় 'বিপত্তারিণী'।

এরকম আরও একটি প্রচলিত কাহিনীর সন্ধান মেলে 'বিপত্তারিণী' নামের উৎস সন্ধানে গিয়ে। গরু চরাতে যাওয়ার সময় শ্রীকৃষ্ণের মা যশোদা দুর্গানাম স্মরণ করে শ্রীকৃষ্ণের হাতে রক্ষাকবচ বেঁধে দিতেন। যাতে শ্রীকৃষ্ণের কোনো বিপদ না আসে। শ্রীকৃষ্ণ যদি কখনও বিপদে পড়তেন, তখন তিনি মা দুর্গাকে স্মরণ করে সব বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেতেন। এমনকি তিনি একবার মুখে 'দুর্গা দুর্গা' উচ্চারণ করে কালীদহে ঝাঁপ দিয়ে 'কালীয়দমন' করেছিলেন। দেবী দুর্গা শ্রীকৃষ্ণকে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন বলেই শ্রীদুর্গার নাম হয়েছে 'বিপত্তারিণী'।  

সধবা নারীরা পরিবার পরিজনের বিপদ থেকে রেহাই, স্বামীর আয়ু বৃদ্ধি, নানাবিধ রোগমুক্তি এবং সন্তান সন্ততির মঙ্গলকামনায় দেবী বিপত্তারিণীর শরণাপন্ন হয়। আগের দিন নিরামিষ আহার করতে হবেই। আর বিপত্তারিণী পূজার দিন ব্রতীনী মহিলাদের তণ্ডুল জাতীয় খাবার তথা ভাত, মুড়ি খাওয়া চলবে না। 

শান্ত স্নিগ্ধ শোভন মনে এবং দেহে সধবা মহিলারা পেতলের রেকাবে 'ডালা' সাজায়। তাতে থাকে ১৩ রকমের কাটা ফল, ১৩ রকমের ফুল, ১৩ টি পান, ১৩ টি পিঠা ( এলাকা বিশেষে ) সহ দেবীর ভোগের নানা নৈবেদ্য। ডালাতে রাখা থাকে পানের খিলি, দূর্বা, সুজি, লুচি ইত্যাদি। লাল ক্রচেট সূতো বা লাল উল পাকিয়ে বিশেষ উপায়ে তৈরি 'ডুরি'ও থাকে ১৩ টি। এই ডুরিতে মোট ১৩ টি গাঁট দেওয়া থাকে। সেইসাথে দূর্বা লাগানো থাকে এতে। এই ডুরি ছেলেদের ডান হাতে এবং মেয়েদের বাম হাতে পরাতে হয়। ঐ ডালা নিয়ে মহিলারা দল বেঁধে যান নিজের গ্রামে বা পার্শ্ববর্তী গ্রামের শীতলার থানে। সেখানে পূজা দেওয়া হয় এবং ব্রাম্ভণ ঠাকুরের মুখে শুনতে হয় বিপত্তারিণীর কাহিনী। অনেক যায়গায় অবশ্য বিপত্তারিণীর মূর্তি বানিয়ে পূজা করা হয়।

পূজা শেষ হলে পূজার প্রসাদ অল্প অল্প করে সকলকে বিতরন করা হয়। ১৩ জনের হাতে বেঁধে দেওয়া হয় দূর্বা লাগানো ১৩ টি গাঁটযুক্ত বিপত্তারিণীর ডুরি। বিশ্বাস যে, এই ডুরি যাঁর হাতে থাকবে তাঁকে কোনো বিপদ স্পর্ষ করবেনা বিপত্তারিণীর দয়ায়। আর ভাত মুড়ির পরিবর্তে ব্রতীনীরা ঐ ডালার নৈবেদ্যই খান। তাছাড়া বাড়িতে সেদিন লুচি, সুজি, তরকারি হয়। দই, চিড়াও খাওয়া যায়। সারাদিন সেইসব খেতে হবে ব্রতীনীদের। এয়োস্ত্রীরা একজন অন্যজনের কপালে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেন। যাতে সে স্বামী পুত্র সংসার নিয়ে সুখে থাকে।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি